Alexa কোরআনে নবী-রাসূল (আ.)-দের বিশেষ বিশেষ দোয়া

কোরআনে নবী-রাসূল (আ.)-দের বিশেষ বিশেষ দোয়া

পর্ব- ২

মুহাম্মদ গোলাম রহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:২৯ ১৮ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৭:২২ ১৯ নভেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

নবী-রাসূল (আ.); তাদের ওপর অর্পিত আমানত নবুওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র, সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন এবং বহুবিধ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। এসব কিছুর এক পর্যায়ে তারা আল্লাহ তায়ালার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেছেন, যা আল-কোরআনে বিধৃত হয়েছে। 

নিম্নে কতিপয় নবী-রাসূলগণের (আ.) প্রেক্ষাপট উল্লেখসহ কোরআনের দোয়াসমূহ দেয়া হলো-

১ম পর্বের শেষের কিছু অংশ…

(৪) লূত (আ.) এর দোয়া: লূত (আ.) ছিলেন মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর ভ্রাতুষ্পুত্র। তিনি স্বীয় জন্মভূমি বাবেল শহরের মায়া ত্যাগ করে চাচা ইব্রাহিম (আ.) এর সঙ্গে বায়তুল মাকদিসের নিকটবর্তী কেনআনে হিজরত করেন। লূত (আ.) আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নবুওয়াত লাভ করে জর্ডান ও বায়তুল মাকদিসের মধ্যবর্তী ‘সাদূম অঞ্চলের অধিবাসীদের হেদায়াতের লক্ষ্যে দাওয়াত প্রদান করেন। 

কিন্তু তার অবাধ্য সম্প্রদায় সে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। এমনকী তারা সমকামিতার মতো জঘন্য পাপাচারে অভ্যস্ত ছিল। তখন লূত (আ.) তাদেরকে এ জঘন্য কার্য থেকেও বিরত থাকতে বললেন। কিন্তু তারা তার কথায় কর্ণপাত না করে বরং তাকে নিয়ে ঠাট্রা-বিদ্রুপ করতে লাগল। তারা ঔদ্ধত্যের সীমা অতিক্রম করে লূত (আ.)-কে এলাকা থেকে বহিষ্কারের হুমকি দিয়েছিল। তখন লূত (আ.) আল্লাহ তায়ালার দরবারে দু’টি দোয়া করলেন।

(১) প্রথম দোয়াটি হলো:

رَبِّ نَجِّنِي وَأَهْلِي مِمَّا يَعْمَلُونَ

‘হে আমার প্রতিপালক! (তারা যা করে ) আমাকে ও আমার পরিবার-পরিজনকে এহেন দুষ্কর্ম থেকে রক্ষা করো।’ (৪৩-সূরা আশ্ শু‘আরাঃ১৬৯)

(২) অপর দু‘আটি হলো:

رَبِّ انصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ

‘হে আমার প্রতিপালক! বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তুমি আমাকে সাহায্য করো। (সূরা: আল আনকাবুত, আয়াত: ৩০)।

আল্লাহ তায়ালা লূত (আ.) এর দোয়া কবুল করত: তাকে ও তার অনুসারীদের রক্ষা করলেন এবং সমকামিতায় লিপ্ত অধিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করে দিলেন। কওমে লূত এর ধ্বংশস্থলটি বর্তমানে‘বাহরে মাইয়েত’ বা ‘বাহরে লূ ‘ অর্থাৎ ‘মৃত সাগর’বা‘লূত সাগর’নামে খ্যাত। যা ফিলিস্তিন ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী বিশাল অঞ্চল জুড়ে নদীর রুপ ধারণ করে আছে। এর পানিতে তৈলজাতীয় পদার্থ বেশি। এতে কোনো মাছ, ব্যাঙ এমনকী কোনো জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। এ কারণেই একে‘মৃত সাগর’ বা ‘মরু সাগর’ বলা হয়।

আরো পড়ুন>>> কোরআনে বর্ণিত নবী-রাসূল (আ.)-দের বিশেষ বিশেষ দোয়া পর্ব-১

১ম পর্বের পর থেকে…

(৫) ইয়াকূব (আ.) এর দোয়া: ইব্রাহিম (আ.) এর পৌত্র এবং ইসহাক (আ.) এর পুত্র ইয়াকূব (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালা নবূওয়াত দিয়েছেন। তিনিও তাওহীদের দাওয়াতী মিশন নিয়ে এ দুনিয়ায় আগমন করেছেন। প্রিয় পুত্র ইউসুফ (আ.) -কে হারিয়ে তিনি শোকাহত হৃদয়ে আল্লাহ তায়ালার দরবারে দোয়া করেছিলেন:

قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللّهِ مَا لاَ تَعْلَمُونَ

‘তিনি বললেন: আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যা জানি, তা তোমরা জান না।’ (সূরা: ইউসুফ, আয়াত: ৮৬)।

(৬) ইউসুফ (আ.) এর দোয়া: কোরআনুল কারিমে নবী-রাসূলগণের বিভিন্ন ঘটনাবলী বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হলেও ইউসুফ (আ.) একমাত্র নবী, যার ঘটনা একটি সূরাতে ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইউসুফ (আ.) এর পিতা ছিলেন ইয়াকূব ইবনু ইসহাক ইবনু ইব্রাহিম (আ.) তারা প্রত্যেকেই কেনআন বা ফিলিস্তিনের হেবরন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। ইয়াকূব (আ.) এর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন ইউসুফ ও বনু ইয়ামীন। বনু ইয়ামীনের জন্মের পরপরই তার মা মৃত্যবরণ করেন। পরে ইয়াকূব (আ.) মৃত স্ত্রীর অপর বোন অর্থাৎ-ইউসুফ (আ.) এর খালা লায়লাকে বিবাহ করেন। ইউসুফ এর সঙ্গে মিসরে পুর্ণমিলনের সময় তিনিই তার পিতার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। (আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ)।

ইউসুফ (আ.) এর বৈমাত্রিয় ভাইয়েরা তার প্রতি ছিল প্রতিহিংসা পরায়ণ। তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে শিশু ইউসুফকে জঙ্গলের কুরায় নিক্ষেপ, মিসরের রাজধানীতে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি,‘আযীযে মিসর কিৎফীর গৃহে ক্রীতদাসরুপে প্রবেশ, অতঃপর সময়ের ব্যবধানে মিসর অধিপতির স্ত্র’র ইউসুফ (আ.) এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়া-এ সবই ছিল আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাধীন।

এরুপ কঠিন ঈমানী পরীক্ষার সময় ইউসুফ (আ.) আল্লাহ তায়ালার দরবারে দোযা করলেন:

قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلاَّ تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ

‘ইউসুফ বলল: হে পালনকর্তা! তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহ্বান করে, তার চাইতে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার ওপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাব।’ (সূরা: ইউসুফ, আয়াত: ৩৩)।

ইউসুফ(আ.) এর বিনম্র প্রার্থনা আল্লাহ তায়ালা কবুল করলেন এবং তিনি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ইহ-পরকালীন অনুগ্রহ ও নিয়ামত লাভ করলেন। অত:পর জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে নিবেদন করলেন:

رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الأَحَادِيثِ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنُيَا وَالآخِرَةِ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ

‘হে পালনকর্তা! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতাও দান করেছেন এবং আমাকে বিভিন্ন তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছেন। হে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের স্রষ্টা, আপনিই আমার কার্যনির্বাহী ইহকাল ও পরকালে। আমাকে ইসলামের ওপর মৃত্যুদান করুন এবং আমাকে স্বজনদের সঙ্গে মিলিত করুন।’ (সূরা: ইউসুফ, আয়াত: ১০১)।

(৭) আইয়ুব (আ.) এর দোয়া: ইসহাক (আ.) এর দুই জমজ পুত্র ঈছ ও ইয়াকূব। আইয়ুব (আ.) ছিলেন ঈছ এর প্রপৌত্র এবং তার স্ত্রী ইয়াকূব-পুত্র ইউসুফ (আ.) এর পৌত্রী‘লাইয়া’বিনতু ইফরাঈম ইবনু ইউসুফ ঐতিহাসিক তথ্য মতে আইয়ুব (আ.)‘হুরান’অঞ্চলের বাছানিয়া এলাকায়-যা ফিলিস্তিনের দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর দামেষ্ক ও আযরুআত এর মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত জনপদে প্রেরিত হয়েছিলেন। তার সম্পর্কে কতিপয় ভ্রান্ত তথ্য-পক্ষাঘাতে তার শরীরে পোকা ধরা, দেহের সব মাংস খসে পড়া, পঁচে-গলে দুর্গন্ধময় হয়ে যাওয়ায়, ঘর থেকে বের করে জঙ্গলে ফেলে আসা ১৮/৩০ বছর ধরে রোগ ভোগ করা,আত্নীয়-স্বজন ঘৃণা ভরে ছেড়ে চলে যাওয়া ইত্যাদি সবই নবীবিদ্বেষী ও গল্পকারদের বানোয়াট মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয়। তিনি দুঃক-কষ্টে পতিত হয়ে আল্লাহ তায়ালার দরবারে দোয়া করলেন:

أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

‘আমি দুঃখকষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।’ (সূরা: আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)।

এই দোয়া প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرٍّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ

‘অত:পর আমি তার (সেই) আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখকষ্ট দূর করে দিলাম এবং তার পরিবারবর্গ ফিরিয়ে দিলাম, আর তাদের সঙ্গে তাদের সমপরিমাণ আরো দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশত, আর এটা ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ।’ (সূরা: আম্বিয়া, আয়াত: ৮৪)।

(৮) শুআইব (আ.) এর দোয়া: সিরিয়া ও হিজাযের সীমান্তবর্তী মাদইয়ান জনপদে আল্লাহ তায়ালা শুআইব (আ.)-কে প্রেরণ করেছিলেন। এ জনপদের অধিবাসীরা ছিল কাফের। এছাড়া ব্যবসায়ে ওজনে কম দেয়া, রাহাজানি, লুটতরাজ, অন্যায়ভাবে জনগণের ধন-সম্পদ লুন্ঠন-ভক্ষণ ইত্যাদি কুকর্মে তারা সীমা অতিক্রম করেছিল। যখন শুআইব (আ.) তাওহীদের দাওয়াত দানের পাশাপাশি যাবতীয় কুকর্ম পরিত্যাগ করার আহ্বান জানালেন তখন তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক ও অতি দুরাচার নেতৃবর্গ বলল, হে শুআইব! তোমরা আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে না এলে আমার তোমাকে ও তোমার অনুসারীদেরকে আমদের এ জনপদ থেকে অবশ্যই বের করে দেব। তখন শুআইব (আ.) আল্লাহ তায়ালার সাহায্য প্রার্থনা করে বললেন: 

 رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ

‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের অপরাধীদের মধ্যে তুমি ন্যায্য মীমাংসা করে দাও এবং তুমি মীমাংসাকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। (সূরা: আল আরাফ, আয়াত: ৮৯)।

আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করে অপরাধীদের ধ্বংস করে দিলেন। চলবে...

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে