Alexa কোরআন সংকলনের ইতিহাস (পর্ব-১)

কোরআন সংকলনের ইতিহাস (পর্ব-১)

সাইয়িদ মানাযির আহসান গিলানি (রহ.) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৩৪ ১১ জুন ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

অন্যান্য আসমানি গ্রন্থসমূহের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক: ঐতিহাসিকভাবে এ কথা নির্ধারণ করা শুধু কঠিনই নয়; বরং অসম্ভব যে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবসম্প্রদায় প্রথম কোন আসমানি গ্রন্থ পেয়েছিলো? সেটি কোনটি? কখন ও কোথায় সেই গ্রন্থ পেয়েছিল? 

কোরআন কারিম সংক্ষিপ্তভাবে শুধু এ কথা বলেছে যে, প্রত্যেক উম্মতের মাঝে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে একজন ভীতিপ্রদর্শনকারী আসমানি নির্দেশনার শিক্ষা নিয়ে এসেছেন। যেভাবে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কোরআন কারিমের অহি অবতীর্ণ হয়েছে, একইরুপে তাঁর পূর্বে হজরত নুহ আলাইহিস সালাম ও তাঁর পরবর্তীকালের অন্যান্য আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের ওপর অহি অবতীর্ণ হয়েছিল। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনার প্রতি ওহী পাঠিয়েছি, যেমন করে ওহী পাঠিয়েছিলাম নূহের প্রতি এবং সে সমস্ত নবী-রাসূলের প্রতি যারা তাঁর পরে প্রেরিত হয়েছেন।’ (সূরা নিসা : ১৬৩)

এ প্রসঙ্গে কয়েকজন মহান নবীর নাম স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর আল্লাহ তায়ালা এ কথাও বলেছেন, ‘এছাড়া এমন রাসূল পাঠিয়েছি যাদের ইতিবৃত্ত আমি আপনাকে শুনিয়েছি ইতোপূর্বে এবং এমন রাসূল পাঠিয়েছি যাদের বৃত্তান্ত আপনাকে শোনাইনি’ (সূরা নিসা : ১৬৪) এ আয়াত থেকে বুঝে আসে যে, মানব জীবনের সৎ ও অসৎ পরিণতিকে ইলম ও আমলের ব্যবস্থাপনার ওপর সুসংবদ্ধ করার জন্যে এবং তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শিখিয়ে দেয়ার জন্যে নবী-রাসূলদের আগমনের ধারাবাহিকতা সর্বযুগে অব্যাহত ছিলো। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সে কথা স্পষ্টাকারেও জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের জন্যে দীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম হজরত ইব্রাহিম, হজরত মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।’ (সূরা শূরা: ১৩)

অন্য আয়াতে বলেছেন, ‘অতএব তারা কী এ কথা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না? না তাদের কাছে এমন কিছু এসেছে, যা তাদের পিতৃ-পুরুষদের কাছে আসেনি?’ (সূরা মুমিনুন : ৬৮) এখানে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মানবজীবনের প্রাকৃতিক সংবিধান মানবতার একটি সর্বসম্পৃক্ত উত্তরাধিকার সম্পত্তি। এটাকেই কেউ দীন শব্দে, কেউ ধর্ম শব্দে, কেউ আবার এ অর্থের অন্য শব্দে ব্যক্ত করেছেন। মৌলিকভাবে সেই সংবিধান এক ও অভিন্ন। পার্থিব জীবনের সূচনালগ্ন থেকে শেষ পর্যন্ত মানবসম্প্রদায়ের ইতিহাসের প্রতিটি যুগে সেই সংবিধান মেনে চলার আহ্বান ঘোষিত হয়েছে। সেই সংবিধান মেনে চলার দাবি ওঠাটাই স্বাভাবিক ছিল। কেননা সংবিধানপ্রণেতা যখন একজনই এবং যাদের জন্যে সংবিধান প্রণয়ন করা হচ্ছে, তারাও যখন একই সম্প্রদায়ের, কাজেই অভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে একক স্রষ্টার  পক্ষ থেকে নির্দেশিত সংবিধান এক ও অভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। হ্যাঁ, যাদের জন্যে সংবিধান প্রণীত হয়েছে, সেই মানবসম্প্রদায়ের সদস্যদের চেহারা-সুরতের মাঝে পার্থক্য থাকতে পারে। ত্বকের বর্ণের মাঝে ভিন্নতা থাকতে পারে। তাদের অবস্থানস্থল ভিন্ন হতে পারে। কেউ সাগর, নদী ও পর্বত বেষ্টিত অঞ্চলে বসবাস করতে পারে। কেউ বিশেষ পরিবারের সন্তান হতে পারে। তাদের পরস্পরে ভাষার পার্থক্য থাকতে পারে। তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্তরের মাঝে ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু এগুলোর কারণে তাদের প্রাকৃতিক স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য বদলে যেতে পারে না।

কাজেই জীবনের সেই আদি সংবিধান, যা আমাদের সূচনালগ্নের পিতৃ-পুরুষগণ পেয়েছিলেন, মৌলিকভাবে সেই সংবিধানই পরবর্তীকালের বিভিন্ন প্রজন্মের মাঝে নানা সময় পুনঅবতীর্ণ হতে থাকে। কাজেই ধর্ম ও ব্যক্তিজীবনের সেই সংবিধান আমাদের সবার সম্মিলিত উত্তরাধিকার সম্পত্তি। এর পাশাপাশি আরেকটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা আমাদের মনে রাখতে হবে। তা হলো, স্রষ্টারপ্রদত্ত সেই সংবিধানের অক্ষুন্নতা ও তত্তাবধানের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী তাদের সমকালে গাফলতি ও উদাসীনতার শিকার হয়েছে। তারা আল্লাহর সবিশেষ শিক্ষা থেকে সরে এসে নিজেদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ কিছু মানুষের তৈরিকৃত রুসম-রেওয়াজের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ে। এটাই সেই ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা, যা বিভিন্ন যুগ ও বিভিন্ন অঞ্চলে নবী-রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ মানুষ যখন আল্লাহর সেই বিশেষ শিক্ষা ও নির্দেশনা থেকে সরে পড়ে তখন সেই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত আদি সংবিধানের দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্য থেকে নবী-রাসূল সৃষ্টি করেন এবং তাঁদের মাধ্যমে তাদের আদি সংবিধানে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। 

এখানে উচিৎ ছিলো, সংবিধান প্রণয়নকারী সত্তা যেহেতু একজন এবং যাদের জন্যে সংবিধান প্রণয়ন করা হলো, তারা যেহেতু একই গোষ্ঠীর সদস্য, কাজেই এ দৃষ্টিকোণ থেকে সবাই সেই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সংবিধানকে সবার ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য আইন হিসেবে স্বীকার করে নেবে। কিন্তু যেহেতু সেই আসমানি সংবিধানের সত্যায়ন, সংশোধন, পূর্ণতাদান ইত্যকার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নবী-রাসূল আগমন করেছেন, বিস্ময়ের বিষয় হলো, সেই এক ও অভিন্ন সংবিধান উপস্থাপনকারী নবীদের সংখ্যাধিক্য দেখে সবার মাঝে এই ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, পৃথিবীতে ধর্ম একটা নয়; অনেকগুলো ও ভিন্ন ভিন্ন।

কোরআন হলো পূর্বের আসমানি গ্রন্থসমূহের শেষ সংস্করণ। প্রশ্ন হলো, যদি কোনো লাইব্রেরি থেকে কয়েকজন মানুষ একটি গ্রন্থের কয়েকটি অনুলিপি নিয়ে বের হয়, তাহলে বাহকের এই ভিন্নতার কারণে কী সেই একটি গ্রন্থই কয়েকটি গ্রন্থ হয়ে যাবে?  আরেকটি প্রশ্ন। যদি কোনো লেখকের কোনো বইয়ের একাধিক সংস্করণ বের হয় তাহলে কী এই কথা বলা সঠিক হবে যে, লেখক একটি নয়; একাধিক বই লিখেছেন? 

এটাই বাস্তব যে, কোরআন কারিম পূর্বের সকল আসমানি গ্রন্থের সঙ্গে তার সম্পর্কের ব্যাপারে ঠিক এ দাবিটাই করেছে। অর্থাৎ কোরআন নিজেকে পেছনের সমস্ত আসমানি গ্রন্থের সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ অভিহিত করেছে। এ দাবির মাধ্যমে কোরআন পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান সবগুলো জাতি-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়কে এ আহ্বান জানিয়েছে যে, তাদের হাতে আসমানি গ্রন্থের যেই পুরনো, সন্দেহযুক্ত, সংশয়মিশ্রিত বা অপূর্ণাঙ্গ ও অসম্পূর্ণ সংস্করণগুলো রয়েছে, সেগুলোকে যেন এই সর্বাধুনিক, পূর্ণাঙ্গ সংস্করণের সঙ্গে মিলিয়ে নিজ নিজ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত গ্রন্থগুলোকে শুদ্ধ করে নেয়। কোরআন পৃথিবীর সকল জাতি-গোষ্ঠীর সামনে এ দাবিটাই উত্থাপন করেছে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, কোরআন কারিমের এ দাবির অর্থ এ নয় যে, দুনিয়ার অপরাপর জাতি-গোষ্ঠীর হাতে যেই আসমানি সংবিধান রয়েছে এবং তারা তাদের পিতৃ-পুরুষ থেকে যেই ধর্ম পেয়েছে, সেগুলো থেকে নিজেকে শতভাগ ছাড়িয়ে, পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ করে একদম নতুন দীন ও সংবিধান হিসেবে কোরআন কারিমকে মেনে নেবে। নিঃসন্দেহে কোরআন কখনোই এ ধরনের দাবি তোলেনি। তদ্রুপ কোরআনের অনুসরণকারী উম্মাহর পক্ষ থেকেও এ ধরনের দাবি ওঠেনি। 

এ থেকে অনুমান করে নিন যে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু যিনি বনি ইসরাইলের অন্যতম বিদগ্ধ জ্ঞানী ছিলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাইআত হন তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কী কোরআনের পাশাপাশি তাওরাতও পড়তে পারব? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আপনি এক  রাতে কুরআন পড়ুন। অন্য রাতে তাওরাত পড়ুন।’ (তাযকিরাতুল হুফফায লিয যাহাভি : ১/২৬)

‘তবাকাতে ইবনে সা‘দ’ গ্রন্থে আবুল জিলা আল জাওনির জীবনালেখ্যে এসেছে যে, তার অভ্যাস ছিলো, তিনি সাত দিনে কোরআন ও ছয় দিনে তাওরাত খতম করতেন। তিনি নিজের জন্যে এ প্রচলন বানিয়ে নিয়েছিলেন। খতমের দিন তিনি লোকদের একত্র করতেন, এদিন রহমত নাজিল হবে, এ প্রত্যাশায়। (ইবনে সা‘দ : ১/১৬১)

আর বাস্তবতা হলো, আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, এ ধরনের আসমানি গ্রন্থগুলো পড়লে কোরআন কারিমের সঠিক দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া যায়। ইঞ্জিল ও তাওরাতের ব্যাপারে নতুন করে বলার নেই। আমি যদিও সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে অবগত নই; কিন্তু উর্দুতে বেদের যে সব অংশের অনুবাদ হয়েছে; আমি সেগুলো পড়ছিলাম। যজুর্বেদের এক জায়গায় এসে আমি এ বাক্য পেলাম, যার অর্থ হলো, ‘হে অগ্নি, তুমি দৃষ্টিনন্দন শাবক। বিভিন্ন চারা থেকে নির্গত তুমি। অন্ধকার দূরকারী। জল পেলে হুল্লোড়কারী হিসেবে তুমি সৃজিত হয়েছো।’ (অধ্যায় : ১১/৪৩)

যদিও সেই অভিজ্ঞতা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে গিয়ে আমি ভয় পাচ্ছি। তবে যা ঘটেছে, তা অকপটে বলছি। ওই শ্লোক তৎক্ষণাৎ আমার মস্তিষ্ককে কোরআন কারিমের এ আয়াতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়, যেখানে ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমরা যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত কর, সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কী? তোমরা কী এর বৃক্ষ সৃষ্টি করেছ, না আমি সৃষ্টি করেছি? (সূরা ওয়াকিয়া : ৭১-৭২)

কাছাকাছি ধরনের বক্তব্য সূরা ইয়াসিনেও এসেছে। অধিকাংশ মুফাসসির আরবের একটি বিশেষ গাছের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন যে, সেই গাছের শাখা পরস্পরে ঘষাঘষি করে আরবরা আগুন জ্বালাতো। এ আয়াতে সেদিকে ইশারা করা হয়েছে। কিন্তু যজুর্বেদের এই বর্ণনাভঙ্গি কোরআন কারিমের এই বর্ণনাভঙ্গির সঙ্গে এতোটাই মিলছে যে, আমার মনে হচ্ছে, কোরআন কারিমে যেভাবে ‘গাছ’ নিঃশর্ত রাখা হয়েছে, সেভাবেও তো বিষয়টি মেনে নেয়া যেতে পারে। যেভাবে বেদের মাঝে এসেছে যে, আগুন দৃষ্টিনন্দন শাবক। বিভিন্ন চারা থেকে নির্গত। অর্থাৎ আগুন জ্বালানী কাঠের প্রজ্জ্বলন থেকেই প্রকাশ পায় এবং সেখান থেকে শো শো শব্দ তুলেই সৃষ্টি হয়। কোরআন কারিমেও কী সেদিকেই ইশারা করা হয়েছে? চলবে...

সংগ্রহ: মাওলানা ওমর ফারুক

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে