কর্মহীন মানুষদের নিয়ে ভাবতে হবে

কর্মহীন মানুষদের নিয়ে ভাবতে হবে

প্রকাশিত: ১৬:০৫ ১৩ জুলাই ২০২০  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। এরমধ্যে বেশি সংকটে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। 

করোনার প্রভাবে প্রতিনিয়ত কর্মহীন হয়ে পড়ছেন শ্রমজীবীরা। এসব কর্মহীন মানুষের বেশিরভাগ ঢাকা ছাড়ছেন প্রতিদিন। রাজধানীর বাড়িতে বাড়িতে ঝুলছে টু-লেট আর টু-লেট। সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপে দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে সারা দেশে ৯৫ ভাগ মানুষের আয় কমেছে। রাজধানীতে ৮৩ ভাগ নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ কাজ করছে। এর মধ্যে কাজ হারিয়েছে প্রায় ৬২ ভাগ মানুষ। পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়েছে ২৮ ভাগ মানুষ। এই দুই শ্রেণির বড় অংশই এখন গ্রামমুখী। সংস্থাটি ঢাকাসহ সারা দেশের নিম্নআয়ের বা মধ্য আয়ের মানুষের আয়-রোজগার নিয়ে জরিপ করেছে। আর তাতেই উঠে এসেছে করোনাকালে ঢাকার বড় একটি জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে পড়ার এই চিত্র। অন্যদিকে প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন কর্মহীন হয়ে শ্রমজীবী মানুষের রাজধানী ত্যাগের সচিত্র সংবাদ। শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারিয়ে নিরূপায় হয়ে পড়ছেন অনেক চাকরিজীবী। ফলে প্রতিনিয়ত দেশে বেকারত্বের পাল্লা ভারী হচ্ছে যা, বৃহত্তর অর্থে এক অশনিসংকেত বলে মনে হওয়া অযৌক্তিক নয়।

করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার প্রথমদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে ১৬০ কোটি কর্মজীবী মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। সংস্থাটির ওই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বিশ্বজুড়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দুইশো কোটি। তার ১৬০ কোটি মানুষই কর্ম হারানোর ঝুঁকিতে, যা সারা বিশ্বে কর্মের সঙ্গে জড়িত মানুষের প্রায় অর্ধেক। 

আইএলও’র হিসাব মতে, সারা বিশ্বে শ্রমের সঙ্গে জড়িত মানুষের সংখ্যা ৩৩০ কোটি। করোনা পরিস্থিতির শুরুর দিকে কর্মসংস্থানের উপর যে প্রভাব ছিল, এখন তা স্বভাবতই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনার উচ্চসংক্রমণ ঝুঁকির মাঝেও স্বল্প-আকারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করলেও এতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে তেমন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের দেশেও একই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরু করেছে সরকার। পোশাক শিল্প কারখানা খোলাসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের নানান ক্ষেত্রে গতি আনার চেষ্টা করে চলেছে সরকার। এরই মাঝ দিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়ছে শ্রমজীবী মানুষ। অপরদিকে এই করোনা-সংকটকালীন সময়েও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে এক শ্রেণির লুটেরা। প্রতারকচক্র সারাদেশে প্রতারণার জাল বিছিয়ে প্রতারণা করে যাচ্ছে। এতে সারা দেশেই একজাতীয় অস্থিরতা বিরাজ করছে সাধারণ জনগণের মধ্যে। 

এটা স্বীকার করতে হবে যে, করোনা গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে যে ধস নামিয়েছে তা দুটি মহাযুদ্ধের সময়ও অনুভূত হয়নি। বিশ্ব মহামারীর ইতিহাসে দেখা যায়, একাধিক দেশ বা এলাকায় মহামারীতে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও কখনো বিশ্বজুড়ে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি। কিন্তু অনুজীব করোনাভাইরাসের ভয়াল আগ্রাসনের শিকার এখন গোটা বিশ্ব। বিশেষ করে দ্রুত অগ্রসরমান বাংলাদেশের অর্থনীতি করোনার প্রভাবে নাজুক অবস্থায় পড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ তৈরি পোশাক শিল্প ভিত্তিক। করোনায় উন্নত-অনুন্নত সব দেশের মানুষের চাহিদার তালিকায় পোশাক এখন অগ্রাধিকার হারিয়েছে। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব থাকবে- এমন আশঙ্কার বিশেষজ্ঞদের। 

তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে এরইমধ্যে দেশে এক কোটিরও বেশি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা যে ক্ষতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তা সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও নাজুক অবস্থার মোকাবিলা করতে হবে। এরইমধ্যে সংকুচিত হয়ে এসেছে কর্মক্ষেত্র। আর্থিক সংগতির অভাবে মানুষের চাহিদা অনুপাতে সম্পদ সরবরাহ কমে গেছে। এর পরিণতিতে সব ধরনের শিল্প উৎপাদনে মারাত্মক ধস নেমেছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে করোনাকাল থেকে যতি উত্তরণও ঘটে, তবে এ সময়ের মধ্যে বেকার সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠবে। ফলে বিপুল জনসংখ্যার এই দেশ কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করবে, এ নিয়ে দেশের নীতিনির্ধারক মহলের মধ্যেও শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা। 

এরইমধ্যে বেকার হয়ে পড়া মানুষ রাজধানী থেকে গ্রামে ফিরতে শুরু করেছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া দেওয়ার জন্য মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন না বাড়ির মালিকরা। রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট সংলগ্ন একটি বাড়ির মালিক সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আবদুস সালাম। তিনি সপরিবারে থাকেন চারতলায়। বাকি ফ্লোরগুলোতে ছাত্রী মেস ছিল। এখন সবই খালি। টু-লেট ঝুলিয়েও তিন মাস ধরে ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না। শাজহাদপুরে সুবাস্তু নজরভেলী টাওয়ারে সাতটি বহুতল ভবন রয়েছে। সব ভবনের নোটিস বোর্ডে ঝুলছে টু-লেট। সুবাস্তু টাওয়ারের ব্যবস্থাপনা কমিটির এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, তিন মাস ধরে ভাড়াটিয়ারা একে টেকে বাসাবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ কম দামের ভিতরে গলিতে ছোট ফ্ল্যাট বাড়িতেও উঠছেন। কেউ কেউ ভাড়া বা সার্ভিস চার্জ না দিয়েও গোপনে বাসা ছাড়ার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার মধ্যে বাকবিতণ্ড ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। মামলা পর্যন্তও গড়াচ্ছে। মূল কথা হলো, করোনার কারণে মানুষের আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় এসব হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই দেশের পরিস্থিতি অনুমান করা যেতে পারে। কিন্তু যারা ঢাকায় চাকরি বা অন্য কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন, গ্রামে ফিরে গিয়ে কী কাজ করবেন তারা এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষের আয় ইতিমধ্যেই কমে গেছে ৭০ ভাগ। একইভাবে চাকরির বাজার অব্যাহতভাবে সংকুচিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি সামলাতে ঘরে ঘরে উদ্যোক্তা এবং স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। 

বলাই বাহুল্য, দেশের বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাকের ডগায় নিঃশ্বাস চলে এসেছে। কেউ কেউ ইতিমধ্যে পুঁজি হারিয়ে ফেলেছে। ঋণ নেয়ার সক্ষমতাও এদের নেই। এটাই প্রকৃত চিত্র। যথাযথ সহায়তা না পেলে এ পরিস্থিতির কারণে এরা অচিরেই হারিয়ে যাবে। আর চাপ বাড়বে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর। করোনার বিরূপ প্রভাবে স্বকর্মসংস্থান ও ছোট-খাটো কাজের সঙ্গে যুক্তরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। করোনাভাইরাস মহামারীতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে তরুণ ও যুবক শ্রেণি। ফলে এদের নিয়ে ভাবতে হবে। তবে এটা ঠিক যে, এই করোনাসংকটের মধ্যেও সরকারি উদ্যোগে আইসিটি বিভাগের মাধ্যমে তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য অনলাইন প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি নজর দেয়া যায়, প্রণোদনা কিংবা ঋণ সুবিধা দেয়া যায় তাহলে আশা করা যায়, আগামী দিনে দেশ থেকে বেকারত্বের চাপ কমানো সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। করোনা-পরবর্তী পর্যায়ে যারা চাকরির বদলে নিজেরা উদ্যোক্তা হয়ে জীবন-জীবিকার লড়াই চালাতে চায় তাদের সহায়তা দেবে তারা। এটি সফল হলে করোনাজনিত সংকট অভিশাপের বদলে আশীর্বাদে পরিণত হবে- এমনটিই আশা করা দোষের হতে পারে না। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর