Alexa কি ঘটেছিল প্রথম বিশ্বকাপে

আইসিসি বিশ্বকাপ-২০১৯

কি ঘটেছিল প্রথম বিশ্বকাপে

রুশাদ রাসেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:০৬ ১৯ মে ২০১৯   আপডেট: ২০:১২ ১৯ মে ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৫ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে কিংবদন্তী ধারভাষ্যকার টনি কোজিয়েরারের একটি অতিশোয়ক্তি বেশ প্রচলিত। ‘ক্রিকেট বৈধতা পাওয়ার পর প্রথম বিশ্বকাপই  হবে নতুনত্বের দিক দিয়ে  দুঃসাহসিক এবং সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষাময় একটি টুর্নামেন্ট।’

কোয়েজারের কথাটি সত্য না মিথ্যা সে পোস্টমর্টেমে যাব না, কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বকাপ যে বিশ্বে নতুন কিছুর জোয়ার সৃষ্টি করেছিল সেটি প্রশ্নাতীতভাবেই প্রমাণিত। পুরো ক্রিকেট বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থাটাই পালটে দিয়েছিল এই বিশ্বকাপ। চার বছর পরপর হওয়া এই বিশ্বকাপের হাত ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে স্পন্সর এবং প্রচারমাধ্যমগুলো।    

১৯৭৫ সালের আগে টেস্ট ক্রিকেট ছিল বেশ জনপ্রিয়। ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে ইংলিশ কাউন্টি ক্লাবগুলো ক্রিকেটের ছোট সংস্করণ নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করে। সেখান থেকেই মূলত ওয়ানডে ক্রিকেটের উৎপত্তি ঘটে। 

১৯৬২ সালে চার দলের একটি নকআউট টুর্নামেন্ট আয়োজন করে তারা। যার নাম দেয়া হয় মিডল্যান্ডস নকআউট কাপ। এরপর থেকেই মূলত ইংল্যান্ডে ওয়ানডে ক্রিকেটের জনপ্রিয় হতে থাকে। 

বিশ্বকাপের শুরুর আগে ওয়ানডে খেলা শুরু হলেও সেটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মর্যাদা তখনও পায়নি। তবে ক্রিকেট বিশ্বকাপের ধারণাটা এসেছে ১৯৬৯ সালের দিকে। শুনতে অবাক হলেও এটাই সত্যি। 

১৯৬৯ সালের এক ট্রেন ভ্রমণের সময় সামারসেট কাউন্টি দলের অধিনায়ক বেন ব্রক্লেহার্স্ট ‘দ্য ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ’ এর চিন্তা নিয়ে ফান্ড গঠনের কাজে নামেন। তার মতে, এটা খুব দরকারি ছিল ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের জন্য। ‘দ্য হিস্টোরি অফ দ্য ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইয়ের লেখক মার্ক বালদউইন ব্রক্লেহার্স্টের সঙ্গে একাত্বতা প্রকাশ করেন। তিনি দেখেন, ব্রক্লেহার্স্ট ৫০ হাজার পাউন্ড স্পন্সরশিপ জোগাড় করেছেন ব্রিস্টলের উইলস সিগারেট কোম্পানির কাছ থেকে। এবং এখান থেকে ৬০ হাজার পাউন্ড লাভের চিন্তা করেছেন টেস্ট এবং কাউন্টি ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে। 

ব্রক্লেহার্স্ট চেষ্টা করেছেন তার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য। এজন্য তিনি এমসিসির কোষাধ্যক্ষ গাবি এলেন ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার ডন ব্রাডম্যানের কাছে যান। তিনি অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডকে এই ব্যাপারটা বোঝান। তারপরই ১৯৭০/৭১ মৌসুমে প্রথমবারের মত এমসিজিতে ওয়ানডে ক্রিকেট আয়োজিত হয় ব্রক্লেহার্স্টের সামনেই। 

ব্রক্লেহার্স্টের স্বপ্ন একটা সময়ে স্থিমিত হতে থাকে টিসিসিবি কমিটির মাধ্যমে। টিসিসিবি কমিটি ব্রক্লেহার্স্টকে বলে, ‘খালি চোখে আমরা মনে করছি না এই রকম মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশিপে চলতে পারবে।’

‘প্যাকার রেভুল্যুশন’ এর আগে তাদের এমন চিন্তা ভাবনা অনেকটাই প্রমাণ করে যে, ক্রিকেটটা আসলে কোন পর্যায়ে ছিল তখনকার সময়ে। তবে অনেকেই ব্রক্লেহার্স্টের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তারা বিশ্বাস করতেন ক্রিকেট বিশ্বকাপ একটা সময় হবেই। অবশেষে সেটি আলোর মুখ দেখে ১৯৭৫ সালের জুন মাসে।

৭ জুন থেকে ২১ জুন হওয়া এই বিশ্বকাপে মোট ৮টি দল অংশ নেয়। যার ভেতর ছিল ৬টি টেস্ট খেলুড়ে দেশ এবং দুটি সহযোগী দেশ। খেলা হয়েছিল ৬০ ওভারের।  যে দুটি দল অংশ নেয় তার একটি ছিল শ্রীলংকা অন্যটি পূর্ব আফ্রিকা। এই দেশটির সম্পর্কে একটু বলে রাখা ভালো। 
১৯৫৮ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় দলটি। মূলত চারটি দেশের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে দলটি গঠিত হয়েছিল। কেনিয়া, উগান্ডা, তাঞ্জানিয়া ও জাম্বিয়া উত্তর আফ্রিকার এই চারটি দেশ মিলে গঠিত হয়েছিল দলটি। ১৯৭৫ সালের পর ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপেও অংশ নেয় তারা। এছাড়া ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালের আইসিসি ট্রফিতেও খেলে দলটি। যদিও আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কেনিয়া স্বতন্ত্র দল পাঠায়, যার কারণে উত্তর আফ্রিকা পরিণত হয় তিন দলে। উত্তর আফ্রিকার দলে তখন ডন প্রিঙ্গেল নামে একজন ক্রিকেটার ছিলেন যিনি তখন অনেক ভালো খেলেছিলেন। ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপের পরপরই নাইরোবিতে এক ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। 

এই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট ধরা হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অস্ট্রেলিয়াকে। টুর্নামেন্টের ফাইনালও খেলে এই দল দুটি। মজার ব্যাপার হলো, টুর্নামেন্ট যখন শুরু হয় এর ঠিক চারদিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড ইংলিশ কাউনন্টি ক্লাব ডার্বিশায়ারের হয়ে ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে বাক্সটনে ম্যাচ খেলেন। এর ঠিক ৫ দিন পরেই ক্রিকেট বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচ! এখনকার যুগে এমনটা ভাবাই যায় না। 

টুর্নামেন্টের ফরম্যাট ছিল বর্তমান সময়ের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আদলে। ৮টি দল দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে লড়াই করে। গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়। বিশ্বকাপে সবমিলিয়ে ১ লক্ষ ৫৮ হাজার দর্শক উপস্থিত থেকে খেলা উপভোগ করেন। সে খেলায় টাইটেল স্পন্সর অনেকভাবে লাভবান হয় এই টুর্নামেন্ট থেকে। প্রায় ১ লক্ষ ৫৫ হাজার পাউন্ড আয় করে তারা। এ সফলতায় পরবর্তীতে তারা আরো অনেক টুর্নামেন্টে পৃষ্ঠপোষকতা করার আগ্রহ প্রকাশ করে।

টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মুহূর্তটি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক  রানের জয়ের ম্যাচটি। যখন শেষ উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডেরিক মারে এবং রবার্টস ছিলেন, জযের জন্য তখন দরকার ছিল ৬৪ রান। এই দুইজন মিলে শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জয়ের বন্দরে নিয়ে আসেন। এমন ঐতিহাসিক এক জয়ে পুরো স্টেডিয়াম ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান সমর্থকে ভরে যায়।  

ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়ন হলেও টুর্নামেন্টের প্রথম দিনই এক অবিস্মরণীয় মুহুর্তের অবতারণা ঘটান ভারতীয় ব্যাটসম্যান সুনিল গাভাস্কার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম বলটি করেছিলেন ভারতীয় বোলার মদন লাল। আর প্রথম বল মোকাবেলা করেছিলেন ডেনিস এমিস। প্রথমে ব্যাট করে ৩৩৫ রানের বিশাল লক্ষ্য ভারতের সামনে দাড় করায় ইংল্যান্ড। সে লক্ষ্যে নেমে আশ্চর্যজনক ভাবে পুরো ৬০ ওভার ব্যাটিং করে মাত্র ৩৬ রানে অপরাজিত থাকার এক কীর্তি গড়েন সুনিল গাভাস্কার। তখন একটি মজার ঘটনা ঘটে স্টেডিয়ামে। গাভাস্কারের এমন ব্যাটিং দেখে অনেকেই বিরক্ত হয়ে পড়েন। এমন সময় এক ইংলিশ দর্শক মাঠে ঢুকে যান। এতটাই বিরক্ত ছিলেন তিনি যার কারণে একটি স্যান্ডুইচ নিয়ে গাভাস্কারের পায়ের সামনে নিয়ে রাখেন। 

ফাইনালটাও হয়েছিল বেশ রোমান্সজাগানিয়া। বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্লাইভ লয়েড ৮৫ বলে ১০২ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন। ২৯১ রানের লড়াকু পুঁজি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভালোই লড়াই করছিল তারা। অজিরাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। ইয়ান চ্যাপেলের ৬২ রানে ভর করে প্রায় কাছাকাছিই গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ানরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৭ রানে হার মেনে নিতে হয় তাদেরকে। 

এক নজরে প্রথম বিশ্বকাপ:

সেমিফাইনালঃ অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। 
টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়নঃ ওয়েস্ট ইন্ডিজ
টুর্নামেন্টের রানার্সআপঃ অস্ট্রেলিয়া

ফাইনালের স্কোরকার্ডঃ 

ওয়েস্ট ইন্ডিজঃ ২৯১/৮, ৬০ ওভার।
ক্লাইভ লয়েড ১০২, গ্যারি গিলমার ৪/৪৮
অস্ট্রেলিয়াঃ ২৭৪ (অলআউট), ৫৮.৪ ওভার। 
ইয়ান চ্যাপেল ৬২, কেইথ বয়েস ৪/৫০। 

ফলাফলঃ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৭ রানে জয়ী।  

টুর্নামেন্টের যত কীর্তিঃ 

# এই বিশ্বকাপের দলীয় সর্বোচ্চ ইনিংস ৩৩৪/৪। যা ইংল্যান্ড করেছিল ভারতের বিপক্ষে। 
# বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান ৩৩৩। সংগ্রাহকারী নিউজল্যান্ডের গ্লেন টার্নার।
# বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান ১৭১* । যা গ্লেন টার্নার উত্তর আফ্রিকার বিপক্ষে করেছিলেন। 
# বিশ্বকাপে মোট ৬টি সেঞ্চুরি হয়েছিল। দুটি করেছিলেন গ্লেন টার্নার। একটি করে সেঞ্চুরি করেন ডেনিস আমিস (১৩৭), কেইথ ফ্লেচার (১৩১), ক্লাইভ লয়েড (১০২), এলান টার্নার (১০১)। 
# বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি হাফসেঞ্চুরি করেন পাকিস্তানের মাজিদ খান। 
# বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ তিনটি ছক্কা হাঁকান ইংল্যান্ডের ক্রিস ওল্ড। 
# অস্ট্রেলিয়ার গেরি গিলমার টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী। 
# ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গ্যারি গিলমারের করা এ বোলিং স্পেলটি টুর্নামেন্টের সেরা বোলিং স্পেল।  
# ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপে ৩ বার উইকেট নেওয়ার ঘটনা ঘটে। 
# অস্ট্রেলিয়ার রড মার্শ টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ১০টি ডিসমিসাল করেন। 
# টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৪টি ক্যাচ গ্রহণ করেন ক্লাইভ লয়েড।
# এক ম্যাচে শ্রীলংকার বিপক্ষে সর্বোচ্চ ৩টি ক্যাচ নেওয়ার কৃতিত্ব দেখান ক্লাইভ লয়েড। 

ডেইলি বাংলাদেশ/সালি