Alexa কম খরচে সিকিম ভ্রমণের বিস্তারিত

বিদেশে ঈদ ভ্রমণ-১

কম খরচে সিকিম ভ্রমণের বিস্তারিত

সজল জাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:২৪ ২০ মে ২০১৯   আপডেট: ১৫:২৮ ২০ মে ২০১৯

সিকিমে ধবধবে তুষার ঢাকা পাহাড়

সিকিমে ধবধবে তুষার ঢাকা পাহাড়

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিম এর রাজধানী গ্যাংটক। হিমালয় পর্বতশ্রেণির শিবালিক পর্বতে প্রায় ১৪০০মিটার উচ্চতায় এই গ্যাংটকের অবস্থান। সৌন্দর্যের জন্য একে ‌‘পূর্বের সুইজারল্যান্ড’ বলা হয়। সত্যজিৎ রায় রচিত উপন্যাস ‘গ্যাংটকে গন্ডগোল’ পড়ে জায়গাটির প্রতি আমার অন্যরকম এক আকর্ষণ জন্ম নেয়। তাছাড়াও কিছুটা হলেও ইউরোপের ছোঁয়া নেওয়ার জন্য সিক্কিম ভ্রমণ বৃথা যাবে না।

আমাদের যাত্রা শুরু হল ঢাকা থেকে। সেই ট্রেন শহর-নদী-দূরের সবুজ ফসলি খেত পেরিয়ে সকাল নয়টায় পৌঁছায় পঞ্চগড়। স্টেশন থেকে নেমেই পথ ধরি বাংলাবান্ধার। সীমান্ত পর্যন্ত এই পথটুকু অদ্ভুত সুন্দর, উত্তরবঙ্গের মানুষের মতোই যেন সরল। বাংলাবান্ধা সীমান্তে অভিবাসনের আনুষ্ঠানিকতায় এসে হলো ভয়াবহ তিক্ত অভিজ্ঞতা। সে মন খারাপ করা অভিজ্ঞতার রেশ মনে চেপেই পা রাখি ভারতের মাটিতে।

গন্তব্য বরফের রাজ্য সিকিম। সেখানে যেতে হলে শিলিগুড়ির সিকিম হাউস অথবা সিকিমের সীমান্ত রাংপো থেকে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হয়। সে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেতেই আমাদের পাঁচজনের দলটা আটজনে রূপ নিল (খরচ বিবেচনায় সিকিম ঘোরার জন্য আটজনের দল হচ্ছে ‘উৎকৃষ্ট’)। একসময় দলেবলে বুনো ফুল ফোটা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢুকলাম বরফ দেশের সীমান্তে। ছয় ঘণ্টার যাত্রা শেষে সামনে হাতছানি দিল রূপকথার রাজ্য—গ্যাংটক।

গ্যাংটকে পর্যটকদের ব্যস্ততা

গ্যাংটকে রাত ৯ টা বাজতে বাজতেই প্রায় সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং তার আগেই সবকিছু শেষ করার চেষ্টা করবেন। কেউ যদি প্যাকেজে ঘোরার কথা ভাবেন তাহলে অবশ্যই খাবার ও হোটেলের বিষয়ে জেনে নেবেন। কারণ অনেকসময় লাচুং-এ কাঠের তৈরি হোটেলে রাখে। বরফ রাজ্যে কাঠের হোটেলে থাকা অনেক কষ্টকর তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! আর এমজি মার্গ থেকে নর্থ সিকিমের গাড়ি যেখান থেকে ছাড়ে ওখানে যেতে কিন্তু ট্যাক্সি ভাড়া ১৫০ রুপি লাগে। তাদের বলে রাখবেন, তারা যেন ট্যাক্সি ভাড়া করে ওখানে নিয়ে যায়। তাহলে আর অতিরিক্ত ১৫০ রুপি গুনতে হবে না। আমাদের প্যাকেজে ছিল বুফে ২ বেলা লাঞ্চ, ১ বেলা ডিনার ও ব্রেকফাস্ট। ওইদিনের মতো কাজ শেষ করে জান্নাত হোটেল থেকে বিরিয়ানি খেয়ে হোটেলে এসে তাড়াতাড়ি ঘুম দিলাম। কারণ পরদিন সকাল ৯টা ৩০ মিনিটেই নর্থ সিকিম যাত্রা শুরু করতে হবে।

পরদিন সকাল ৯ টায় ঘুম থেকে উঠে হোটেল চেক আউট করে বের হই। ব্যাগ হোটেলেই রেখে এসেছিলাম, বলেছিলাম নর্থ সিকিম থেকে ফিরে এসে এই হোটেলেই উঠবো। হোটেলের সামনের এক রেস্টুরেন্ট থেকে সকালের নাস্তা করে নেই। তারপর এমজি মার্গে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পর নর্থ সিকিমের গাড়িতে উঠে পড়ি। আমাদের ম্যাক্স গাড়ি দিয়েছিল, তাতে সবাই খুবই আরামে বসতে পেরেছিলাম। ১০ টার দিকে গাড়ি ছাড়ার কথা থাকলেও ছাড়তে ছাড়তে ১১ টা বেজে গিয়েছিল প্রায়। গ্যাংটক থেকে লাচুং এর দূরত্ব প্রায় ১১০ কিমি, সম্পূর্ণ পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা। ৫ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে যেতে। যাওয়ার সময় মনে হবে একবার উপরে উঠছি আরেকবার মনে হবে নিচে নামছি।

সিকিমের আবহাওয়া কিছুক্ষণ পর পর পরিবর্তন হয়। এই বৃষ্টি তো এই রোদ! আবার মেঘে ঢাকা! পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পাহাড়ের যে রূপ দেখেছিলাম তা আসলে বলে বোঝানো সম্ভব না। মাঝেমধ্যে তো এমনও মনে হচ্ছিল মেঘ বোধহয় হাতের মুঠোতে চলে আসবে। যাওয়ার সময় তিস্তা নদী সামনে পড়ে, এতটা স্বচ্ছ নীল পানি আমি আগে কখনো দেখিনি। বড় বড় ২ টা অসাধারণ সুন্দর ঝরনাও সামনে পড়বে। দেখলেই বোঝা যায় যে বৃষ্টি হওয়াতে ঝরনাগুলো তাদের যৌবন ফিরে পেয়েছে। পাহাড়গুলা মেঘে ঢাকা ছিল দেখে তখনো আমরা বরফের দেখা পাইনি, অধীর আগ্রহে ছিলাম যে কখন বরফের দেখা মিলবে। রাস্তার মধ্যে ড্রাইভার অলরেডি কয়েকবার প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছেন যে ‘কাটাও’ নামক একটা জায়গা আছে, ওখানে প্রচুর বরফ আছে। কাটাও কিন্তু প্যাকেজে নেই, এটার জন্য এক্সট্রা চার্জ দিতে হবে। ভুলেও তাদের কথা শুনে কাটাও যাবেন না।

পাখির চোখে সিকিম

উপরের দিকে উঠতে উঠতে হঠাৎ করে দূরের পাহাড়ে বরফের সন্ধান পেলাম। যত উপরের দিকে উঠছি শীতের পরিমাণ তত বাড়ছে। অবশেষে সন্ধ্যা ৬ টার দিকে আমরা লাচুং এসেছিলাম। আমাদের নিয়ে গিয়েছিল ‘হোটেল ভিক্টোরিয়া’তে। খুব সুন্দর হোটেল। ৮ জনের জন্য ৩ টা রুম দিয়েছিল, প্রতি রুমে ৩ টা করে সিঙ্গেল বেড ছিল।কয়েকটা পোস্ট পড়েছিলাম যে লাচুং এর হোটেলে বিদ্যুৎ থাকেনা, কিন্তু আমাদের তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। রাত ৮ টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম, কারণ পরদিন সকাল ৬ টার মধ্যে বের হতে হবে।

সাড়ে ৫ টায় ঘুম থেকে উঠার পর রিমন ভাই ডেকে বললো, বরফ দেখা যাচ্ছে! আমি ভাবলাম হয়তো ফাজলামি করছে, পরে বাইরে গিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল আমার! দেখি যে হোটেলের পাশের পাহাড় বরফে ঢেকে আছে, আর সকালের সূর্যের আলোতে ‌‘চিকচিক’ করছে। ৬ টার দিকে প্যাকেজের নাস্তা (ম্যাগী নুডুলস আর চা) খেয়ে হোলেটের নিচ থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে গামবুট ভাড়া নিয়ে ইয়ামথাং এর উদ্দেশ্যে রওনা দেই। বরফে হাঁটতে হলে অবশ্যই গামবুট ভাড়া নিতেই হবে।

আমাদের সামনে সাদা বরফের পাহাড়। রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে টুক করে নেমে গেলাম সবাই। স্তব্ধ হয়ে মুহূর্তের পর মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল প্রত্যেকে। চালক রাজুদা একসময় নেমে এসে বললেন, ‘একটা ছবি?’ হাসলাম! এখানে সবকিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ফ্রেশ। লাচুং থেকে ইয়ামথাং ভ্যালিতে যাওয়ার সময় সমস্ত প্লাস্টিকের বোতল রেখে যেতে হবে, না হলে ধরা পড়লে ৫০০ রুপি জরিমানা! লাচুং থেকে ইয়ামথাং ভ্যালির দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার।

চকচকে সূর্য ও ধবধবে পাহাড়

মনে হচ্ছিল পৃথিবীর বাইরে অন্যকোথাও চলে এসেছি। আল্লাহর সৃষ্টি এত সুন্দর হতে পারে, না দেখলে বোঝা সম্ভব না। পাহাড়গুলোর দিকে যতবারই তাকই ততবারই নতুন মনে হয়। চারপাশে যত দূর চোখ যায় ধবধবে তুষার ঢাকা মাঠ, পাহাড়ের গা বেয়ে বরফ জমে তৈরি হয়েছে বরফের উপত্যকা। হোটেল থেকে ৫০ রুপি ভাড়া দিয়ে বরফে হাঁটার জন্য গাম বুট নিয়ে এসেছিলাম, সেগুলো কোথায় কাজে লাগাব এতক্ষণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না, এবার মোক্ষম সুযোগ এল।

বরফ ছুড়ে খেলতে খেলতেই আমাদের টনক নড়ল ঘড়ির কাঁটা দেখে। বেলা ১২টা। সূর্য একটু হেলে যেতেই কনকনে ঠান্ডা জেঁকে বসেছে। মুহূর্তেই হাত–পা অবশ হয়ে যাওয়ার জো। মেঘ এসে আড়াল করে দিল সবাইকে, কেউ কাউকে দেখছি না। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল দুপুরের পর বরফের এলাকাটা সরাসরি ডেথ জোনে রূপ নেয়, তাপমাত্রা প্রতি সেকেন্ডে হিড়হিড় করে কমতে থাকে। সবাইকে এক করে কোনোমতে বরফের ওপর দিয়েই পড়িমরি করে দৌড় শুরু করলাম। দৌড়াতে দৌড়াতেই দেখলাম, বরফের মধ্যেই ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে ছুটে এসেছেন। ধুপধাপ ভেতরে ঢুকেই জানালা–দরজা বন্ধ করে ঠকঠক করে কাঁপা শুরু করলাম। চোখের সামনে প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় সৃষ্টি মেঘে মেঘে ঘোলা হয়ে গেল।

আবারো হোটেলে গেলাম। এখান থেকে ব্যাগ গুছিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে করে ১টার দিকে আবার গ্যাংটক এর উদ্দ্যেশ্য রওনা হলাম। যাওয়ার সময় পাহাড়ের অন্য রূপ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ৬টা ৩০মিনিটের দিকে গ্যাংটকে পৌঁছে গেলাম। গ্রুপের ৫ জন শিলিগুড়ির গাড়িতে উঠলো আর আমরা ৪ জন ৩০০ টাকা দিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে ‘হোটেল মেরিগোল্ড’ এ চলে আসলাম। হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে সাঙ্গু লেকের প্যাকেজ নেয়ার জন্য এজেন্সি তে গেলাম। প্যাকেজ নিয়েছিলাম ৩৫০০ টাকা দিয়ে। সে গল্প হবে আরেকদিন!

যেন সাদাগালিচা!

নির্দেশনা

সিকিম যেতে হলে ভারতের শিলিগুড়ি হয়ে রাংপো সীমান্তে অনুমতি নিতে হয়, নর্থ সিকিম এবং ইস্ট সিকিমে অনুমতি ছাড়া বেড়ানো যাবে না। এ জন্য দরকার এক কপি ছবি, ভিসা এবং পাসপোর্টের ফটোকপি। এখানে ট্যুর অপারেটর ছাড়া অনুমতি দেয়া হয় না। কাজেই গ্যাংটক পৌঁছে বিভিন্ন ট্যুর কোম্পানি যাচাই করে ভালো একটা প্যাকেজ নিয়ে নিন। তারাই আপনাকে বলে দেবে ঘোরার জায়গা। আটজনের দল হলে সব মিলিয়ে সিকিম ভ্রমণে বাংলাদেশি টাকায় জনপ্রতি প্রায় ১০ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে

Best Electronics
Best Electronics