করোনার অবসরে কী করছেন শিক্ষার্থীরা?

করোনার অবসরে কী করছেন শিক্ষার্থীরা?

মো. মিরাজুল আল মিশকাত, হাবিপ্রবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:২৪ ১৪ জুন ২০২০  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

প্রায় তিন মাস ধরে ঘরবন্দী হয়ে আছে স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ব্যতিক্রম নন দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরাও। তবে অবসর সময়কে কাজে লাগাতে শুরু করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। আজকের পর্বে থাকছে হাবিপ্রবিতে অধ্যয়নরত বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের করোনা পরিস্থিতির সময়কে কাজে লাগানোর গল্প। 


মারিয়া তুল জান্নাত মৌ, মার্কেটিং বিভাগ
পৃথিবীতে একেকজন মানুষের একেক রকম শখ থাকে। আমারও কিছু ব্যতিক্রমী শখ রয়েছে, এসবের মাঝেই আমি প্রশান্তি খুঁজে পাই। অনেক আগে থেকেই অবসর সময় পেলে  টুকটাক হাতের কাজ করতাম কিন্তু এবারের এই টানা বন্ধের মতো এতটা সময় নিয়ে আগে কখনোই শখের কাজ গুলো করা হয়নি। যদিও হঠাৎ করে ক্যাম্পাস ছুটি দেয়ার কারণে ক্রাফটিং এর অনেক জিনিস সঙ্গে আনতে পারিনি। আস্তে আস্তে ছুটি যখন বাড়তে থাকলো তখন এদিকে মনোযোগ দিলাম। আমি সাধারণত পুরনো ও অব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস দিয়ে অত্যন্ত অল্প খরচে ক্রাফট তৈরি করি। যেমন এক্ষেত্রে ফাঁকা জর্দার কৌটা থেকে শুরু করে পুরনো কার্টুন বক্স, প্ল্যাস্টিকের জিনিস কোনো কিছুই বাদ যায় না। এগুলো থেকে যখন নতুন একটি জিনিস তৈরি হয় তখন নিজের পরিশ্রমটাকে সার্থক মনে হয়। এসবের পাশাপাশি ছবি আঁকার প্রতিও আমার খুব আগ্রহ কাজ করে। মাঝে কিছুটা সময় কাটানো শুরু হল রঙ দিয়ে দেয়ালে বিভিন্ন ডিজাইন থেকে শুরু করে ক্যালিগ্রাফি করা, বিভিন্ন পেইন্টিং করে দেয়াল সাজানো ও কাগজে পেইন্টিং এর মাধ্যমে। আবার কয়েকদিন আগে নিজ হাতে তৈরি কাগজের ফুল ও কিছু উপকরণ দিয়ে বাসার মধ্যেই বানিয়ে ফেললাম একটা সেলফি কর্ণার। আমি আমার বেশিরভাগ কাজ গুলোই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করি। এরপর সেখানে সবার কাছে থেকে যে ইতিবাচক উৎসাহ পাই সেটিই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি যোগায়। এসবের মধ্যে ফেইসবুকে দেয়ার পর বেশ কিছু জিনিসের অর্ডারও পেয়েছি। নিত্য নতুন আইটেমের খাবার তৈরি করা আমার আরেকটি শখ। এসবের ফাঁকে ফাঁকে সেটিও সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছি। এদিকে দুদিন আগে শুরু করেছি ড্রেসে ফেব্রিক্স এর ডিজাইন করার কাজ। আগে থেকেই চাকরির প্রতি আমার একটু কম উৎসাহ কাজ করে। খুব ছোট থেকেই ইচ্ছে ছিল নিজে কিছু করব, উদ্যোক্তা হবো। সেই ভাবনা থেকে পাশাপাশি অনেকের পরামর্শে নিজেও শিখছি এবং চেষ্টা করছি অপরকে শেখানোর, সে জন্য একটি ইউটিউব চ্যানেলও খুলেছি, যেখানে প্রতিনিয়ত হাতের কাজ, রান্না সহ বিভিন্ন কাজগুলো আপলোড করছি, কোনটা কিভাবে তৈরি করতে হয় সেসব শেয়ার করছি । এতে সময়ও যেমন কাটছে ঠিক তেমনি অভিজ্ঞতাও বাড়ছে, কোয়ারেন্টাইনে যখন সবাই কী করবে ভেবে পাচ্ছে না সেখানে আমি নিজের স্বপ্ন বুনোনের একটা সুযোগ পেয়েছি, এগিয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে, স্বপ্নগুলোকে আরো অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।  


মাহমুদুল হাসান রুমন, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ
দেশ সহ পুরো বিশ্ব আজ মহামারির কবলে পতিত। মুক্তির একটাই উপায়, তা হল সচেতন থাকা। সচেতনতার মাঝে সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ হলো নিজ বাসায় অবস্থান করা। বাইরে খুব প্রয়োজন ছাড়া না বের হওয়া। বের হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। আর এই সামগ্রিক অংশের নাম হল লকডাউন।

প্রায় নব্বই দিনের মতো বাসায় লকডাউন পরিস্থিতিতে আছি। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর এত দীর্ঘ সময় বাসায় থাকা হয়ে ওঠেনি। যখন মেনে নিলাম যে বাসাতেই থাকতে হচ্ছে, উপায় নেই; তখন এর পজেটিভ দিকগুলোকে প্রকাশ করা শ্রেয় বলে মনে করলাম। বাসায় থাকলে আম্মা খুশি হয়, তাকে তো খুশি রাখতে পারব। পুরো ফ্যামিলি একসঙ্গে থাকার সুবর্ণ সুযোগ এটি। দীর্ঘদিনের শখ গিটার শেখা, সেটা শুরু করেছি এরইমধ্যে। রোজার মাস পুরোটাই বাসায় ছিলাম তাই ইবাদত বান্দেগিতে বেশি সময় দেয়ার চেষ্টা করেছি। ছোট থেকে বই পড়ার অদম্য বাসনা ছিলো আমার, সেই  ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করছি। আবার সোশ্যাল মিডিয়াতে কার্যকর কমিউনিকেশন স্কিল ঝালাইয়ের সুযোগ মিস করছি না। এমন সংকটময় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে এর মাঝেই ‘মন্দের ভালো দিক’ খুঁজে নিয়ে এসব নিয়েই চলছে লকডাউন জীবন। নতুন কিছু শিখে চলার মাধ্যমে ঘরে বসেই নিজেকে ব্যস্ত রাখছি। আর সময়টাও বেশ ভালভাবেই যাচ্ছে। আশেপাশের অনেক ঘটনাই হতাশার, আবার কিছু উৎসাহমূলক, মানবিকতার খবর প্রতিনিয়ত নিজের মনকে উদ্যম দেয়।

‘Negativity Spread Negativity’ বলে ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে। তাই নিজে হতাশাগ্রস্ত না হয়ে পরিবারের সঙ্গে আশেপাশের মানুষদের হতাশার দিকে প্রভাবিত না করে সবার মাঝে পজিটিভিটি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। জানিনা নিজের জায়গা থেকে কথাটা পেরেছি তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কোথায় কি হচ্ছে, কে কি করলো, এসব খুব বেশি না ভেবে নিজের করণীয় বিষয় টাতেই সবসময় বেশি ফোকাসড থাকার চেষ্টা করছি। 

বাস্তবের হিমুরা আজ ঘরবন্দি। পৃথিবীর অসুখ ভাল হোক। তারপর না হয় আবার চোখ ভরে পৃথিবী দেখা যাবে! 

মো. ইকবাল হোসেন রবি, পরিসংখ্যান বিভাগ
বর্তমান সময়ের ত্রাস করোনা। করোনা আজ আমাদের বাধ্য করেছে অনেক কিছু ছেড়ে দিতে। বাইরে বের হওয়া, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে আড্ডা, ক্লাস পরীক্ষা মোটকথা আমাদের স্বাভাবিক জীবন থমকে গেছে এই করোনায়। আমাদের সবার কাছে আসলেই অনেক কঠিন এই সময়টা পার করা। এত দীর্ঘ সময় লকডাউন আমাদেরকে মানসিকভাবে অনেকটা ডিপ্রেশন এ ফেলে দিচ্ছে। আর সেই কারনেই করোনা নিয়ে আমাদের আতঙ্কটা বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণে। ঠিক সেকারণেই ঘরে বসে সময়কে কাজে লাগানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইউটিউবিং করছি, বিনোদনমূলক কন্টেন্ট বানাচ্ছি ঘরে বসেই, যেন সবাই ঘরে বসেই বিনোদন পায়, হাসিখুশি থাকে। কারণ এই সময়ে আমাদের দরকার মানসিকভাবে সুস্থ থাকা, যার জন্য হাসির কোনো বিকল্প নেই।তাছাড়াও বাসার টুকিটাকি কাজে সাহায্য কর,বাসার বাগান পরিচর্যা  করা,বাসাতেই ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ  করেও সময় কাটাচ্ছি।

খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হই না, তবে মাঝে মাঝে ভিডিও শুট এর জন্য বাইরে যাওয়ার লাগে, তবে সামাজিক দূরত্ব মেনেই তা করছি, ঘন ঘন হাত স্যানিটাইজ করে কাজগুলো করছি।

আপনারা  যারা ডিপ্রেশন এ ভুগছেন বা মানসিকভাবে দুর্বল বা অনেক ভয় পাচ্ছেন, তাদের বলব আপনারা নিজেদের ব্যাস্ত রাখুন। আপনি যা পারেন নাচ, গান, অংকন, গল্প লেখা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে, এসব করতে পারেন। অনেক আগে করতেন, এখন করেন না এটা ভাববেন না।আমরা চাইলেই আমাদের পুরনো ট্যালেন্টগুলো বুস্ট করতে পারি, প্রয়োজন শুধু চর্চার। তাই বসে থাকবেন না, হাতের কাছে যা পাবেন তা নিয়ে বসে পড়ুন কাজে। তাছাড়াও মুভি, সিরিজ, অনলাইন আড্ডা, গেমিং করেও আপনি আপনার সময়গুলো কাজে লাগাতে পারেন।
 
সব কথার মূল প্রতিপাদ্য এটাই। আপনাকে ঘরে থাকতে হবে, সুস্থ থাকতে হবে এবং সচেতন থাকতে হবে। তাহলেই এই পৃথিবী দ্রুত সুস্থ হবে।

সুমাইয়া আনান সুমা, পরিসংখ্যান বিভাগ
করোনা বিশ্বায়ন পরিস্থিতিতে করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত  নিউজ সমূহ দুশ্চিন্তা এবং উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে নষ্ট করছে। যার কারণে এই সংকটাপন্নকালীন সময়ে যতদূর সম্ভব প্যানিক সৃষ্টি করে এমন খবরগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছি এবং লেখাপড়ার পাশাপাশি নতুন কিছু শেখার চেষ্টায় নিজেকে ব্যস্ত রাখছি। যেন করোনা বিষয়টি আমার মধ্যে  প্যানিক সৃষ্টি করতে না পারে। সেজন্য বেশির ভাগ সময় আমি আমার ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও তৈরির জন্য কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি, বিভিন্ন অনলাইন কোর্স (LEDP) করছি, কিছুটা Fiver এ সময় দিচ্ছি এছাড়াও বাসার ছোটখাটো কাজগুলোতেও পরিবারকে সাহায্য করি। অবসর সময় গুলোতে গেমস খেলি, গল্পের বই এবং টিভি দেখেও সময় অতিবাহিত করছি। এছাড়াও লকডাউনের সময়গুলোতে পরিবারের সঙ্গেই গল্পের মাধ্যমে বেশি সময় কাটছে আমার। লকডাউনের সময়টিতে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় সোশ্যাল মিডিয়াতেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া হয়। এতে মনটাও ভালো থাকে এবং আড্ডার মাধ্যমে অনেক সচেতনতামূলক আলোচনাও উঠে আসে নিজেদের মধ্যে। নিজের মনের জোর আর সচেতনটাই প্রধান পরিস্থিতিটাকে মোকাবেলা করার জন্য। এতে প্যানিক হওয়ারও কোনো সুযোগ থাকবে না। ফলে নিজে বাচঁবেন, বাচঁবে দেশ।


আব্দুল্লাহ আল মুবাশ্বির, ইংরেজি বিভাগ
করোনায় বিপর্যস্ত পুরো দেশ। এমতাবস্থায় বাসায় বসে বসেই দিনাতিপাত করতে হচ্ছে সবাইকে। তবে ক্যাম্পাস সাংবাদিক হিসেবে আমার বসে থাকার জোঁ নেই। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি জানা, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের খোঁজ খবর রাখাসহ বাসায় বসে থেকেও নানা দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

যদিও ক্যাম্পাস খোলা থাকলে এর চেয়েও বেশি ব্যস্ত রাখতে হতো নিজেকে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম সংগঠন  হাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি আয়োজন করেছে ‘হাবিপ্রবিসাস আলাপন’ নামের এক বিশেষ অনলাইন লাইভ অনুষ্ঠান। মূলত দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেই দূরত্বকে ঘুঁচিয়ে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মাঝে এক আত্নিক বন্ধন সৃষ্টি করাই ‘হাবিপ্রবিসাস আলাপন’ এর মূল লক্ষ্য। এই আলাপনে নিয়মিত অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে হচ্ছে আমাকে। একারণেও ব্যস্ত সময় পার করছি। এরইমধ্যে বেশ সারা ফেলেছে এই অনলাইন আলাপনটি। অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে অনলাইন আলাপনে যুক্ত হবার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হাবিপ্রবির সাবেক সফল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এই অনলাইন আলাপনটি শিক্ষার্থীদের এক ঘেঁয়েমি এবং কিছুটা একাডেমিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে বলেই মনে করছি। এছাড়াও গল্পের বই,বিভিন্ন ধর্মীয় বই পড়াসহ আরো নানা সমাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর