Alexa কৃত্রিম মেঘ ও বৃষ্টি আবিষ্কারের নেপথ্যে

পর্ব-১

কৃত্রিম মেঘ ও বৃষ্টি আবিষ্কারের নেপথ্যে

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০১ ৩০ জুলাই ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর, বৃষ্টির ছন্দে বাজে নূপুর।’ এ নূপুরে জীবনেরই গান। কর্মব্যস্ত গতানুগতিক জীবনে অনেকে বৃষ্টির ভেতর খুঁজে ফেরেন সজীবতার আমেজ। বৃষ্টিতে ভিজে অনুভব করেন দারুণ এক রোমাঞ্চ! বৃষ্টির ছন্দ মানুষকে নাড়িয়ে দেয় ঘুমের ভেতরও। মানুষের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বৃষ্টির ছন্দ মানুষের জীবনের ছন্দের সমর্থক! বৃষ্টির ছন্দ, শব্দ, স্বাদ, স্পর্শ, টংকার, মৃদু কোলাহল—সবই অনেক কোমল এবং বিমূর্ত।

বৃষ্টির মানুষের জন্য কতটা আশীর্বাদ, তা বলে কখনো শেষ করা যাবেনা। প্রচণ্ড গরমে এক পশলা বৃষ্টি স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। আবার ফসল ফলানোর জন্য হাহাকার উঠে কৃষকের মনে বৃষ্টির জন্য। বৃষ্টি হবে, এই আশা করে এখনো অনেক জায়গাতেই বীজ বুনা হয়। যদি উপযুক্ত সময়ে বৃষ্টি না হয় তাহলে ফসলের জমি কৃষকের মন খুশি করতে পারে না।

সহজভাবে বললে, মানুষ প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে চলছে আদিকাল থেকে। যেদিন থেকে মানুষের সৃষ্টি সেদিন থেকেই প্রত্যেকেই প্রকৃতির কাছে বশীভূত। তবে মানুষ ধীরে ধীরে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে! প্রচণ্ড গরম? তাতে কী, ফ্যান কিংবা এসি আছে তো! বন্যায় হাঁটা যায়না বলেই নৌকা বানিয়েছে মানুষ। তাপশক্তিকে সহজে কাজে লাগানো যায় না তাতে কী, ইঞ্জিন বানিয়েছে। প্রকৃতির হাজার হাজার উপাদান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে বৃষ্টিকেও। কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত করার বিষয়টি প্রথম মাথায় আসে মার্কিন বিজ্ঞানী ভিনসেন্ট শায়েফার।

চিত্র: ১

সালটা ছিল ১৯৪৬। মার্কিন বিজ্ঞানী ভিনসেন্ট শায়েফার এবং নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ল্যাংমুর একসঙ্গে কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টি করার পন্থা বের করার কথা ভাবলেন। তারা বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখেন যে, বৃষ্টি সৃষ্টি হতে যে পরিমাণ ‘শীতলতা’ দরকার বায়ুমণ্ডলের বাষ্পকে মেঘে রূপান্তরিত করতে সে পরিমাণ শীতল যন্ত্র না থাকলে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তখনকার সময় ভিনসেন্ট জানতেন ‘ড্রাই আইস’ নামক কঠিনিত কার্বন ডাই-অক্সাইডের গুড়ো অনেক ঠাণ্ডা। তিনি পরীক্ষায় ড্রাই আইস ব্যবহার করলেন। এই যাত্রায় তিনি সফল হলেন কি-না তা জানার আগে চলুন ‘ড্রাই আইস’সম্পর্কে জেনে নিই।

ড্রাই আইস কী?

খুব সহজে বললে, শুষ্ক কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কঠিন রূপকেই ড্রাই আইস বলা হয়। অনেক কম তাপমাত্রায় এবং কম চাপে (−56.4 °C তাপমাত্রা এবং 5.13 atm চাপে) গ্যাসিয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে রেখে দিলে সেটি তরলে রূপান্তরিত হয় না। তখন সরাসরি কঠিন পদার্থের আকার ধারণ করে। এই কঠিন পদার্থটিই হচ্ছে ড্রাই আইস। অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে, পানি কঠিন হলে কি সেটা ধোঁয়ার মত উড়বে? উড়লেও সেটা কীভাবে সম্ভব?

ড্রাই আইসকে যখন উষ্ণ ও গরম পানির সংস্পর্শে আনা হয়, তখন মেঘের মত দেখতে শুভ্র ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এই সাদা ধোঁয়াটি কিন্তু কার্বন-ডাই-অক্সাইড নয়, অধিক ঘনমাত্রার পানির বাষ্পের সঙ্গে মিশ্রিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড। বিষয়টি হচ্ছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডার ফলে গরম পানির বাষ্প ঘনীভূত হয়ে এমন আকার ধারণ করে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাহিত এই কুয়াশাটা অনেক ভারি হয়। তাই এটি পাত্রের নিচে জমা হয়। পরে দেখা যায় এটি ফ্লোর ঘেঁষে ঘেঁষে উড়ছে।

চিত্র : ২

ড্রাই আইস আমরা প্রতিদিনই ব্যবহার করি। কিন্তু আমরা কি টের পাই? রাস্তায় যেসব গাড়িতে করে আইসক্রিম বিক্রি করা হয়, সেখানেও সংরক্ষণের জন্য ড্রাই আইস ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া হিমাগারে জিনিসপত্র সংরক্ষণে এবং জাহাজে করে দূরে পচনশীল পণ্য প্রেরণ করতে এটা ব্যবহৃত হয়। তবে ভুলেও খালি হাতে ড্রাই আইস হাতে নেবেন না। কেননা এটি এতই ঠাণ্ডা, চামড়ার অনেক ক্ষতি হবে।

অবাক হয়েছিল বিশ্ব

ভিনসেন্ট কৃত্রিম মেঘ বানাতে ব্যবহার করেছিলেন জমাট বাঁধা কার্বন ডাই অক্সাইড-এর টুকরো। এবং অবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন সেখানে সৃষ্ট পদার্থ আলোর দারুণ প্রতিফলন করছে। তিনি বুঝতে পারলেন এখানে বরফের কেলাসের সৃষ্টি হয়েছে যা পরিষ্কারভাবে ল্যাম্পের আলোর প্রতিফলন দিচ্ছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভাবন করে ফেলেন অতি শীতল করার দারুণ এক উপায়। ভিনসেন্ট বার্কশায়ার পাহাড়ের কাছে ড্রাই আইস ছুঁড়ে দিয়ে তুলোর মতো মেঘ বানাতে সক্ষম হয়েছিলেন। সর্বপ্রথম প্রকৃতির মেঘকে মানুষের হাতে বৃষ্টিতে রূপান্তর করা হয় ১৯৪৬ সালের ১৩ নভেম্বর। সেদিন শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, সারা বিশ্ব অবাক হয়েছিল।

কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি নামানোর ক্ষেত্রে উপায় দুইটি। একটি হচ্ছে ভূমি থেকে কামান বা কোনো নিক্ষেপকের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার এলাকায় ঘনীভবনকারী পদার্থ ছুড়ে দেয়া। কিংবা ভূমি থেকে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা, অনেকটা ধোঁয়ার মতো রাসায়নিক পদার্থগুলোকে ধীরে ধীরে ওপরে পাঠানো। এই পদ্ধতিতে প্রথমে বাহকের মাঝে রাসায়নিক ভরা হয়। যেহেতু এটি রকেটের মতো করে ছুঁড়ে মারা হবে তাই ওড়ার জন্য বাহককেও রকেটের মতো করে বানানো হয়। সেই রকেট একটি কামানের মতো নিক্ষেপক যন্ত্রের মাঝে রাখা হয়। পরে দিক ও লক্ষ ঠিক করে ছুড়ে মারা হয় ওপরে।

[কৃত্রিম বৃষ্টিকে ঘিরে সারা বিশ্বে নানা ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে কিছু ঘটনা মজার, আবার অনেক ঘটনা আপনাকে অবাক করবে। লেখাটিকে বড় হওয়ায় তিন পর্বে ভাগ করা হয়েছে। এটি প্রথম পর্ব, বাকি পর্বগুলো পড়তে ডেইলি বাংলাদেশ-এ চোখ রাখুন]

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে

Best Electronics
Best Electronics