কোরআন নাজিলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও পরিচিতি

কোরআন নাজিলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও পরিচিতি

ধর্ম ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:৪০ ২৮ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ২২:৪৫ ২৮ এপ্রিল ২০২০

‘আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ (সূরা : হিজর, আয়াত : ৯)।

‘আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ (সূরা : হিজর, আয়াত : ৯)।

পবিত্র কোরআনুল কারিম মানবজাতির সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও মুক্তির দিশারি বা পথপ্রদর্শক। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা ওহীর মাধ্যমে- সর্বকালের, সর্বদেশের, সর্বলোকের জীবনবিধান ও মুক্তির সনদ হিসেবে কোরআনকে নাজিল করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন সম্পর্কে ইরশাদ করেন,

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

অর্থ : ‘আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ (সূরা : হিজর, আয়াত : ৯)।

এটি বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত বিশ্বনবী হজরত মুহম্মাদ (সা.) এর প্রতি আল্লাহর কাছ থেকে জিবরাইল ফেরেশতা মারফত সুদীর্ঘ ২৩ বছরে অবতীর্ণ হয়।

পবিত্র কোরআন নাজিলের ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর পেয়ারে হাবিব হজরত মুহম্মাদ (সা.)-কে স্বপ্নের মাধ্যমে এ মহান কাজের জন্য প্রস্তুত করে নিচ্ছিলেন।

মানুষের ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির দিগদর্শণ মুসলিম উম্মাহর জন্য শ্রেষ্ঠতম নিয়ামত আল্লাহর বাণী পবিত্র ‘আল-কোরআন’।

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (আ.) হতে বর্ণিত আছে, প্রিয় নবী হজরত মুহম্মাদ (সা.) এর ওপর ওহী নাজিলের সূচনা হয়েছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি স্বপ্নে যা দেখতেন তা দিনের আলোর মতো তাঁর জীবনে প্রতিভাত হতো।

হযরত জিবরাইল (আ.) এর মাধ্যমে ওহী প্রাপ্তির আগে আস্তে আস্তে তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে ওঠেন, হেরা গুহায় নিভৃতে আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে তিনি মশগুল হয়ে পড়েন এবং বিশাল সৃষ্টি ও তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন।

খাবার পানি শেষ হয়ে গেলে সেসব নেয়ার জন্যেই তিনি শুধু বাড়ি যেতেন। মাঝে মাঝে উনার অতি প্রিয় সহধর্মিণী হজরত বিবি খাদিজা (আ.) উনাকে হেরা গুহায় খাবার দিয়ে আসতেন।

একদিন জিবরাইল (আ.) হজরত মুহম্মাদ (সা.) এর কাছে এসে গভীর কণ্ঠে তাঁকে বলেন ‘ইকরা’ পড়ুন। প্রিয় নবী (সা.) বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। উদ্বেলিত কণ্ঠে তাকে বললেন ‘আমি তো পড়তে জানি না’।

জিবরাইল (আ.) তখন রাসূলে পাক হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে বুকে চেপে ধরে আবার বলেন, পড়ুন। তৃতীয় বার যখন জিবরাইল (আ.) তাঁকে বুকে আলিংগন করে ছেড়ে দিয়ে বলেন, পড়ুন!

তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ওহীর প্রথম পাঁচটি আয়াত, 

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ

خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ

اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ

الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ

عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ

‘পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা : আলাক : প্রথম পাঁচ (১-৫) আয়াত)। পড়লেন। তারপর সঙ্গে সঙ্গে হজরত জিবরাইল (আ.) সেখান থেকে চলে গেলেন। এই হলো পবিত্র কোরআন নাজিলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

এখন আমরা জানবো পবিত্র কোরআনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :

> ৬১০ খ্রিস্টাব্দ ও রমজান মাসের কদরের রজনীতে হেরা পর্বতের গুহায় সর্বপ্রথম কোরআন অবতীর্ণ হয়।

> অবতীর্ণের মোট সময়কাল ২২ বছর পাঁচ মাস ১৪ দিন।

> প্রথম নাজিলকৃত পূর্ণ সূরা হলো সূরা ফাতিহা।

> সর্বপ্রথম নাজিলকৃত কোরআনের আয়াত হলো সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত।

> কোরআনের প্রথম শব্দ হলো ‘ইকরা’-তুমি পড়ো।

> কোরআনের সর্বশেষ নাজিলকৃত সূরা হলো সূরা আন নাস এবং সর্বশেষ নাজিলকৃত আয়াত হলো সূরা বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত।

> কোরআন নাজিল শেষ হয় হিজরি ১১ সালের সফর মাসে।

> কোরআনের সর্ববৃহৎ সূরা হলো সূরা বাকারা। এর আয়াত সংখ্যা ২৮৬।

> কোরআনের সবচেয়ে ছোট সূরা হলো সূরা আল কাওসার। এর আয়াত সংখ্যা ৩।

> পবিত্র কোরআনের মোট সূরা ১১৪টি। এর মধ্যে মক্কি সূরা (হিজরতের আগে বর্ণিত) ৯২টি, মাদানি সূরা (হিজরতের পরে বর্ণিত) ২২টি।

> কোরআনে মোট ৫৪০টি রুকু আছে।

> প্রসিদ্ধ অভিমত অনুযায়ী কোরআনের মোট আয়াত ছয় হাজার ৬৬৬টি। কিন্তু গবেষকদের দৃষ্টিতে মোট ছয় হাজার ২৩৬টি।

> কোরআনের আয়াতের ধরন- আদেশসূচক আয়াত এক হাজার, নিষেধসূচক এক হাজার, সুসংবাদসূচক এক হাজার, ভীতি প্রদর্শনসূচক এক হাজার, কাহিনীমূলক এক হাজার, দৃষ্টান্তমূলক এক হাজার, হালালসংক্রান্ত ২৫০, হারামসংক্রান্ত ২৫০, দোয়া, জিকির ও তাসবিহসংক্রান্ত ১০০টি।

> কোরআনের মোট শব্দ ৮৬ হাজার ৪৩০টি।

> কোরআনের মোট অক্ষর তিন লাখ ৪৭ হাজার ৮৩৩টি, মতান্তরে তিন লাখ ৪৯ হাজার ৩৭০টি, মতান্তরে তিন লাখ ৫১ হাজার ২৫২টি।

> কোরআনের মোট মনজিল সাতটি এবং পারা ৩০টি।

> কোরআনের মোট হরকত- জের ৩৯ হাজার ৫৮২, জবর ৫২ হাজার ২৩৪, পেশ হলো আট হাজার ৮০৪, জজম এক হাজার ৭৭১, নুকতা এক লাখ পাঁচ হাজার ৬৮১, তাশদিদ এক হাজার ৪৫৩, ওয়াকফ্ ১০ হাজার ৫৬৪, মাদ এক হাজার ১৭১ ও আলিফ মামদুদাহ ২৪০টি।

> কোরআনে হরফের সংখ্যা- আলিফ ৪৮ হাজার ৪৭৬ বা ১১ হাজার ৪৪২, তা ১০ হাজার ১৯৯, ছা এক হাজার ২৭৬, জিম তিন হাজার ২৭৩, হা তিন হাজার ৯৭৩, খা দুই হাজার ৪৪৬, দাল পাঁচ হাজার ৬৪২, জাল চার হাজার ৬৭৭, রা ১১ হাজার ৭৯৩, জা এক হাজার ৫৯৩, সিন এক হাজার ৮৯১, শিন দুই হাজার ২৫৩, ছোয়াদ দুই হাজার ১৩, দোয়াদ এক হাজার ৬০৭, তোয়া এক হাজার ২৭৭, জোয়া ৮৪২, আইন ৯ হাজার ২২০, গাইন দুই হাজার ১০৮, ফা আট হাজার ৪৯৯, ক্বাফ ছয় হাজার ৮১৩, কাফ ৯ হাজার ৫০২, লাম ৩৩ হাজার ৪৩২, মিম ২৬ হাজার ৫৬০, নুন ৪৫ হাজার ১৯০, ওয়াও ২৫ হাজার ৫৩৬, হা ১৯ হাজার ৭০, লাম আলিফ চার হাজার ৭২০, ইয়া ৪৫ হাজার ৯১৯টি।

> সর্বপ্রথম কোরআনে নুকতা ও হরকত প্রবর্তন করেন আবুল আসওয়াদ দুয়াইলি, মতান্তরে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ।

> হানাফি মাজহাব মতে, কোরআনে তেলাওয়াতে সিজদা ১৪টি এবং সাকতার সংখ্যা চারটি।

> কোরআনে নবী ও রাসূলের নাম এসেছে ২৫ জনের। ফেরেশতার নাম এসেছে চারজনের। শয়তান শব্দটি এসেছে ৮৫ বার, ইবলিস এসেছে ১১ বার। জিনজাতির প্রসঙ্গ এসেছে ৩২ বার।

> নবীদের মধ্যে পবিত্র কোরআনে সবচেয়ে বেশি এসেছে মুসা (আ.) এর নাম। তার নাম এসেছে ১৩৫ বার।

> কোরআনে ছয়জন কাফিরের নাম আছে।

> কোরআনে বিসমিল্লাহ নেই সূরা তাওবায়।

> কোরআনে বিসমিল্লাহ দুইবার এসেছে সূরা নামলে।

> কোরআনে বর্ণিত একজন সাহাবি হজরত জায়েদ (রা.)।

> কোরআনে বর্ণিত একজন নারী মারইয়াম বিনতে ইমরান।

> কোরআনের প্রথম ওহি লেখক জায়েদ বিন সাবেত (রা.)।

> কোরআনের মুখপাত্র হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস।

> কোরআনকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে।

> কোরআনের প্রথম সংকলক হজরত ওসমান (রা.)।

> কোরআনের প্রথম ও প্রধান তাফসিরবিদ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে