এবার মোদির দায়িত্ব তিস্তা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া

এবার মোদির দায়িত্ব তিস্তা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া

প্রকাশিত: ১৬:৫১ ২৮ মে ২০১৯   আপডেট: ০৬:৪৬ ৩০ মে ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

স্বল্প ব্যবধানে বাংলাদেশ ও ভারতে সরকার গঠন করল পূর্বে আসীন দুই রাজনৈতিক জোট।  বাংলাদেশে এর নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ আর ভারতে বিজেপি।

এ মুহূর্তে দুই দেশের সংসদে তারা নিরঙ্কুশ। বিরোধীরা নিতান্তই নগন্য। সম্পর্ক দুই দেশের দুই জোটের অত্যন্ত ভালো। গত পাঁচ বছরে ভারত একবারের জন্যও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলায়নি। কোনো ক্ষেত্রে সামান্যতম প্রশ্ন তোলেনি। তাদের বিরুদ্ধে পূর্বে ওঠা ‘দাদাগিরি’র অভিযোগ গত পাঁচ বছরে তোলেননি কেউ। বরং ভারতের সঙ্গে একের পর এক কার্যকরী চুক্তি সম্পাদন করেছে বাংলাদেশ। এতে লাভের সম্ভাবনা দু’পক্ষেরই। কিন্তু একটি স্পর্শকাতর বিষয় এখনো অমীমাংসিত আছে। তা হলো- তিস্তা চুক্তি। ৩০মে শপথ নিতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। সে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধি দল থাকছেন। জাপান ও সৌদি আরব সফরে যেতে হওয়ায় কারণে মোদির শপথের অনুষ্ঠানে থাকতে পারছেন না শেখ হাসিনা। জানা গেছে, এই মুহূর্তে মন্ত্রিসভার প্রবীণতম সদস্য মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক দিল্লির সে অনুষ্ঠানে আসছেন। তিনি ঢাকা সফরের জন্য শেখ হাসিনার একটি আমন্ত্রণবার্তা মোদির হাতে তুলে দেবেন। মোদির শপথের পরে তিস্তা চুক্তি নিয়ে পুরনো প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে ফের দিল্লিকে তাড়া দেবে বাংলাদেশ। মোদির আমলে দু’দেশের সম্পর্ক যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, তার জন্য মোদির ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল বলে মনে করেন তারা। এর আগে দিল্লির কূটনীতিকরা ঢাকাকে বারে বারে জানিয়েছেন, তিস্তা চুক্তি নিয়ে ঘরোয়া স্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করছেন তারা।

কিন্তু এবারে সে ঐক্যমত তৈরির দায় নেই নরেন্দ্র মোদির। মূল আপত্তিকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গেছে জনাদেশ। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ‘আমি তিস্তা চুক্তির বিরুদ্ধে নই। কিন্তু অতীতে যে চুক্তিটি তৈরি করা হয়েছিল, তাতে বেশ কিছু ত্রুটি আছে।“ সেই ত্রুটির পক্ষে যে বিশেষজ্ঞের মতামত তিনি পেশ  করেছিলেন সেটা কতটা সত্য! পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গড়া পরামর্শদাতা কমিটির প্রধান কল্যাণ রুদ্র বলেছিলেন – ‘সেচের জন্য যত জল তার কাছে চাওয়া হচ্ছে, ততটা দেয়ার ক্ষমতা নেই তিস্তার। এমনকী শুধু পশ্চিমবঙ্গের যা চাহিদা, সেটুকুও পূরণ করার অবস্থাতেও নেই সে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে তিস্তার জল দেয়া দুরূহ। তাদের মতে তিস্তার জল দিয়ে ন’লক্ষ হেক্টর জমিকে সেচসেবিত করে তুলতে চায় পশ্চিমবঙ্গ। আর বাংলাদেশ চায় সাত লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের জল দিক তিস্তা। নদী-বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ১৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের জন্য নদীর জল দিতে গেলে শুকনো মৌসুমে তিস্তায় প্রতি সেকেন্ডে ১৬০০ ঘন মিটার জল থাকা দরকার। অথচ এখন থাকে প্রতি সেকেন্ডে ১৫০-২০০ ঘন মিটার জল। অর্থাৎ সেচের জন্য তিস্তার কাছে যতটা জল প্রত্যাশা করা হচ্ছে, বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সেই চাহিদা মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।‘ (২৮ নভেম্বর,২০১৭ কলকাতায় ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (নিরি)-এর কলকাতা শাখা আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রদত্ত বক্তৃতা)। কিন্তু এই তথ্য কতটা সত্য? 

এ যুক্তি যে মূল সমস্যার যে খণ্ডচিত্র তা এই মুহূর্তে প্রমাণিত। ২০১১ সালেও বাংলাদেশ তিস্তা থেকে ৩ থেকে ৫ হাজার কিউসেক পানি পেত। তার আগে আরো বেশি ছিল। প্রশ্ন হলো, ২০১১ সালের পর হঠাৎ করেই কি তিস্তা শুকিয়ে গেছে? না যায়নি। তাহলে আসল চিত্রের দিকে নজর দেয়া যাক।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশে লালমনিরহাটে দোয়ানিতে তিস্তা ব্যারেজের কাজ শুরু হয়। প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষে এ প্রকল্প ১৯৯৮ সালে চালু হয়। এই প্রকল্প থেকে ১২টি উপজেলার ৬ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে এ প্রবাহ কমে ৫০০ থেকে ১০০০ কিউসেকে নেমে আসায় বাংলাদেশের সেচপ্রকল্প ধ্বংসের মুখে অথচ আগে সর্বনিম্ন প্রবাহ থাকার সময়ও ৫০০০ কিউসেক পানি ছিল।

কিন্তু ভারত ১৯৯৮ সালে পশ্চিম বাংলার জলপাইগুড়ির গজল ডোবাতে তিস্তা নদীর উপরেই একটি বাঁধ নির্মাণের কাজে হাত দেয়। ভারত তার আন্তঃনদীসংযোগ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিস্তার জল গজলডোবা থেকে প্রত্যাহার করে বেশ কয়েকটি খালের মাধ্যমে মহানন্দার দিকে নিতে থাকে। উদ্দেশ্য তিস্তার পানি ব্যবহার করে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদাতে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি নির্মাণ আর বন্যা নিয়ন্ত্রণ।

মোট ৩১৫ কিমি দৈর্ঘ্যের তিস্তা নদীর ২০০ কিমি পশ্চিম বঙ্গে এবং বাংলাদেশের ১১৫ কিমি এর শুরু রংপুর দিয়ে। শেষ হয়েছে ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্রে। জনসংখ্যার তুলনামূলক বিচারে তিস্তার মোট সুবিধাপ্রত্যাশী জনগণের ৩০ ভাগ ভারতে আর ৭০ ভাগ বাংলাদেশে। বর্তমানে তিস্তার প্রবাহ কমে ৫০০ থেকে ১০০০ কিউসেকে নেমে এসেছে।  তিস্তায় পানি নেই। তাই সেই পানি নিয়ে চুক্তি হলে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু পানি নেই কেন?

কারণ সিকিম। বাংলাদেশের দোয়ানিতে তিস্তা ব্যারেজ কিংবা গজলডোবার ব্যারেজের পরিকল্পনা কিংবা বাস্তবায়নের সময় উজানে সিকিমে জলবিদ্যুতের কোনো প্রকল্প ছিল না। কিন্তু এখন? তিস্তার ওপর এরইমধ্যে ৫টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র চলছে।   লাগায়াপ -১২ মেগাওয়াট , রাম্মাম ২ - ৫০ মেগাওয়াট , রাঙ্গিত - ৬০ মেগাওয়াট , তিস্তা ৫- ৫১০ মেগাওয়াট, রংনিছু - ৮ মেগাওয়াট  । বর্তমানে ৪ টি প্রায় শেষের মুখে - রাম্মাম ৩ - ১২০ মেগাওয়াট,  রোলেপ - ৩২ মেগাওয়াট , তিস্তা ৩- ১৩২ মেগাওয়াট, তিস্তা ৪ - ১৬০ মেগাওয়াট। সিকিমে মুড়ি-মুড়কির মতো অসংখ্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতের জাতীয় বিদ্যুত গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুতের সরবরাহ সিকিমের মূল লক্ষ্য। 

ভারতের জাতীয় বিদ্যুত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রতিবেদন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে দৈনিক ২০ থেকে ২১ ঘণ্টার চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন যথেষ্ট বেশি। তবে কেবলমাত্র ‘পিক  আওয়ারে’ (বেশি চাহিদাকালীন সময়ে) অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা/১০টা পর্যন্ত চাহিদার তুলনায় ঘাটতি কিছুটা রয়েছে। সমস্যা হল বেশিরভাগ কোম্পানিই  সন্ধ্যায় বিদ্যুত বিক্রিতে আগ্রহী। কারণ ওই সময়ে বিদ্যুতের মূল্য সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। আর এ’কারণে জলবিদ্যুত প্রকল্পগুলো নদীর জল ২০-২১ ঘণ্টা যাবত জল আটকে রাখে। আর এই আটকে রাখা জল পরে সন্ধ্যার সময়ে টানেল বা সুরঙ্গ দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় যখন তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য টারবাইন ঘোরানোর প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ সম্পূর্ণ অর্থ আয়ের কারণে সিকিম এই প্রকল্পগুলি চালু রাখছে। এদিকে একই নদীর ক্ষেত্রে যেখানে অনেক একই  ধরনের জল বিদ্যুৎ প্র্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে বাঁধ দিয়ে ভাটির প্রকল্পগুলি সারাদিনে জল পাচ্ছে না। তারা শুধুমাত্র তখনই জল পাচ্ছে যখন উজান থেকে দিনের ওই নির্দিষ্ট তিন থেকে চার ঘণ্টায় জল ছাড়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভাটির বা নিচের দিকের প্রকল্পগুলোও জল আটকে রাখছে পরবর্তী দিনে অধিক চাহিদাকালীন সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য।

পানিবণ্টন চুক্তি ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত কার্যকর থাকে এবং পানিবণ্টন হয় ১০ দিন ভিত্তিক, অর্থাৎ একটি মাসে তিনটি ভাগে ভাগ করে ১০ দিনের গড় প্রবাহ অনুযায়ী চুক্তি অবলোকন করতে হয়। হিস্টরিকাল প্রবাহের উপর ভিত্তি করে সাধারণত চুক্তি হয়। কিন্তু বর্তমানে শুকনো মরসুমে তিস্তায় বড় জোর ২০০ কিউবিক ফুট পার সেকেন্ড পানি থাকে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে যে সেচপ্রকল্প রূপায়িত হয়েছে, তাতে কমপক্ষে মোট পানি প্রয়োজন ১৬০০ কিউবিক ফুট পার সেকেন্ড। এই অবস্থায় করণীয় কী? 

বাংলাদেশের উচিত ৫০:৫০ শতাংশের হিসেবে গেলেও আগে বাঁধমুখে ১৬০০ কিউসেক পানির আগমন চুক্তিবদ্ধ করা। 

এতে ভারতের শাসকদলের লাভ বই ক্ষতি নেই। কারণ পশ্চিমবঙ্গের যে অংশ তাদের বিপুল জনসমর্থন দিয়ে ভোটে জয় উপহার দিয়েছে সেই বিস্তৃত অঞ্চল এ উল্লেখিত ১৬০০ কিউসেকের অর্ধেক পেলে সেচের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উপকৃত হবে। যেভাবে এতদিন তিস্তার পানিপ্রবাহ আটকানো হয়েছে আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ আইন অনুযায়ী। এভাবে তিস্তার পানি আটকানো যায় না। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে গেলে যে ভারতের মুখ পুড়বে তা আইন বিশেষজ্ঞরা ভালোই জানেন। একথা স্বীকার করতেই হবে যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েছেন অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়ে। কাজেই ভারতের উচিত আর উপেক্ষা নয়। দ্রুত এ সমস্যার নিরসন করা। এ মুহূর্তে অতি বাস্তব সত্য এই যে ভারতের জনগণ সম্পূর্ণ আস্থা রেখেছে নরেন্দ্র মোদির ওপরে। মোদি জানেন যে বাংলাদেশে কিছু মানুষ ভারতবিরোধী সুর সবসময় উচ্চগ্রামে বেঁধে রাখেন এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীন চূড়ান্ত  আগ্রাসী। সে আগ্রাসনকে লাগাম পড়াতেও বাংলাদেশের ভারতবিরোধী স্বরকে নির্মূল করতে ভারতের প্রয়োজন অবিলম্বে তিস্তা চুক্তি সম্পাদন। এক্ষেত্রে যে কোনো আপত্তি উপেক্ষা করা উচিত। কারণ ‘বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের সহযোগিতা করেছে গত পাঁচ বছর, বিশেষত সন্ত্রাসদমনের ক্ষেত্রে, তাতে ভারতেরও দায়িত্ব সে দেশের দীর্ঘদিনের দাবিটি পূরণ করা’– মন্তব্যটি আমার নয়, মন্তব্যটি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সব্যসাচী বসুরায় চৌধুরীর।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর