করোনার সঙ্গে আতঙ্ককেও জয় করলেন তারা

করোনার সঙ্গে আতঙ্ককেও জয় করলেন তারা

আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:০৯ ৭ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৮:১৬ ৭ জুলাই ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

প্রাণঘাতী করোনা প্রার্দুভাবের আতঙ্কে ভুগছে গোটা দেশ। করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে মৃত স্বামীকে ফেলে চলে যাচ্ছেন স্ত্রী, আবার স্ত্রীকে ফেলে যাচ্ছেন তার স্বামী। এমনও ঘটনা ঘটেছে ছেলে তার মৃত বাবাকে হাসপাতালে ফেলে চলে গেছেন । বাবার মৃত্যুতে সন্তানকে কিংবা সন্তানের মৃত্যুতে জানাজা-দাফনে পাওয়া যায়নি বাবাকে।

করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয় ও আতঙ্ক থাকায় আপনজনেরা দুঃসময়ে কাছে না থেকে নিজেকে অনেকটাই আড়াল করে রাখতে চান। এমন সব অমানবিক খবর চোখের সামনে অহরহ ঘটলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় ব্যতিক্রম হৃদয়স্পশী ও মানবিকতার গল্প ও চোখে রয়েছে। যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

করোনা আক্রান্ত বাবার চিকিৎসায় হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টাই সঙ্গে ছিলেন তিন ছেলে। করোনা আক্রান্ত বাবা মারা যাওয়ার পর মা আক্রান্ত হলে ছেলে তার পাশে থেকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। এতে ছেলে আক্রান্ত হলেও মাকে সুস্থ করে তুলতে পেরে খুশি।

এদিকে স্বামীর সেবা দিতে গিয়ে স্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত হন। কিন্তু তিনি মনোবল হারাননি। এক বিছানায় থেকে স্বামীকে সেবা যত্ম করে করোনা জয় করেছেন স্ত্রী।

করোনার উপসর্গ নিয়ে গত ৩০ মে মারা যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার পৌর শহরের নারায়ণপুরে বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম বন্দরের চাকরিজীবী আতাউর রহমান সেলিম। মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমানের ছেলে সেলিম বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে এক রকম বিনা চিকিৎসায়ই মারা যান। মৃত্যুর পরদিন তার করোনা পজিটিভ আসে। 

এদিকে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই স্ত্রী শাহীনূর আক্তারের শরীরে করোনা উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় তার অবস্থার অবনতি হলে শাহীনূর আক্তারকে ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পরই শুরু হয় মায়ের বেঁচে থাকার সঙ্গে ছেলের সংগ্রাম।

শাহীনূরের ছেলে তানভীর রহমান বলেন, করোনায় বাবাকে হারিয়েছি, মাকে হারাতে চাই না বলেই সঙ্গে থাকার চ্যালেঞ্জ নিলাম। হাসপাতালে যাওয়ার পর যখন বলা হলো এখানে আলাদাভাবে কেউ দেখাশোনা করবে না তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম মায়ের সঙ্গে নিজেই থাকব। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মায়ের সব ধরনের সেবা দিতে থাকলাম। তবে তিন দিন পর থেকে আমারও উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষায় আমারও করোনা পজিটিভ আসে। শেষ পর্যন্ত গত ১৯ জুন আমার মা ও ২৬ জুন আমার নেগেটিভ ফল আসে। আমরা দুজনই বর্তমানে এখন সুস্থ আছি।

উপজেলার মনিয়ন্দ ইউপি যুবলীগের সভাপতি আবুল বাশার হাজারী করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হন। তার এই সুস্থ হওয়ার পেছনে বড় অবদান রেখেছেন স্ত্রী সোহেলি আরফিন সুমী। স্বামীর সেবা দিতে গিয়ে তিনিও করোনায় আক্রান্ত হন। ঢাকায় কর্মরত আবুল বাশার হাজারীর উপসর্গ দেখা দিলে তিনি বাড়িতেই চিকিৎসা নেন।

এ সময় তার স্ত্রীকে আলাদা থাকতে বললেও তিনি সেটা করেননি। সেবা করতে গিয়ে একপর্যায়ে স্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত হন। কিন্তু তিনি মনোবল হারাননি। এক বিছানায় থেকে স্বামীকে সেবা যত্ম করেছেন স্ত্রী। শুধু মাত্র ভালবাসার জোরে একইরুমে আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসার পাশাপাশি স্ত্রী তার স্বামীকে সেবা করতে থাকেন। একপর্যায়ে স্ত্রী করোনা জয় করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

আবুল বাশার হাজারী বলেন আইসোলেশনে টানা ১৬ দিন পর পুনরায় নমুনা দেওয়া হয়। নমুনার ফলাফল দুজনেরই নেগেটিভ আসে। তারপর আরো ৭ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা হয়। তৃতীয়বার নমুনা রিপোর্ট নেগেটিভ আসলে স্বাস্থ্য বিভাগ দুজনকে করোনা মুক্ত ঘোষণা করে। বর্তমানে দুজনই নিয়ম মেনে চলায় সুস্থ আছি।

তার স্ত্রী সোহেলি আরফিন সুমী বলেন, আল্লাহর উপর ভরসা রেখেই স্বামীর সেবা শুরু করা হয়। বিশ্বাস ছিল করোনা দুজনকে কখনো আলাদা করতে পারবে না। করোনা মুক্ত হওয়ায় আমি মহান আল্লাহর প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ