Alexa কবি, কবিতা ও ইসলাম

কবি, কবিতা ও ইসলাম

পর্ব- ১

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১২ ১৮ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৯:১৯ ১৮ নভেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

মানবতার ধর্ম ইসলাম। সর্বাধুনিক ধর্ম ইসলাম। সৃষ্টিশীলতা বিনোদনপ্রিয়তা মানুষ্যবোধের ধর্ম ইলসাম। ইসলাম সর্বকালে সর্বস্থানে সাদরিত হয়েছে তার স্বকীয়তা বজায় রেখে। 

কিসরার রাজপ্রসাদে, বাইতুল মুকাদ্দাসে, খ্রিষ্টান পুরোহিতদের সামনে। কাবাঘরে যেমনিভাবে ইসলাম স্বকীয়তা বজায় রাখে, তেমনি করে বজায় রাখে কট্টরকাফের ও প্রভাবশালী গির্জাতেও। ইসলাম পৃথিবীকে সুন্দর দেখতে চায়, আনন্দঘন দেখতে চায়, দেখতে চায় সুস্থ নিরাপত্তার সঙ্গে। তাই, ইসলাম সুন্দর প্রোজ্জ্বল বিবেক ও সভ্যতা সম্পন্ন কোনো কাজকে কখনো নিষেধ করেনি।

ইসলামের মূল দর্শন এখানেই ইসলাম আসার আগে যেসব কাজ মানুষের মাঝে প্রচলিত ছিল ওই কাজের ক্ষেত্রে উদারনীতি অবলম্বন করেছে ওই কাজটি যদি মানুষের জন্য ভালো ও সুন্দর হতো তাকে বহাল রাখতো; অন্যথায় তাকে নিষেধ করতো। যেমন ধরুন- ইসলাম আসার আগে ব্যবসাও ছিল, সুদ কারবারিও ছিল। ইসলাম এসে সুদকে হারাম করলো আর ব্যবসাকে উৎসাহিত করলো। এভাবে ইসলাম আসার আগে যিনাও ছিল, বিবাহও ছিল। ইসলাম এসে বিবাহকে বহাল রেখে যিনাকে জীবনের তরে হারাম ঘোষণা করলো। ইসলাম এমন ধর্ম নয় যে, আগেকার সমস্ত রীতিনীতি নিষেধ করে দেবে।

সাহিত্যের অন্যতম মূলধারা হলো কবিতা। কবিতার ওপর ভর করেই মূলত সাহিত্যের পথচলা। সাহিত্য বলতে একসময় মানুষ কবিতা ছড়া ছন্দকেই বুঝতো। পরে আস্তে আস্তে প্রবন্ধ নিবন্ধ, প্রতিবেদন, চিঠি যুক্ত হয়েছে, তারপর আরো কী যুক্ত হয়েছে তার হিসেব নেই। সাহিত্যের মূলপাঠ হিসেবে এখনো কবিতা সাদরিত ও গ্রহণীয়। কবিতার স্বাতন্ত্র্য আবেদন অন্য কোনোভাবে মিটানো যায় না। ইসলাম আসার আগে আরবের বুকে কবিতার বেশ চর্চা ছিল। বেশ বলতে শুধু চর্চাই না ছিল না, বরং কবিতাকেই মনে করা হতো গৌরব ও বড়ত্বের প্রতীক। তাদের গৌরব ও অহঙ্কারের প্রধানতম হাতিয়ার ছিল কবি ও কবিতা।

এখন প্রশ্ন হলো ইসলাম আসার পর কি সেই কবিতার আবেদন কোনো অংশে কমে গেছে না ইসলাম কবিতাকে নাজায়েজ ফতোয়া দিয়েছে? এর কোনটাই না। ইসলাম আসার কারণে কবিতার আবেদন ফুরায়নি এবং ইসলামও কবিতাকে নাজায়েজ ফতোয়া দেয়নি বরং ইসলাম কখনো কখনো কবিকে উৎসাহিত করেছে আর কবিতাকে শক্ত গলায় পাঠ করেছে। তবে হ্যাঁ, কবিতার নামে যদি নগ্নতা, বেহায়পনা বা অশ্লীলতা পাঠ দেয়; ইসলাম সেই কবিতাকেই শুধু নিষেধ করেনি, সমাজ থেকে চিরতরে মুছে ফেলার আদেশও দিয়েছে। কবিতার নামে যদি তাওহিদবাদ আঘাত করা হয়, কবিতার নামে যদি একাত্ববোধকে কলঙ্কিত করা হয়; তখন কবি কবিতাকে উপড়ে ফেলার হুকুম দিয়েছে ইসলাম। মোটকথা ইসলাম চায় না কবিতার নামে কেউ নগ্নতা ছড়াক, কবিতার নামে কেউ একাত্ববোধকে নষ্ট করুক।

হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাক জবানে যে কবিতা আবৃত্তি হয়েছে, সেই কবিতার গল্প শুনবো এখন। সে কথা আমাদেরকে জানাচ্ছেন ইমাম বুখারি রহ.। হজরত বারা বিন আযিব রাযি. হতে বর্ণিত আছে- ‘আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খন্দকের মাটি বহনরত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছি। এ মাটি বহন করার কারণে তাঁর দেহ মুবারক ধূলি ধূসরিত হয়ে উঠেছিল। এ অবস্থায় তাঁকে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার কবিতার নিম্মোক্ত চরণগুলো আবৃত্তি করতে শুনেছিলাম:
اللَّهُمَّ لَوْلَا أَنْتَ مَا اهْتَدَيْنَا - وَلَا تَصَدَّقْنَا وَلَا صَلَّيْنَا
فأنزلن سكينـة علينـا   ** وَثَبِّتْ الْأَقْدَامَ إِنْ لَاقَيْنَا
إن الألى رغبوا علينـا  ** وإن أرادوا فتـنـة أبينـــا

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি যদি আমাদের অনুগ্রহ না করতেন; আমরা হেদায়াতপ্রাপ্ত হতাম না,
আমরা দান খয়রাত করতাম না এবং সলাত আদায় করতাম না।
অতএব, আমাদের প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন এবং কাফিরদের সঙ্গে যদি আমাদের মোকাবিলা হয় তাহলে আমাদেরকে ধৈর্য দান করিয়েন। তারা আমাদের বিরুদ্ধে লোকদের প্ররোচিত করেছে, যদি তারা ফেৎনা সৃষ্টি করতে চায় তাহলে আমরা কখনই মাথা নত করব না।
(বুখারি : হাদিস নম্বর: ২৮৭০, ৩৮৮০, ৩৯৬০ মুসলিম : হাদিস নম্বর: ৪৭৬৯, নাসায়ী : হাদিস নম্বর: ৮২৪৮, ৮২৫১)।

হজরত বারা বিন আযিব রাযি. বলেছেন, ‘শেষের শব্দগুলো সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক টান দিয়ে উচ্চারণ করছিলেন, অন্য একটি বর্ণনায় কবিতাটির শেষাংশ ছিল নিম্নরূপ :
إن الألى قـد بغـوا علينـا ** وإن أرادوا فـتنـة أبينـا

অর্থ : তারা আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে এবং তারা যদি আমাদেরকে ফেৎনায় নিক্ষেপ করতে চায়, আমরা কখনোই মাথা নত করে তা মেনে নেবো না।’

কবিতার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা কী? কবিতার মধ্যে নগ্নতা বেহায়াপনা বা তাওহিদ বিশ্বাসকে আঘাত জাতীয় কিছু না থাকে তাহলে সেই কবিতা লেখা জায়েজ। এর বিপরীত হলে জায়েজ নেই। কবিতার ব্যাপারে হাদিসে বেশ কিছু নির্দেশনা দেখা যায়, যার দ্বারা আমরা বুঝতে পারি কবিতা জায়েজ নাকী নাজায়েজ। হাদিস থেকেই আমরা সেই কথা জানি-
روى البخاري في الأدب والدارقطني عن ابن عمر عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال : الشعر بمنزلة الكلام: حسنه كحسن الكلام، وقبيحه كقبيح الكلام

অর্থ: হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর রাযি. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন কবিতাও কথারই মতো (কথার মিষ্টিতা ও আকর্ষণের দিক দিয়ে)। রুচিসম্মত কবিতা উত্তম কথাতুল্য এবং কুরুচিপূর্ণ কবিতা কুরুচিপূর্ণ কথাতুল্য।

উল্লিখিত হাদিস দ্বারা আমরা জানতে পারলাম, কবিতার হুকুম সাধারণ কথার মতোই। উত্তম কথার মতো উত্তম কবিতাও ইসলামে উত্তম বলে গণ্য হয়। আর নাজায়েজ জিনিসে পূর্ণ কবিতা ইসলামে নাজায়েজ বলে গণ্য হয়। কবিতায় নাজায়েজ থাকলে তার গ্রহণীয় নয়, রবং সেই কবিতার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে হাদিসে। এরকম একটি হাদিস

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم  لأَنْ يَمْتَلِئَ جَوْفُ الرَّجُلِ قَيْحًا يَرِيهِ خَيْرٌ مِنْ أَنْ يَمْتَلِئَ شِعْرًا

অর্থ : হজরত আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো ব্যক্তি কবিতা দিয়ে পেট ভর্তি করার চেয়ে পুঁজ দিয়ে পেট ভর্তি করা অনেক উত্তম। (মুসলিম : হাদিস নম্বর: ৬০৩০, মুসনাদ আহমদ : হাদিস নম্বর: ৭৮৭৪) 

এরকম আরেকটি হাদিস শুনি। যে হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবিতার কুৎসা করেছেন।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ‏:‏ إِنَّ أَعْظَمَ النَّاسِ جُرْمًا إِنْسَانٌ شَاعِرٌ يَهْجُو الْقَبِيلَةَ مِنْ أَسْرِهَا، وَرَجُلٌ انْتَفَى مِنْ أَبِيهِ

অর্থ : আম্মাজান হজরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী করিম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন মানুষের মধ্যে মারাত্মক অপরাধী হলো সেই কবি যে সমগ্র গোত্রের নিন্দা করে এবং যে ব্যক্তি নিজ পিতাকে অস্বীকার করে।

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ‏:‏ إِنَّ أَعْظَمَ النَّاسِ جُرْمًا إِنْسَانٌ شَاعِرٌ يَهْجُو الْقَبِيلَةَ مِنْ أَسْرِهَا، وَرَجُلٌ انْتَفَى مِنْ أَبِيهِ

অর্থ : আম্মাজান হজরত আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  মানুষের মধ্যে মারাত্মক অপরাধী হলো সেই কবি যে সমগ্র গোত্রের নিন্দা করে এবং যে ব্যক্তি নিজ পিতাকে অস্বীকার করে।

উপরোক্ত হাদিসগুলো দ্বারা আমরা বুঝলাম। কবিতার মধ্যে মন্দ বিষয় থাকায় কবিতাকে খারাপ বলেছেন। আর কবিতার মধ্যে ভালো বিষয় থাকলে তাকে ভালো বলেছেন।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ أَعْرَابِيًّا جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَكَلَّمَ بِكَلَامٍ بَيِّنٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ مِنْ الْبَيَانِ سِحْرًا وَإِنَّ مِنْ الشِّعْرِ حُكْمًا

অর্থ: হজরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি বা এক বেদুইন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় ভাষায় কথাবার্তা বললো। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে, কথায়ও যাদুকরী প্রভাব থাকে এবং কবিতাও প্রজ্ঞাপূর্ণ হতে পারে। (তিরমিযি : হাদিস নম্বর ২০২৮, মুসনাদে আহমদ : হাদিস নম্বর ২৭৬১, ৩০২৬, আবু দাউদ : হাদিস নম্বর ৫০১২)।

হাদিসের একটি ঘটনা বলি! শারিদ ইবনে সালামি রাযি. বলেন আমি একদিন রাসূলুল্লাহ এর সঙ্গে সফরে ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেন,
هل معك من شعر أمية بن أبي الصلت شيء؟)
: তোমার কাছে কী কবি উমাইয়া ইবনে আবিস সালত এর কোনো কবিতা আছে?
: জি হুজুর, আছে।
: আমাকে শুনাও!
আমি কিছু কবিতা শুনালাম। তিনি বলেন, আরো শুনাও! আমি তাকে আরো কিছু কবিতা শুনালাম। তিনি বলেন, আরো শুনাও। এভাবে আমি তাকে উমাইয়া ইবনে আবিস সালত এর প্রায় একশটি কবিতা শুনালাম।

প্রিয় পাঠক! উমাইয়া ইবনে আবিস সালত কে, জানেন? তিনি হলেন জাহেলি যুগের একজন কবি। কিন্তু তার কবিতায় উত্তম কথামালা থাকায় এবং অশ্লীল বেহায়াপনা ও ঈমান বিনষ্ট কোনো উপাদান না থাকায় স্বয়ং রাসূল (সা.) তাঁর কবিতা বেশ সময় নিয়ে শুনেছেন। এবং শারিদ ইবনে সালামে তার কবিতা মুখস্থ রাখার কারণে রাসূল তাকে কোনো কথা বলেননি। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে