করোনা জয়ী প্রকৌশলী নিজামুদ্দিনের পরিবারের গল্প

করোনা জয়ী প্রকৌশলী নিজামুদ্দিনের পরিবারের গল্প

মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন, সেন্ট্রাল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৪৭ ২৩ মে ২০২০  

প্রকৌশলী নিজামুদ্দিন ও তার দুই মেয়ে

প্রকৌশলী নিজামুদ্দিন ও তার দুই মেয়ে

করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন, সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এ ভাইরাসের নিষ্ঠুরতায় প্রিয় মানুষটির কাছেও আসা নিষেধ স্বজনদের। এমন পরিস্থিতিতে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিয়ে এ যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডের একই পরিবারের পাঁচ সদস্য।

প্রকৌশলী নিজামুদ্দিনের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি। বয়স ৫২ বছর। করোনায় আক্রান্ত পরিবারের অন্যন্য সদস্যরা হলেন- তার বৃদ্ধা মা, বয়স ৮৫ বছর, স্ত্রী (৪০) ও দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বয়স ১৮ এবং ছোট মেয়ের বয়স ১৪ বছর। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তিনিই প্রথম করোনায় সংক্রমিত হয়েছিলেন। তবে কীভাবে এই রোগে সংক্রমিত হলেন তা তিনি জানেন না। 

তার ধারণা, প্রতিদিন যখন সকালে হাঁটতে বের হন তখন তিনি একটু কাঁচাবাজারে ‘ঢু’ মেরে আসতেন। এছাড়া তার প্রথম যখন শরীরে জ্বর অনুভূত হয় তার দুদিন আগে তিনি আগোরা ও স্বপ্ন সুপারশপে গিয়েছিলেন। হয়তো সেখান থেকেই তিনি করোনা বয়ে নিয়ে বাসায় এসেছেন।

শুক্রবার তিনি ডেইলি বাংলাদেশের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে তুলে ধরেন তার ও পরিবারের করোনা জয়ের অভিজ্ঞতা।  

আলাপে প্রকৌশলী নিজামুদ্দিন বলেন, চলতি বছরের এপ্রিলের ৮ তারিখে রাত্রে প্রথম তার একটু জ্বর জ্বর অনুভব হয়। জ্বরটা আসার সময় মাথা ব্যথা করে। জ্বর ১০০ ডিগ্রির মতো ছিলো। অন্যান্য সময় যে জ্বর হয়, এর চেয়ে এটা একটু ব্যতিক্রম। এ সময় শরীরে কেমন যেন আনইজি-আনইজি লাগে। তখন আমার স্ত্রীকে বললাম আমারতো করোনা হয়েছে মনে হয়। ও ভাবছে আমি দুষ্টুমি করছি, সে বলে ‘তুমি এসব কি বল? তোমার হবে কেন? তুমি তো বাইরেই বের হওনা।’ আমি অবশ্য তখন অফিসে যাইতাম, আমার অফিস পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার।  সকালে হাঁটতেও বের হতাম।

পরদিন বৃহস্পতিবার আর অফিসে গেলাম না। বাসায় থেকেই কাজ সারলাম। বৃহস্পতিবার জ্বর উঠল ১০২ পর্যন্ত,  শুক্রবারও জ্বর থাকলো ১০২ পর্যন্ত। তারপর মনে হলো আস্তে আস্তে শরীর খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর এক নাক বন্ধ হয়ে থাকে। মনে হয় ঠান্ডা কিন্তু নাক দিয়ে পানি পড়ে না। অবশ্য শরীরে ব্যথা ছিলো না। তবে গলার স্বরটা একটু চেঞ্জ হলো। শনিবার নিজ উদ্যোগে আমি আমার বন্ধু কিংস্টন হাসপাতালের মালিক মেজর সালামের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। সে তখন আমাকে বলল ‘তুই করোনা পরীক্ষা করে আয়।’ তারপর আমি বিএসএমএমইউতে টেস্ট করালাম। তখন ভিড় কম ছিল। সকাল ১০টার দিকে নমুনা দিয়ে আসলাম। সন্ধ্যার দিকে আমাকে ফোন করে জানানো হলো করোনা পজিটিভ।

তিনি বলেন, এটা শোনার পর আমি প্রথমে একটু ভয় পেয়েছি। মনের মধ্যে একটা দুর্বলতা কাজ করতো। আমি সঙ্গে সঙ্গে আইইডিসিআরের যোগাযোগ করলাম। তখন তারা আশ্বাস দিলো ব্যবস্থা নেবে এবং লোকাল থানায় বলে লকডাউন করে দিতে পারে বলে জানালো। পরে আমি আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সভাপতি-সেক্রেটারি সবাইকে জানালাম, কিন্তু তারা আমাকে সহযোগিতা না করে বলল- ‘আপনি হাসপাতালে চলে যান। আমরা চাচ্ছি আপনি হাসপাতালে চলে যান।’ জাস্ট এভাবে বলল, কোনো সৌজন্যতা বা সহানুভূতি নেই আচরণে। 

তখন আমি আবার আইইডিসিআরে যোগাযোগ করলাম। তখন তারা বললেন- ‘কে বলেছে আপনাকে হাসপাতালে যেতে, তাদের নাম্বারটা দেন। এছাড়াও যতক্ষণ আপনার শ্বাসকষ্ট না হয়, আপনি বাসায় আইসোলেশনে চলে যান। হাসপাতলে আসার দরকার নেই।’ পরে আমি সভাপতি-সেক্রেটারিকে বললাম হাসপাতাল তো আমাকে নেবে না। তারপরও তারা বলেন, ‘আপনি হাসপাতালে গেলে আমরা সবাই খুশি হই।’

সেই মুহূর্তে এই জোনের এডিসি সৈকত আমাকে ফোন করেছেন এবং প্রতিদিন খোঁজ-খবর নিতেন কোনো সমস্যা হয় কিনা? বা কেউ আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করে কিছু বলে কিনা জানতে চাইলেন। ‘আমি বললাম না আমাদের এখানে কোনো সমস্যা নেই।’

তখন আমি অ্যাপার্টমেন্টের সভাপতি সেক্রেটারিকে বললাম, থানা থেকে আমাকে বলেছে বাসায় আইসোলেশনে থাকতে। তারপরে তারা আর কিছু বলেনি। তবে একদিন পরেই তারা আমার বাসায় নোটিশ পাঠিয়েছে, আমি যাতে বেলকুনিতে না যাই। আমার ঘরের জানালা না খুলি।

আমার একেবারে পাশের ফ্ল্যাটটি এক ডাক্তার দম্পতির। ওই ডাক্তার আমাকে পরামর্শ দিলেন, আমি যেন দ্রুত হাসপাতালে চলে যাই। উনার স্ত্রী আমাকে বললেন, ‘আমি যেন মূল দরজার সামনে না আসি। এই সময়ে উনি আজগর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডিউটি করতেন। আমার করোনা পজিটিভ আসার তিন-চারদিন পর ওই ভদ্রমহিলারও করোনা পজিটিভ আসে। তখন তিনিও বাসায় থেকেই আইসোলেশন ছিলেন।

প্রকৌশলী নিজামুদ্দিন ও তার মা

‘১১ তারিখ রাতে ছোট মেয়ের জ্বর আসে এবং ১২ তারিখ রাতে মা, স্ত্রী ও বড় মেয়ের জ্বর আসে। হালকা কাশিও হয় ওদের। তখন আইইডিসিআরের যোগাযোগ করলাম তারা এসে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। ১৪ তারিখ রেজাল্ট দিলো তারা সবাই করোনায় আক্রান্ত। আমার মায়ের বয়স ৮৫ বছর, আমার স্ত্রীর শ্বাসকষ্ট ছিল। তখন আমি মানসিকভাবে একটু দুর্বল হয়ে পড়লাম। আমার বিশ্বাস ছিল আমি ও আমার দুই মেয়ে ওভারকাম করতে পারব।  কিন্তু স্ত্রী এবং মাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। 

ডাক্তারের পরামর্শে মেন্থল দিয়ে গরম পানির ভাপ নিয়েছি ঘণ্টায় ঘণ্টায়। লবণ পানি দিয়ে গার্গল করেছি। নিয়মিত গরম পানিতে লেবু যোগ করে, আদা দিয়ে চা, গ্রিন-টি এসব ট্রিটমেন্ট চালাতে শুরু করলাম।

মেডিসিনের মধ্যে জিম্যাক্স, কাশির জন্য ফেক্স, জ্বর থাকলে নাপা দুটি করে এসব ডাক্তারের পরামর্শ খাচ্ছিলাম। কিংস্টন হাসপাতালের ডাক্তার আমাদের সবসময় খোঁজ নিতেন। এছাড়া একজন ডাক্তার প্রতিনিয়ত আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। সবাই যখন মোটামুটি সুস্থতার দিকে। তখন ২৭ এপ্রিল আইইডিসিআর থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে আমাদের সবার নেগেটিভ আসে। আল্লাহর রহমতে আমরা এখন পুরো সুস্থ।

করোনা জয়ী এই প্রকৌশলী বলেন, করোনাকে সিরিয়াসলি নেয়ার কিছু নেই। শ্বাসকষ্ট না হলে, বাসায় থেকে চিকিৎসা নেয়া উত্তম। বেশি বেশি গরম পানির ভাপ নিতে হবে, লবণ পানি দিয়ে গার্গল করতে হবে, সব ক্ষেত্রে গরম পানি ব্যবহার করতে হবে। ঠান্ডা কিছুই ধরা যাবে না।

তিনি বলেন, করোনা রোগকে কেউ অভিশাপ না ভেবে সহযোগিতার হাত বাড়ান। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মনোবল বৃদ্ধি করেন, তাদের সব সময় উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করতে হবে, প্রতিবেশীরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। করোনা এমন রোগ না যে জানালা দিয়ে আপনার ঘরে চলে যাবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মোবাইল ফোনেও মনোবল বৃদ্ধি করা যায় বলেও জানান তিনি।

আমি প্লাজমা’র জন্য স্যাম্পল দিয়ে এসেছি। হাসপাতাল থেকে আমাকে জানাবে বলেছে। আমি এবং আমার পরিবারের সবাই প্লাজমা দিতে রাজি আছি বলেও জানান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএএম/এসআই