Alexa কাঁকড়া রফতানি বাণিজ্যে ধস

কাঁকড়া রফতানি বাণিজ্যে ধস

আহসানুর রহমান রাজীব, সাতক্ষীরা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০১:৪৫ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

চীনে করোনাভাইরাসের কারণে উপকূলীয় এলাকায় উৎপাদিত কুচিয়া ও কাঁকড়া রফতানি বাণিজ্যে ধস নেমেছে। হঠাৎ করে রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। চাহিদা কমে যাওয়ায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া সংগ্রহকারী জেলেরা।

প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। সময় মত বিক্রি না হওয়ায় অসংখ্য খামারে মড়ক দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন তারা। হুমকিতে পড়বে রফতানিমুখী এই খাত।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য, সাতক্ষীরা জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় চিংড়ি মাছের পাশাপাশি বিদেশে চাহিদা থাকায় স্বল্প বিনিয়োগে অধিক লাভের আশায় হাজার হাজার মানুষ কুচিয়া ও কাঁকড়া চাষ করছে। শ্যামনগর, আশাশুনি, দেবহাটা ও কালিগঞ্জ উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় গড়ে উঠেছে কুচে ও কাঁকড়ার খামার। এসব খামারের কাঁকড়া ও কুচিয়া দেবহাটার পারুলিয়া, কালিগঞ্জের উজিরপুর, কালিবাড়ি, শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ বাজারে ডিপোগুলোতে বিক্রি হয়। চীন কুচে ও কাঁকড়ার মূল বাজার। তবে গত ২৫ জানুয়ারি থেকে চীনে কুচিয়া কাঁকড়ার রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আভ্যন্তরীন বাজারে কুচিয়া কাঁকড়ার কেনাবেচায় চরম ধস নেমেছে। আগে যে কাঁকড়া প্রতি কেজি বিক্রি হতো ১ হাজার ৫০০ টাকা এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৩ থেকে ৪ টাকায়। মূলত: সুন্দরবন তথা সাতক্ষীরা অঞ্চলে চাষ করা জীবিত কাঁকড়া ও কুচিয়ার ৮০ ভাগ রফতানি করা হয় চীনে।

২০১৯ সালে সাতক্ষীরা জেলায় ৩১০ দশমিক ৯ হেক্টর জমিতে কাঁকড়া চাষ হয়। ওই জমি থেকে দুই হাজার ১৯০ মেট্রিক টন ও সুন্দরবন থেকে এক হাজার ১০৯ মেট্রিক টন কাঁকড়া সংগ্রহ করা হয়। একই সময়ে কুচিয়া উৎপাদন হয় ৩৫০ মেট্রিক টন।

সাতক্ষীরা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, করোনাভাইরাসের প্রভাবে কাঁকড়া-কুচিয়া রফতানি চীনে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অল্প পরিমাণ কাঁকড়া যাচ্ছে সিঙ্গাপুর, থাইল্যন্ড, তাইওয়ান, ব্যাংকক, হংকং, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে। কিন্তু সেখানে দাম দিচ্ছে অর্ধেকেরও কম।

এছাড়া একটি কাঁকড়া পানি থেকে তোলার পর ৭-১০ দিন জীবিত থাকতে পারে। যদি এ সময়ের মধ্যে বিদেশ পাঠানো না যায় তাহলে তা বিক্রির অযোগ্য হয়ে পড়ে। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসায়ীরা অন্যদিকে বেকার হয়ে পড়েছেন কাঁকড়া-কুচিয়া সংগ্রহ-লালনপালন ও রফতানির সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার মানুষ। এছাড়া রফতানিকারকদের কাছে পাওনা টাকা আটকে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতেও পারছেন না খামারিরা।

তিনি আরো জানান, করোনাভাইরাসের আগে যেখানে গড়ে প্রতিদিন ৪-৫ টন কাঁকড়া পাঠানো হতো। কিন্তু সেখানে এখন ২৫ জানুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি বুধবার পর্যন্ত ১৮ দিনে মাত্র ৩-৪ টন কাঁকড়া রফতানির জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান জানান, চীন হচ্ছে জীবিত কাঁকড়ার মূল বাজার। করোনাভাইরাসের কারণে চীনে কুচিয়া ও কাঁকড়া রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। চীনে রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যবসায়ী ও খামারিরা।

তিনি আরো জানান, আগে যেখানে ১৬০ গ্রাম থেকে ২০০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া বিক্রি হতো দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় সেখানে এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রফতানি বন্ধ হওয়ায় মধ্য প্রাচ্যসহ নতুন বাজার খুঁজতে হবে। তা না হলে এ শিল্পকে রক্ষা করা যাবে না। এজন্য সরকারও বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন বলে জানান তিনি।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে ২০১৯ সালে কাঁকড়া-কুচিয়ার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১০০ কোটি টাকা। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ল এ খাত।

বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিলড ফুড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত রফতানিকারকের সংখ্যা রয়েছে ২০৪টি। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। 

রফতানিকারকদের হিসেবে, বর্তমানে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাঁকড়া-কুচিয়া মজুদ আছে। ১০০ কেজিতে দৈনিক ৫-৭ কেজি কাঁকড়া-কুচিয়া মারা যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে দ্রুত সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম