করোনা দিনের প্রার্থনা

করোনা দিনের প্রার্থনা

প্রকাশিত: ১৭:৪০ ৩০ মার্চ ২০২০  

আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

গত ৭২ ঘণ্টায় মাত্র একজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। কারো মৃত্যু হয়নি। নিঃসন্দেহে আশার বাণী। খবরটা সত্য হলে আতঙ্কিত দেশের মানুষ অনেকটাই স্বস্তি পাবে। প্রার্থনা করি যেন সত্য হয়!

করোনা আতঙ্কে কাঁপছে সারা পৃথিবী। চীনের উহান প্রদেশ থেকে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবীতে। চীন এখন অনেকটাই সামাল দিয়েছে। কিন্তু সামাল দিতে প্রাণান্ত ইউরোপ আমেরিকা ইতালিসহ উন্নত দেশগুলোর। প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে লাশের বহর। একের পর এক লকডাইন হচ্ছে একের পর এক শহর। একের পর এক দেশ। বলতে গেলে গোটা পৃথিবীই এখন বিচ্ছিন্ন।

এ রোগে মৃত্যু ভয়ানক মর্মান্তিক। আপনজন কাউকেই রোগির কাছে যেতে দেয়া হয় না। এমনকি মৃত্যুর পর মৃতদেহ আত্মীয়-স্বজনকে হস্তান্তর করা হয় না ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে। মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়। এমন করুণ আর অবহেলিত অসহায় মৃত্যু কারো কাম্য নয়, কারোই নয়। 

এ ভাইরাস প্রতিকারের জন্য নানান সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে প্রধান নিয়ম মেনে বারে বারে স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। হাঁচি কাশি থেকে দূরে থাকা। নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা। যতদূর সম্ভব ঘরে থাকে। মানুষের সাহচর্যে না যাওয়া, হ্যান্ডশেক না করা, জড়িয়ে না ধরা, কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে না যাওয়া। যতদূর সম্ভব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা। লিফট-এর বাটন, দরজার ছিটকেনি হ্যান্ডেল পরিষ্কার রাখা। ওগুলো স্পর্শ করার পর হাত ধোয়া। গণপরিবহন যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা। প্রবাসীদের থেকে দূরে থাকা। 

করোনা ভাইরাসের কোন ওষুধ নেই। যে রোগের ওষুধ নেই সে ব্যাপারে তো সতর্ক থাকাই উচিত। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ আমাদের। প্রধানত বিদেশ থেকে আগত প্রবাসীদের দ্বারা ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাস। ইতালি থেকে অনেক প্রবাসী এসেছে দেশে। দেশে ফিরে এদেশের ১৭ কোটি মানুষের কথা না ভেবে বাড়ি গিয়েছে। পরিবার পরিজনের কথা পর্যন্ত এরা ভাবেনি। 

খালেদা জিয়াও ছাড়া পেলেন এ সময়ে। পিজি হাসপাতাল থেকে শুরু করে তার গুলশানের বাসা পর্যন্ত যে জনযট সৃষ্টি হলো তা দেখে শিউরে উঠলাম। ঘটনাটি করোনার আগে ঘটতে পারত, ঘটতে পারত পরে, কিন্তু ঘটল করোনার মধ্যেই। 

স্কুল কলেজ ছুটি দেয়া হলো। কক্সবাজার রাঙ্গামাটি বান্দরবান চলে গেল সবাই পরিবার পরিজন নিয়ে ছুটির আনন্দে। সরকারি ছুটি ঘোষণা হলো। ছুটি কাটানোর আমেজে ট্রেনে বাসে লঞ্চে নাকের ওপর নাক নিয়ে কাঁধের উপর কাঁধ ঠেকিয়ে অসংখ্য মানুষ চলে গেলো নিজ নিজ গন্তব্যে। তিন ফুট তো দূরের কথা, একজন গেলো আরেকজনের গায়ের উপর চড়ে। এই অসচেতন জাতিকে ঠেকাতে আগেই তো বন্ধ করা যেত পরিবহন! এতসব কিছুর পরও যে এখনো কেউ আক্রান্ত হননি এটা আমাদের পূর্ব পুরুষের দোয়া ছাড়া আর কী বলব। 

আর এই করোনারাজ্যে দেখা গেল মানুষের মানবতার বহরও। গরিবের হাতে এককেজি চাল ধরিয়ে দিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন অনেকেই। নাম কামাবার লোভ সম্বরণ করতে পারছেন না। একটা মাস্ক দিচ্ছেন তিরিশজন মিলে। 

কানাডার প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে ঘরে ঘরে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দেবার ঘোষণা দিয়েছেন। তার মর্মস্পর্শী ভাষণ আর চোখের জল নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। উন্নত অনুন্নত সব দেশ নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী করোনা মোকাবিলায় একযোগে কাজ করছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘মন্ত্রী, এমপি, জেলা উপজেলা, ইউনিয়ম পরিষদ চেয়ারম্যান সাহেবরা ভোটের সময় মানুষের দরজায় গিয়েছেন, এবার মানুষের দরজায় খাবার পৌঁছে দিন।’ তাঁর নির্দেশ মেনে জনপ্রতিনিধিরা দোরে দোরে যাচ্ছেন বলে শুনিনি। বরং শুনেছি একজন ওয়ার্ড কমিশনার পেশীশক্তি দেখিয়ে হাসপাতাল নির্মাণে বাধা দিয়েছেন।

সতেরো কোটি মানুষের দেশ আমাদের। প্রান্তিক মানুষের সংখ্যা বেশি। দেশের এই যে সব খেটে খাওয়া মানুষ এরা যদি কাজে না যায় এদের দিন চলবে না। এদের চুরি ডাকাতি রাহাজানি করে খেতে হবে। বাঁচার জন্য তো খাদ্যও দরকার। 

করোনার কথা জানাজানি হবার সাথে সাথেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। আগের কেনা জিনিসও দ্বিগুণ তিনগুণ দামে বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। জনগণ দেদার কিনে গুদোম ভরে ফেলছে। যার পাঁচ কেজি দরকার সে কিনছে পঞ্চাশ কেজি। যার পয়সা নেই সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। 
করোনারাজ্যে কিন্তু অন্যায় অবিচার কমেনি। কুড়িগ্রামের ডিসি সাংবাদিক পিটিয়েছে রাতের অন্ধকারে। ডিসির ব্যবহারে আমি যারপরনাই মর্মাহত। ম্যাডামের কি প্রয়োজন ছিল নিজের নামে সরোবরের নামকরণের চিন্তা করার? নামকরণ নাকি করতেও পারেননি! নামকরণ করতে চান নিজের বাড়িতে নিজের টাকায় পুকুর/ দীঘি/ সরোবর কেটে কেন করলেন না? সেটার নাম তিনি নিজের নামে সরোবর, সি, ওশান, পন্ড বা ড্রেন যা ইচ্ছে দিতে পারতেন। কারো কিছু বলার ছিল না। কাবিখা আর জনগণের স্বেচ্ছা অনুদানের টাকায় কাটা সরোবরের পুরানো নাম ‘নিউ টাউন পার্ক’ বদলে নিজের নামে নামকরণ করার দুর্মতি তার কেন হল? মনিরামপুরের এসি ল্যান্ড বাপের বয়সী দুজন গরিব মানুষকে কান ধরিয়ে ছবি তুলে পোস্ট দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অপরাধ মাস্ক না পরা। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়েছে সত্য, কিন্তু তাদের এই অন্যায় আচরণের কারণে চাপা পড়ে যাচ্ছে অনেকের অনেক ভালো কাজ, মানবিক আচরণ। 

সবশেষে অনুরোধ, সচেতন হন, নিজে সাবধান থাকুন, অন্যকে সাবধান থাকতে বলুন। কাজে চিন্তায় আচরণে মানবিক হোন। মনে রাখবেন মানবিকতাই আপনার মনে শান্তির বারি বর্ষণ করতে পারে, অর্থ নয়, বিত্ত নয়, ক্ষমতা নয়। করোনা দিনে প্রার্থনা করি আর যেন কেউ নতুন করে আক্রান্ত না হন, প্রার্থনা করি রোগমুক্ত নতুন দিনের।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর