Alexa প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধির এক অতুলনীয় আলোচনা (পর্ব-৫)

সূরা ফাতেহা 

প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধির এক অতুলনীয় আলোচনা (পর্ব-৫)

মাওলানা কালিম সিদ্দিকি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৪৯ ১০ জুন ২০১৯   আপডেট: ১৮:৩৩ ১৩ জুন ২০১৯

সূরা ফাতেহা (ফাইল ফটো)

সূরা ফাতেহা (ফাইল ফটো)

আমার সম্মানিত ভাইয়েরা! বলা হচ্ছিল যে, আল্লাহ তায়ালার দরবারে আমরা ভিখারী হয়ে পড়ে আছি। তাঁর নিকট আমাদের দরখাস্ত পেশ করতে হবে এবং আমাদের যাবতীয় চাহিদা ও ভিক্ষা চাইতে হবে। 

দয়াময়ের কী অসীম দয়া যে, প্রথমত: আমাদের মতো অথর্ব, অযোগ্য, অকর্মণ্য এবং অসহায় গোলামকে নিজের দরবারে মেহমান হিসেবে ডেকেছেন। দ্বিতীয়ত: শুধু তা-ই নয়; বিরাট আনন্দ আয়োজন এবং দান-দক্ষিণার বড় মোক্ষম সময়েই তিনি আমাদের রীতিমতো ‘চিফ গেস্ট’ করে এখানে ডেকে পাঠিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়। তৃতীয়ত: ডেকেই কেবল ক্ষ্যান্ত হননি; বরং দরখাস্ত এবং ভিক্ষা চাওয়ার নমুনা ও পদ্ধতি পর্যন্ত তিনি আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন এখানে আবেদনপত্র গ্রহণীয় ও মঞ্জুর করবার জন্য কোন ভাষায় ও পদ্ধতিতে তা পেশ করতে হবে। 

আমি বলেছিলাম, কোরআন মাজিদের এমন এক দরখাস্ত এটি যা মঞ্জুর হয়েই আছে। দরখাস্তও আমাদের লিখে দেয়া হয়েছে এবং এটাও শিখিয়ে দেয়া হয়েছে আমার দরবারে এসে তোমরা এটি এই পদ্ধতিতে পেশ কর।

এই দরখাস্ত গৃহিত হবার জন্য কোনো জামানতের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা নিশ্চিতরূপেই গৃহিত হবে। এর গ্রহণযোগ্যতা এ পরিমাণ যে, আল্লাহ তায়ালা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে উপঢৌকন দিয়েছেন নামাজ, যার অসিলায় আমাদেরকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দিয়েছেন তাতেই তার পাঠ বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। কেননা কেউ যখন কারো দরবার পর্যন্ত চলে যায়, তখন জরুরি নয় যে, প্রধানের সঙ্গে তার একান্ত সাক্ষাত হবেই। একান্ত মিটিংয়ের জন্য ছোটো-খাটো কোনো নেতা, পাতিনেতা, সেখানকার কোনো কর্মকর্তা, জ্ঞানী বা পেয়াদার অনুসরণ করতে হয়। তবু প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে দু‘মিনিট অন্তত সময় দেয়াও একজন বড় ব্যক্তির জন্য মুশকিল হয়ে যায়। কিন্তু তিনি তো আহকামুল হাকিমীন। তাঁর দয়া ও মাহাত্ত¡ এ পরিমাণ যে, তিনি তাঁর নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রদত্ত উপহারের মধ্যে আমাদের জন্য নামাজ নামক সাক্ষাতব্যবস্থার সুযোগ করে দিয়েছেন।

নামাজ মুমিনদের জন্য মেরাজ স্বরূপ: নামাজটা আসলে কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নামাজ হচ্ছে মুমিনদের জন্য মেরাজ স্বরূপ। রবের সঙ্গে সরাসরি ও সামনাসামনি সাক্ষাতের নামই নামাজ। বিশেষত: সকাল বেলার দরখাস্ত কোরআনের ভাষায় ‘নিশ্চয়ই ফজরের কোরআন পাঠ মুখোমুখি হয়।’ (সূরা আল-ইসরা: ৭৮)। অর্থাৎ সকালে ফজরের নামাজে যে তেলাওয়াত করে মানুষ সে তো সামনাসামনিই। মাঝে তো আর পর্দা নেই কোনো।

প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের দৃষ্টি বিনিময়: আর মানুষ যখন কোরআনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার দরবারে দরখাস্ত পেশ করে তখন তার মধ্যে কেমন যেন এ আয়াতের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ‘বস্তুত: যেকোনো অবস্থাতেই তুমি থাকো এবং কোরআনের যেকোনো অংশ থেকেই পাঠ করো কিংবা যে কোনো কাজই তোমরা করো; আমি তখন তোমাদের নিকট উপস্থিত থাকি যখন তোমরা তাতে আত্মনিয়োগ কর।’ (সূরা ইউনূস: ৬১) ওহে ঈমানদারগণ! আমাদের কী সৌভাগ্য যে, আল্লাহ স্বয়ং বলছেন, তোমরা যে অবস্থায় ও যে প্রেক্ষাপটেই থাকো না কেন; আমি তোমাদের এতো বেশি মুহাব্বত করি ও ভালোবাসি যে, তোমরা যেকোনো অবস্থাতেই থাকো না কেন এবং কোরআনের যে কোনো অংশই তেলাওয়াত করো না কেন, আর সে মোতাবেক যখন আমল করো, তখন আমি নিজেই সেখানে দৃষ্টি দিই। ভালোবাসা ও প্রেমের দৃষ্টিতে তাকাই। অর্থাৎ আমি স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হয়ে দৃষ্টি দিতে থাকি। যতক্ষণ তোমরা কোরআন তেলাওয়াত করতে থাকো। তেলাওয়াত কালীন তোমরা যে অবস্থা ও প্রেক্ষিতেই থাকো এবং সে মোতাবেক তোমরা যা-ই করো তার সবকিছুতেই আমি নিজে উপস্থিত থেকে সে সবকিছু ভালোবাসার নজরে দেখতে থাকি; প্রেমিক যেমন তার প্রেমাস্পদের দিকে ভালোবাসার নজরে দৃষ্টিপাত করে। বস্তুত তোমরা তো প্রেমিকই বটে এবং আমি তোমাদের প্রেমাস্পদ। তোমরা আমার প্রতি ভালোবাসার অনুরাগী এবং আমি তোমাদের অনুরক্ত। কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটাই উল্টে যায় যখন তোমরা তিলাওয়াত করো। আমিই বরং তখন তোমাদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ করতে থাকি।

আমাদের নবীর (সা.) মে‘রাজে; একদম সরাসরি সাক্ষাতে যে উপহার আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন, তাতে একটি দরখাস্ত দেয়া হয়েছে এবং তা কবুল করে নেয়া হয়েছে। কবুলই নয় শুধু; বরং তাৎক্ষণিক তার জবাবও দিয়ে দেয়া হয় আমাদের। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব (সূরা গাফির: ৬০)। অপর আয়াতে বলেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে, বস্তুত: আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নিই।’ (সূরা বাকারা: ১৮০)। অর্থাৎ যখন কোনো বান্দা আমাকে ডাকে, আমি তখন তা শুনতে পাই। সূরা ফাতেহা’র তো এটাই বৈশিষ্ট্য। এটা এমনই এক দরখাস্ত যে, তার জবাব দেয়া হয়। হাদিসে এসেছে, হজরত নবী (সা.) যিনি সত্যবাদী এবং সত্যায়িত নবী তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, মানুষ যখন আল্লাহর দরবারে সাক্ষাতের সময় তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দরখাস্ত পেশ করে, তখন সম্পূর্ণ দরখাস্ত শুনে তারপর তার জবাব দেয়া হয় না। বরং এক একটি বাক্য উচ্চারণ করা হয়, আর ওখান থেকে তার জবাব আসতে থাকে।

আল-হামদু লিল্লাহি রব্বিল-আলামীন এর ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, বান্দা যখন তাঁর রবের প্রশংসা ও বড়ত্বের বর্ণনা করে, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পাশাপাশি নিঃশর্ত স্বীকারোক্তি দেয় তার প্রভুত্বের, সেই সঙ্গে চেষ্টা চালাতে থাকে নিজের চিন্তা ও ভাবনার জগতকে বিশ্বজনীন বানাবার, আর আল্লাহর সামনে একথার স্বীকৃতি দেয় যে, আল-হামদু লিল্লাহি রব্বিল-আলামীন তথা যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, আল্লাহ তখন বলেন হামিদা-নি ‘আব্দী আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। কে করেছে? আমার বান্দা; আমার গোলাম। আমার গোলাম আমার প্রশংসা করেছে। আল্লাহ খুশি হয়ে যান। প্রফুল্ল চিত্তে তিনি জবাব দেন আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।

আর বান্দা যখন বলে আর-রাহমানুর রাহীম তিনি পরম করুণাময়, অতিশয় দয়ালু। আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলীর বর্ণনা করে। প্রভুত্বের স্বীকৃতি দেবার পর তাঁর ‘পরম করুণাময় ও অতিশয় দয়ালু’ হবার গুণ প্রকাশ করে, আল্লাহ তখন বলেন আছ্না ‘আলাইয়্যা ‘আব্দী আমার বান্দা আমার স্তুতি গেয়েছে। আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে, আমার বান্দা আমার বড়ত্বের বয়ান দিয়েছে। আর যখন বান্দা বলে মালিকি-য়াওমিদ্দীন বিচার দিবসের অধিপতি। আল্লাহ তখন বলেন মাজ্জাদা-নি ‘আব্দী আমার বান্দা আমাকে মহিমান্বিত করেছে। আমার বান্দা আমার মর্যাদা বয়ান করেছে। বান্দা বলে ইয়্যাকা না‘বুদু অ ইয়্যাকা নাসতা‘য়ীন আমরা কেবলই আপনার ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে আমরা সাহায্য চাই। আল্লাহ বলেন হাযা বাইনি অ বাইনা ‘আব্দী এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যকার বিষয়।

প্রতিটি বাক্যে বাক্যে জবাব হতে থাকে। তবে এগুলো শোনার মতো আমাদের অন্তঃকর্ণ নেই সেটা ভিন্ন কথা। আমাদের ব্যর্থতা যে, আমরা আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে জীবিত করতে পারিনি। না হয় আমরাও তা শুনতে পেতাম। আল্লাহর কিছু বান্দা আছেন, যারা দিব্যি এসব জবাব শুনতে পান।

আমার হজরতের এক খাদেম ছিলেন। হজরতকে তিনি চিঠি লিখেছেন যে, হজরত, চিরসত্যবাদী নবী (সা.) যখন এ কথা বলে গেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা আল-হামদু লিল্লাহি রব্বিল-আলামীন এর জবাব দেন, তো আমার তো আল-হামদু লিল্লাহি রব্বিল-আলামীন পড়ে আর সামনে এগোতে ইচ্ছে করে না, যতক্ষণ না আমি নিজ কানে শুনতে পাই যে, আল্লাহপাক জবাব দিচ্ছেন হামিদা-নি ‘আব্দী আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। তিনি অবশ্য মাসআলা জানতে চেয়েছেন যে, নামাজ কী হচ্ছে নাকি না? কেননা জবাব শোনার অপেক্ষায় কিছুটা বিলম্ব তো হয়ে যায়। কখনো আবার আওয়াজ দেরিতে পৌঁছে। এতে আরেকটু বিলম্ব হয়ে যায়। এজন্য তিনি তা জিজ্ঞেস করেছেন।

অনুরূপ যখন আর-রাহমানুর রাহীম পড়ি তখনো অপেক্ষা তৈরি হয় যে, আমার আল্লাহ কী জবাবে আছ্না ‘আলাইয়্যা ‘আব্দী আমার বান্দা আমার স্তুতি গেয়েছে বলছেন কী-না? কানে যখন জবাবের আওয়াজ চলে আসে তখন তৃতীয় আয়াত পড়ি। এমনই অবস্থা হয় সূরা ফাতেহার ক্ষেত্রে। কাজেই এটা এমনই এক দরখাস্ত যে, এর জবাব আসতে থাকে।

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, এর মধ্যে আমাদের দীক্ষাদানের ব্যবস্থাও নিহিত। আল্লাহপাকের শাহি দরবার, যিনি একক ক্ষমতাবান, যা চান তা-ই করেন, যিনি আহকামুল হাকিমীন সকল বাদশার বাদশা তাঁর দরবারে আমাদের মতো গোলাম উপস্থিত হয়ে আল্লাহর সামনে দরখাস্ত পেশ করছি। আল্লাহ আমাদের শাসক ও অধিপতি আর আমরা তাঁর গোলাম এমনটাই তো শুধু নয়; বরং আমাদের মধ্যে তো প্রেমিক ও প্রেমাস্পদেরও একটা সম্পর্ক আছে। প্রতিজন ঈমানদার আল্লাহর প্রেমিক। কোরআনে আছে ‘আর কোনো লোক এমনো রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার, তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।’ (সূরা বাকারা: ১৬৫)।

যারা ঈমানদার নয়, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা বহু বন্ধু-বান্ধব খুঁজে ফেরে। কিন্তু ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য কী? তাদের হৃদয়ের যাবতীয় ভালোবাসার চেয়ে আল্লাহর ভালোবাসা তীব্র। তাদের অন্তরে এক মহান সত্তার বাস। তাদের ভালোবাসা সেই মহিমান্বিত সত্তার জন্যেই। তাদের অন্তর জুড়ে থাকে সেই সত্তার সঙ্গে। সুতরাং আল্লাহ আমাদের প্রেমাস্পদও বটে। কাজেই আমাদের প্রেমাস্পদ ও মহান আল্লাহর সামনে আমাদের যে দরখাস্ত পেশ করতে হবে তার শুরুতে তো তাঁর বড়ত্বের বয়ান করতেই হবে। তাঁর কিছু উপাধি ও শ্রদ্ধাপূর্ণ নিবেদন আনতেই হবে আপনি এমন, আপনি তেমন, অমুক অনুগ্রহটা আপনি করেছিলেন, আমরাও আরো দয়া-অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী। এতে করে এগুলো যাকে বলা হবে তিনিও বুঝে নেবেন যে, তার আরো প্রয়োজন আছে। এজন্য সে অতীত দাক্ষিণ্যের স্মরণ করছে। তার আসলে আরো কিছু চাহিদা আছে।

সংগ্রহ : নুসরাত জাহান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে