করোনা আক্রান্ত স্বামীর ত্যাগ-মৃত্যু নিয়ে স্ত্রীর আবেগঘন স্ট্যাটাস

করোনা আক্রান্ত স্বামীর ত্যাগ-মৃত্যু নিয়ে স্ত্রীর আবেগঘন স্ট্যাটাস

সোশ্যাল মিডিয়া ডেস্ক  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৫০ ৩১ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৬:৫৬ ৩১ মার্চ ২০২০

আলম আকন্দের পরিবার

আলম আকন্দের পরিবার

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ৩৮ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করা আলম আকন্দ রয়েছেন। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী রুকসানা হোসেইন স্বামীর ত্যাগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস পোস্ট করেছেন। হৃদয়বিদারক স্ট্যাটাসটি নেটিজেনদের আবেগে নাড়া দিয়েছে। সেই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো- 

‘আজকে সেই ১৪ দিন, আমি আবার লাইভ এ আসতে চেয়েছিলাম কিন্তু না, আমি পারলাম না। আমি হেরে গিয়েছি। যু'দ্ধ করতে করতে আমি, করোনা ভাই'রাস যাকে বলছে কোভিড-১৯ তার কাছে হেরে গেলাম। আমি সেই সময় বিলিভ করতে পারছিলামনা যে আলমের করোনা পজিটিব। অথচ সে তার শরীরে করোনা নিয়ে আমাকে সেভ করে গেল ।

আম'রা সবাই এখন আলহাম'দুলিল্লাহ ভালো এবং সুস্থ আছি, শুধু আলম (আমা'র হাসবেন্ড) নেই আমাদের মাঝে। সে বুঝতে পেরেছিলো তার সময় শেষ, করোনার মহামা'রী থেকে রক্ষা করতে শুধু ইদ্দাতের ৪ মাস ১০ দিন না, আগের ১৪ দিন সহ রক্ষা করে গেল আমাকে। যদি তার করোনা পজিটিব না আসত, আমাকে ঘর থেকে বের হতে হতো, প্রতিদিন হসপিটালে যেতে হতো; আমি করোনা সংক্রমিত হতে পারতাম।

কিন্তু সে জানেনা, করোনার ভ'য়াবহতার কাছে; ঘরটাও নিরাপদ না। হসপিটালের ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট স্পেশাল ডিপার্টমেন্ট এ থেকেও যদি তাকে করোনা স্প'র্শ করতে পারে আর সেই হিসেব করলে, ঘরতো কিছুই না, আমাকে স্প'র্শ করা আরও সহ'জ।

আমাকে হোম কোরেন্টাইনে পাঠাবার ৩ দিন পর, ২০ তারিখ শুক্রবার আলম নার্স এর মোবাইল দিয়ে একটা কল দেয়, এই কলটা যে লাস্ট কল হবে, এটাই যে শেষ কথা হবে কে জানতো? সে তার মোবাইল টা খুঁজছে, আমি বললাম এক্ষুণি নিয়ে আসতেছি। ডাক্তারের কাছ থেকে পারমিশন নিলাম এবং সে মোবাইল ইউজ করার মত স্টেবল আলহাম'দুলিল্লাহ, সেটাও জেনে নিলাম। ডাক্তার আরও বললো এই অবস্থায় দুই দিন থাকলে, তাকে সোমবার নাগাদ আইসিইউ থেকে ওয়ার্ডে ট্রান্সফার করতে পারবে ইনশাল্লাহ।

আলহাম'দুলিল্লাহ অবস্থার উন্নতি দেখে তাড়াতাড়ি রওনা হলাম। আমা'র বাচ্চারা আমাকে টেনে ধরে না মামণি তুমি বের হবে না, আম'রা মাকে হারাতে চাই না, বাবা অ'সুস্থ, তুমিও অ'সুস্থ হলে আম'রা কার কাছে যাবো। কিছুই হবে না আমাদের ইনশাল্লাহ, আল্লাহর উপর ভরসা রাখ বলে বেড়িয়ে গেলাম। প্রায় এক ঘন্টার মেট্রো জার্নি আমা'র বাসা থেকে হসপিটাল। কোরেন্টাইন ভেঙ্গে ছুটে চললাম হসপিটালে। একটা পাথর, একটা তাসবিহ, মোবাইল আর কিছু টাকাসহ ছোট একটা ব্যাগ ডাক্তার এর হাতে দিয়ে রিকোয়েস্ট করলাম, একটা বার আমাকে দেখার সুযোগ করে দাও। না কোন ভাবেই যেতে পারলাম না আলমের কাছে। কিন্তু সে ঠিকি অনুভব করেছিল, আমি তার অনেক কাছে এসেও তার সাথে দেখা করতে পারি নাই।

তাই শুক্রবার বিকেল থেকে আজকে পর্যন্ত আর সাড়া দেয় নাই কারও ডাকে। আমা'র ব্যাগটা তার হাত পর্যন্ত পৌছানো হয়েছিলো কিনা আমি তাও জানি না। মোবাইল ইউজ করবে, পাথর দিয়ে তাইমুম করবে আমি সেই অ'পেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু সে আর চোখ খুলে পৃথিবীর আলো দেখেনি লাস্ট ডে পর্যন্ত। এর ভিতরে আমাকে দুইবার ভিডিও কলে দেখানো হয়েছিলো। অনেক ডেকে ছিলাম ভিডিও কলে, তারপরেও চোখ খুলেনি। চলে গেছেন জান্নাতে। এইভাবে করোনা, পৃথিবীর বুকে করুণ ইতিহাস লিখে যাচ্ছে।

করোনা লন্ডনে কি ভ'য়াবহ রুপ নিয়েছে, তা এক সপ্তাহ আগেও আমি আন্দাজ করতে পারিনি। তাই ডাক্তারদের উপর অনেক রাগ হচ্ছিল আমা'র। আইসিইউ এর ভিতরে কিভাবে করোনা প্রবেশ করতে পারে বা আমাকে কেন টেস্ট করা হচ্ছিল না ইত্যাদি নিয়ে। আসলে আমি ভুল ছিলাম। হসপিটাল ভর্তি এত মুমূর্ষু করোনার রোগি রেখে, আমাকে তারা কেন টেস্ট করবে? যেখানে আলহাম'দুলিল্লাহ আমা'র কোন সিমটম ছিল না। টেস্ট করেও যদি পজিটিব আসতো, তাহলেও করার কিছু ছিল না। সেল্ফ আইসোলেশন মানে অন্যের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই। যেটা এখন আম'রা সারা বিশ্বের প্রায় সবাই করছি। অন্যের থেকে দূরে থাকা যায়, কিন্তু সন্তান মা এদের থেকে দূরে থাকা যায় না; যেমনটা আমি পারিনি।

আলম করোনার রোগী হওয়াতে, আমি দেখেছি ডাক্তার নার্সদের সার্বক্ষণিক কঠিন প্রচেষ্টা। এখন বুঝতে পারছি কত রোগী হলে, সরকার প্রাক্তন ১১ হাজার ডাক্তার, ২৪ হাজার ফাইনাল ইয়ারের মেডিকেল স্টুডেন্ট এবং আড়াই লক্ষাধিক সেচ্ছাসেবীদের করোনা রোগিদের পাশে দাঁড়াতে বলছে। আমি স্যালুট জানাই সকল ডাক্তার নার্স সেচ্ছাসেবীদের, যারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের জন্য।

হে আল্লাহ আপনিই সকল শক্তির মালিক। আপনিই পারেন আমাদের এই মহা বিপদ থেকে উ'দ্ধার করতে। আপনি আমাদের ক্ষমা করুন’।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)
 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ