করোনায় সব থামলেও সক্রিয় সুবিধাবাদী চক্র

করোনায় সব থামলেও সক্রিয় সুবিধাবাদী চক্র

প্রকাশিত: ১৭:৩৯ ২৩ জুন ২০২০  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

বাঙালি জাতি স্বাধীনতার পঞ্চাশবর্ষ, অর্থাৎ রজতজয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কবলে পড়ে গোটা বিশ্বের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত। যেন থেমে গেছে সব। আবার অর্থনীতির ধস ঠেকাতে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ স্বল্প পরিসরে হলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করেছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ধারায় এগিয়ে চলেছি স্বদেশ। বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। কিন্তু এর জন্য তো কাজকর্ম বন্ধ থাকতে পারে না! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মহামারী আসবে চলেও যাবে, কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তো বন্ধ থাকতে পারে না। মানুষের আয় রোজগারের পথ তো আমরা বন্ধ রাখতে পারি না। প্রধানমন্ত্রীর উপলব্ধি যথার্থ। কিন্তু মহামারী সংকটে পড়ে আমাদের দেশের নানান খাতের যে বিষয়গুলো খুব নাজুক হয়ে সামনে এসেছে, তার মধ্যে স্বাস্থ্যখাত অন্যতম। সাম্প্রতিক সময়ের পত্র-পত্রিকার খবর এবং বিশিষ্টজনদের বিশ্লেষণ থেকেই বিষয়টি প্রতীয়মান। একটি দেশের নাগরিকের পাঁচটি মৌলিক খাতের মধ্যে স্বাস্থ্য খাত একটি।

প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্র তার দায় কিছুতেই অস্বীকার করতে পারে না। কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত হয়ে একজন নাগরিককে যখন বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে, কোথাও ভর্তি হতে না পেরে মৃত্যুমুখে পড়তে হয়- তখন একটি গণতান্ত্রিক দেশে এর চেয়ে পরিতাপের আর কী হতে পারে! সম্প্রতি জানা গেছে, অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হতে যাচ্ছেন, তাদের কাছে চাওয়া হচ্ছে কোভিড-১৯ নেই মর্মে প্রত্যয়নপত্র। আর এই সুযোগে জমে উঠেছে ‘কোভিড-১৯’ নেই মর্মে প্রত্যয়নপত্র বাণিজ্য। হায় সেলুকাস! কী বিচিত্র আমার দেশ! 
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের দ্বারপ্রান্তে এসে বাংলাদেশের উন্নয়ন আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণের সুযোগ কারো নেই। এ ধারায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতেও অর্জন রয়েছে। এ সময়ে দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ একধরনের সন্তোষজনক জায়গায় এসেছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি গতি পেয়েছে ইত্যাদি। এ অর্জনগুলোকে বলা যায় এমডিজি যুগের অর্জন। এখন আমরা আছি এসডিজি যুগে। কিন্তু আগে আমাদের আকাক্সক্ষা ছিল ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’। এখন ওই আকাক্সক্ষায় নতুন কিছু শব্দ যোগ করতে হয়েছে। এখন আমরা বলছি ‘সবার জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্য’। আগে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ বললে বোঝা যেত দেশের মোটামুটি সব জায়গায় হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বানালেই হয়ে গেল। এখন কিন্তু আমাদের ‘মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্য’ বলতে হচ্ছে। 

‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ বলতে যে আকাঙ্ক্ষার কথা আমরা বলে এসেছি, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে দিনবদলের কারণে আকাঙ্ক্ষাটাকেও এখন আমাদের নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। এরইমধ্যে করোনাভাইরাসের হানা বুঝিয়ে দিয়েছে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে। করোনায় আক্রান্তরা নির্ধারিত হাসপাতালে তেমন চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না, তেমনিভাবে হাসপাতালগুলোতে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে যেসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক রোগীতে ঠাসা থাকত, সেগুলো এখন প্রায় রোগীশূন্য। 

কিছুদিন আগে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব কিডনি জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাজধানীর অন্তত ৯টি হাসপাতাল ঘোরার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি সেখানে মারা যান। শুধু ওই সচিবই নন, অনেকের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটছে। এমনকি চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটার ঘবর এসেছে গণমাধ্যমে। ফলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী তা সহজেই অনুমেয়। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর (১৭ জুন) একটি সংবাদচিত্রে দেখা গেছে, নরসিংদী থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ঢাকায় আসা শিমুল বিশ্বাস অপেক্ষা করতে করতে হাসপাতালের বেঞ্চেই কাত হয়ে পড়ে যান। দেখা যাচ্ছে, একদিকে রোগীরা যেমন চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ডায়াগনসিসও করা যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় চিকিৎসাসেবার বর্তমান অবস্থায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সবাই। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেয়ার কারণে। বস্তুত করোনা সংকট দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার চিত্রটিই যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কী করণীয়, তা দেশের নীতি নির্ধারকদেরই স্থির করতে হবে। 

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে করোনার জাল সার্টিফিকেটের জমজমাট ব্যবসা চলছে। গত এক সপ্তাহে করোনার সার্টিফিকেট জাল করে এরকম কয়েকটি চক্রের সদস্যদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে জাল সার্টিফিকেটও উদ্ধার করা হয়েছে। এই চক্রগুলো করোনা নেগেটিভ এবং পজেটিভ দুই ধরনের জাল সার্টিফিকেটই তৈরি করছে চাহিদা অনুযায়ী। তবে নেগেটিভ সার্টিফিকেটের চাহিদা বেশি বলে জানা যায়। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ চিকিৎসার জন্যও হাসপাতালে রোগী ভর্তি হতে গেলেই করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট ছাড়া রোগী ভর্তি করছে না সংশ্লিষ্টরা। এর বাইরে কর্মস্থল, পোশাক কারখানা এবং ভ্রমণের জন্য করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়েছে। অথচ সাধারণভাবে করোনা টেস্ট সময়সাপেক্ষ এবং উপসর্গ ছাড়া পরীক্ষা করানো অত্যন্ত কঠিন। এই সুযোগে প্রতারক চক্র বিভিন্ন হাসপাতাল, করোনা টেস্টিং সেন্টারের সিল, চিকিৎসকের নাম, সাক্ষর এবং করোনা সার্টিফিকেটের স্টাইল জাল করে ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। এরা শুধু নেগেটিভ নয়, পজেটিভ সার্টিফিকেটও বিক্রি করছে। পজেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে কেউ কেউ আবার অফিসে না গিয়ে বাসায় ছুটি কাটানোসহ নানা সরকারি সুবিধা নিচ্ছেন৷ভাবতে অবাক লাগে, ভয়াবহ এই করোনা সংকটকালে এসব সার্টিফিকেট পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকাসহ জেলা শহরের হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে এই চক্র সবচেয়ে বেশি তৎপর৷ পোশাক কারখানা এলাকায়ও তাদের তৎপরতা রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যে সামনে এসেছে। 

সম্প্রতি র‌্যাব-৩ এর সদস্যদের হাতে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে করোনা জাল সার্টিফিকেট চক্রের চার সদস্যকে আটক করে। তাদের কাছ থেকে করোনার বেশ কিছু জাল সার্টিফিকেট, দুটি কম্পিউটার, দুটি প্রিন্টার ও দুটি স্ক্যানার উদ্ধার করা হয়। চক্রটি এরইমধ্যে করোনার দুই শতাধিক জাল সার্টিফিকেট বিক্রির কথা স্বীকার করেছে। র‌্যাবের তথ্য মতে, এই ধরনের চক্র শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরেও তৎপর বলে জানান তিনি৷ এর আগে বিমানবন্দরে জাপান যাওয়ার পথে এক বাংলাদেশি যাত্রী করোনার ভুয়া নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে ধরা পড়েন৷ এতে নিঃসন্দেহে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে৷ উদ্বেগের বিষয় যে, এভাবে দেশের অভ্যন্তরে এই ধরনের জল সার্টিফিকেটধারীরা দিব্যি কাজ করছেন কিংবা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে করে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা বহুলাংশে বাড়ছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার, দেশে করোনার প্রাথমিক পর্যায়ে মার্চ মাসের দিকে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের কাছে বিমানবন্দরে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগ ছিলো। জাল নয়, টাকার বিনিময়ে আসল সার্টিফিকেট বিক্রিরই অভিযোগ ওঠে তখন৷ যাত্রীরা বাধ্যতামূলক কোয়ারিন্টিন এড়াতে বিমানবন্দরে দায়িত্বরত অসাধু কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে এই সার্টিাফিকেট নিতেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। 
বলা অসঙ্গত হয় না যে, নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও অনেক চিকিৎসক করোনা রোগীর সেবা দিয়ে চলেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বত্র করোনা আতঙ্ক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু করোনার এই ভয়াবহ সংকটকালে ওষুধ ও সুরক্ষা সামগ্রী মজুদ করে, পণ্যের দাম বাড়িয়ে, ত্রাণ আত্মসাৎ করে, নকল সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করে, করোনার নকল সার্টিফিকেটের ব্যবসা করে যারা দেশ ও সরকারের সুনাম ক্ষুন্ন করতে চায় তাদের কঠোর সাজা নিশ্চিত করা জরুরি। করোনা সংকট মোকাবিলায়, সরকারের পাশাপাশি আইনপ্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্য এবং চিকিৎসকেরা উদারতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। সুতরাং কতিপয় স্বার্থান্বেষী এবং অসাধু গোষ্ঠী যাতে জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে না পারে তার জন্য রাষ্ট্রকেই যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর