Alexa সৌরভ ছড়াচ্ছে শত বছরের দুর্লভ ‘নাগ লিঙ্গম’

সৌরভ ছড়াচ্ছে শত বছরের দুর্লভ ‘নাগ লিঙ্গম’

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:০১ ৩০ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১১:৪০ ৩১ অক্টোবর ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

নাম শুনেই চোখের সামনে কোনো সাপের ছবিই ভেসে উঠেছে নিশ্চয়! ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নাগ লিঙ্গম কোনো সাপ নয়। এটি একটি বৃক্ষ। এর ফুল নিমিষেই সবার নজর কাড়ে।

এই বৃক্ষের কাণ্ডে ফুল ফোটে। শাখা-প্রশাখায় কোন ফুল ফোটে না। গোলাকার বলের মত এর ফল। ফলের গায়ের রং সফেদার মতো। ফলের ওজন প্রায় ২ কেজি। দেখতে সুন্দর হলেও ফলের স্বাদ খুবই তিক্ত। পশু-পাখিও এই ফল খায় না। বৃক্ষের পাতার রং গাঢ় সবুজ। বহুদূর থেকে ফুলের সুবাস পাওয়া যায়। কিন্তু ফুলের সুবাস তীব্র নয়। গাছের আকৃতি আকারে বড়। বাংলাদেশের অনেকেই গাছটির ফল সংগ্রহ করে এর বীজ থেকে চারা উৎপাদনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো চারা গজায়নি।

নাগ লিঙ্গম২০ বছর আগে এক বৃক্ষ জরিপে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীগণ হিসেব করেছেন বাংলাদেশে ৫২টি নাগেশ্বর বৃক্ষ আছে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় নাগ লিঙ্গম বৃক্ষের সংখ্যা ছিল ৪টি। ২০০২ সালে টর্নেডোর ছোবলে একটি গাছ উপড়ে পড়ে। অপর ৩টি বৃক্ষ অক্ষত অবস্থায় আছে। সেগুলো জলটঙ্গী পুকুর ঘাটের পূর্বপাশে আছে। স্থানীয়ভাবে এই গাছটি নারায়ণ গাছ বা নাগেশ্বর নামে পরিচিত। এই অঞ্চলের বিয়ের কনে সাজানোর সময় এই ফুলের ব্যাপক কদর রয়েছে।  

অনেকেরই ধারণা, ঐ বৃক্ষগুলোর বয়স প্রায় আড়াইশ বছর। মুক্তাগাছার জমিদাররা শখ করে অথবা নিতান্তই ভেষজ গুণাবলির কথা বিবেচনা করে বিদেশ থেকে এই বৃক্ষ এনে তাদের বাড়ির সামনে রোপন করেছিলেন। এদেশের দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষগুলো সংরক্ষণ করে থাকে সরকারের বন বিভাগ।

নাগ লিঙ্গমএলাকাবাসী চায় বৃক্ষগুলো সংরক্ষণ করা হোক। নীরবে সৌরভ ছড়াচ্ছে দেড়শ বছরের পুরাতন দুর্লভ নাগ লিঙ্গম গাছ। ব্যাপক ওষুধি গুণসমৃদ্ধ এ গাছটিতে এবারও ফুল ফুটেছে।

অপরদিকে গৌরীপুর থানা বাউন্ডারি দেয়ালের ভেতর রান্না ঘরের এক পাশে ময়লা আবর্জনাপূর্ণ স্থানে গাছটির বয়স সম্পর্কে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী এর বয়স দেড় শতাধিক বলে ধারণা স্থানীয়দের।

এলাকার প্রবীণরা জানান, কালীপুরের তৎকালীন জমিদার উপেন্দ্র কিশোর রায় প্রায় দেড়শ বছর আগে অনেকগুলো রয়েল পামগাছের সঙ্গে ভারত থেকে ওই নাগ লিঙ্গম গাছের চারা এনে তার বাসভবনে রোপন করেছিলেন।

জনশ্রুতি আছে, হাতির পেটের অসুখের প্রতিষেধক হিসেবে ওই গাছের কচি পাতা কার্যকর ভূমিকা রাখত বলে জমিদার এ গাছ রোপন করেছিলেন।

নাগ লিঙ্গমতারা জানান, আমাজান অঞ্চলের এ গাছটি এ দেশের প্রতিকূল আবহাওয়ায় বাঁচিয়ে রাখতে জমিদার নিজে মালির সঙ্গে গাছটির পরিচর্যা করতেন। তবে স্থানীয়রা সবসময় মনে করতেন এ গাছের ফুল নাগ-নাগিনী পাহারা দেয়। এ কুসংস্কারের কারণে প্রতিবছর নাগ পঞ্চমিতে এ গাছের গোড়ায় পূজা করে নাগকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হতো। বর্তমানে পূজা বন্ধ থাকলেও ওই গাছে নাগ-নাগিনী বসবাস করে এ ভয়ে এখনো কেউ এ গাছের আশে পাশে যায় না।

দেশ ভাগের পর জমিদাররা ভারতে চলে গেলে পরিত্যক্ত এ বাড়িতে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। সে সময় থেকে পুলিশ ফাঁড়ির (যা বর্তমানে গৌরীপুর থানা) বাউন্ডারি দেয়ালের ভেতর রান্না ঘরের এক পাশে ময়লা আবর্জনাপূর্ণ স্থানে অযত্ন-অবহেলায় এখনো টিকে আছে গাছটি। গাছটি প্রতি বছর শরৎকালে ফুল ফুটিয়ে সৌরভ ছড়াচ্ছে চারদিকে।

নাগ লিঙ্গমবাংলাদেশে নাগ লিঙ্গম গাছের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন জার্নালে ঢাকা শেরে বাংলা নগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি, বলদা গার্ডেনে একটি, সিলেট ও হবিগঞ্জে একটি করে নাগ লিঙ্গম গাছ থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রাচীন ও বৃহদাকার এ গাছাটির কথা কোথাও উল্লেখ নেই।

এ গাছটির গোড়ার ব্যস প্রায় ১৮ ফুট এবং কাণ্ড ৩০ ফুট লম্বা। এর ফুল উজ্জ্বল গোলাপী, পাপড়ি গোলাকার কুণ্ডলী পাকানো। ফুটন্ত ফুলের পরাগ কেশর সাপের ফনার মত। আর এ কারণেই গাছটি নাম নাগ লিঙ্গম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

কড়া গন্ধ যুক্ত এ ফুল শুকলে তাৎক্ষণিক মাথা ব্যথা শুরু হয়। কু-সংস্কারের কারণে স্থানীয়রা এ ফুল না ছিড়লেও কবিরাজরা দূর-দূরান্ত থেকে এ ফুল সংগ্রহ করতে এখানে আসেন। জানা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত এই উদ্ভিদটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যাপক। এই গাছগুলোর দ্রুত বৃদ্ধি এবং আকর্ষণীয় ফুলের জন্য রোপণ করা হয়।

নাগ লিঙ্গমঅর্থনৈতিক গুরুত্ব
এ বৃক্ষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কম নয়। দক্ষিণ আমেরিকায় এ বৃক্ষেও কাঠ দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি করা হয়। তবে সুগন্ধি ফুলের গাছ হিসেবে বাগানে বা বাড়ির আঙ্গিনায় রোপন করা হয়। ওষুধ হিসেবে এ বৃক্ষের ফুল, পাতা এবং বাকলের নির্যাস এনটিবায়েটিক, এনটিফাঙ্গাল এবং এনিটসেপটিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পেটের পীড়া দূরীকরণে এর জুড়ি নেই। পাতা থেকে উৎপন্ন জুস ত্বকের সমস্যা দূরীকরণে খুবই কার্যকর।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ