করোনার ছুটি যেভাবে কাটাচ্ছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা

করোনার ছুটি যেভাবে কাটাচ্ছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা

শোয়াইব আহমেদ, ঢাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৫৪ ২৮ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৭:২২ ২৮ মার্চ ২০২০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল

আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, হাসি-খেলার এক বিচিত্র জীবনপ্রণালির মধ্য দিয়ে সময় পার হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে অনেক প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী, নবীন এ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসকে করে তুলে প্রাণবন্ত, চঞ্চল। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় অর্ধ লাখ। বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় বিভিন্ন মতাদর্শের বিচিত্র মানুষ। শিক্ষার্থীরা তাদের নিত্য সময় পার করেন নানা বিচিত্র কর্মের মাধ্যমে। 

বন্ধুদের সঙ্গে রাতের ক্যাম্পাসে অফুরন্ত আড্ডা দেয়া, হলের ছাদে, ফুলার রোডে বৃষ্টিতে ভেজা, ক্যাম্পাসের ফিল্ডে বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলা, বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে একাকার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরে গোসল করা, বিকেলে টিউশনি, সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে কিংবা টিএসসির চত্বরে বসে চা-আড্ডা, মধুর ক্যান্টিনে রাজনৈতিক পদচারণায় মুখরিত হওয়া প্রত্যেকটা ক্ষণ, পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ দূরে কোথাও ট্যুরে চলে যাওয়া, সবুজ ঘাসে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গান-বাজনার জগতে হারিয়ে দীর্ঘ সময় পার করে দেয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের খাবার ক্যান্টিনে দলবেধে বসে সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে মেডিকেল মোড়ে গিয়ে আড্ডা, বড়দের দেখে সালাম দিয়ে ট্রিট চাওয়া, ছোটদেরকে ট্রিট দেয়া ইত্যাদি নানা কাজের মধ্যদিয়ে আনন্দ বেদনা মিশে যেন বিচিত্র রূপ নেয় এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। জীবনের জন্য হয়ে উঠে শ্রেষ্ঠ স্মরণীয় মুহূর্ত। 

এমন শিক্ষার্থীরা করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯ প্যানডেমিক) প্রাদুর্ভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় কিভাবে তাদের দিন কাটাচ্ছেন, মানুষকে সচেতন করতে কি করছে তারা, ক্যাম্পাস ছেড়ে থাকতে তাদের অনুভূতি কেমন, কিভাবে ক্যাম্পাস জীবনের অভাব পূরণ করছে ইত্যাদি বিষয় জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা হয় ডেইলি বাংলাদেশ প্রতিনিধির সঙ্গে। এসব নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। 

তানভীর হাসান সৈকত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য। গত মঙ্গলবার থেকে প্রতিদিন ৫০ জন শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তিনি। দেশে করোনা যতদিন থাকবে ততদিন মানুষের পাশে থাকার ইচ্ছা ডাকসুর এ সদস্যের।

প্রতিদিন ৫০ জন শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য তানভীর হাসান সৈকত।

তানভীর হাসান সৈকত  বলেন, দেশের এ ক্রান্তিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং একজন ছাত্রনেতা হিসেবে শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমার কর্তব্য মনে করছি। কেন না মহামারিতে আমাদের থেকে তাদের অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে। কেউ যদি এটিকে শো-অফ মনে করে করুক। কর্মহীন নিরুপায় নিম্নবিত্ত ৫০টি পরিবারের পাশে প্রতিদিন আমি সৈকত খাবার নিয়ে ‘শো-অফ’ চালিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। সবার সম্মিলিত শো-অফে যদি কিছু শ্রমজীবী মানুষ খাবার পাই তাহলে মন্দ কিসে? যদি আমরা পাশে না থাকি তাহলে এই মানুষগুলো না খেয়ে মারা যাবে। এদের জীবনেরও মূল্য আছে। এই কাজে আমার কয়েকজন বন্ধু, দুএকটি সংগঠন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফরা (মামারা) আমাকে সহযোগিতা করছে।

আমরা এখন নিয়মিত টিএসসি থেকে চাল, আলু, পেয়াজ প্যাকেট করে বিভিন্ন জায়গায় বিলি করে দিচ্ছি এবং দিব যাতে অসহায়রা একটু হলেও আস্থা পায়। এ কাজে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন ডাকসু সদস্য তানভীর হাসান সৈকত।

এনামুল হাছান নাহিদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী। বাড়িতে অধিকাংশ সময় কাটে কোয়ারান্টাইনের নিয়মের মধ্যে। ঘরে বসে বই পড়ে কাটানো হয় তার। তিনি বলেন, করোনার ছুটিতে একেবারেই বাসায় আছি খুব প্রয়োজন ছাড়া বের হচ্ছি না। ক্যাস্পাসে থেকে বাড়ি ফেরার সময় কয়েকটা বই নিয়ে এসেছিলাম, বাসায়ও কিছু বই ছিলো সেগুলোর সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, আমার দেখা নয়া চীন, কাদের স্যার এর লিখা কারাগারে বঙ্গবন্ধু, কারাগারের রোজনামচা ও কিছু গল্পের বই পড়ছি।

বাড়িতে কিভাবে সময় কাটানো হয় সে সম্পর্কে তিনি বলেন, টিভিতে নিউজ দেখা, বাসার ছাদের বাগানে ফুল ও ফলের গাছের পরিচর্যা করি। বিকেলে বাগানে সময় কাটাই, কিছু সময় ফেইসবুকে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার কাজ করি। দেশের এই ক্রান্তিকালে বাসায় থাকাটা নিজের জন্য এবং সবার সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে চলাটাই উত্তম পাশাপাশি সচেতন থাকা ও সরকার প্রশাসন যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছে সেগুলো মেনে চলা সকলে নিরাপদ থাকুন, সুস্থ থাকুন সেই কামনা করি। আর হ্যা অবশ্যই বাসায় থাকতে চেষ্টা করুন।

ক্যাস্পাস থেকে দূরে থাকায় কি কি অভাব হচ্ছে সে সম্পর্কে জানান, টিএসসি, হাকিমের আড্ডা, রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় মধুর ক্যান্টিন এর প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো সময় খুব মিস করি। হল ছাত্রলীগের ছোট ভাই-বন্ধুদের কথা অনেক মনে পড়ে। 

শাহাদাত হোসাইন। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (২০১৮-১৯ সেশন) শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, দেশের ক্রান্তিলগ্নে ঢাবি শিক্ষার্থী হিসেবে জাতির প্রতি আমার দায়বদ্ধতা অনেক। করোনা উপলক্ষে এই দীর্ঘ ছুটিতে নিজ অবস্থানে থেকে করোনা নিয়ে আতঙ্কিত এলাকার সাধারণ মানুষকে সচেতন ও প্রতিরোধমূলক পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার সাথে সাথে এলাকার আশপাশের অসহায়দের সাধ্যমত সাহায্য করার চেষ্টা করছি। 

কিভাবে অবসর সময় কাটানো হয় এবং বাড়িতে আবদ্ধ থেকে ক্যাম্পাসকে কিভাবে অনুভব করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সাহিত্য পড়া, ভাইবোনের সাথে দুষ্টুমি আর ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে কেটে যায় বাকি সময়টা। এরই মধ্যে স্মৃতিচারিত হয় প্রিয় ক্যাম্পাসে ক্রিকেট অথবা ফুটবল টুর্নামেন্ট, নিত্য দিনের আড্ডা কিংবা বন্ধুর জন্মদিনের মাতামাতি, ক্লাসের বোরিং টাইমটাও একসময় বিরক্তিকর মনে হলেও বাসায় বসে এসব কিছুকেই বেশি মিস করছি। পিডিএফ, শীট, এটেন্ডেন্স, টিএসসি, হাকিম, মামা ইত্যাদি চিরচেনা শব্দগুলোকে অনেক মনে পড়ে। ভালোবাসার, ভালোলাগার প্রাঙ্গণগুলো আবারও রঙিন হোক। এই হতাশার অন্ধকার কাটিয়ে দিয়ে প্রিয় ক্যাম্পাস ফিরে পাক তার আবেগ। 

ফারাহ জাহান শুচি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারে (২০১৮-১৯ সেশন) অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, করোনা আতঙ্কে স্বেচ্ছা অন্তরীণের প্রথম দুয়েকদিন খুব একঘেঁয়ে লাগলেও কিছুটা মানিয়ে নিয়েছি। ঠিক করে নিয়েছি এই অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে কিছু বই পড়ব, সিনেমা, মুভি দেখব। আর ভেবেছি সাধ্যমতো গরীব-দুখীদের সাহায্যের চেষ্টাও করবো। ফেসবুকে দেখছি অনেকে তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে তাদের পাশের মানুষের দিকে। নিঃসন্দেহে এটি অনেক প্রশংসনীয়। 

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে কাটাতে যেমনভাবে মিস করছেন বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্পাস থেকে দূরে আছি এই অনিশ্চিত ছুটিতে৷ কবে আবার ক্যাম্পাসে ফিরবো, তা জানি না। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে কাটানো সময়গুলো অনেক বেশি মনে পড়ছে। বিশেষ করে বটতলা, টিএসসি, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ঘুরাফেরাকে খুব মিস করি। আশা করি, দ্রুতই আবার প্রাণপ্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসবো। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে বিনামূল্যে হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং লিফলেট বিতরণ করছেন ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের সাধারণ সম্পাদক ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নরত (২০১৪-১৫ সেশন) ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয় বলেন, নিজ উদ্যোগে প্রিয় জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার অসহায় দুঃস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষুদ্র প্রয়াসের অংশ হিসেবে বিনামূল্যে হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং লিফলেট বিতরণ করেছি। সেই সঙ্গে জনসাধারণকে সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করতে মাইকিং করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছি। ক্যাম্পাসের সবকিছুকেই অনেক মনে পড়ছে তবে দেশের অবস্থা কোনদিকে যায় সেটা নিয়েই বেশি উদ্বেগ রয়েছে। 

সবাই কাজ করছেন নিজ নিজ জায়গা থেকে, আর কেনই বা করবে না দেশের জন্য কাজ করা তো নিজ মায়েরই সেবা করা। পাশাপাশি এই দুর্যোগপূর্ণ জীবন থেকে পরিত্রাণ দিয়ে সকলকে সুস্থ রাখেন সৃষ্টিকর্তার কাছে এমনটাই আকুতি সবার। প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে সকলের সাথে আবার দেখা হবে এমন আশা পূর্ণ হোক সবার।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম