করোনা মোকাবিলায় মাশরাফীর ব্যতিক্রমী সব উদ্যোগ

করোনা মোকাবিলায় মাশরাফীর ব্যতিক্রমী সব উদ্যোগ

রনজিনা খানম, নড়াইল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৪৬ ২৯ মে ২০২০  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা।  যিনি নড়াইল এক্সপ্রেস নামেও খ্যাত। এ দেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে সফল অধিনায়ক কে? এমন প্রশ্নে, এক নম্বরেই মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নাম চলে আসে।

কয়েকবার ইনজুরিতে আক্রান্ত ও অপারেশনের পরে অদম্য মনোবল নিয়ে তিনি ব্যাট-বল হাতে নিয়ে কোটি কোটি দর্শক ভক্তদের মন জয় করেছেন। তেমনি রাজনীতির মাঠে নেমেও ব্যতিক্রমী সব কাজের মধ্যদিয়ে নির্বাচনী এলাকার মানুষের মন জয় করেছেন। অবহেলিত জেলা নড়াইলের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। 

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতায় লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। বাংলাদেশেও এরইমধ্যে পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় ‘হিরের টুকরা’ মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাও তার নির্বাচনী এলাকায় করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চমৎকার সব উদ্যোগ নিয়ে সর্বমহলেই ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন। মানবিক এমপি মাশরাফী তার প্রিয় ব্যাচলেটটিও করোনা মোকাবিলায় নিলামের মাধ্যমে ৪২ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। এই অর্থ করোনা মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। 

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবর সবুজ শ্যামলে ঘেরা চিত্রানদী বেষ্টিত নড়াইল শহরের মহিষখোলা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম গোলাম মোর্ত্তজা স্বপন ও মায়ের নাম হামিদা বেগম বলাকা।

ছোটবেলা থেকেই তিনি বাঁধাধরা পড়াশোনার পরিবর্তে ফুটবল আর ব্যাডমিন্টন খেলতেই বেশি পছন্দ করতেন। তারুণ্যের শুরুতে ক্রিকেটের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। 

বাংলাদেশ এ-দলের হয়ে একটিমাত্র ম্যাচ খেলেই মাশরাফী জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে  ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর টেস্ট ক্রিকেটে তার অভিষেক ঘটে, ২০০৯ সালে তিনি অধিনায়কের দায়িত্ব পান। তবে ইনজুরির কারণে তিনি বারবার হোঁচট খেয়েছেন। তবে অদ্যম মনোবল মাশরাফীকে দমাতে পারেনি। নড়াইল এক্সপ্রেস খ্যাত মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ২০২০ সালের ৬ মার্চ জিম্বাবুয়ের সঙ্গে তৃতীয় ওডিআই ম্যাচের পর ওডিআই দলের অধিনায়ক পদ থেকে সরে দাড়ান। 

এর আগে তিনি জাতির পিতার আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারন করে  ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ব্যানারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হন। 

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নির্বাচিত হওয়ার পর খেলার মাঠের মতো রাজনীতির মাঠেও নতুন ইনিংস শুরু করেন। অবহেলিত নড়াইল জেলাকে একটি মডেল জেলায় রূপান্তরের স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেন। হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে নানা উদ্যোগ, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো উন্নয়নসহ সর্বক্ষেত্রেই তিনি সফল জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পরপরই মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা চলে আসেন তার নির্বাচনী এলাকায়। নড়াইল সদর উপজেলার আংশকি ও লোহাগড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নড়াইল-২ আসনের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে তিনি নিজেই সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচার-প্রচারণায় নেমে পড়েন। এরপর তিনি করোনা মোকাবিলায় নিয়েছেন নানা পদক্ষেপ।

সংকটময় মুহূতে নড়াইলের চিকিৎসকসহ সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তায় মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি ব্যক্তিগতাবে নড়াইলবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছেন।

এছাড়া মাশরাফীর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন’র মাধ্যমেও মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন। 

করোনা মোকাবিলায় সর্বপ্রথম চিকিৎসক, সেবিকা, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের কথা ভেবেছেন তিনি। ব্যক্তিগত অর্থায়নে তিনি ৬৪০টি পিপিই বিতরণ করেছেন। এছাড়া নড়াইল সদর হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে জীবাণুনাশক কক্ষ স্থাপন এবং চিকিৎসকদের সুরক্ষায় ‘ডক্টরস সেফটি চেম্বার’ স্থাপন করেছেন। 

করোনা আতঙ্কে যখন রোগীরা হাসপাতালে এসে চিকিৎসা সেবা নিতে ভয় পাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ‘ডাক্তারের কাছে রোগী নয়, রোগীর কাছে ডাক্তার’- এ শ্লোগানে নড়াইলে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা চালু করেন মাশরাফী। নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুই সহস্রাধিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করেছেন। 

রোগীরা যাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা সেবা নিতে পারেন সে জন্য চালু করেছেন ‘টেলি-মেডিসিন সেবা’। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মোবাইলের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করছেন রোগীরা।  এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনে দানকৃত মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার  দুটি অ্যাম্বুলেন্স করোনাসহ সাধারণ রোগীদের সেবায় সব সময় নিয়োজিত রয়েছে। 

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে নড়াইল সদর হাসপাতাল ও লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে  ভর্তিসহ সু-চিকিৎসা পায় সে ব্যবস্থাসহ হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ১০টি বেড নিয়ে করোনা ইউনিট চালু করা হয়েছে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার পরামর্শে। 

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নড়াইল জেলা থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে নড়াইল সদর হাসপাতালে একটি আইসিইউ ইউনিট চালু এবং করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্য নিরাপত্তায় বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন মাশরাফী।

এরইমধ্যে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নড়াইল জেলা কারাগারের ১৪৪ জন কারাবন্দীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ওয়াশেবল মাস্ক, হ্যান্ডওয়াশ, সাবান, হ্যান্ড গ্লাভস বিতরণ করেছেন। 

করোনা মোকাবিলায় সচেতনার পাশাপাশি তিনি খাদ্য নিরাপত্তার ব্যাপারেও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। মানবিক এমপি মাশরাফী তার ব্যক্তিগতভাবে ৬ হাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে  দিনমজুর, মোটর শ্রমিক, ভ্যানচালক, কৃষি শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খেলোয়াড়, শিক্ষক, ইমামসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে সে জন্য অন্তত ১০ হাজার মানুষের মাঝে উপহার সামগ্রী ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ  বিতরণ করেছেন। 

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দলীয় নেতাদের মাধ্যমে  চার হাজার পরিবারকে উপহার সামগ্রী, নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিন হাজার পরিবার, জেলা ক্রীড়া সংস্থার মাধ্যমে এক হাজার  অসচ্ছল সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়, বাস, মিনিবাস, ট্রাক, মোটরযানের ৮০০ শ্রমিকের মাঝে উপহার সামগ্রী বিতরণ করেছেন। 

এছাড়া মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনদের খাবার ও নগদ অর্থ প্রদান,  প্রতিটি এতিম খানা-মাদরাসায় ৫০ কেজি করে চাল উপহার, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের মাধ্যমে ৫০ জন পুরোহিতকে খাবার ও নগদ টাকা প্রদান করেছেন। 

আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগের অসচ্ছল নেতাকর্মীদের মাঝেও তিনি গোপনে  উপহার সামগ্রী বিতরণ  করেছেন। 

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নড়াইলে এসে কয়েকটি ইউপির ঘরে-ঘরে গিয়ে মানুষের খোঁজ নিয়েছেন এবং নিজহাতে উপহার সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। ভ্যান চালকদের মাঝে নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। 

প্রধানমন্ত্রীর উপহার, সরকারি ত্রাণের তালিকা প্রস্তুতি ও বিতরণে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তদারকি অব্যাহত রেখেছেন। পবিত্র রমজান মাসে রাস্তাঘাটে কোনো রাজাদার যাতে ইফতারি করতে কষ্ট না পায় সে জন্য ভ্রাম্যমাণ ইফতার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।  

করোনার এই সংকটময় মুহূর্তে তিনি কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কৃষি বান্ধব এই এমপি তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ধান কাটার চারটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন ক্রয় করে দিয়েছেছন। শ্রমিক সংকটের এই দুর্দিনে কৃষকরা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। 

এছাড়া তিনি রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, পুলিশ বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক নিয়ে হোয়াটস আপ গ্রুপ পরিচালনা করে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে করোনা মোকাবিলাসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে এলাকার জনগণের সেবা অব্যাহত রেখেছেন। 

নড়াইল-২ আসনের এমপি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা করোনা মোকাবিলায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, পরিবেশ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যা যা করণীয় করা হবে। তবে আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই। করোনা পরিস্থিতিতে আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্য সুরক্ষাসহ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ