Alexa এভারেস্ট চূড়ায় পদচিহ্ন আঁকলেন তারা মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে

এভারেস্ট চূড়ায় পদচিহ্ন আঁকলেন তারা মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে

মেহেদী হাসান শান্ত ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৩৬ ৭ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১২:৪০ ৭ জুলাই ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ হল মাউন্ট এভারেস্ট সম্পর্কে কমবেশি সবারই ধারনা রয়েছে। যার উচ্চতা ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু এই বিন্দুতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কিন্তু অনেক পর্বতারোহীরাই এই অসাধ্যকে সাধন করেছেন। অনেকেই আবার একাধিকবার মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণ করেছেন। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, মাউন্ট এভারেস্টের যাত্রাপথে গড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন পর্বতারোহী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। 

হ্যাঁ, এই আধুনিক যুগে এসেও মাউন্ট এভারেস্ট মানুষকে মৃত্যুর হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাহলে বিংশ শতাব্দীতে শুরুর দিকে পর্বতারোহীদের অবস্থা কেমন ছিল, একটু চিন্তা করুন! পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গ মাউন্ট এভারে ওঠার স্বপ্ন মানুষ দেখতে শুরু করে ১৯২১ সালের ঠিক আগে থেকে। কিন্তু এভারেস্টে ওঠা একেবারেই সহজসাধ্য কোনো কাজ ছিল না। বিশেষ করে এর আগে কেউ এভারেস্ট জয় না করায় পর্বতারোহীদের কাছে এভারেস্ট ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক জগতের নাম। আর এর প্রতি পদে পদে ভয়ংকর সব বিপদ তো লুকিয়ে আছেই।

আজ অব্দি অনেকেই মাউন্ট এভারেস্টের কাছে পরাজিত হয়েছে, অনেকে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়ে এসেছে। এমনকি অনেক পর্বতারোহীর মৃতদেহ এখনো এই পর্বতমালার বরফের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে, যা আজও পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এতসব কিছুর পরও কিছু দুঃসাহসী অভিযাত্রী একেবারেই হার মেনে নেয়নি। এভারেস্ট শৃঙ্গে ওঠার নিরন্তর প্রয়াস তারা চালিয়ে গেছে দিনের পর দিন। আর এসব সাহসী বীরদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নেপালের শেরপা তেনজিং নরগে। 

১৯৫২ সালে সর্বপ্রথম এভারেস্টে ওঠার পরিকল্পনা করেন তেনজিং। সুইজারল্যান্ডের অন্য এক পর্বতারোহী র‌্যামন ল্যাম্বার্ডের সাথে তেনজিং সর্বপ্রথম এভারেস্টে ওঠার ঝুঁকি নেন। সেবার এভারেস্টের চূড়ায় এই দু’জন উঠে গিয়েছিলেন প্রায়। তবে প্রচন্ড খারাপ আবহাওয়ার কারণে শৃঙ্গ থেকে মাত্র এক হাজার ফুট দূরত্বে থেকে তাদেরকে নেমে যেতে হয়। অটল মাউন্ট এভারেস্টের এত কাছাকাছি পৌঁছে ফিরে আসার ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে পড়েন র‌্যামন। তবে হাল ছাড়েননি তেনজিং। তিনি যে এভারেস্টের পাদদেশের দেশ নেপালের জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা তরুণ! তার প্রত্যয় যে এভারেস্টের চেয়েও অনড়! 

বাম থেকে তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারিফের ১৯৫৩ সালে সাতজন ইংরেজ ও দুইজন সুইস পর্বতারোহীকে নিয়ে তেনজিং বেরিয়ে পড়েন এভারেস্ট অভিযানে। তেনজিং নরগে, এডমুন্ড হিলারি ও তাদের সহযোগীরা পর্বতারোহণ শুরু করে ৯ এপ্রিল। বরফের রাস্তা, শূন্যের নিচে তাপমাত্রা, হিম নদী, নদী থেকে ভেঙে পড়া বরফের পাহাড় এবং খাদ; ইত্যাদি বাধা ও প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে তারা একটির পর একটি ক্যাম্প তৈরি করে চলেছিল। এভাবেই তারা সময়ের সাথে সাথে একটু একটু করে নিজেদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মোটামুটি কুড়ি হাজার ফুট ওপরে ওঠার পর একটি ছোট্ট বরফের খাদ পার হবার জন্য এডমন্ড হিলারি লাফ দেন। তবে তার শরীরের ওজন সইতে না পেরে বরফের রাস্তা সেখান থেকে খসে পড়ে। সেই মুহূর্তে বরফের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাতে বসেছিলেন হিলারি। পেছন থেকে তেনজিং-এর ছুঁড়ে দেয়া দড়ি ধরে কোনো মতে প্রাণে বেঁচে যান হিলারি। 

তবে তেনজিং নরগে ও এডমন্ড হিলারির দলের আগে ব্রিটিশ পর্বতারোহী চার্লস ওয়ার্নের নেতৃত্বে আরো একটি দল এভারেস্টের চূড়ায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তাই তেনজিংদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল ওই দলটি ফিরে আসা অবধি। ইতোমধ্যেই চূড়ায় পৌঁছানোর অর্ধেকের বেশি রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফেলেছিলেন তেনজিং-হিলারি। তবে এভারেস্টের চূড়ার কাছাকাছি আসার পর সর্বশেষ যে খাদটি পাড়ি দিতে হয় সেটি বড়ই বিপদসংকুল। মূলত এখানে পৌঁছাতে গিয়েই অনেক পর্বতারোহী প্রাণ হারাতেন। চার্লস ওয়ার্নের দলটিও ওই পর্যন্ত গিয়েই আটকে যায়। অসম্ভব ক্লান্তিতে পর্যদুস্ত হয়ে শেষ ৩০০ ফুট পথ আর তারা পাড়ি দিতে সক্ষম হয়নি।

এরপরে সুযোগ চলে আসে তেনজিং ও হিলারির কাছে। এক রাত বেস ক্যাম্পে কাটানোর পরে পরদিন সকালে তাপমাত্রা নেমে আসে শূণ্যেরও ২৭ ডিগ্রি নিচে! এরই মধ্যে যাত্রা শুরু করেন এই দুই অসম্ভব সাহসী অভিযাত্রিক। সব প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের শরীরের সর্বোচ্চ সহনশীলতা ব্যবহার করে তারা এগিয়ে যেতে থাকে। ঠিক সকাল ন'টায় তারা দক্ষিণ শিখরে পৌঁছে যায়। তবে ধীরে ধীরে তাদের অক্সিজেন সিলিন্ডার শূন্য হয়ে আসছিল। আর তাদের কাছে তখন পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডারও ছিল না, যা দিয়ে তারা পর্বতের শৃঙ্গ আরোহন করে আবার নিচে ফিরে যেতে পারবে। মৃত্যুকে যেন চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছিলেন দু’জন। 

একটা সময় অক্সিজেনের অভাবে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে তেনজিং আর এগোতে পারছিলেন না, তার পা অসাঢ় হয়ে আসছিল। ওই সময় এডমন্ড হিলারি তাকে সাহস দেন এবং একটু বিশ্রাম নিতে বলেন। হিলারি তেনজিংয়ের অক্সিজেনের নল পরিষ্কার করে দেন। এ কারণে দেখে খানিকটা বল ফিরে পান তেনজিং। সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে ১৯৫৩ সালের ২৯ মে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহন করেন তেনজিং নোরগের ও এডমন্ড হিলারি। পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে এতটাই বিমোহিত হয়ে গিয়েছিলেন দু’জন, যে অক্সিজেনের স্বল্পতা আর নিচে নামার কথা দুজনের একদমই খেয়াল ছিল না! 

এভারেস্টের গায়ে তখন ছিল না কোনো পদচিহ্ন, ছিলনা পূর্ববর্তীদের দেখিয়ে দেয়া কোনো পথ, কিংবা ছিল না বেয়ে ওঠার মতো কোনো দড়ি। তারপরও দু’জন অদম্য সাহসী ও অধ্যবসায়ী মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন, উত্তরসূরিদের করেছিলেন পথপ্রদর্শন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস