কী এই টেলিস্কোপ?

সিফাত সোহা

প্রকাশিত: ১২:৪১ ১০ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১২:৪১ ১০ জানুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আধুনিক সভ্যতার সূচনা অনেক আগেই হয়েছিল। বিজ্ঞান শুধু মানব সভ্যতার বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিজ্ঞানই পেরেছে মানুষের কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাসকে দূর করতে। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের ধারণা ছিল সূর্য পৃথিবীর চারদিকে পরিক্রমা করছে আর এটার প্রতি মানুষের বিশ্বাস অটুট ছিল, কারণ তারা দেখতেন সূর্য পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। এছাড়াও প্রাচীন গ্রন্থ মতে এমনটাই লেখা ছিল। যার কারণে মানুষ এটাকে এতটা বিশ্বাস করতো। কিন্তু মানুষের এই বিশ্বাস আর মান্যতার উপরে তখনই আঘাত করা হয় যখন গ্যালিলিও টেলিস্কোপের সাহায্যে এটা প্রমাণ করেন আমাদের এই পৃথিবী এই ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র নয়। এটা সাধারন একটি গ্রহ মাত্র আর এই গ্রহটি সূর্যের পরিক্রমা করছে। 

গ্যালিলিও এর এই কথা তখনকার সময়ের ধর্ম প্রেমীদের কাছে মোটেও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। কিন্তু বিজয় বিজ্ঞানেরই হয়েছিল। আর এই বিজয় ছিল ওই টেলিস্কোপ এর যেটার সাহায্যে গ্যালিলিও ভেনাস ও জুপিটারের চারটি চাঁদকে দেখতে পেয়েছিল। টেলিস্কোপ তখন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের একটি পছন্দের গ্যাজেট। যেটার সাহায্যে  বিজ্ঞানীরা হাজার লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের কোনো বস্তুকে ঘরে বসেই দেখতে পারে। এর জন্য বলা যেতেই পারে যে সম্পূর্ণ এস্ট্রোনমি টিকে আছে টেলিস্কোপের ওপর ভিত্তি করে। 

আচ্ছা আমরা কি জানি কি এই টেলিস্কোপ? হয়ত অনেকেই জানি না। তাই আমাদের আজকের আলোচনা থেকে আমরা এটাই জানার চেষ্টা করবো যে টেলিস্কোপ কি, এটা কিভাবে দূরের কোন বস্তুকে বা তারাকে খুজে বের করে। আর ব্রম্মাণ্ডের হাজারো আলোকবর্ষ দূরের কোন বস্তুর যদি আমরা এইচডি পিকচার দেখতে চাই তাহলে আমাদের কত বড় টেলিস্কোপের প্রয়োজন হবে।  

আমরা সবাই ভালো করেই জানি যে টেলিস্কোপ এমন একটি ডিভাইস কার ব্যবহার করে আমরা ঘরে বসেই অনেক দূরের জিনিস দেখতে পারি। এটা লাইট যেমন ভিজিবল লাইট ইনফারেট, রেডিও আর এক্সরে'র মত লাইটের কিরণের এর উপরে ভিত্তি করে কাজ করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে আপনি যদি চাঁদকে একটি টেলিস্কোপ এর সাহায্যে ভিজিবল লাইটে দেখতে চান তো আপনি তখনি দেখতে পাবেন যখন চাঁদ থেকে লাইট রিফ্লেক্ট হয়ে আপনার টেলিস্কোপে এসে পড়বে। মোটকথা ভিজিবল লাইটে দেখা মানে হলো এটাই আমরা মানুষ যেভাবে কোন বস্তুকে দেখে থাকি। যদি ইনফারেন্ট বা এক্সরের প্রয়োগ করা হয় তো আপনি চাদের গঠন তাপমাত্রা আর কেমিক্যাল কম্পোজিশন এর সম্পর্কে জানতে পারবেন। 
একই সাথে রেডিও টেলিস্কোপের ইউনিভার্স এর হাজার লাইট ইয়ার্স দূরে থেকে আসা রেডিও সিগনালকে ক্যাচ করে ঐ বস্তুর দূরত্ব সম্পর্কে আপনাকে ইনফর্মেশন দিতে পারে। বাস্তব অর্থে টেলিস্কোপ হোল বিজ্ঞানীদের ওই চোখ যেটা দিয়ে হাজারো লাখো আলোকবর্ষ দূরের বস্তুকে অতি সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। তবে বিজ্ঞানীরা কিভাবে তারা গ্রহ গ্যালাক্সির খোঁজ করে এবং কিভাবে তার তাপমাত্রার, কেমিক্যাল কম্পোজিশন আর এলিমেন্ট এর সম্পর্কে জানতে পারে সেটা সম্পর্কে জানি। 

আমরা জানি আমাদের এই ইউনিভার্স বিশাল বড় আর এতটাই বড় যে সেটা কল্পনা করেও শেষ করা যায় না। আপনি রাতের আকাশে হাজারো লাখো তারা দেখতে পাবেন। এখন আপনি যদি একটি আঙুল দিয়ে যতটুকু জায়গা বন্ধ করতে পারেন শুধুমাত্র ঐটুকু স্থানকেই টেলিস্কপের সাহায্যে দেখেন তাহলে আপনি ওইখানে হাজারো লাখো তারা দেখতে পাবেন। কিন্তু আপনি খালি চোখে অল্প কিছু সংখ্যক তারা দেখতে পারবেন। যত গুলো সাইন্স এর ব্রাঞ্চ আছে তার মধ্যে একমাত্র অ্যাস্ট্রোনমি একমাত্র ব্রাঞ্চ যার সব অধ্যায়ন অবসারভেশনের উপরেই টিকে আছে। আমরা আমাদের বর্তমান টেকনিকের সাহায্যে স্পেকট্রাম সূর্য বা আমাদের সলার স্যস্টেমের বাইরে পাঠাতে পারি। কিন্তু কল্পনার থেকেও বিশাল এই ইউনিভার্স এর সামনে ঐ সমস্ত কিছুই ক্র্যাফট তো কিছুই না।

তাহলে কিভাবে আমরা জানতে পারি অন্য কোন গ্যালাক্সি সম্পর্কে যে, সেটা কতটা পুরনো আর সেটা আমাদের থেকে কতটা দূরে আছে এবং সেখানে কত স্টার হতে পারে। এটার জন্য সর্বপ্রথম আকাশে দেখতে পাওয়া প্রথম যে জিনিস স্টার, সেটার সাহায্য নিতে হয়। আমরা সেটার প্রপার্টিস যেমন সেটা কি দিয়ে তৈরি, তার টেম্পারেচার, ওজন, বয়স এবং সেটা পৃথিবী থেকে কত দূরে আছে এটা সম্পর্কে জেনে আমরা গ্যালাক্সির সম্পর্কে জানতে পারি। আর বিজ্ঞানীরা এই সমস্ত তথ্য শুধুমাত্র তারা থেকে আসা আলোর সাহায্যে নিতে পারে। জানি, আপনারা হয়তো বিশ্বাস করতে পারছেন না। এটার জন্য ওই স্টার থেকে আসা আলোকে আমাদের রেইনবো করতে হবে। যেমনটা আমরা সূর্যের আলোকে এই পৃথিবীতে দেখি। কিন্তু যেহেতু সূর্য আমাদের পৃথিবীর কাছেই আছে তাই বৃষ্টির কণা বা জলীয়বাষ্প মিশ্রিত সূর্যের আলো যাবার সময় আলোর প্রতিসরণ এবং আলোর প্রতিফলনের কারণে রংধনু বা রাইনবোর সৃষ্টি হয়। যার কারণে আমরা সূর্যের প্রকৃত রং এর মধ্যে সাতটি আলাদা আলাদা লাইট দেখতে পাই। 

স্পেকট্রামে আলাদা আলাদা ওয়েভ লেন্থে হয়ে থাকে। সূর্য তো আমাদের কাছে তারা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা কিভাবে হাজারো আলোকবর্ষ দূরের তারার আলোর রেইনবো দেখতে পায়। এর জন্য বিজ্ঞানীরা জলীয়বাষ্পের পরিবর্তে একটি বিশেষ প্রকারের ইকুইপমেন্ট এর ব্যবহার করে থাকে। যেটাতে ওই তারার লাইট স্কেটার হয়ে যায়। যেটা থেকে বিজ্ঞানীরা ওই লাইটের আলোতে লুকিয়ে থাকা অন্যান্য রং এর সম্পর্কে জানতে পারে। যদি আপনি সূর্যের রাইনবো কে দেখেন তো আপনি সাতটি আলাদা আলাদা লাইটের মধ্যে কালো কালো লাইন দেখতে পাবেন। আসলে ওই কাল লাইনের প্যাটেল ওই তারার  অ্যাটমিক স্টাকচার এর মানে ওই তারা মধ্যে কি কি এলিমেন্ট আছে সেটা কে বুঝাচ্ছে। প্রতিটা অ্যাটম একটি আলাদা প্রকারের বিশেষ লাইট কে অ্যাব্জরভ করে থাকে। আর যতটা বেশি ওই লাইট অ্যাব্জরভ করবে ওটা থেকেই বিজ্ঞানীরা অ্যাটমের সম্পর্কে জানতে পারবে। 

এই রাইনবোতে থাকা আলাদা আলাদা সাতটি রঙের যত বেশি করে লাইন হবে ওটার হিসেবে বিজ্ঞানীরা তারা তে মজুত অ্যাটম আর তার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা করে থাকে। কিন্তু শুধুমাত্র রাইনবো আর লাইটের স্কেটারিংই একমাত্র মাধ্যম নয়। রেডিও ওয়েভ থেকেও বিজ্ঞানীরা অনেক কিছুই জানতে পারেন  রেডিও টেলিস্কোপ এই সমস্ত ওয়েভকে ক্যাচ করে আমাদের ইউনভারসের ওই সমস্ত ইতিহাস কে জানতে সাহায্য করতে পারে। যা আমরা আজও জানতে পারিনি।  

একইভাবে অন্য সব লাইট যেমন ইনফারেট আর এক্সরে টেলিস্কোপ থেকেও তারা সম্পর্কে জানতে পারা যায়। ইনফারেট থেকে আমরা গ্যাসের বিশাল মেঘ মানে নেবুলার মধ্যে লুকিয়ে থাকা তারা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। আর আলট্রা ভায়লেট কিরণ থেকে আমরা যে কোন গরম অবজেক্ট বা তারার সম্পর্কে জানতে পারি। এর মানে যদি আমরা আলাদা আলাদা ওয়েভ লেন্থ থেকে তারার অধ্যায়ন করি তো আমরা ল্যাবের মধ্যে বসেই অনেক কিছু জানতে পারি। কিন্তু  টেলিস্কোপের ও একটি সীমাবদ্ধতা আছে। টেলিস্কোপ শুধুমাত্র বড় বড় অবজেক্টকে দেখতে পায়। যেমন স্টার, বড় বড় নেবুলা, গ্যালাক্সি এই সব। যে টেলিস্কোপ এখনো পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে সেগুলো শুধুমাত্র বড় অবজেকটেরই হাই-রেজুলেশন ছবি নিতে সক্ষম। আর এর মধ্য থেকে গ্রহ কে খুজে বের করা অনেক কঠিন একটি কাজ। 

বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ওই সমস্ত গ্রহেরই খোঁজ করতে পারে যেগুলো কোন তারার খুব কাছে আছে। কারণ যখন কোন গ্রহ তারা পরিক্রমা করে তখন তারার আলোর মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন আসে। আর টেলিস্কোপ তারার আলোর মধ্যে আসা পরিবর্তনকে অতি সহজেই ক্যাচ করে নেয়। আর তখনই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ওই তারার কাছে কোন প্ল্যানেট আছে। সত্যিকার অর্থে গ্রহকে খোজা ভীষণ কঠিন একটি কাজ। কারণ সেটার আকার অনেক ছোট আর তার নিজস্ব কোন আলো নেই। তাহলে এখানে সবার মনেই একটি প্রশ্ন জাগে, বাস্তবে কত বড় টেলিস্কোপ এর প্রয়োজন হবে যেটার সাহায্যে আমরা হাজারও আলোকবর্ষ দুরের কোন গ্রহের হাইরেজুলেশন পিকচার দেখতে পারব। 

মনে করুন যদি আপনি দু'হাজার লাইট ইয়ার্স দূরে মজুদ কোন গ্রহকে পৃথিবী থেকে দেখতে চান, তাহলে ১১ বিলিয়ন  কিলোমিটার ডায়ামিটারের টেলিস্কোপ এর প্রয়োজন হবে। তাহলে আপনি ওই গ্রহের এইচডি পিকচার এবং ওই সব গ্রহের সম্পূর্ণ তথ্য ঘরে বসেই দেখতে পারবেন। কিন্তু এত বড় টেলিস্কোপ তৈরি করা অসম্ভব। এছাড়াও আমরা যদি এতো বড় টেলিস্কোপ তৈরি করে ফেলি তারপরও আমরা ওই দু হাজার বছর পূর্বে দেখতে পারব। কারণ লাইটকে ওই গ্রহ থেকে ট্রাভেল করে আমাদের কাছে এসে পৌঁছাতে দু হাজার বছর সময় লেগে যাবে। আশা করি আপানারা আজকের আলোচনা থেকে জানতে পারলেন যে টেলিস্কোপ কি আর কিভাবে বিজ্ঞানীরা এটা ব্যাবহার করে। হয়ত আমাদের দৈনন্দিন কাজে এই টেলিস্কোপ আমরা ব্যাবহার করি না কিন্তু আমাদের পৃথিবী এবং আমাদের ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে অনেক তথ্যই আমরা এই টেলিস্কোপের সাহায্যে পেয়ে থাকি।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ