Alexa কঠোরতায় ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

কঠোরতায় ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

প্রকাশিত: ১৫:০২ ৯ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৯:৩৫ ৯ জুলাই ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

দিন দুয়েক আগে বাংলাদেশের এক টেলিভিশন টক শো’র নামী কথকের ফোন পেয়ে চমকে গেলাম। ধর্ষণের ওপরে বেশ কিছু তথ্য চাইলেন। আমার পড়াশোনা নৃতত্ত্ব নিয়ে। নৃতাত্ত্বিক তথ্য কখনোই জনপ্রিয় নয়। 

নৃবিজ্ঞানের মতে– ধর্ষণ ছিল, আছে ও থাকবে। একে নির্মূল করা সম্ভব নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয় কারণ এর উৎস সম্ভবত জিনগত। এখনো প্রমাণিত হয়নি। তবে এ নিয়ে বহু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হয়েছে।  মতামত এসেছে এবং পরীক্ষা চলছে। কিন্তু মানুষের মনে এর কার্যকারণ ও বিহিত সম্পর্কে অনেক রকম ধারণা আছে যা পরস্পরবিরোধী। তা নিয়ে বিতর্ক হয়। কেউ কেউ ভাবেন– এই আলোচনায় লাভ কী? কিন্তু ধর্ষণ নিয়ে টেলিভিশনে যে আলোচনা হয় বা সংবাদপত্রে যে লম্বা  নিবন্ধ রচিত হয় তা সার্থক হয় তখনই যখন এই বিষয়ে একটি স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট জনমত গঠিত হয় এবং রাষ্ট্র নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়।

প্রাণিজগতে মানুষের মত ধর্ষণ প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে বিভিন্ন গবেষণায়। হাঁস, মুরগি, ডলফিন, শিম্পাঞ্জি, ওরাং, ওটাংদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা প্রমাণিত। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ধর্ষণ একটি বিপথগামিতা বা মতিভ্রম হিসেবে দেখা হয়। পূর্বে ধারণা ছিল যে অতিরিক্ত মাত্রায় যৌনকামনায় ভোগা পুরুষ একজন অরক্ষিত নারীকে সামনে পেলে সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না এবং ধর্ষণ করে। কিন্তু কেন তার এই প্রবণতা? ১৮৮৬ সালে রিচার্ড ভন ক্রাফট-এবিং তার ‘সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস’ বইয়ে যৌনাঙ্গের অতিরিক্ত উত্তেজিত থাকা এবং মানসিক দুর্বলতাকে পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্য দায়ী করেন। জার্মান মনোবিশ্লেষক কারেন হর্নি ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘দ্যা প্রবলেম অব ফেমিনিন মাসোচিজম’ গ্রন্থে বলেন, নারীদের যৌনতা স্বভাবগতভাবেই এক ধরনের আত্ননিগ্রহের যৌনতা। বয়ঃসন্ধিকালের যৌন আকাঙ্ক্ষা শুরু হয় পিতাকে কেন্দ্র করে। ১৯৬০ সালে ‘দ্যা সাইকোলজি অফ ক্রাইম’ বইয়ে বলেন যে, একজন ধর্ষক তৈরি হয় তার মাকে দেখে। যিনি একই সঙ্গে সম্মোহনকারী কিন্তু ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, এভাবে পুরুষ তাড়িত হয়। এই ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে প্রথম বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন বিখ্যাত আমেরিকান নারীবাদী লেখিকা সুসান ব্রাউনমিলার। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘এগেইনস্ট আওয়ার উইল: ম্যান, উইমেন এন্ড রেপ’ বইতে তিনি বলেন, ধর্ষণ সচেতনভাবেই এক ধরনের আতংক ছড়িয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে পুরুষরা নারীদেরকে এক ধরনের ভয়ের ভিতরে রাখতে চায়। 

মার্কিন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নিকোলাস গ্রোথ ম্যাসাচুসেটস কারাগারে বন্দি কয়েকশ ধর্ষকের উপর গবেষণা করে এর উপর ভিত্তি করে তিনি ১৯৭৯ সালে ‘ম্যান হু রেপ’ লেখেন। সেখানে বলেন যে ধর্ষণের উদ্দেশ্য হতে পারে- স্যাডিজম (অন্যকে জোর পূর্বক ধর্ষণের মাধ্যমে যৌনসুখ লাভের মানসিক বিকার) এবং ক্রোধ এবং ক্ষমতা লাভের ইচ্ছা। তিনি বলেন যে মানসিকভাবে সুস্থ কোনো পুরুষ ধর্ষণ করতে পারে না এবং ধর্ষণ একটি যৌনতার ছদ্মবেশ যার মাধ্যমে আসলে ক্ষমতা এবং ক্রোধই নিজেকে পরিচালিত করে। আমেরিকান লেখক ডায়ানা স্কালি ১৯৯০ সালে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স’ নামে একটি বইয়ে বলেন যে ধর্ষকরা নিজেদের কৃতকর্মকে একটি সাধারণ প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। ধর্ষকদের মানসিকতা এইরকম যে যদি আপনি কাউকে কাছে পেতে চান এবং সে রাজি না হয়, তাহলে আপনাকে অবশ্যই বল প্রয়োগ করতে হবে।

এতদিন অবধি যা গবেষণালব্ধ তত্ত্ব এসেছে তা মানুষের মনোজগতের ওপরে ভিত্তি করে। কিন্তু জীববিজ্ঞানী র‍্যানডি থর্নহিল এবং নৃতাত্ত্বিক ক্রেইগ টি. পালমার ২০০০ সালে ‘এ ন্যাচারাল হিস্টোরি অব রেপ: বায়োলজিকাল বেজেস অব সেক্সুয়াল কোয়েরশন’ বইয়ে বললেন "মানব ধর্ষণ একটি বিকল্প জিন উন্নয়ন কৌশল (gene-promotion strategy) প্রজননগত সাফল্য অর্জন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। ২০০২ সালে নৃতত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড এইচ. হাগেন তার ইভোল্যুশনারি সাইকোলজি এফএকিউ-তে বলেন, ধর্ষণের অভিযোজ্যতা (adaptivity) থাকা সম্ভব যা জিনগত। এই তত্ত্বসমূহের সমালোচনা পরবর্তীকালে হ্যামিলটন (২০০৮) ও ভ্যানডারমাসেন (২০১০) করলেও এই কার্যের সঙ্গে জিনগত সংযোগের সম্ভাবনা মেনে নিয়েছেন। অতএব এখন বিজ্ঞান গবেষণার অভিমুখ ‘জিনতত্ত্ব’ বা জেনেটিক্সের দিকে। কাজেই যতদিন জিন মানচিত্র নির্মাণ, দায়ী জিন নির্ধারণ ও জিন সংশোধন না হচ্ছে ততদিন ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ কাজ। শাস্তি দিয়ে বা সামাজিক তর্জনী তুলে একে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও সম্পূর্ণ সম্ভব নয়। কিন্তু এখানে একটা কথা আছে। কথাটা কী, দেখা যাক।

সমীক্ষায় প্রকাশ ধর্ষণের ক্ষেত্রে ১ নম্বরে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ দেশে ছয় জন নারীর মধ্যে এক জন ধর্ষণের শিকার। এই দেশে ১৪ বছর বয়স থেকেই ধর্ষণের মত অপরাধের প্রবণতা তৈরি হয় শিশু মনে। দক্ষিণ আফ্রিকা গোটা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়। এই দেশে ধর্ষণের শাস্তি মাত্র দুই বছরের জেল। তৃতীয় স্থনে আছে সুইডেন। চার নম্বরে আছে ভারত। প্রতি ২২ মিনিটে ভারতে একটি করে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয়। পাঁচ নম্বরে ব্রিটেন। দেশটিতে চার লাখ মানুষ প্রতিবছর ধর্ষণের মত ঘটনার শিকার হন এদেশে। প্রতি পাঁচ জন মহিলার মধ্যে একজন করে ধর্ষণের শিকার হন। ষষ্ঠ স্থানে জার্মানি। প্রতি বছর জার্মানিতে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয় ৬৫ লাখ। সপ্তম স্থানে ফ্রান্স। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের মত ঘটনা ফ্রান্সে অপরাধ বলেই মানা হতো না। অষ্টম স্থানে কানাডা। নবম স্থানে শ্রীলংকা। ১০ নম্বরে থাকা ইথিওপিয়া। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখুন এই দেশগুলির মধ্যে একটিও বামপন্থী দেশ ও ইসলামিক রাষ্ট্র নেই। তার অর্থ বোঝা খুব কঠিন নয়। এর কারণ হল শাস্তির ভয়।

যুদ্ধের সময় সেনা দ্বারা ধর্ষণও নির্ভর করে একটি বিষয়ের ওপরে। সেটা হল সে দেশের মদত। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি কমান্ডাররা সৈনিকদের উদ্দীপিত করতো চিনা নাগরিকদের লাঞ্চিত করার জন্য। নানজিং নামক স্থানে প্রথম মাসেই ২০ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয় জাপানি বাহিনীর হাতে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় একই জিনিষ দেখা গেছে। অথচ ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে কম ঘটে বামপন্থী গেরিলা সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রে। এল সালভেদরে ১২ বছর গৃহযুদ্ধ চলার পরও ১৯৮১ সালে ‘ইউএন ট্রুথ কমিশন’ তদন্ত করে দেখলো যে বিদ্রোহী গেরিলাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের কোনো মামলা হয়নি। কারণ বিদ্রোহী গ্রুপের নিজস্ব আইন ছিলো ধর্ষণের বিরুদ্ধে। একই ঘটনা ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত বাহিনীর দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। কারণ যুদ্ধের সময় ধর্ষণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই।

ধর্ষণের শাস্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের দিকে চোখ রাখা যাক। রাশিয়া: ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। চীন: কোনো ট্রায়াল নেই, মেডিকেল পরীক্ষার পর মৃত্যুদণ্ড। মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দুনিয়া: শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত পাথর ছুড়ে মৃত্যু, ফাঁসি, হাত পা কাটা, যৌনাঙ্গ কেটে অতি দ্রুততার সাথে মৃত্যুদণ্ড দেয়া। পোল্যান্ড: হিংস্র বুনো শুয়োরের খাঁচায় ফেলে মৃত্যুদণ্ড। মঙ্গোলিয়া: ধর্ষিতার পরিবারের হাত দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে প্রতিশোধ পুরণ। মালয়েশিয়া: মৃত্যুদণ্ড। অথচ বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৮৬০ আইনের ৩৭৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ধর্ষণের অপরাধ করে তবে সে ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে অথবা দশ বছর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং জরিমানা দণ্ডেও দণ্ডিত হবে।’ নরম আইন। ভারতের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একই রকমের ছিল। মাত্র গতবছর আইন পাল্টেছে। নতুন এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ১২ বছরের নিচে শিশু ধর্ষণের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। ১২ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত মেয়েদের ধর্ষণের জন্যে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যে কোনো ধর্ষণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাজা সাত বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে। কিন্তু এটা কি যথেষ্ঠ? একেবারেই নয়। আইন প্রণয়নের ঢিলেমির ক্ষেত্রে দাদা- ভাই এই দুই দেশ হাত ধরাধরি করে হাঁটছে।

যদি নির্মমতা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং যৌনতা একজন পুরুষকে ধর্ষক বানায়, তাহলে ধর্ষণের সমস্যাটির সমাধান করাটা আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব। কিন্তু সমীক্ষায় প্রকাশ যে অধিকাংশ ধর্ষণের কারণ ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’। এই সংস্কৃতির মানে হচ্ছে, ধর্ষক মনে করে যে ধর্ষণ শুধু একটি স্বাভাবিক আচরণই নয়, বরং একই সঙ্গে সম্পূর্ণ নিরাপদ। কাজেই ধর্ষণের কারণ যদি শারীরবৃত্তীয় বা জিনগত হয় তাহলে তার সম্পূর্ণ সংশোধন জিন মানচিত্র নির্মাণ, দায়ী জিন নির্ধারণ ও জিন সংশোধন– এই সকল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পরেই সম্ভব হবে। কিন্তু তার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব আইন প্রণয়ন এবং তার প্রয়োগের মাধ্যমে। মানবতাবাদীরা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে অনেক যুক্তির জাল রচনা করেন। কিন্তু ধর্ষণের তীব্রতা, ভয়াবহতা ও নৃশংসতা বিচার করে সকল দেশে গঠন করা উচিত ফাস্ট ট্র্যাক আদালত। যেখানে বিচার হবে পূর্বনির্ধারিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। অপরাধ প্রমাণে শাস্তি হোক মৃত্যুদণ্ড কারণ এই অপরাধীদের সভ্যতা থেকে অবরুদ্ধ করাই যদি উদ্দেশ্য থাকে তাহলে তাকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্র তথা সাধারণ মানুষ নেবে কেন?  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর