দূরবীনপ্রথম প্রহর

এক-চতুর্থাংশ স্থান তখন মুক্তিবাহিনীর দখলে...

তানভীর রাসিব হাশেমী
১৯৯৩ সালের ২০ নভেম্বর রাজধানী ঢাকার শাহজাহানপুরে জন্মগ্রহণ করেন তানভীর রাসিব হাশেমী। শহুরে আবহাওয়াতেই তার বেড়ে ওঠা। মিডিয়া স্ট্যাডিস এন্ড জার্নালিজমে অনার্স করা ছেলেটির বহু আগে থেকেই সাংবাদিকতায় ঝোঁক। ছাত্রজীবন থেকেই লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক ও অনলাইনগুলোতে। লিখেছেন ফিচার, প্রবন্ধ ও গল্প। দৈনিক মানবজমিন, আজকের কাগজ, ব্রেকিংনিউজডটকমডটবিডি ও বাংলানিউজ সহ বেশ কিছু গণমাধ্যমে কাজ করেছেন সহ-সম্পাদক ও কন্ট্রিবিউটর হিসেবে। বর্তমানে ডেইলি বাংলাদেশ’র সহ সম্পাদক ও শিফট ইনচার্জের (সকাল) দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি অব্যাহত রেখেছেন গণমাধ্যমে লেখালেখি।

সারা দেশে চলছে যুদ্ধ। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য যুদ্ধ। পুরো বাংলাদেশে একের পর এক পতন ঘটছিল পাক-হানাদারবাহিনীর শক্ত ঘাঁটিগুলো। গ্রাম থেকে পিছু হটে তারা শহরে এসে অবস্থান নিতে শুরু করে। কিন্তু ফিরে আসার পথে আশেপাশের গ্রামগুলোতে ব্যপক হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট চালায়। দেশের এক-চতুর্থাংশ স্থান মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। মুক্তাঞ্চলগুলোতে মুজিবনগর সরকারের প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

সেক্টর কমান্ডাররাও তাঁদের নিজ নিজ সেক্টর হেডকোয়ার্টার মুক্তাঞ্চলগুলোতে স্থানান্তরিত করেন। প্রায় ২ লাখ মুক্তিযোদ্ধা তখন বীর বিক্রমে রণাঙ্গনে লড়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন ক্যাম্পর প্রশিক্ষণরত ছিলেন ১৫ হাজারেরও বেশি তরুণ। শরণার্থী শিবির থেকে কত মানুষ যে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তার হিসেব নেই।

বলছিলাম একাত্তরের আজকের দিনের কথা অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর। মিত্র বাহিনীর বিমানবাহিনী ঢাকার আকাশ পুরোপুরি দখল করে নেয়। বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। আর জাতিসংঘে বাংলাদেশকে নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সব বিমান বিধ্বস্ত হয়ে যায় যৌথবাহিনীর আক্রমণে।

এদিকে বাংলাদেশকে নিয়ে মার্কিন সরকারের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসে। এতে যুদ্ধ বিরতির জন্য মার্কিন প্রতিনিধি সিনিয়র বুশের চেষ্টায় সোভিয়েত প্রতিনিধি কমরেড মালিক ‘ভেটো’ প্রয়োগ করেন। ‘ভেটো’ প্রয়োগের পূর্বে কমরেড মালিক বলেন, ‘পাক সামরিক জান্তার নিষ্ঠুর কার্যকলাপের ফলেই পূর্ব বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি উদ্ভব হয়েছে।’

মূলত, বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূল লড়াইটা ছিল দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে আর যুক্তরাষ্ট্র ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। আর বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিষদে তৃতীয় প্রস্তাবটি পেশ করে বেলজিয়াম, ইতালি ও জাপান।

ভারতীয় জঙ্গি বিমানগুলো সারাদিন অবাধে আকাশে উড়ে পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিগুলোতে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। অকেজো করে দেয় বিমান বন্দরগুলো। বিধ্বস্ত হয় বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিকাংশ বিমান। পাকিস্তানি বাহিনীর কনভয়ের উপর ভারতীয় জঙ্গি বিমান আক্রমণ চালায়। এতে পাক বাহিনীর ৯০টি গাড়ি ধ্বংস হয়। এছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্য বোঝাই কয়কেটি লঞ্চ ধ্বংস হয়।

বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ডের সফল আক্রমণে ধ্বংস হয় পাকিস্তানি সাবমেরিন গাজী। এ সাবমেরিনটি পাকিস্তানকে ধার দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এদিন নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ড চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সব নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জাহাজগুলোকে বন্দর ত্যাগের নির্দেশ দেয়। যৌথবাহিনী তাদের হুশিয়ারি দিয়ে বলেন যে আপনারা সবাই চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে চলে যান। এতে কাজ হলো। বিশ্বের সব দেশ বুঝল বংলাদেশের বন্দরগুলো রক্ষা করার কোনো ক্ষমতা পাক বাহিনীর নেই। এ সুযোগে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ও বিমানগুলো সব বন্দরকে ঘায়েল করার সুযোগ ও পেয়ে গেল।

এদিকে তখন স্থলেও মিত্রবাহিনীও এগিয়ে যাচ্ছে। পাক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। ভারতীয় বাহিনীর প্রধান সড়কগুলো অবরোধ সৃষ্টি করার ফলে ঢাকার সঙ্গে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং রংপুর আর যশোরের সঙ্গে নাটোর ও রাজশাহীর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভারতের ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন আখাউড়ার যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী আখাউড়ার দক্ষিণ এবং পশ্চিমাংশ দিয়ে অবরোধ করে।

এখানে পাকবাহিনী মিত্র বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্নসমর্পণ করে। ফলে আখাউড়া সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়। এই যুদ্ধে সুবেদার আশরাফ আলী খান, সিপাহী আমীর হোসেন, লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামান, সিপাহী রুহুল আমীন, সিপাহী সাহাব উদ্দীন ও সিপাহী মুস্তাফিজুর রহমান শহীদ হন। এদিন ১৬০ জন পাকিস্তানী সৈন্য মিত্রবাহিনীর হাতে নিহত হয়। একাত্তরের এই দিনে বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন ছিল আরও উত্তপ্ত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রধান লড়াইটা ছিল দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে।

রাজনৈতিক এ পরিস্থিতি মুক্তিযোদ্ধাদের যাতে দুর্বল না করে তোলে তাই মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণ দেন। এদিকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এর শাসক গভর্নর ডা. মালিক দেশবাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তিনি বলেন, ‘দেশ আক্রান্ত। ভারতীয়দের সহযোগিতায় কিছু বিশ্বাসঘাতক দেশ আক্রমণ করেছে। এ দেশের সেনাবাহিনী তাদের প্রতিরোধ করছে। তাদের সাহায্য করার জন্য প্রতিরক্ষা তহবিল করা হয়েছে।’ সে তহবিলে মুক্তহস্তে সাহায্য করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান। তবে তার আহ্বানে কেউ যে এগিয়ে আসেননি তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এই দিন বখশীগঞ্জে যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। মুক্ত হয় পীরগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পচাগড়, বোদা, ফুলবাড়ী, বীরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ। আর জীবননগর, দর্শনা ও কোটচাঁদপুরে পাক হানাদার বাহিনী মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে।

এছাড়া, ১৯৭১ সালের এ দিনে দু’দিক থেকে মিত্র ও মুক্তি বাহিনীর আক্রমণে যশোর সেনানিবাস ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি হানাদাররা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সর্বপ্রথম স্বাধীন হয় যশোর জেলা। এর আগে ৪ ডিসেম্বর বেনাপোল ও চৌগাছার বয়রা সীমান্ত দিয়ে হামলা শুরু করে মিত্র সেনারা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় সীমান্তবর্তী যশোর জেলা ছিল পাক হানাদারদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। বীর মুক্তিযোদ্ধারাও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এ জেলাকে স্বাধীন করতে প্রাণপণ লড়াই শুরু করে। ছিন্ন বিচ্ছিন্নভাবে পাকসেনাদের সঙ্গে তাদের তুমুল যুদ্ধ হয় চৌগাছা ও ঝিকরগাছার জগন্নাথপুর, গরীবপুর, আড়পাড়া, দিঘলসিংহা, ঢেকিপোতা, হুদোপাড়া, কদমতলা, মাশিলা, যাত্রাপুর ও সিংহঝুলি এলাকায়।

৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুরের নেতৃত্বে এ যুদ্ধে যেসব মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন। তারা জানায়, জগন্নাথপুর আম বাগান এলাকায় দুই বাহিনীর প্রচণ্ড গোলাগুলির এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের রসদ শেষ হয়। তারপরও থেমে থাকেনি লড়াই। খালি হাতেই এ সময় পাক সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা। অস্ত্রের বাট, বেয়নেট, কিল, ঘুসি, লাথি, এমনকি কুস্তাকুস্তি হয় উভয় পক্ষের মধ্যে।

ভারতের ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন আখাউড়ার যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সাথে মিলিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী আখাউড়ার দক্ষিণ এবং পশ্চিমাংশ দিয়ে অবরোধ করে। এখানে পাকিস্তানী বাহিনী মিত্রবাহিনীর সাথে যুদ্ধে টিকতে না পেরে অবশেষে আত্মসমর্পণ করে। ফলে আখাউড়া সম্পূর্ণরূপে শত্রু মুক্ত হয়। এই যুদ্ধে সুবেদার আশরাফ আলী খান, সিপাহী আমীর হোসেন, লেফট্যানেন্ট বদিউজ্জামান, সিপাহী রুহুল আমীন, সিপাহী সাহাব উদ্দীন, সিপাহী মুস্তাফিজুর রহমান শহীদ হন। আখাউড়া মুক্ত হওয়ার পর কিছু পাকিস্তানী সৈন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পালিয়ে যাওয়ার সময় মিত্রবাহিনীর হাতে নিহত হয়। এ দিনেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে; কিন্তু রাশিয়ার ভেটোর কারণে তা বরবাদ হয়ে যায়।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধে বিভিন্ন দেশ নিজেদের কোন পক্ষে জড়াবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয় বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারণী মহলে। চীনের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সীমানা মেনে ভারতীয় বাহিনীকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় জাতিসঙ্ঘে প্রস্তাব উত্থাপন করে। ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার জন্য চীনের পক্ষ থেকে ভারতকেই দায়ী করা হয় স্পষ্টভাবে। অন্য দিকে রাশিয়াও জাতিসঙ্ঘে উত্থাপিত এক প্রস্তাবে জানায় যুদ্ধবিরতির আগে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান আগে করতে হবে। পাকিস্তান রক্ষায় বঙ্গোপসাগরে কেউ কোনো নৌ জাহাজ পাঠালে তারাও ভারতের আক্রমণের শিকার হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক/নয়াদিগন্ত/যুগান্তর

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ

daily-bd-hrch_cat_news-23-10