কিশোরগঞ্চের পাগলা মসজিদ: যে কারণে আলোচিত 

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩০ ১৫ এপ্রিল ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মাত্র ৮৩ দিনে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাগলা মসজিদের দানবাক্সে কোটি টাকার ওপরে দানের অর্থ জমা হয়েছে। 

গত শনিবার চৈত্রের শেষদিনে গণনা শেষে দেখা যায়, মাত্র ৮৩ দিনে ১ কোটি ৮ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা জমা হয়েছে এ টাকার হিসাব পাওয়া যায়। এবার মাত্র ৮৩ দিনে কোটি টা মসজিদের দানবাক্সগুলোতে। আর দানবাক্সে দেশি টাকার সঙ্গে জমা হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রাও। আরো পাওয়া গেছে স্বর্ণ এবং রৌপ্য।

কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকারি কর্মকর্তা, মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পাগলা মসজিদের ছয়টি লোহার দানবাক্স খোলা হয় এদিন। এরপর বাক্সগুলো থেকে পাওয়া নগদ অর্থ বস্তায় ভরে মসজিদের দোতলায় স্তূপ করা হয়। শুরু হয় গণনা। মসজিদ কমপ্লেক্সের শতাধিক শিক্ষার্থীসহ শহরের রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা গণনা শেষে বিকেল ৫টায় টাকার হিসাব পান।

কিশোরগঞ্জ শাখা রূপালী ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিবারই আমাদের ব্যাংকের লোকজন টাকা গণনা করে ব্যাংকে জমা করেন। এবার ৮৩ দিন পর দানবাক্স খোলা হয়েছে। মোট টাকা পাওয়া গেছে ১ কোটি ৮ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা।

সংশ্রিষ্টরা জানান, ১৯ জানুয়ারি মসজিদের পাঁচটি লোহার দানবাক্স থেকে ১ কোটি ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৩ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। আর গত বছর দানবাক্সে পাওয়া টাকার পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৩৫ লাখ ৭৬ হাজার ১৭৭ টাকা।

তারা আরো জানান, দানবাক্স সূত্রে পাওয়া এই বিশাল অর্থ থেকে পাগলা মসজিদ ও ইসলামী কমপ্লেক্সের খরচ চালিয়ে অবশিষ্ট টাকা জমা রাখা হয় ব্যাংকে। তার থেকে পাওয়া আয় থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেয়া হয়।

শহরের হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের অবস্থান। অনেকের বিশ্বাস, এখানে ইবাদত বন্দেগি করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। অনেকে বিশ্বাস রাখেন, রোগ-শোক বা বিপদে মসজিদে মানত করলে মনের বাসনাও পূর্ণ হয়। এমন বিশ্বাস থেকে এখানে প্রতিনিয়ত দান খয়রাত করে মানুষ। তিন মাস পর পর খোলা হয় মসজিদের দানবাক্স। প্রতিবারই টাকার পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় কোটি টাকা। স্থানীয়রা জানান, নানা শ্রেণিপেশার লোকজন এখানে আসেন মানতের দান করতে। আর শুধু মুসলমান-ই নয়, আসেন অন্যান্য ধর্মের মানুষও।

যে কারণে পাগলা মসজিদ নাম: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন ও উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, অনেক বছর আগে পাগলবেশী এক আধ্যাত্মিক পুরুষ খরস্রোতা নরসুন্দা নদীর মধ্যস্থলে মাদুর পেতে ভেসে এসে বর্তমান মসজিদের কাছে থিতু হন। এসময় তাকে ঘিরে আশেপাশের অনেক এসে ভক্তকূল সমবেত হন। পাগলবেশী ওই সাধকের মৃত্যুর পর তার সমাধির পাশে পরবর্তীতে এই মসজিদটি গড়ে উঠে। কালক্রমে মসজিদটি ‘পাগলা মসজিদ’ নামে পরিচিত পেয়ে যায়।

তবে মসজিদটির সঠিক ইতিহাস কারোর জানা নেই। তবে স্থানীয়দের অনেকের ধারণা- মসজিদটি প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো। এ মসজিদে নারীদেরও নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তারা মসজিদের ভেতরেই আলাদা করা স্থানে নামাজ আদায় করেন। 

প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে প্রচুর লোক সমাগম হয়। সেদিনই দান খয়রাত বেশি করে লোকজন।

কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিমে নরসুন্দা নদীর তীরে হারুয়ায় দশ শতাংশ জমির ওপর এই তিনতলা বিশিষ্ট মসজিদটির মূল ভবনের অবস্থান। পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু একটি মিনার রয়েছে। মসজিদের ব্যয়ে ২০০২ সালে মসজিদের পাশেই একটি হাফেজিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। পাগলা মসজিদে গরু-খাসি এবং প্রচুর স্বর্ণ অলংকার সহ প্রচুর টাকা দান-খয়রাত করে থাকেন আগত মানতকারীরা। দান সূত্রে প্রতিদিন মসজিদের আয় দুই লক্ষ টাকার বেশি।

জানা গেছে, মানতকারীরা দানবাক্সে নগদ টাকা দেয়া ছাড়াও নিয়ে আসে চাল-ডাল-গবাদি পশুসহ বিভিন্ন সামগ্রী। দিন শেষে এসব পণ্য নিলামে বিক্রি করে এর থেকে পাওয়া অর্থ জমা করা হয় ব্যাংকে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুর রহমান বলেন, তিন মাস পরপর মসজিদের দানবাক্সগুলো খোলা হয়। এবার দুই মাস ২৪ দিনপর খোলা হলো। 

তিনি আরো বলেন, মসজিদের দানবাক্স খোলা হলেই সাধারণত ১ কোটি টাকার মতো পাওয়া যায়। এবারও ১ কোটি টাকার উপরে পাওয়া গেছে। টাকাগুলো রূপালী ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছে। যে স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গেছে তা আগের স্বর্ণালঙ্কারের সঙ্গে যোগ করে সিন্দুকে রেখে দেয়া হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী পদাধিকার বলে পাগলা মসজিদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মসজিদের আয় থেকে জেলার বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদানসহ বিভিন্ন সেবামূলক খাতে সাহায্য দেয়া হয়। জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষজনকেও চিকিৎসার জন্য মসজিদের তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কিছু জিনিস নিলামে বিক্রি করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে ২৩৮ ভরি স্বর্ণ, যা বিক্রি করা হয়েছে ৪৯ লাখ টাকায়, ৮৬ ভরি রূপা বিক্রি করা হয় ৪৩ হাজার টাকায়। একটি হীরার আংটি বিক্রি হয়েছে ৩৮ হাজার ৬০০ টাকায়। তামা বিক্রি হয়েছে তিন হাজার টাকায়। ৯৭২টি কুরআন শরীফের হাদিয়া পাওয়অ গেছে ২২ লাখ টাকা, ৪৯ মণ মোম বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায়, কিছু বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি হয়েছে ৩০ হাজার টাকায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে