একাত্তরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু

একাত্তরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু

সাহিদা আফরিন মিথিলা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:২১ ১৭ মার্চ ২০২০  

সংগৃহীত

সংগৃহীত

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি হল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমেই অর্জিত হয় বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন এ স্বাধীনতা। ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতার গৌরবময় অধ্যায়টি রচনা করতে জাতিকে প্রত্যয়ী করেছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

পাকিস্তানি বাহিনীর শাসন-শোষণ, নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা-লুণ্ঠন সীমা ছাড়িয়ে গেলেও স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি। এ যুদ্ধে প্রস্তুতি গ্রহণে দেশের মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে এক বাঙালি নেতার বজ্রকন্ঠ। বাঙালি জাতির মনে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে জাগ্রত করেন মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

ছয় দফা ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত সংগ্রামের দিকে ধাবমান করেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করে বাঙালি জাতি। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সে যুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর সাফল্য পায় বাঙালিরা। বিশ্ব মানচিত্রে নাম ওঠে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামক দেশটি।

মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও। সেসব গণমাধ্যমে লেখাগুলো বিভিন্নভাবে সাহস যুগিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরদার হয়েছে বিশ্ব জনমত, সুগম হয়েছে বিজয় অর্জনের পথ।

বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও সোচ্চার ছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।

বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে মুহূর্তেই ছড়িয়ে দেয় নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটস ম্যান, ফিনান্সিয়াল টাইমস, বিবিসি, টাইম ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন বিদেশি গণমাধ্যমগুলো।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রতিবেদন:
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ব্রিটিশভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে ইউডিআই (পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র) নামক শিরোনামে লেখা হয়: গত রাতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। সেখানে সরকারি সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

একইদিনে ব্রিটিশ আরেকটি সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসে 'শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন ঘোষণা করায় তীব্র বিক্ষোভ' শিরোনামে লেখে: প্রাদেশিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র ঘোষণা করার পর গত রাতে ওই অঞ্চলটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

জাপানি পত্রিকা দ্য ইওমিউরি 'স্বাধীনতা ঘোষিত' শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ করে। সেখানে পত্রিকাটি লেখে: আজ পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।

১৯৭১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি লন্ডন টাইমস লেখে, জনগণের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বিবৃতিতে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এর পরিবর্তে: ‘বাঙালি জাতির’ কথা উল্লেখ করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান।

একদিন পরেই ২৪ ফেব্রুয়ারি লিভারপুল ডেইলি পোস্ট লেখে: পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেতে পারে বলে এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থাৎ নিজেদের স্বাধীন বাঙালি মুসলিম প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করবে পূর্ব পাকিস্তান।

৩ মার্চ ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনের খবর প্রকাশ করে লেখে: আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ৭ই মার্চ একটি জনসভা করবে আওয়ামী লীগ। সেই সভায় বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের কর্মসূচি প্রদান করবেন তিনি।

৯ মার্চে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফের এক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ২৫ মার্চে জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের পূর্বশর্ত হিসেবে প্রদত্ত দাবির মধ্যেই একথা লুকানো রয়েছে।

একইদিনে ডেইলি টেলিগ্রাফ এর সম্পাদকীয়তে আরেকটি মন্তব্যে লেখা হয়: এরইমধ্যে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের সম্ভাব্য নামকরণ শুনেছি আমরা। সেটি বাংলাদেশ অথবা বঙ্গভূমি হতে পারে। এরইমধ্যে পতাকাও বানানো হয়েছে।

১৫ মার্চ নিউইয়র্ক ভিত্তিক ‘টাইম’ সাপ্তাহিক লেখে: গত সপ্তাহে ঢাকায় শেখ মুজিব টাইম-এর সংবাদদাতা ডন কগিনকে বলেছেন, বর্তমান পাকিস্তানের মৃত্যু হয়েছে, সমঝোতার আর কোনো আশা নেই।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রথম পাতায় নতুন দিল্লি থেকে তাদের সাংবাদিক ডেভিড লোমাক-এর পাঠানো সংবাদের ভিত্তিতে ‘পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ: শেখকে দেশদ্রোহী বলেছেন প্রেসিডেন্ট’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা লেখা হয়।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকা ২৫-২৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ প্রকাশ করে। স্বাধীনতার ঘোষণা শিরোনামের নিচে লিখা ছিল, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা দিলে সেখানে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৯৪ সালের ‘দ্য আটলান্টিক মান্থলী’ পত্রিকায় ‘হোয়াট মেকস এ গুড লিডার’ প্রবন্ধে মার্কিন লেখক গ্যারী উইলস বলেন, নেতা, অনুসারী এবং লক্ষ্য নেতৃত্ব বৃত্তের তিন উপাদান। তিনি আরো লেখেন, একজন নেতার প্রয়োজনীয় গুণাবলি হলো- ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা, ব্যক্তিত্বের সম্মোহনী ক্ষমতা এবং জনগণের সামনে স্পষ্ট এমন একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যম ও উদ্যোগে নেতৃত্ব দেয়ার মতো দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা।

উল্লেখিত এসব উপাদানই বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী নেতৃত্বের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তখনকার সংবাদ বিশ্লেষণ নিশ্চিতভাবেই সাক্ষ্য দেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের রক্তস্নাত গৌরব বঙ্গবন্ধুর হাতে পরিণতি প্রাপ্ত, প্রথম বাংলাদেশ সরকারের (নির্বাচিত) নেতৃত্বে মরণপণ যুদ্ধের মাধ্যমে সূচিত। এই নেতৃত্বকে নির্বাসন, আন্দোলন বা নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরাভূত করা যায় না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস