কাক কাহিনী...

আহনাফ তাহমিদ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৩৬ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৯:২৯ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কাক কিন্তু কোনো সাধারণ পাখি নয়। ওদের বুদ্ধিমত্তা কিংবা পরিস্থিতি বিচার করে পদক্ষেপ নেবার দক্ষতা সম্পর্কে জানতে পারলে মাঝে মাঝে তাক লেগে যেতে হয়।

বিজ্ঞানীরা এই কাকদের নিয়েই করেছেন কত শত অনুসন্ধান, চালিয়েছেন গবেষণা। পাখিগুলোর বুদ্ধি দেখে হয়েছেন চমৎকৃত। তবে মাঝে মাঝে তাদের কার্যকলাপে যে কিছুটা হতভম্ব হয়ে যাননি, এটা বললেও ভুল হবে। পক্ষীজগতের মাঝে আমাদের সবচেয়ে চিরচেনা এই কাকদের নিয়েই আজকের আলাপন।
 
আজ থেকে ধরুন প্রায় ২০ বছর আগের কথা। ক্রিস্টোফার গ্যাবোরিট নামক একজন ব্যক্তি উচ্ছিষ্ট থেকে দাঁড়কাকদের খাবার খেতে দেখেন। সে তো আমরা প্রতিদিনই দেখি, তাই না? তবে গ্যাবোরিটের মনে বুঝি অন্যকোনো পরিকল্পনা ছিল। ফ্রান্সের বিখ্যাত একটি থিম পার্কের নাম পয় দু ফো। এখানে চাকরি নিলেন গ্যাবোরিট। প্রাচীন বাগিচা আর গ্রামের আদলে তৈরি এই থিম পার্কটি ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে খুব সহজেই। তাছাড়া এখানে ঘুরে বেড়ানোরও রয়েছে পর্যাপ্ত জায়গা। তবে একটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো পার্কের কর্মকর্তাদের। প্রতিদিন শত শত পর্যটক এখানে আসেন। তাদের হাতে বিভিন্ন খাবারের প্যাকেটে সয়লাব হয়ে থাকে পার্কের প্রাঙ্গন। পরিষ্কার আর কত করা যায়? এর থেকে মুক্তি পাবার একটা উপায় খুঁজতে শুরু করলেন তারা। হঠাত করেই গ্যাবোরিটের মনে এলো দাঁড়কাকদের সে দৃশ্যের কথা। তুড়ি বাজিয়ে উঠলেন তিনি। আরে! সমাধান তো পাওয়া গিয়েছে। 

ধরে আনা হলো কিছু দাঁড়কাক। সপ্তাহজুড়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হলো এদের। অনেকে মনে করেন টিয়া কিংবা ময়না জাতীয় পাখিদের পোষ মানানো কিংবা কিছু একটা শিখিয়ে দেয়ার কাজ অনেক সহজে করা যায়। ভাবলে অবাক হবেন, কাকদেরও কিন্তু পোষ মানানো যায়। তাদের দিয়ে করিয়ে নেয়া যায় অনেক কাজ। গ্যাবোরিট এই কাজটিই করলেন। প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিষ্কারকর্মী হিসেবে নিযুক্ত করলেন কাকদের। এতে দুই কাজ হলো। পয়সা খরচ করতে হলো না, আবার পার্কের অঙ্গনও পরিষ্কার থাকল। তাছাড়া, যারা এখানে আসতেন, কাকদের এই কাজগুলো করতে দেখেও খুব মজা পেতেন।  

অনেকে মনে করেন, মানুষের মতো পাখিরাও তাদের মৃত সদস্যের জন্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করে থাকে। বিজ্ঞানীরাও তাদের এই চরিত্র নিয়ে বেশ গবেষণা করেছেন। দলের কোনো একজন সদস্য মারা গেলে কা কা রব তুলে অন্যান্যদের তারা ডাকে। এরপর মৃত কাকের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সম্মান প্রদর্শন করছে মৃত সদস্যের প্রতি। তবে গবেষকেরা কেউ কেউ অন্য একটি বিষয়ের প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন। মৃত কাক দেখে তারা ধরতে পারে যে কোনো শত্রুর আক্রমণে হয়ত সে মারা গিয়েছে। ভবিষ্যতে তাদের ওপরও এমন আঘাত আসতে পারে। তাই আসন্ন বিপদ থেকে কীভাবে সাবধানে থাকা যায়, তা নিয়েই হয়ত আলোচনা করে তারা। ওয়াশিংটন স্টেটের কাছাকাছি কিছু অঞ্চলে কাকদের এই প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, মানুষকেই সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে থাকে কাক। আবার তাদের এই সভায় যদি অন্যকোনো পাখি এসে দাঁড়িয়ে যায় (যেমন কবুতর), যত দ্রুত সম্ভব, সেখান থেকে অন্য পাখিটিকে বিতাড়িত করতে তৎপর হয়ে যায় কাকের দল। 

ঈশপের গল্পটি আপনাদের মনে আছে তো? সে-ই যে তৃষ্ণার্ত এক কাক পেয়েছিল এক ঘটি জলের সন্ধান। জল ছিল অনেক নিচের দিকে। শেষে বুদ্ধি করে একটি একটি করে নুড়ি পাথর ফেলে তেষ্টা মেটায় পাখিটি। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে দেখেছেন ঈশপের এই গল্প সত্যি হয় কিনা। অবাক হয়ে গিয়েছেন ফলাফল দেখে। তবে বিষয়টি একটু অন্যভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল।

একটি পাত্রের মাঝে কিছু পানি রেখে তার ওপর ভাসমান কিছু খাবার রেখে দিলেন তারা। এরপর ডাকা হলো গবেষণাগারে রাখা একটি কাক। পাশে রাখা হলো কিছু পাথর। ঠোঁট দিয়ে খাবারের নাগাল পেল না পাখিটি। শেষে একটি করে নুড়ি পাথর ফেলতে শুরু করল পাত্রের ভেতর। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসতে শুরু করল তার খাবার। এরপর সেটি মুখে তুলে নিয়ে খেতে শুরু করল কাক। ঈশপের গল্পের এই বাস্তব প্রমাণ দেখে অবাক হয়ে গেলেন বিজ্ঞানীরা। 

আমাদের সঙ্গে কেউ খারাপ আচরণ করলে যেমন আমরা তা মনে রাখি, কাকদের মাঝেও ঠিক এমন প্রবণতা রয়েছে। সুযোগ পেলে তারাও শত্রুর ওপর চরমতম প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। ২০১২ সালে সিয়াটলে এই ব্যাপারটি সঠিক কিনা, তা যাচাই করার জন্য ১২টি কাকের ওপর একটি গবেষণা চালানো হয়। মুখোশ পরে একজন ব্যক্তি এই কাকগুলোকে আটকে রাখেন। আরেকজন ব্যক্তি মুখোশ পরেই তাদের দেখভাল করেন কিছুদিন। মুখোশগুলোর মাঝে ভীতি জাগানিয়া কিছু ছিল না, বরং সেগুলো দেখতে একইরকম ছিল। তবুও দুটি মুখোশ পড়ে দুজন ব্যক্তির একজন তাদের অপহরণ করে, আরেকজন সেবা করে। কিছুদিন পর কাকগুলোকে ছেড়ে দেয়া হলে সেগুলোর সামনে এই দুজন ব্যক্তিকে আনা হয়। মুখোশ এক হলেও অপহরণকারীকে শনাক্ত করতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে বেচারার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কাকগুলো। তবে নিরাপদেই সে ব্যক্তিকে রক্ষা করে আনা হয়েছিল!
 
২০১৫ সালে ফু চান নামের একজন ফটোগ্রাফার বেশ মজার একটি ছবি তোলে। ঈগলের পিঠে চড়ে বেড়াচ্ছে একটি কাক! এমনটি হবার কারণ কী? প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন ঈগল কাকটির ওপর আক্রমণ করেছিল। আসন্ন আক্রমণ ঠেকাতেই কাকটি তার পিঠে চড়ে বসার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দেখা গেল, তাদের দুজনের মাঝে এমন কিছুই হয়নি। বেশ আরামসেই ঈগলটি তার পিঠে চড়ে বসা এই “যাত্রী” নিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে! 

সত্যিই, কাকের কত মজার মজার কাহিনীই না দেখা যায় এই প্রকৃতিতে। তাই না? 

সূত্রঃ লিস্টভার্স ডট কম

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে