কেবিন নম্বর তিনশ তিন ।। মাহবুব হাসান বাবর

কেবিন নম্বর তিনশ তিন ।। মাহবুব হাসান বাবর

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০৬ ৫ এপ্রিল ২০২০  

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

মনিদির  সাথে একুশ বছর পর আজ হসপিটালে দেখা। প্রথমে আমি তাকে দেখিনি। সে দেখে আমাকে ডাকলো। আমি প্রথমে থতমত খেয়ে গেলাম। কী হাল হয়েছে শরীরের। দেখে মনে হচ্ছে কতদিন খায় না- না ঘুমানো চোখের কোনে কালো দাগ। 

আমি মনিদির কাছে গিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলাম

: কেমন আছো
মনিদি মৃদু হেসে বললো
: তুই কেমন আছিস?
মনিদি তুই করে বলছে শুনেও
আমি একেবারেই স্বাভাবিকভাবে বললাম,
: এইতো বেশ আছি। চলে যাচ্ছে দিন...
মনদির সাথে ভুড়িওয়ালা খাটো করে লোকটা মনিদিকে বললো-
: চলো বাসায় চলো।

রোবট আকৃতির মানুষটিকে আমার দেখতে মন চাইছিলো না। অসহ্য লাগছিলো।
মনিদি তাকে ধমক দিলো। ধমক খেয়ে বেচারা হসপিটালে রাখা পেছনের চেয়ারে বসলো।
মনিদির সাথে এতোবছর পরে দেখা হবে ভাবতে পারিনি। 

আমি যখন নাইনে পড়ি সে তখন কলেজে ফাস্ট ইয়ারে। কলেজের অন্যতম সুন্দরী ছিলো সে। কত হ্যান্ডসাম ছেলেরা যে পাগল ছিলো তার জন্য তা আজও মনে আছে। 

আমি তখন কলেজ ছুঁইছুই। মানে মেট্রিক দিয়েছি। পূজার ছুটি চলছে।  চারিদিকে উৎসবের আমেজে যখন সবাই দিশেহারা তখন মেলার মাঠে মনিদির সাথে দেখা।

 আমি কাছে গিয়ে বললাম-
: মেলা থেকে কী কী কিনলে?
মনিদি হাসলো। হাসি থামিয়ে বললো-
: আমি আবার কী কিনবো। কে আমাকে কিনে দেবে?
আমি বললাম-
: আমি কিনে দেবো। কী কিনবে বলো?
মনিদি বললো-
তুই কেনো কিনে দিবি। আমি্র তোর কে?
আমি কী মনে করে বলে ফেললাম-
: তুমিতো আমার সোনাবৌ
মনিদি থমকে গেলো। লজ্জা্য় চোখটা লাল হয়ে গেছে। মিটিমিটি হাসছে। আমি দ্রুত সেখান থেকে চলে এলাম।

সারারাত মনিদিকে ভাবতে ভাবতে সময় কেটে গেলো। ধুর কিসব ভাবছি! এ হয় নাকি? আমার চেয়ে বেশ বড় সে। সমাজ কি মেনে নেবে? অপবাদ দেবে সবাই। ছিছি করবে।

পরদিন ভোর হতে না হতেই মনিদি আমাদের বাড়ি এসে হাজির।
 মাকে ডাকছে। মা তখন রান্না নিয়ে ব্যাস্ত।  
: কিরে মা আয়। এতদিন পর এই বুড়ো মেয়েটার কথা মনে পড়লো?
: না কাকী কলেজ নিয়ে ব্যাস্ত সময় যাচ্ছে। 
এ কথা বলতে বলতে আমি ঘর থেকে বের হয়ে রান্নাঘরের দিকে আসতেই মা বললো-
: শোন মনি সবুজতো এবার কলেজে যাবে ওকে দেখে রাখিস।
 তাকিয়ে মুচকি হাসলো মনি।
বসা থেকে দাড়িয়ে বললো-
: আসি কাকী। আরেকদিন আসবো।
সে কি কতদিন পর আসলি। রান্না হোক খেয়ে তারপর যাবি।
: না কাকী আরেকদিন খাবো
: না তুই না খেয়ে যেতে পারবি না।
 অবশেষে মনি থেকে গেলো। নাস্তা শেষ করে যখন চলে যাবে তখন আমার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে আস্তে করে বললো-
: সন্ধ্যায় দেখা করিস। আমি বাড়ির সামনে থাকবো।
এই বলে মনিদি চলে গেলো। তার চোখে মুখে উত্তাপ। সে উত্তাপে আমার ভেতর বাহির পুড়ে যাচ্ছে। 
 
আমি সন্ধ্যার প্রতীক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। কখন সন্ধা হবে। কেনইবা মনিদি দেখা করতে বললো। কিভাবেই বা দেখা করবো।
এসব ভাবতে ভাবতে একসময় সন্ধ্যার আবছা আলোতে মনিদির বাড়ির সামনে এলাম। বাড়ির সামনে আসতেই দেখি মনি বাড়ির শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে কাছে আসতে থাকলো।

কাছে এসে দ্রুত হাতটা ধরে বললো-
: সবুজ চলনা আমরা দুরে হারিয়ে যাই। এক ছাদের নিচে ঘর বাধি। তোর বুকের মধ্যে মাথা গুঁজি। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলো। আমিও ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি।

তারপর দিন-মাস -বছর চলে যায় আমি আর মনি দিনদিন  আপন হয়ে যাই। গায়ের লোকেরা এক এক করে সবাই জানতে থাকে। বয়সে বড় মনিকে নিয়ে কত কথা হতে থাকে পাড়ায়। আমার বাবা -মাকে কেউকেউ মাতুব্বর কেসেমের মানুষেরা শাসিয়েও যায়।

একদিন মনিদিকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়। বিয়েটা হয় মনিদির দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয়র  বাসায়। সম্পর্ক গোপন করে ওদের বিয়ে হয়ে গেলো।
আমি মরতে মরতে বেচে থাকি। মনিদির শোকে আর তার ভালোবাসার স্মৃতি বুকে নিয়ে আর কোনদিন বিয়ে করা হয়ে উঠেনি। 
বিয়ের পর মনিকে তার বাবার বাড়ি তেমন আসতে দেয়নি। আর আসলেও এতোটা কমযে পাড়ার কেউ তাদের দেখেছে কিনা তা কেউ জানে না।

আজ এ মস্তবড় শহরে মনিদির দেখা পাবো কল্পনাতীত। মনের ভেতর খচ করে উঠলো। মনিদির চোখের পানি তখন তরতর করে পড়ছে। আঁচল দিয়ে বারবার মুছছে। মনির স্বামী পেছনে বসে বসে অসহ্য হয়ে উঠছে। একসময়  বললো-
: এই চলো না সন্ধ্যা হয়ে গেলো। 
আমি তার দিকে তাকালাম। বেচারা আমার দিকে খিস্তি করে তাকাচ্ছে। উঠে এসে বললো-
: চলো ওষুধ কিনতে হবে। 
মনিদি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো তার গ্রামের কাজিন হিসেবে।
তারপর একসময় মনি তার স্বামীকে বললো-
: চলো যাই।
স্বামী বেচারা অনিচ্ছাসত্ত্বে আমার সাথে হ্যান্ডশেক করে চলে গেলো। আমি মনির চলে যাবার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হঠাৎ কিছুদূর যেতেই তার স্বামী পিছনে ফিরে আসতে থাকলো। সে যেখানে বসেছিলো সেখানে ডাক্তারের ফাইল রেখে গিয়েছিলো। ফাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি ডাঃ তানজিম মুবিন
অনকোলজি
মনের ভেতর খচ করে উঠলো। দ্রুত এগিয়ে তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম
: মনিদির কী হয়েছে
সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
: আজ তার সাতটা কেমো শেষ হলো।
এই বলে সে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মনিদির দিকে যেতে থাকলো।
আমি ততক্ষণে ঘামছি। মনিদি করুনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
একসময় তারা চলে গেলো। তাদের ছায়াও  অদৃশ্য হয়ে গেলো।
আমার শরীরে তখন ঘামের ফোয়ারা। হাত- পা অবশ হয়ে কখনযে জ্ঞান হারিয়েছি জানি না। একসময় নিজেকে আবিস্কার করলাম হসপিটালের তিনশ তিন নম্বর কেবিনের সফেন বিছানায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর