Alexa একদিনে দুই জেলা ভ্রমণ!

একদিনে দুই জেলা ভ্রমণ!

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:০৫ ১৫ জুলাই ২০১৯  

পুঠিয়া যেন মন্দিরের শহর

পুঠিয়া যেন মন্দিরের শহর

রাজশাহী থেকে বাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে সময় লাগলো এক ঘণ্টা। সেখান থেকেই চলে গেলাম ছোট সোনা মসজিদ। তখন সকাল ১১টা। বিশ টাকার নোটে এই ঐতিহাসিক মসজিদের ছবি আছে। এটি সুলতানি আমলের স্থাপনা। এটি নির্মাণের সময় জেলাটির শিবগঞ্জ থানা ছিল প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের অংশ।

১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে এটি নির্মিত হয়। দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা যথাক্রমে ৮২, ৫২ ও ২০ ফুট। এটি ইটের তৈরি, কুসুম্বা মসজিদের মতই পাথর দিয়ে ঘেরা। কাছে গেলে দেয়ালে খোদাইয়ের কাজ চোখে পড়ে। এতে মোট ১৫টি গম্বুজ। স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য নিয়ে লিখে শেষ করা যাবেনা। মসজিদের সামনে বেশ কিছু প্রাচীন কবর আছে। আর মসজিদের সীমানার ভেতরে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি। বীরশ্রেষ্ঠর পাশেই শায়িত আছেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হক।

এরপর আমরা গেলাম খানিয়াদীঘি মসজিদে। এটি সোনা মসজিদের কাছেই। ধারণা করা হয়, ১৪৮০ সালে কোনো এক রাজবিবি এটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের কাছে বিশাল এক দীঘি রয়েছে। এটি খানিয়াদীঘি মসজিদ নামেই পরিচিত। স্থাপত্যের ধরণ অনেকটা আগের মসজিদগুলোর মতই। দেয়ালে পাথুরে কারুকার্য আছে। তবে এটি আকারে ছোট। খানিয়াদীঘি মসজিদের কাছেই দারাসবাড়ি মসজিদ। শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুরের দারাসবাড়িতে যেতে বেশিক্ষণ লাগেনি।

ছোট সোনা মসজিদ

কুসুম্বা, সোনা মসজিদ বা খানিয়াদীঘি মসজিদের মতো দারাসবাড়ি মসজিদ ব্যবহার উপযোগী নয়। বেশ আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে। ছাদ ধ্বসে গেছে। ভেতরে ঘাস, লতাপাতা ও আগাছা জন্ম নিয়েছে। তবে চারদিকের দেয়ালগুলো এখনো এটির স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতা জানান দেয়। দেয়ালের কারুকার্য বেশ ভালো ভাবে টিকে আছে এখনো। ১৪৭৯ সালের দিকে শামসুদ্দিন আবুল মুজাফফর ইউসুফ শাহ দারাসবাড়ি মসজিদ নির্মাণ করেন। পোড়ামাটির নকশা বা টেরাকোটায় মোড়ানো দেয়াল এটির অনন্য বৈশিষ্ট্য। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। 

মসজিদ দর্শন শেষে আমরা আবার রাজশাহী ফিরলাম। এবারের উদ্দেশ্য পুঠিয়া রাজবাড়ি দর্শন। এবারের যাত্রায় এটাই আমাদের শেষ স্থাপনা দর্শন। পুঠিয়া রাজবাড়ির গোড়াপত্তন মোঘল আমলে। সপ্তদশ শতকে মুঘল আমলে জনৈক নীলাম্বর সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করার পর পুঠিয়া রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৭৪৪ সালে জমিদারি ভাগ হয়। সেই ভাগাভাগিতে জমিদারের বড় ছেলে পান সম্পত্তির সাড়ে পাঁচআনা এবং অন্য তিন ছেলে পান সাড়ে তিনআনা। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত জমিদারি প্রথা ছিল। প্রথা বিলুপ্ত হলে পুঠিয়া রাজবাড়ির জমিদারিও বিলুপ্ত হয়।

১৮৯৫ সালে রাজবংশের সর্বশেষ উত্তরাধিকারী হেমন্তকুমারী দেবী তার শাশুড়ি রাণী শরৎ সুন্দরী দেবীকে উৎসর্গ করে এই বাড়ি নির্মাণ করেন। রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণের স্ত্রী শরৎ দেবী খুব অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিলেন। মারা যান ৩৭ বছর বয়সে। তাদেরই উত্তরাধিকারী হেমন্তকুমারী, যার মৃত্যুর পর রাজবাড়ি জৌলুশ হারাতে থাকে। তবে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর বর্তমানে বাড়িটিকে যত্নের সঙ্গে সংস্কার করে জাদুঘর তৈরি করছে।

পুঠিয়া রাজবাড়ির সামনে স্তম্ভ, অলংকরণ, কাঠের কাজ, ফুল ও লতাপাতার নকশা চমৎকার নির্মাণশৈলি ফুটিয়ে তোলে। রাজবাড়ির আশেপাশে ছয় একর আয়তনের ছয়টি দিঘী রয়েছে। মন্দিরও আছে ছয়টি। সবচেয়ে বড় হচ্ছে শিব মন্দির। এছাড়া রাধাগোবিন্দ মন্দির, গোপাল মন্দির, গোবিন্দ মন্দির, দোলমঞ্চ ইত্যাদি রয়েছে। প্রতিটি মন্দিরের দেয়ালেই অপূর্ব সব পোড়ামাটির ফলকের কারুকাজ। তবে রানির স্নানের ঘাট, অন্দর মহল মিলিয়ে বিশাল এই রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ।

রাজবাড়ির একেকটি মন্দিরের গায়ের পোড়া মাটির কাজ দেখলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হবেন। পুঠিয়ায় এককালে ২১টি মন্দির ছিল, এখন এর ১৩টি টিকে আছে। এক এক করে আমরা বেশকিছু মন্দির ঘুরে দেখলাম। সবশেষে দেখলাম ভুবনেশ্বর পঞ্চরন্ধ্র বড় শিবমন্দির। চারপাশে এত মন্দির, জায়গাটিকে মন্দিরের শহর বললে ভুল হবেনা। আর প্রতিটির স্থাপত্যশৈলী যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।

সন্ধ্যা ৭টায় ভুবনেশ্বর মন্দিরের সিঁড়ি ধরে নামার সময় টের পাচ্ছিলাম, এবারের মত সফরের সমাপ্তি এখানেই। সবে সূর্য ডুবেছে। ফিরতে মন চাইছিল না। কিন্তু ফিরতে তো হবেই। দুইদিনের দারুণ অভিজ্ঞতা আর স্মৃতি একেরপর এক চোখে ভাসছিল। সবার চোখেমুখে বিষাদের ছায়া। চোখের পলকে কেটে গেল সময়টা। ঘড়ির কাটার মত করে আমাদের গাড়িও চলতে লাগল ঢাকার উদ্দেশ্যে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে

Best Electronics
Best Electronics