Alexa এক ভাইরাসেই ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু!

স্প্যানিশ ফ্লু

এক ভাইরাসেই ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু!

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১৬ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:৪০ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মহামারি এক ভাইরাস। এতে আক্রান্ত হয় প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। এই ফ্লু’টি কারো পুরো পরিবারকেই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। অনেকেই হারিয়েছে তার বাবা-মাকে আবার অনেকে সন্তানদের। মৃতদেহের স্তূপ জমতে শুরু হয়। চারপাশে যেন লাশ পচা গন্ধ! আবার অনেকের পরিবার প্রিয় সদস্যকে কবর শায়িত করেন।

এই ভাইরাসের নাম স্প্যানিশ ফ্লু। নাম শুনেই নিশ্চয় ধারণা করতে পারছেন, এর উৎপত্তিস্থল ছিল কোথায়! স্পেনেই এই ফ্লু প্রথম থাবা বসায়। বিশ্ব অর্থনীতিতেও এই মহামারি ফ্লু ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলকারখানা ও কোম্পানির কর্মচারীরা অসুস্থ থাকায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়ে। কিছু জায়গায় ফসল তোলার মতো পর্যাপ্ত খামার শ্রমিকও ছিল না।

ফ্লুতে আক্রান্তরা১৯১৮ সালে এই ফ্লু মহামারি আকার ধারণ করে। যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী ভাইরাস হিসেবে বিবেচিত। কারণ এই ভাইরাসের কবলে প্রাণ যায় বিশ্বের ১০০ মিলিয়ন মানুষের। আক্রান্ত হন ৫০০ মিলিয়ন মানুষ। যা তখনকার বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে মার্কিনদের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৭৫ হাজার। ১৯১৮ সালে এই ফ্লু’টি দ্রুত ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। 

এই ঘাতক ফ্লু থেকে বাঁচার কোনো উপায় জানা ছিল না কারো। তখন এই রোগের চিকিত্সার জন্য কোনো কার্যকরী ওষুধ বা ভ্যাকসিন ছিল না। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতা ও পরিষ্কার থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল সবাইকে। যেসব দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছিল সেসব স্থানে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল মাস্ক ব্যবহার করার। আপনি জানেন কি? ১৯১৮-সালের এই স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি পর্যায়ে চলে গেলে নিউইয়র্কের স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশে জনবহুল অঞ্চলে মানুষের চলাচল বন্ধ করা হয়। পাশাপাশি স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন দোকানও বন্ধ করে দেয়া হয়। 

মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছিলফ্লু কি?

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু একটি ভাইরাস। যা শ্বাসযন্ত্রের কার্যকারিতায় ব্যাঘাত ঘটায়। ফ্লু ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা কথা বলার সময়ও বাতাসের মাধ্যমে ক্ষতিকর ভাইরাসটি অন্যকেই সংক্রামিত করতে পারে। এমনকি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিস অন্য কেউ স্পর্শ করে ওই হাত দিয়ে তার মুখ, চোখ বা নাক স্পর্শ করলেও সে সংক্রামিত হতে পারে।

স্প্যানিশ ফ্লুর লক্ষণ কেমন ছিল?

১৯১৮ সালের বসন্তের শেষের দিকে আঘাত হানে এই মহামারি ফ্লু’টি। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে শারীরিক কোনো জটিলতা প্রকাশ পায়নি। সামান্য ঠাণ্ডা, জ্বর, কাশি, ক্লান্তি বোধ এসব লক্ষণই প্রকাশ পেয়েছিল। একেবারেই সাধারণ সর্দি-কাশির সমস্যার মতোই এর লক্ষণ ছিল। ওই বছরেরই শরৎকালে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো এক সংক্রমণে অনেকেই মারা যান। এতে আক্রান্তরা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন। আক্রান্তদের ত্বক নীল হয়ে গিয়েছিল। সেইসঙ্গে ফুসফুস পানিতে ভরে যাওয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে তারা মারা যায়। ১৯১৮ সালে মাত্র এক বছরেই মার্কিনদের গড় আয়ু ১২ বছর কমে গিয়েছিল। 

অনেকেরই পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়স্প্যানিশ ফ্লুর কারণ কী ছিল?

১৯১৮ সালের এই ফ্লু’টি প্রথম ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও ফ্লু’টি স্পেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তা স্বত্ত্বেও এটি স্প্যানিশ ফ্লু হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। যেহেতু স্পেনবাসীদের উপরই সর্বপ্রথম এই রোগটি থাবা বসায়। জানা যায়, স্পেনের রাজা আলফোনসো দ্বাদশও এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। 

১৯১৮ সালের এই প্রাণঘাতী ফ্লুতে ছোট, বড়, যুবক ও যুবতী এমনকি বয়স্করাও আক্রান্ত হতে থাকেন। তবে স্প্যানিশ ফ্লুর আক্রমণে সবচেয়ে বেশি মারা যান ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অনেক মার্কিন সেনাও মারা যান। জানা যায়, যুদ্ধে নিহত হওয়ার চেয়ে এই ফ্লুতেই বেশি সেনা মারা গিয়েছিলেন। ইউএস নেভির চল্লিশ শতাংশ সৈন্য ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনীর প্রায় তিন শতাংশ। ধারণা করা হয়, জাহাজ, ট্রেনে ও বিমান পথে যাতায়াতকালেই বিশ্বজুড়ে এই ঘাতক ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে।

যদিও স্প্যানিশ এই ভাইরাসে মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায়নি। কোথাও বলা হয়েছে, এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ যায় বিশ্বের ১০০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১০ কোটি মানুষের। আবার অন্য নথিতে প্রকাশ পেয়েছে ৫০০ মিলিয়ন অর্থাৎ ৫০ কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছিল। অনেক জায়গায় চিকিত্সা রেকর্ড রাখার অভাবে সঠিক সংখ্যা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। এই ফ্লুতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরের বাসিন্দারাও আক্রান্ত হয়েছিলেন। কেউই নিরাপদ ছিল না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন ১৯১৯ সালের প্রথম দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভার্সাই চুক্তি সমঝোতার সময় ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

হাসপাতালের অভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়স্প্যানিশ ফ্লু যুদ্ধ

১৯১৮-এর ফ্লু মহামারি আকারে পৌঁছায়। অন্যদিকে চিকিত্সক এবং বিজ্ঞানীরা আক্রান্তদের বাঁচাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলেন। তারা কোনোভাবেই নিশ্চিত হতে পারছিলেন না এটি কীভাবে ঘটেছে? কিংবা কীভাবে এই ফ্লু’টি ঠেকানো সম্ভব? তখন এই ফ্লুর জন্য কার্যকরী কোনো ভ্যাকসিন বা অ্যান্টিবায়োটিকও ছিল না। স্প্যানিশ ফ্লু প্রতিরোধে প্রথম লাইসেন্সযুক্ত ভ্যাকসিনটি ১৯৪০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ পায়। সেখানকার বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিত্সক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের অভাবেই চলছিল হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো। 

কারণ রোগীদের উপচে পড়া ভিড় বাড়ছিল। এদের মধ্যে আবার অনেক চিকিত্সাকর্মীরাও এই ঘাতক মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিছু অঞ্চলের হাসপাতালগুলো রোগীদের ঠাঁই দেয়ার জায়গা স্বল্পতায় বিভিন্ন স্কুল, বেসরকারি অফিস এবং অন্যান্য ফাঁকা বড় বাড়িগুলো বেছে নেয়া হয়। সেগুলোতেই অস্থায়ী হাসপাতাল হিসেবে রোগীদের চিকিৎসা চলে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় মেডিকেলের শিক্ষার্থীরাও রোগীদের বাঁচাতে মাঠে নেমে পড়েন।

মরে পড়ে আছেন সৈন্যরাস্প্যানিশ ফ্লু মহামারি শেষ হয় কবে?

১৯১৯ সালের গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপে এই ফ্লুর মহামারি ভাব কেটে যায়। এরইমধ্যে আক্রান্তদের সবাই মারা গিয়েছিলেন। এর প্রায় ৯০ বছর পর ২০০৮ সালে গবেষকরা স্প্যানিশ ফ্লুর মারাত্মক প্রভাব সম্পর্কে জানতে সক্ষম হন। তারা আবিষ্কার করেন, তিনটি জিন দ্বারা গঠিত একটি দলীয় ভাইরাস এটি। যা ব্রঙ্কিয়াল টিউব এবং ফুসফুসকে দুর্বল করার মাধ্যমেই আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়। এই গবেষণার মাধ্যমেই মহামারি ফ্লু’টি শনাক্ত করে এর নাম দেয়া হয় 'এইচ ওয়ান এন ওয়ান ভাইরাস ।

১৯১৮ সালে পর ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত আরো এক ইফ্লুয়েঞ্জা মহামারিতে রূপ নেয়। অতঃপর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০ মিলিয়ন মানুষ এতে মারা যায়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা যায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। এরপর আবারো ১৯৬৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঘটা আরো একটি মহামারিতে বিশ্বের প্রায় ৩ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। যাদের মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার মার্কিন নাগরিক ছিলেন।

২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এইচএনএন ১ বা সোয়াইন ফ্লু মহামারি আকার ধারণ করে। সে সময় আরো ১২ হাজার মার্কিন মারা গিয়েছিলেন। সর্বশেষ চীনের উহান থেকে শুরু করোনাভাইসে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। আক্রান্তের সংখ্যাও হু হু করে বাড়ছে। 

সূত্র: হিস্টোরিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস