এক বিবেকবান ও প্রতিবাদী কিংবদন্তির গল্প

এক বিবেকবান ও প্রতিবাদী কিংবদন্তির গল্প

সঞ্জয় বসাক পার্থ

প্রকাশিত: ১৫:৫৩ ৯ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৫:৫৩ ৯ জানুয়ারি ২০১৯

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। ছবি: সংগৃহীত

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। ছবি: সংগৃহীত

জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের অবস্থা বর্তমানে কতটা নাজুক সে ব্যাপারে নতুন করে বলার কিছু নেই। ব্রেন্ডন টেইলর কিংবা হ্যামিল্টন মাসাকাদজা ছাড়া বলার উল্লেখযোগ্য কোনো তারকা ক্রিকেটারও আর নেই। কিন্তু একসময় এই জিম্বাবুয়েতেই ছিলো দারুণ সব ক্রিকেটার। ডেভিড হটন, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল, হিথ স্ট্রিক, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, টাটেন্ডা টাইবু, নিল জনসন, ডানকান ফ্লেচারদের মতো অসাধারণ সব ক্রিকেটার এসেছেন জিম্বাবুয়ে থেকে। কিন্তু কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে বলা যায়, এরা কেউই জিম্বাবুয়ের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার নন! বেশিরভাগ ক্রিকেটবোদ্ধার দৃষ্টিতে জিম্বাবুয়ের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার- অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার! যারা অ্যান্ডির খেলা দেখেছেন, তারাও নিশ্চয়ই একমত হবেন এ বিষয়ে।

জন্ম সাউথ আফ্রিকার কেপটাউনে হলেও অ্যান্ডির ক্যারিয়ার, পরিচিতি, খ্যাতি সবকিছুই জিম্বাবুয়ের হয়ে। খেলার জন্য জিম্বাবুয়েকে বেছে নিয়ে যে মোটেও ভুল করেননি তার প্রমাণ দেবে পরিসংখ্যান। দশ বছরের চেয়েও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে খেলেছেন ৬৩ টি টেস্ট ও ২১৩ টি ওয়ানডে। টেস্ট ক্রিকেটে একজন ব্যাটসম্যানকে বিচার করার সবচেয়ে সাধারণ পরিমাপক হচ্ছে তার গড়। সাধারণত ৫০ বা তার চেয়ে বেশি গড়সম্পন্ন কোনো ব্যাটসম্যানকে টপ ক্লাস ব্যাটসম্যান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। অ্যান্ডি সেদিক থেকে নিজেকে টপ ক্লাস ব্যাটসম্যানের কাতারেই নিয়ে গেছেন, লাল বলের ক্রিকেটে তার গড় যে ৫১.৫৪! যা কি-না সুনীল গাভাস্কার, ম্যাথু হেইডেন, স্টিভ ওয়াহ, মাহেলা জয়াবর্ধনেদের মতো বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদের চেয়েও বেশি। ওয়ানডেতেও গড়টা নেহাত মন্দ নয়, ৩৫.৩৪। ব্যাটসম্যান হিসেবে তার স্কিল এতোই উঁচু মানের ছিলো, বেশিরভাগ সফরকারী ব্যাটসম্যান যেখানে ভারতে এসে স্পিন বোলিংয়ের সামনে খাবি খেতো, অ্যান্ডি সেখানে রিভার্স সুইপের পসরা সাজিয়ে বসতেন। সাথে যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উইকেটকিপার হিসেবে করা ৩১৬ টি ডিসমিসালও যোগ করবেন, তখন অ্যান্ডির মাহাত্ম্য বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হবার কথা নয়।

কিংবদন্তির শুরু

ফ্লাওয়ার পরিবারের খেলাধুলার আবহ আগে থেকেই ছিলো। অ্যান্ডির বয়স যখন ১০ বছর, তখন তার পরিবার সাউথ আফ্রিকা ছেড়ে জিম্বাবুয়েতে চলে আসে। আর সেখানেই ক্রিকেটে হাতেখড়ি। নর্থ পার্ক স্কুলের হয়ে খেলার সময় থেকেই জুনিয়র ক্রিকেটে তার নামডাক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অসাধারণ ব্যাটসম্যান হবার কারণে স্কুল দলের অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে তাকে। স্কুল পর্যায়ের ক্রিকেটে অ্যান্ডির গড় ছিল ১০০ রানের বেশি!

১৫ বছর বয়সে তার উইকেটকিপিং শুরু। ব্যাটসম্যানশিপের মতো এখানেও খুব দ্রুতই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ রাখেন তিনি। ৩ বছর পর তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট ইউনিয়ন প্রেসিডেন্টস ইলেভেনের হয়ে। ঘরোয়া ক্রিকেটে অ্যান্ডির ধারাবাহিক পারফরম্যান্সকে বেশিদিন অগ্রাহ্য করতে পারলেন না নির্বাচকেরা। ১৯৯২ সালে বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপে তাই প্রথমবারের মতো জিম্বাবুয়ের জার্সি গায়ে খেলতে নামলেন তিনি। অভিষেক ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ১১৫ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচসেরা তিনি! ‌'স্বপ্নের মতো শুরু' বোধহয় একেই বলে।

স্বপ্নযাত্রা কিংবা অগ্রযাত্রা

অভিষেকের পর ৭ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অ্যান্ডির যাত্রা কাটলো অম্লমধুর। খারাপ সময় যেমন এসেছে, তেমনি দুর্দান্ত সব পারফরম্যান্সও করেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই অধিনায়কত্বের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়েছিলো তাকে। তবে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব তার ব্যাটিংয়ের পথে তেমন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রমাণ, অধিনায়ক থাকা অবস্থায় টেস্টে তার ব্যাটিং গড় ৪৯.২৮।

তবে ব্যাটসম্যান অ্যান্ডির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুখকর সময় এসেছে ২০০০ সালের নভেম্বরে। ভারতের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে ১৮৩ রানের অনবদ্য ইনিংস দিয়ে শুরু। ওই একই সিরিজে ৭০, ৫৫ ও অপরাজিত ২৩২ রানের তিনটি ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। সিরিজে ভারতীয় স্পিনারদের যেভাবে সাহসিকতা ও টেকনিকের সমন্বয়ে সামলেছিলেন তিনি, সেটিকে অনেকেই তার ব্যাটসম্যানশিপের চূড়ান্ত প্রদর্শনী হিসেবে গণ্য করে থাকেন।

২০০০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১৩ টি টেস্ট খেলেছেন অ্যান্ডি। টেস্টগুলোতে তার স্কোরগুলোর দিকে একবার তাকালেই বোঝা যাবে, তিনি কতোটা অসাধারণ খেলেছেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৮ ও ৬৫ ও ৭৯, ভারতের বিপক্ষে ১৮৩*, ৭০, ৫৫ আর ২৩২*, বাংলাদেশের বিপক্ষে ৭৩ ও ২৩, ভারতের বিপক্ষে ফিরতি সিরিজে ৫১, ৮৩, ৪৫, ৮* এবং সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৪২, ১৯৯*, ৬৭ ও ১৪*। ১৩ টেস্টে মোট রান ১৬৩০, গড় ১০৮.৬৭! অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? হতেই পারে!

অ্যান্ডির এরকম রান-বন্যা সত্ত্বেও জিম্বাবুয়ে এই ১৩ টেস্টের মধ্যে জিততে পেরেছিল মাত্র ৪ টি। পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই এই অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে তার। নিজে অসাধারণ খেলেও বেশিরভাগ সময় রয়ে গেছেন পরাজিত দলে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হতে পারে ২০০২ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি। ২৮৯ তাড়া করতে নেমে অ্যান্ডি খেলেছিলেন ১৪৫ রানের অসাধারণ একটি ইনিংস, কিন্তু তারপরেও সেই ম্যাচ জিততে পারেনি জিম্বাবুয়ে। কারণ দলের বাকিরা মিলে করেছিলেন মাত্র ১২৯ রান!

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও হেনরি ওলোঙ্গা

স্পর্ধা দেখে হতভম্ব জিম্বাবুয়ে সরকার!

২০০৩ বিশ্বকাপের যুগ্ম আয়োজক ছিলো সাউথ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া। এই বিশ্বকাপের সময়ই সতীর্থ হেনরি ওলোঙ্গাকে সাথে নিয়ে এক দারুণ সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। জিম্বাবুয়েতে তখন প্রচণ্ড রকম রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এই অবস্থায় নিজেদের জায়গা থেকে প্রতিবাদ জানানোর চিন্তা করলেন অ্যান্ডি ও ওলোঙ্গা। হারারেতে নামিবিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হাতে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামলেন দুজন। দুই খেলোয়াড়ের এমন স্পর্ধা আর সাহস দেখে হতভম্ব হয়ে যায় জিম্বাবুয়ে সরকার! 

শুধু তাই নয়, দুজনে মিলে একটি যৌথ বিবৃতিও দিলেন। সেই বিবৃতিতে লেখা ছিল, জিম্বাবুয়েতে এই মুহূর্তে যা হচ্ছে তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। যদিও আমরা কেবলই পেশাদার ক্রিকেটার মাত্র, কিন্তু আমাদেরও বিবেক ও অনুভূতি আছে। যদি আমরা নিশ্চুপ থাকি তাহলে এটাই প্রমাণ হবে যে, হয় এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কোন মাথাব্যথা নেই, আর নাহয় যা হচ্ছে তাতে আমাদের সমর্থন আছে। আমরা বিশ্বাস করি, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো আমাদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ।

এমন বক্তব্যের পরে যে দুজনের উপরেই শাস্তির খড়গ নেমে আসতে পারে সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন তারা। ওলোঙ্গাকে দল থেকে চিরতরে বাদ দিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু ফ্লাওয়ারের সাথে এমনটা করার সাহস পায়নি খোদ জিম্বাবুয়ে সরকারও। দলের একমাত্র ‘ব্যতিক্রমী প্রতিভা’ বিবেচনায় তাকে দল থেকে বাদ দেয়া হয়নি। কিন্তু বিশ্বকাপের সুপার সিক্স পর্ব থেকে জিম্বাবুয়ে বাদ পড়ার পর ফ্লাওয়ার নিজেই বিদায় বলে দেন, টুর্নামেন্টের সময় আমি যা করেছি তার জন্য আমার বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই। আমার একমাত্র আফসোস নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ৩৭ করে রান আউট হয়ে যাওয়াটা।

স্মরণীয় কোচিং জীবন

খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর কাউন্টি ক্রিকেটে কোচ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। শুরুতে পিটার মুরসের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন, পরে নিজেই মূল কোচের দায়িত্ব পালন শুরু করেন।  নিঃসন্দেহে ফ্লাওয়ারের কোচিং জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে কোচিং করানো। ফ্লাওয়ারের কোচিংয়েই দুইটি অ্যাশেজ জিতেছে ইংল্যান্ড। শুধু তাই নয় ক্যারিবিয়ানে গিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে, নিজেদের মাটিতে ভারতকে ৪-০ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজে হারিয়েছে এবং ভারতে গিয়ে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জিতে ফিরেছে। 

ভবিষ্যতে যদি এমন কারো উদাহরণ খোঁজা হয় যিনি কি না খেলোয়াড়, অধিনায়ক, কোচ এবং ব্যক্তি হিসেবে সমান সফল ছিলেন, চোখ বন্ধ করে বোধহয় অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের নামটাই বলে দেয়া যাবে।

ডেইলিবাংলাদেশ/এনকে