করোনা সংকটের সুযোগ নিচ্ছে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা

করোনা সংকটের সুযোগ নিচ্ছে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা

শফিকুল বারী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০০:১৬ ৭ জুলাই ২০২০   আপডেট: ০০:৫৫ ৭ জুলাই ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে ফলের ঝুড়ি, কার্টন বা সবজির ভেতরে আসছে ক্ষুদ্র অস্ত্র ও মাদক। এর মধ্যে বেশিরভাগ অস্ত্র আসে উত্তারাঞ্চল থেকে, তবে মাদক পাচার হয় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ পরিস্থিতিতে প্রায় সব কিছুই থেমে যাওয়ার উপক্রম। তবে থেমে নেই মাদক ও অস্ত্র পাচার। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, প্রশাসনসহ সবাইকে এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। করোনাকালের এই সুযোগই নিচ্ছে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। 

এরা দেশ ও সমাজের শত্রু বলে মন্তব্য করেছেন অনেক সিনিয়র সিটিজেন ও বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন মাদকের বিষে নষ্ট হচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। আর অস্ত্র বাড়িয়ে দিচ্ছে খুনোখুনি। 

সূত্র জানায়, এখন ফলের মৌসুম বলেই অভিনব কৌশলে বিভিন্ন ফলের ঝুড়িতে পাচার হচ্ছে ক্ষুদাস্ত্র ও মাদক। ফল ছাড়াও সবজি ও খাদ্যপণ্যের আড়ালেও আসছে এসব। এ ক্ষেত্রে ট্রাক, পিকআপ বা কাভার্ড ভ্যানসহ সব কিছুই ব্যবহার করে এই অপরাধীরা।

সীমান্ত এলাকা থেকে এসব অস্ত্র আসে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায়। এতদিন মনে করা হতো মাদক ব্যবসায়ীদের গডফাদাররা অস্ত্র কিনে। কিন্তু এবার মাদক কারবারিরা মাদকের পাশাপাশি অস্ত্রও কিনছে বলে জানা গেছে।

এসব বিষয়ে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের প্রধান ডিআইজি (উপ-মহাপরিদশক) এ কে এম হাফিজ আকতারের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়। তিনি উেইলি বাংলাদেশকে বলেন, মাদক বা অস্ত্রের চালান ধরা পড়ছে ঠিকই। তবে সেটি খুব বেশি না। মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশলে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাতে চায়। ফল, সবজি ও বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য পরিবহনের আড়ালে ট্রাক,পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে কৌশলে পাচার হয় অস্ত্র ও মাদক। এমনকি এসব যানবাহন ও প্রাইভেটকারের বড়ির ভেতরে গোপন চেম্বার (কুঠরি) তৈরি করে সেখানে এসব বহন করা হয়।

এসব প্রতিরোধের বিষয়ে আপনারা কি কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ, র‌্যাবসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করছে। কঠোর গোয়েন্দা নজরদারী, সোর্স, প্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন সময় অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাীয়দের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি মেনে প্রতিদিন বাড়ানো হচ্ছে নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা। ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসছে। এসব নির্মূল করতে না পারলেও নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। 

তবে জনসচেনতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়ে তিনি সবাইকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানান। অন্তত পক্ষে পুলিশের সেবা পেতে ৯৯৯ এ ফোন করে তথ্য দিন, পরিচয় গোপন থাকবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর গাউছিয়ার ডিস ব্যবসায়ী সুমন, দক্ষিণগাঁও এর জাকারিয়া, ফকিরাপুলের গফুরের ছেলে সালাম, কালিবাড়ির দাসপাড়ার ওমর দাসের ছেলে প্রফুল্ল, শাহিনবাগের তারা মিয়ার ছেলে পলাশ ও সিপাহীবাগের জাহাঙ্গীর অস্ত্র ব্যবসার সাথে জড়িত। এছাড়া সুমনের রয়েছে রাজশাহীতে আমের ব্যবসা। এই ব্যবসার আড়ালে তিনি অস্ত্র ব্যবসা করেন।

অথচ সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ অস্ত্রসহ অনেককে গ্রেফতার করা হলেও পরবর্তীতে জানা যায় এরা সবাই বাহক মাত্র। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করেও প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই অবৈধ অস্ত্রের গডফাদাররা সবসময়ই রয়ে যায় পর্দার আড়ালে।

গত ২১ মে রাজধানী আদাবর থেকে ৪ অস্ত্র ও মাদক কারবারীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। জরুরি প্রাণী খাদ্য সরবরাহ কাজে নিয়োজিত স্টিকার লাগানো একটি গাড়ি থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের থেকে ২টি দেশি বন্দুক, ৬ রাউন্ড গুলি ও প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭ হাজার করে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত গাড়িটি আটক করা হয়। গ্রেফতাররা হলো- মো. ওসমান, শাহজাহান সরকার, সেলিম সরকার ও নুর ইসলাম।

বিশেষ সূত্রে সংবাদ ছিল একটি পিকাআপে কাঁচামালের আড়ালে মাদক ও অস্ত্রের চালান পাচার হবে। এ তথ্য পেয়ে র‌্যাব-২ এর ক্রাইম প্রিভেনশন স্পেশালাউজড কোম্পানির (সিপিএসসি) কামান্ডার এসপি মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফরুকীর নেতৃত্বে আদাবর রিং রোডে চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে কাঁঠাল ও ডাব ভর্তি পিকআপ থেকে এই অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।  মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত পিকআপ গাড়িটি আটক করা হয়। 

পুলিশ সুপার ফারুকী জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা মাদক ও অস্ত্রেও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন কৌশলে তারা রাজধানী গাজীপুরসহ অন্যন্য অঞ্চলে মাদক বিক্রেতাদের চাহিদা মত অস্ত্র সরবরাহ করে বলে স্বীকার করেছে।

অপরদিকে, গত ৬ জুন রাজধানীর গাবতলী ও কল্যাণপুরে পৃথক দু’টি অভিযানে ৬৩৫ বোতল ফেন্সিডিলসহ ২টি পিকআপ ভ্যান থেকে ৪ মাদক কারবারীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪।

অভিযানে গাবতলী থেকে ৩০০ বোতল ও কল্যাণপুর থেকে ৩৩৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন র‌্যাব -৪ এর সিনিয়র এএসপি সাজেদুল ইসলাম। তিনি জানান, পিকআপ ভ্যানের পিছনের পাটাতনের নিচে কৌশলে লুকিয়ে ফেনসিডিল বহন করছিল। এছাড়া বিভিন্ন ফল, সবজির ভিতরে লুকিয়ে অবৈধ ফেন্সিডিল পরিবহন করে বলে স্বীকার করেছে আসামিরা।

এর আগে গত ২৮ মে র‌্যাব জানতে পারে সীমান্ত এলাকা থেকে কুরিয়ার সার্ভিসে মাদকের চালান আসবে। এ তথ্যে র‌্যাব-২ এর সিপিএসসি’র কমান্ডার পুলিশ সুপার মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী'র নেতৃত্বে সাভার ও আশুলিয়া হতে কুরিয়ার সার্ভিসে খাদ্য সামগ্রীর আড়ালে পাচার হয়ে আসা দেড় কোটি টাকা মূল্যের দেড় কেজি হেরোইনসহ ২ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো- চাঁপাই নবাবাগঞ্জের সৈবুর রহমান ও নাজমা আক্তার। 

আসামীরা দীর্ঘদিন ধরে কুরিয়ার সার্ভিসে শিশু খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্য ও বিভিন্ন ফলের আড়ালে হেরোইন পাচার করে আসছে। পুলিশ কর্মকর্তা ফারুকী বলেন, আইন-শৃংখলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে অস্ত্র বা মাদক ব্যবসায়ীরা ফল থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য ও সবজির আড়ালে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএএম/আরএ