Alexa কোরআন সংকলনের ইতিহাস (পর্ব: ৩)

কোরআন সংকলনের ইতিহাস (পর্ব: ৩)

সাইয়েদ মানাযির আহসান গিলানি (রহ.) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৪৪ ১৪ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৮:৪৬ ১৪ আগস্ট ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

যেই ঐতিহাসিক বাস্তবতা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।

বাস্তবতা হলো, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরআন কারিমকে যে সকল বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পৃথিবীর হাতে অর্পণ করেছেন, প্রথম দিন থেকে আজোব্দি কোনো ধরনের পরিবর্তন, বিকৃতি, পরিমার্জন ও পার্থক্য ব্যতিরেকে ঠিক সেভাবেই কোটি কোটি মুসলমান এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে হস্তান্তর করে এসেছে। এই মধ্যবর্তী সময়ে এক দু’বছর তো পরের কথা, এক মুহূর্তের জন্যেও কোরআন কারিম মুসলমানদের হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি এবং মুসলমানরাও কোরআন কারিম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। 

বর্তমান যুগে তো মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটেছে। মুদ্রণের অজস্র মাধ্যম বেরিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে এখন গালগল্পের বই বা দাদিমা ও বুড়ির আষাঢ়ে গল্পের মতো অতি সাধারণ মানের বই যেখানে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেয়েছে, সেখানে তো কোরআন কারিমের বিলুপ্তির কোনো যৎসামান্য শঙ্কাও থাকতে পারে না।

এতক্ষণ পর্যন্ত আমি কোরআন কারিমের সেই অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যগুলো উপস্থাপন করেছি, যেগুলো থেকে প্রাপ্ত ফলাফল সেই অমুসলিমরাও স্বীকার করে, যারা এখন পর্যন্ত এই গ্রন্থকে আল্লাহর গ্রন্থ বলে স্বীকার করেনি। হ্যাঁ, আমরা যারা কোরআনকে আল্লাহর কালাম স্বীকার করি, তাদের জন্য তো আলোচিত ফলাফলগুলো অস্বীকার করার কোনো ধরনের সুযোগই নেই। কেননা, এটি সেই গ্রন্থ, যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই।’ (সূরা: হামিম সাজদা : ৪২)।

এ আয়াতের সারাংশ হলো, অর্থাৎ যা কোরআনের অংশ নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা এ দায়িত্ব নিয়েছেন যে, বাতিল যত পথ ধরেই চেষ্টা করুক না কেনো, কোনোভাবেই সে কোরআন কারিমের মাঝে কোনো কিছুর অনুপ্রবেশ করাতে পারবে না। কাজেই এ কথা স্পষ্ট যে, এই শব্দগুলোকে যারা আল্লাহর বাণী বলে মেনে নিয়েছে, তারা নিজেদের মুসলমানিত্বের প্রতি লাজ রেখে কখনো কী এ কথা কল্পনা করতে পারবে যে, সেই কোরআনের মাঝে অন্য কেউ কোনো শব্দ বা কোনো অণু পরিমাণ জিনিস যুক্ত করেছে!

কোরআন কারিমের মাঝে যেভাবে অণু পরিমাণ অনুপ্রবেশ ঘটেনি, তেমনি অণু পরিমাণ বিয়োজনও ঘটেনি। সূরা কিয়ামাহর নিমোক্ত আয়াত গভীর মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন করলে বিষয়টি বুঝে আসবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্ব। অতপর আমি যখন তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন। এরপর বিশদ বর্ণনা আমারই দায়িত্ব।’ (সূরা কিয়ামাহ : ১৭-১৯)।

কোরআন কারিম অবতীর্ণকারী মহান আল্লাহ এ আয়াতে নিজেই বলেছেন ‘এর সংরক্ষণ আমারই দায়িত্ব।’ মহান আল্লাহর ওই ঘোষণার পর এখন কী আর এ সুযোগ থাকে যে, কোরআন কারিমের মাঝে তিনি যে জিনিসগুলো একত্র করেছেন, সেগুলোর কোনোটিকে কেউ বের করে দেবে, বা স্থানচ্যুত করবে। বরং আপনি যদি পরবর্তী শব্দটির প্রতি গভীর মনোযোগ দেন তাহলে দেখতে পাবেন, আল্লাহ তায়ালা অহেতুক শব্দের পর শব্দ যুক্ত করেননি। বরং এ দুটি শব্দের সমন্বয়ের প্রতি দৃষ্টি দিলে বুঝে আসে যে, এখানে কিছু উদ্ভূত প্রশ্ন ও সন্দেহ-সংশয়ের নিরসনের খোরাক রয়েছে। কারো মনে এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এই দুই শব্দ জমানুসারে আল্লাহ তায়ালা শুধু কোরআন একত্রকরণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। যার থেকে বুঝে আসে যে, আল্লাহ তায়ালা কাউকে কোরআনের কোনো অংশ গায়েব করতে দেবেন না। যতদিন পৃথিবী অবশিষ্ট থাকবে, কোরআনের প্রতিটি অংশ বহাল ও অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু এই পৃথিবীর বুকে এমন অজস্র বই-পুস্তক রয়েছে, যা কেউ কখনো পাঠ করে না। এমতবস্থায় সেই বই-পুস্তকের পৃথিবীতে থাকা-না থাকা সমান। 

আপনি আয়াতটির মর্ম ভেবে দেখলে বুঝবেন যে, আল্লাহ তায়ালা এই দুই শব্দের মাধ্যমে সেই আশঙ্কার নাকচ করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা উল্লিখিত শব্দের মাধ্যমে এই দায়িত্বগ্রহণের কথাও বলে দিয়েছেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা এই কোরআনের পাঠক সৃষ্টি করতে থাকবেন। এ সময় পর্যন্ত সেই যিম্মাদারি মহান আল্লাহ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন, যেমনটি গোটা বিশ্ববাসী দেখছে। কাজেই  উক্ত শব্দদয় থেকে এ ব্যাখ্যা সুন্দরভাবে বুঝে আসছে যে, আল্লাহ তায়ালা যেভাবে কোরআন কারিমের প্রতিটি অংশ সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, তদ্রুপ এই মহাগ্রন্থের পাঠ ও পাঠদানের দায়িত্বও তিনি গ্রহণ করেছেন।

এখন নতুন একটি প্রশ্ন উঠতে পারে। তা হলো মেনে নিলাম, কোরআন অক্ষুণ্ণভাবে একত্র থাকবে। এ মহাগ্রন্থের পাঠদানকারীও বহাল থাকবে। কিন্তু কোরআন বোঝা ও বোঝানোর লোক থাকবে না। তখন তো কোরআনের উপকারিতা নিঃশেষ হয়ে যাবে। যেমন, আজকাল বেদ সম্পর্কে হিন্দুদের বিশ্বাস রয়েছে যে, এই ধর্মগ্রন্থের ভাষা এতোটাই পুরনো হয়ে গেছে যে, অভিধানের সহায়তা নিয়েও বেদের মর্মোদ্ধার করা সীমাহীন দুরহ।

সেই সংশয়ের নিরসন আপনি পেয়ে যাবেন এ আয়াতে, যেখানে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এরপর বিশদ বর্ণনা আমারই দায়িত্ব।’ তাহলে বলুন, যেই মহাগ্রন্থের অর্থ ও শিক্ষ্যার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পূর্ণ দায়িত্ব সেই আল্লাহ তায়ালা নিয়েছেন, যিনি শুধু অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতই নয়; অনাদিকাল থেকে অনন্তকাল বিরাজমান। এমন অবিনশ্বর সত্তা কেনো নিজ দায়িত্ব ইতিহাসের কোনো এক সময়ে পালন করবেন না? কোরআন কারিমের ভাষ্য থেকে এ কথা বুঝে আসে এবং ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় যে, প্রতিটি যুগের চাহিদা অনুসারে কোরআন কারিমের মর্ম ও শিক্ষার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকারী কাফেলা সর্বযুগেই ধারাবাহিক ছিলেন। এ কথাটিকেই সংক্ষেপে কোরআন কারিমের একটি বিখ্যাত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ফুটিয়ে তুলেছেন, যে আয়াতটি প্রায় সময় উলামায়ে কেরাম তাদের ওয়ায-নসিহতের মাঝে জনগণকে শুনিয়ে থাকেন ‘আমি স্বয়ং এ উপদেশগ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ (সূরা হিজর : ৯)।

সারকথা হলো, আমরা যদি বাইরের সবগুলো সাক্ষ্য এক পাশে রেখে শুধু কোরআন কারিমের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যগুলো লক্ষ্য করি, তাহলে কোরআন কারিম সম্পর্কে যতগুলো প্রশ্নের বুদবুদ ক্ষণে ক্ষণে আমাদের হৃদয়-পুকুরে ভেসে ওঠে, আমাদের সেসব প্রশ্ন ও সংশয়ের উত্তর আমরা অনায়াসে কোরআন কারিমের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের কাছেই পেয়ে যাবো। চলবে...

সংকলন: মাওলানা ওমর ফারুক

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics
Best Electronics