Alexa কালো জাদুকর ‘অঘোরী’!

কালো জাদুকর ‘অঘোরী’!

ধ্রুব ইকরামুল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:৪৪ ২৩ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৮:০৩ ২৪ আগস্ট ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

অঘোরী সাধু সম্প্রদায় কিংবা সন্ন্যাসী, কারো কাছে সাধুবাবা, কারো কাছে নগ্ন পাগল আবার কারো কাছে কালো জাদুকর হিসেবে পরিচিত। এই সভ্য সমাজের যুগে অঘোরী সন্ন্যাসীরা সত্যিই নানা কারণে রহস্যের বিষয়। 

কিভাবে এলো অঘোরী শব্দটি?

অঘোরী শব্দটি এসেছে-অ+ঘর থেকে। অর্থাৎ তারা ঘর-বাড়িহীন, তাই অঘোরী। সেই কারণেই তারা শ্মশানে থাকেন। মতান্তরে অঘোরী শব্দটির আরো একটি মানে হল অন্ধকারের বিলয় কিংবা ভয়হীনতা। অর্থাৎ অঘোরী সন্ন্যাসীরা কোনো কিছুকেই ভয় পায় না।

অঘোরীদের উৎপত্তি:

মধ্যযুগীয় কাশ্মীরী কাপালিকতন্ত্র থেকেই অঘোরীদের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। এদের প্রাচীন নাম ‘কালমুখ’।  তাছাড়া কিনারাম’র ঐতিহ্যের কথা সব অঘোরীই স্বীকার করে। এক হিসেবে দেখলে অঘোরীরা শক্তি আরাধক। কালী বা তারা’র উপাসনাই তারা করে থাকে। কিন্তু তাদের আদর্শ শিবত্ব। এই জায়গায় মূলধারার শাক্ত তান্ত্রিকদের সঙ্গে তারা সহমত। তাদের আরাধ্য পুরুষ দেবতাদের মধ্যে শিব ছাড়াও কালভৈরব, মহাকাল, বীরভদ্র প্রমুখ রয়েছে।

অঘোরীদের গমনাগমন মূলত ভারতের শাক্ত তীর্থগুলোতে। তবে,বিশেষ কয়েকটি মন্দির বা দেবস্থানকে তারা তাদের উপাসনাক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেয়। জন্মচক্র থেকে মুক্তি এবং মোক্ষের সাধনাই অঘোরীদের কাছে মুখ্য কাজ। তাদের ক্রিয়া-কর্ম রাত্রিকালীন। তারা এমনিতেও নিশাচর। কিন্তু তাই বলে তারা ‘অপ্রকাশ্য’ নন। মজার ব্যাপার হলো- তারা শৈব সাধক হলেও শাক্তদের সঙ্গে তাদের কোনো বিরোধ নেই। তাই বলে যেকোনো শাক্ততীর্থে অঘোরীদের দেখা মিলবে এমনও নয়।

অঘোরীদের জীবন:

অঘোরীরা এই পৃথিবীতে অতি সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করে এবং আত্মোপলব্ধি থেকে জ্ঞান অর্জন করার প্রচেষ্টা চালায়। বেশিরভাগ অঘোরীরা নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তারা একে মানুষের সত্যিকারের কাঠামো বলে মনে করে। তারা এ নশ্বর পৃথিবী থেকে নিজেদের পৃথক রাখতে চায়। তাদের মতে এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকা একটা মায়া,আর এই মায়াকে ঘিরে গড়ে উঠে ভালবাসা, ঘৃণা, হিংসা ও অহংকারের মত বিষয়। বেশ কিছু পুঁথিতে লেখা রয়েছে অঘোরী সাধুদের কাছে সবাই মৃতদেহ। সেই কারণেই কোনো কিছু নিয়েই এদের কোনো মোহ-মায়া নেই। 

অঘোরীদের বেশিরভাগ আচারণই মানুষের ভীতি উদ্রেককারী। অঘোরীরা বিশ্বাস করে শিবের বৈনাশিক রূপে। এক তীব্র শৈব ভাবনা থেকে তারা শিবানুসারী জীবনযাপনে উদ্যোগী হন। শ্মশানবাস তার মধ্যে প্রধান। অঘোরী সাধুরা মৃতদেহ ভক্ষণ,মূত্রপান ইত্যাদি অভ্যাস করে। ১৭ শতকের সন্ন্যাসী বাবা কিনারামের সূত্রেই এই আচারণগুলো অঘোরীদের কাছে প্রবেশ করেছে বলে জানা যায়। এর বাইরে অঘোরীরা নিয়মিত শবসাধনা করে থাকে। মৃতদেহ থেকে হাড় ছাড়িয়ে তা নিজেদের শরীরে ধারণ করে,সঙ্গে রাখে। মানুষের হাড়কে তারা গহনার মতো পরিধান করে। অঘোরীরা নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেন। কিন্তু তাদের ইচ্ছা না থাকলে স্পর্শ করে না। তারা শশ্মানের মৃতদেহের সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক করে বলেও শোনা যায়।

অঘোরীদের অনেককেই কাপলা নামক নরকপাল পরিহিত অবস্থায় উত্তর ভারতের রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়। তারা ডাস্টবিন থেকে পঁচা খাবার,পশুপাখির বিষ্ঠা ও মল ভক্ষণ করে থাকে। তাদের বিশ্বাস। গরুর গোবর কিংবা কোনো খাদ্য, ঈশ্বর সব কিছুতেই বিরাজমান; তাই অপবিত্র কিংবা অমঙ্গলজনক বলে কিছুই নেই। সব কিছুই পবিত্র। সমাজে অপবিত্র ও নোংরা হিসেবে গ্রাহ্য কাজগুলোর মাধ্যমেই তারা শক্তি অর্জন করে। এই পবিত্র-অপবিত্র কিংবা ভালো-মন্দের পার্থক্য যতই নিষ্প্রভ করতে পারবে,ততই শক্তি অর্জিত হবে বলে তারা মনে করে।

অঘোরী গুরুরা বিশ্বাস করে, একজন অঘোরী সাধুকে সমাজ,পরিবার, বন্ধুত্ব এমনকি যেকোনো প্রকার জাগতিক চাহিদা ত্যাগ করতে হবে। তাদের আজীবন শ্মশান ঘাটে অবস্থান করা উচিৎ এবং কাপলার (মানুষের মাথার খুলি) মাধ্যমে পানাহার করা উচিৎ। মদ্যপান,গাঁজা সেবন ইত্যাদিকে অঘোরীরা সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ বলে মনে করেন। হিমালয়ের ঠান্ডা আবহাওয়া হোক বা গরম- তারা প্রতিটি ঋতুতে জামাকাপড় ছাড়া থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন, ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর জন্য পরিচ্ছন্ন থাকা এবং পোশাক পরিধান করার মত ছোটোখাটো বিষয়গুলো নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়।

অঘোরী হওয়ার পূর্বশর্ত:

টানা ১২ বছর কঠোর সাধনার পর অঘোরী গুরুর আশীর্বাদে নিজের ধর্মীয় যাত্রা শুরু করেন অঘোরী সাধুরা। সন্ন্যাসী হয়ে ওঠার আগে, তাদের নিজের শ্রাদ্ধ তথা তর্পন নিজেকেই করতে হয়। ছিন্ন করা হয়,সাংসারিক সম্পর্ক চিরতরে। শুরু হয় ‘সন্ন্যাস জীবন’,যেন ঠিক পুনর্জন্মের মাধ্যমেই শুরু করা হলো, একটি নতুন জীবন। এছাড়াও অঘোরী সাধু হওয়ার জন্য তাকে আরো কিছু শর্তাবলি মানতে হয়-

• প্রথমত সে ব্যক্তিকে একজন অঘোরী গুরুকে খুঁজে বের করতে হবে এবং তার নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

• এরপর তাকে একজন মৃত মানুষের মাথার খুলি খুঁজে বের করতে হবে। এ মাথার খুলি কাপলা নামে পরিচিত। তার দীক্ষা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তাকে প্রতিনিয়ত শুধু এই কাপলাকেই খাবারের পাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

• তার ধ্যানের সময় অবশ্যই তাকে চিতার ছাই গায়ে মেখে নিতে হবে।

• তাকে অবশ্যই মানুষের পচা মাংস ভক্ষণ করতে হবে এবং মৃতদেহ সঙ্গে রেখে ধ্যান করতে হবে।

অঘোরীদের সমাজ ব্যবস্থা:

তাদের নিজ সমাজ,পরিবার বলে কিছু নেই, থাকার কোনো ঘর-বাড়ি নেই। পিছুটানহীন এই মানুষগুলো তাদের ইচ্ছে মতোই যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। তারা কখনোই তাদের খাদ্য-বাসস্থানের চিন্তা করেন না। কারণ তারা জানে,যেখানেই তারা যান কোথাও না কোথাও শ্মশান ঘাট পাবেন।

অঘোরীদের দীক্ষা পূর্ণ হওয়ার পর তাদের বন্ধু কিংবা পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া তাদের গুরু কর্তৃক নিষিদ্ধ। কেউ যদি একবারও তা করে তাহলে তাদের এই আরাধনা বাতিল বলে গণ্য হয়।

কোথায় দেখা পাবেন অঘোরী সন্যাসীদের?

• অঘোরীদের উৎস কাশীতে। এই প্রাচীন শহরে তাদের নিয়মিত দেখা পাওয়া যায়। এখান থেকেই তারা বিভিন্ন তীর্থে গমন করে।

• কুম্ভের মেলায় বহু অঘোরী সন্ন্যাসীকে দেখা যায়, তবে যুগের হাওয়া এখন বদলে গেছে, কে আসল কে নকল বোঝা মুশকিল। কোথাও আবার ভণ্ড মানুষকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে আবার কোথাও সাধুদের কপালে জুটছে চরম অপমান।

• আসামের নীলাচলে অবস্থিত কামরূপ কামাখ্যা মন্দিরে তাদের পূজা করতে দেখা যায়। সেখানে তারা কালো জাদু করেন বলেও কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

• নেপালের কাঠমান্ডুর ‘অঘোর কুটি’ অঘোরীদের বহু প্রাচীন তীর্থ। কথিত আছে,বাবা সিং শাবক নামের এক রামভক্ত সন্ন্যাসী এই তীর্থের প্রতিষ্ঠাতা।

• বিন্ধ্যাচলও অঘোরীদের কাছে পবিত্র উপাসনাক্ষেত্র। কাশীর কাছেই এই শাক্ততীর্থ। এখানে অঘোরীরা প্রায়ই সমবেত হন। দেবী বিন্ধ্যাবাসিনীর মন্দিরকে ঘিরে প্রচুর গুহা রয়েছে। এই গুহাগুলোই অঘোরীদের আস্তানা। এখানেই ধ্যান ও অন্যান্য ক্রিয়া সম্পন্ন করে তারা।

• গুপ্তকাশীর কালী মঠ আর এক গুরুত্বপূর্ণ অঘোরী-তীর্থ। কেদারনাথের নিকটবর্তী এই তীর্থ একটি শাক্তপীঠ। সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম এই পীঠস্থানে অঘোরীদের যাতায়াত অনাবিল।

• কলকাতা শহরে অঘোরীদের দেখা মেলে প্রায়শই। কালীঘাট ও দক্ষিণেশ্বর তাদের কাছে পবিত্র তীর্থ। তবে, পশ্চিমবঙ্গে যে মন্দিরটিতে সারা বছরই অঘোরীদের দেখা মেলে, সেটি তারাপীঠ।

• মাদুরাইয়ের কপিলেশ্বর মন্দিরটি অঘেরীদের প্রিয় তীর্থ। এই মন্দিরের নিকটবর্তী একটি আশ্রমে তারা প্রায়ই সমবেত হন।

• চিত্রকূটের দত্তাত্রেয় মন্দিরে ত্রিনাথের দর্শন অঘোরীদের কাছে পবিত্র কর্তব্য। কিংবদন্তি অনুসারে, দত্তাত্রেয় অঘোরপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। বেদ ও তন্ত্রের সম্মিলন তিনিই ঘটান বলে বিশ্বাস করেন অনেকেই।

• সুদূর আফগানিস্তানের কাবুলেও অঘোরী তীর্থ বিদ্যমান। অঘোর রতনলালজি নামের এক সন্ন্যাসী এখানে প্রথম আসেন এবং আশ্রম তৈরি করেন। তার মৃত্যুও হয় এখানেই। রতনলালজির সমাধি অঘোরীদের কাছে পবিত্র তীর্থ।

• অঘোরপন্থিদের প্রধান গুরু কিনারাম হিংলাজ মাতার অশীর্বাদধন্য ছিলেন বলে বিশ্বাস। পাকিস্তানের মরুতীর্থ হিংলাজকে তাই অঘোরীরা অন্যতম গন্তব্য হিসেবে ধরেন।   

তারা কী কালো জাদু করে?

অনেকেরই ধারণা অঘোরীরা কালো জাদুকর। তবে তারা কোনো কালো জাদু করে না, বরং তারা মনে করে যারা কালো জাদু করে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। তাদের জীবনের মূল সাধনা, জীবন মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভ করা। তারা শিবের ভক্ত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে মা কালি ও কাল ভৈরবের আরাধনা করেন। তা লাভ করার পর তারা হিমালয়ে গিয়ে বিলীন হয়ে যায়।

তারা পূজিত হন কেন?

সাধারণ মানুষের সঙ্গে অঘোরীরা কখনোই খারাপ ব্যবহার করেন না। তাদের দূরে সরিয়েও রাখেন না। কাশীতে তাদের মূল সাধনক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সদাশয়। বহুপ্রকার ভেজ ও জৈব ওষুধের জ্ঞান তাদের করায়ত্ত। বিপন্ন মানুষকে সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে তারা দ্বিধাবোধ করেন না। অন্যদিকে তারা মৃতদেহ থেকে অসাধারণ তেল বের করে ওষুধ তৈরি করে,যা খুব কার্যকর বলে কিছু মানুষ মনে করে থাকে। সর্বোপরি,অঘোরীরা একান্তভাবেই নির্বিরোধী এক সম্প্রদায়। তাই আপাত-বীভৎসতাগুলোকে মাথায় রাখে না সাধারণ মানুষ। তাই অনেক সাধারণ মানুষই তাদের পুজা করে থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে