Alexa বিনা অপরাধে অভিশাপ ও গালি দেয়ার পরিণতি

বিনা অপরাধে অভিশাপ ও গালি দেয়ার পরিণতি

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:১৮ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২০:৪৯ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ইবনে মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী (আল্লাহর অবাধ্যাচরণ) এবং তার সঙ্গে ঝগড়া, লড়াই করা কুফরি।’ (বুখারী ও মুসলিম) 

তিনি আরো বলেছেন যে, ‘কোনো মুমিনকে অভিশাপ দেয়া তাকে হত্যা করার শামিল।’ (ইবনে মাজাহ ব্যতীত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ)

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘অভিশাপকারীরা কেয়ামতের দিন কারো সুপারিশকারীও হবে না, সাক্ষীও হবে না।’ হাদিসে আরো আছে, মুমিন কখনো অভিশাপকারী, কটুভাষী, অশ্লীনভাষী ও অশালীনভাষী হতে পারে না।’ সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে রাসূর (সা.) বলেছেন, ‘কোনো বান্দা যখন কাউকে অভিশাপ করে তখন তা আকাশে উঠে যায়। কিন্তু আকাশের দরজা বন্ধ করে দিয়ে তার প্রবেশ রোধ করা হয়। অতঃপর তা পৃথিবীতে নেমে আসে। কিন্তু তার জন্য পৃথিবীর পথ রুদ্ধ করা হয়। অতঃপর তা ডানে ও বামে ছুটাছুটি করতে থাকে। যখন বেরুবার কোনো পথ পায় না, তখন যার ওপর অভিশাপ বর্ষণ করা হয়েছে, সে তার উপযুক্ত হলে তার ওপর কার্যকর হয়, নচেত স্বয়ং অভিশাপকারীর ওপরই কার্যকর হয়।’

হজরত ইমরান বিন হাসীন বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূল (সা.) কোনো সফরে যান। সেই সফরে এক অনসারী নারী স্বীয় বাহন উটকে উচ্চস্বরে গালাগালি করে উটলো ও অভিশাপ দিল। এটা শুনতে পেয়ে রাসূল (সা.) বললেন, ‘এই উটের পিঠে যে সব মালপত্র আছে তা নামাও এবং উটকে ছেড়ে দাও। কেননা সে তো অভিশপ্ত। ইমরান বলেন, আমি যেন এখনো মহিলাটিকে দেখতে পাচ্ছি যে, অসহায়ভাবে লোকদের সাঙ্গে হেঁটে চলছে, কেউ তাকে সাহায্য করতে আসছে না।’ (সহীহ মুসলিম)

রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, ‘সবচেয়ে খারাপ সুদ হলো, একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অপমানজনক ভাষা প্রয়োগ করা ’

অবশ্য কতিপয় সুনির্দিস্ট পাপ কার্যে জড়িত ব্যক্তিকে অভিশাপ দেয়া যায়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘অত্যাচারীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ রাসূল (সা.) বিভিন্ন ব্যক্তিকে, যথা সুদের সঙ্গে জড়িত, তাহলীলের সঙ্গে জড়িত এবং ঘুষ, মদ ও জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে অভিশাপ্ত করেছেন, যারা চুলের সঙ্গে চুল গিরে দিয়ে বাঁধে, ভ্রর চুল ফেলে দেয়, বিপদে ঘাবড়ে গিয়ে চিৎকার ও আহাজারী করে, চুল কামায় ও কাপড় ছিঁড়ে ফেলে দেয়, তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি চিত্রকর, ভাস্কর ও যারা অন্যের জমি দখল করার জন্য সীমানার চিহ্ন তুলে ফেলে বা পাল্টে ফেলে, তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। 

অনুরুপভাবে তিনি নিজের পিতা-মাতার ওপর অভিশাপ বর্ষণকারী, গালিগালাজ বর্ষণকারী, কোনো অন্ধ ব্যক্তি পথভ্রষ্টকারী, জীব-জন্তুর সঙ্গে কুকর্মকারী, সমকারী, নিজ স্ত্রীর সঙ্গে পশ্চাৎদ্বারে সংগমকারী, ভাগ্য গননাকারী, ও তার সঙ্গে গমনকারী, মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চস্বরে ক্রন্দনকারিণী এবং পেশাদার ক্রন্দনকারিণী ওতার সহকর্মী, জনগণ অপছন্দ করা সত্ত্বেও জোরপূর্বক তাদের নেতা বা শাসককের পদ দখলকারী, স্বামী অসন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় স্ত্রী রাত কাটিয়ে দিয়েছে, আজান শুনতে পেয়েও যে ব্যক্তি বিনা ওজরে জামাতে উপস্থিত হয় না, আল্লাহ ছাড়া আর কারো নামে জীবজন্তু জবাইকারী, চোর, সাহাবীগণকে গালিগালাজকারী,পুরুষের বেশভূষা ও সাদৃশ্যধারণকারী স্ত্রীলোক এবং স্ত্রীলোকের বেশভূষা ও সাদৃশ্যধারণকারী পুরুষ, মানুষের চলাফেরার পথে মলমূত্র ত্যাগকারী, হাতে মেহেদী ও চোখে সুর্মা ব্যবহারে বিমুখ (অর্থাৎ সৌন্দর্য চর্চার মাধ্যমে স্বামীকে খুশী রাখতে অনাগ্রহী) রমণী, স্বামী-স্ত্রী ও চাকর-মনিবের সম্পর্ক বিনষ্টকারী, ঋতুবতী স্ত্রীর সঙ্গে সংগমকারী, কোনো মানুষকে অস্ত্র দেখিয়ে ভীতি প্রদর্শনকারী, জাকাত দিতে অস্বীকারকারী, নিজের পিতা নয় এমন কাউকে পিতা এবং নিজের মনিব নয় এমন কাউকে মনিব পরিচয় দানকারী, কোনো জীবজন্তুর গায়ে তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে দাগ অংকনকারী, শরীয়তের বিধান অনুসারে কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে বিচারক কর্তৃক শাস্তি ঘোষণা করার সম্ভাবনা দেখে তা থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য সুপারিশকারী গ্রহণকারী, স্বামীগৃহ থেকে স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে কোথাও গমনকারিণী নারী, স্বামীর বিছানা ছেড়ে রাত যাপনকারিণী মহিলা, ক্ষমতা থাকা সত্বেও সৎকাজে  আদেশ দান ও অসৎত কাজ থেকে নিষেধ করণে বিমুখ, মদ পানকারী ও মদ উৎপাদান, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন ও এই সবের সঙ্গে জড়িত ও সহযোগিতাকারীকে অবিশাপ দিয়েছেন।

অপর হাদিসে আছে যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, ছয় ব্যক্তিকে আমি অভিশাপ দিয়েছি, আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন এবং প্রত্যেক নবী অভিশাপ দিয়েছেন, আর প্রত্যেক নবীর দোয়া কবুর হওয়া নিশ্চিত। সেই ছয় ব্যক্তি হলো: আল্লাহর নির্ধারিত অদৃষ্টকে অস্বীকারকারী, আল্লাহর কিতাবে কোনো কিছু সংযোজনকারী, আল্লাহ যাদের সম্মানিত করেছেন তাদেরকে অপমানিত করা এবং আল্লাহ যাদের অপমানিত করেছেন তাদেরকে সম্মানিত করার জন্য জোঁরপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী, আল্লাহ যাকে হারাম করেছেন তাকে হালাল প্রতিপন্নকারী এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তাকে হারাম প্রতিপন্নকারী এবং আমার প্রদর্শিত বর্জনকারী। এছাড়া রাসূল (সা.) প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচারকারীকে, হস্তমৈথুনকারী, কোনো নারী ও তার কন্যাকে একসঙ্গে বিবাহকারীকে, ঘুষখোর, ঘুষদাতা ও ঘুষের দালালকে, বিদ্যা গোপনকারীকে, খাদ্য গোলাজাতকারীকে, কোনো মুসলমানের অপমানকারীকে, ক্ষমতা থাকা সত্বেও
মযলুম মুসলমানকে সাহায্য করে না তাকে, নির্দয় শাসককে, বিয়ে না করার প্রতিজ্ঞাকারী পুরুষ ও স্ত্রীকে এবং কোনো নির্জন প্রান্তরে বিনা প্রয়োজনে একাকী গমনকারীকে ও অভিসম্পাত করেছেন।

নিরপরাধ মুসলমানকে অভিশাপ দেয়া সর্বসম্মতভাবে হারাম। আর অসচ্চরিত্র লোকদেরকে নামোল্লেখ ব্যতিরেখে অভিসম্পাত করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। যেমন কেউ যদি বলে, অত্যাচারীদের ওপর বা মিথ্যাচারীদের ওপর বা কাফেরদের ওপর অভিসম্মাত, তবে তা সর্বসম্মতভাবে জায়েয। পক্ষান্তরে কোনো পাপ কাজে জড়িত ব্যক্তিকে নামোল্লেখপূর্বক অভিসম্পাত করা সম্পর্কে মতভেদ আছে। অনেকের মতে এটা জায়েয। কিন্ত ইমাম গাযযালীর মতে, যে ব্যক্তি তওবা 
ছাড়া মারা গেছে বলে নিশ্চিত জানা যায়, যেমন আবু লাহাব, আবু জেহেল, ফেরাউন, হামান প্রমুখ কেবলমাত্র তাদের ওপর অভিশাপ করা জায়েয। কারো অকল্যাণ কামনা করে বদদোয়া করা অনুচিত, তবে প্রতিরোধের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলে মযলুম স্বয়ং যালেমদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে পারেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও অভিসম্পাত করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ  

অর্থাৎ সাবধান! অত্যাচারীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। (সূরা হূদ ১৮ আয়াত)

অন্যত্র তিনি বলেন,  فَأَذَّنَ مُؤَذِّنٌ بَيْنَهُمْ أَنْ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ 

অর্থাৎ অতঃপর জনৈক ঘোষণাকারী তাদের নিকট ঘোষণা করবে, অত্যাচারীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত। (সূরা আ’রাফ ৪৪ আয়াত)

সহীহ হাদিসসমূহে প্রমাণিত যে,

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «لَعنَ اللهُ الوَاصِلَةَ وَالمُسْتَوْصِلَةَ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সেই নারীর ওপর আল্লাহর অভিশাপ, যে অপরের মাথায় নকল চুল জুড়ে দেয়। আর সেই নারীর ওপরেও, যে অন্য নারীর দ্বারা (নিজ মাথায়) নকল চুল সংযুক্ত করায়।’

وَأنَّهُ قَالَ: «لَعَنَ اللهُ آكِلَ الرِّبَا

তিনি বলেন, ‘আল্লাহ সুদখোরকে অভিশাপ করুন (অথবা করেছেন)।’

وأنَّهُ لَعَنَ المُصَوِّرِينَ. তিনি ছবি নির্মাতাকে অভিশাপ করেছেন।

وأنَّهُ قَالَ: «لَعَنَ اللهُ مَنْ غيَّرَ مَنَارَ الأَرْضِ». أيْ حُدُودَهَا. 

তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি জমি জায়গার সীমা-চিহ্ন পরিবর্তন করে, আল্লাহ তাকে অভিশাপ করুন (অথবা করেছেন)

وأنَّهُ قَالَ: «لَعَنَ اللهُ السَّارِقَ يَسْرِقُ البَيْضَةَ

তিনি বলেন, ‘‘আল্লাহ চোরকে অভিশাপ করুন [অথবা করেছেন], যে চোর ডিম চুরি করে।’’

وأنَّهُ قَالَ: «لَعَنَ اللهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَيهِ». 

তিনি বলেন, ‘যে নিজ মাতা-পিতাকে অভিশাপ ও ভৎর্সনা করে তাকেও আল্লাহ অভিসম্পাত করুন (অথবা করেছেন)।’

وَلَعَنَ اللهُ من ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ . ‘এবং সেই ব্যক্তির ওপর আল্লাহ অভিশাপ করুন (অথবা করেছেন), যে গায়রুল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য পশু যবেহ করে।’

وَأنَّه قَالَ: «مَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثاً أَوْ آوَى مُحْدِثاً فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالمَلاَئِكَة والنَّاسِ أجْمَعينَ».

তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মদিনায় কোনো প্রকার বিদাত (আবিষ্কার) করে অথবা কোনো বিদাতী লোককে আশ্রয় দেয়, তার ওপর আল্লাহ, তাঁর ফেরেশ্তামন্ডলী এবং সমস্ত মানুষের অভিশাপ।’

وأنَّه قَالَ: « اَللهم الْعَنْ رِعْلاً، وَذَكْوَانَ، وعُصَيَّةَ : عَصَوُا اللهَ وَرَسُولَهُ». وهذِهِ ثَلاَثُ قَبَائِلَ مِنَ العَرَبِ .

তিনি এভাবে (বদদোয়া) করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! রি’ল, যাকওয়ান ও উসাইয়াহ গোত্রসমূহের ওপর অভিশাপ কর। কেননা, তারা আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের অবাধ্যতা করেছে।’ আর এ তিনটিই ছিল আরবের এক একটি গোত্রের নাম।

وَأنَّهُ قَالَ: «لَعَنَ اللهُ اليَهُودَ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ».

তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ইয়াহূদীদেরকে অভিসম্পাত করুন (অথবা করেছেন), তারা তাদের পয়গম্বরদের সমাধিসমূহকে উপাসনালয়ে পরিণত করেছে।’

وَأَنَّهُ لَعَنَ المُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بالنِّسَاءِ وَالمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ.

তিনি সেই সকল পুরুষকেও অভিশাপ করেছেন, যারা নারীদের সাদৃশ্য ও আকৃতি গ্রহণ করে। তেমনি সেই সব নারীদেরকেও অভিশাপ করেছেন, যারা পুরুষদের সাদৃশ্য ও আকৃতি অবলম্বন করে থাকে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

﴿وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا﴾ [الاحزاب : ٥٨] 

অর্থাৎ যারা বিনা অপরাধে ঈমানদার পুরুষ ও নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে। (সূরা: আহযাব আয়াত ৫৮)

ডেইলি বাংলাদেশে/আরএজে