Alexa একটি বিড়ালকে পরিত্যাগ করার গল্প

একটি বিড়ালকে পরিত্যাগ করার গল্প

হারুকি মুরাকামি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:০৯ ২৯ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

(গল্পটির ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ। অনুবাদটির স্বত্ব সংরক্ষিত)

আমার পিতার সাথে আমার অনেক স্মৃতি আছে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ একটা ক্ষুদ্র বাসস্থানে একই ছাঁদের নীচে তার সাথে একাধারে আঠার বছর বসবাস করেছিলাম আমি। এর পর আমি বাড়ি ছেড়ে চলে আসি। পৃথিবীর বেশীর ভাগ সন্তানদের মত, আমার ধারনা হল যে, পিতার সাথে আমার কিছু কিছু স্মৃতি ছিল সতত সুখের এবং কিছু কিছু স্মৃতি তেমন সুখের নয়। কিন্তু যে স্মৃতিগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেগুলোকে এই দুই শ্রেণীর কোনটাতেই ফেলা যাবে না। সেগুলো ছিল আরও সাধারণ ধরণের। 

এই যেমন, নীচেরটাঃ 
আমরা শুকুগাওয়াতে (নিশিনোমিয়া শহরের অংশ, হাইওগো অঞ্চলে) বাস করতাম। একদিন আমরা সৈকতে গিয়েছিলাম একটা বিড়ালকে ছেড়ে দিয়ে আসতে। কোন বাচ্চা বিড়াল নয়। বয়স্কা স্ত্রী বিড়াল। আমরা কি কারণে সেটাকে পরিত্যাগ করতে চেয়েছিলাম, তা আমার মনে নেই।

আমরা যে বাড়িতে বাস করতাম, তা ছিল একটি একক পরিবারের বাসস্থান। বাড়িটির সাথে লাগোয়া একটা বাগান ছিল। সেই বিড়ালটির জন্যেও যথেষ্ট জায়গা ছিল। হতে পারে যে, আমরা যখন তাকে এনেছিলাম তখন সে একটি মালিকহীন পথের বিড়াল ছিল, কিন্তু আমাদের বাড়িতে আগমনের পর সে গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল। সম্ভবত আমার পিতামাতা একারণেই একে আর প্রতিপালন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আমার স্মৃতি খুব স্পষ্ট নয়। এছাড়াও বিড়ালকে পরিত্যাগ করা সেই সময়ে ছিল একটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। এটা এমন কোন ব্যাপার ছিল না, যার জন্যে লোকে সমালোচনা করতে পারত। আসলে বিড়ালটিকে প্রতিপালন করার কোন চিন্তাই আমাদের কারও মাথায় ছিল না। আমি তখন প্রাইমারী স্কুলের নীচের ক্লাসে পড়তাম। সম্ভবত সেটা ছিল ১৯৫৫ সাল। আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল একটি ইমারতের ধ্বংসাবশেষ। বিগত যুদ্ধের দৃশ্যমান ক্ষত ছিল সেটা। আমেরিকান বিমান থেকে সেটার উপরে বোমা ফেলা হয়েছিল। 
গ্রীষ্মের এক পড়ন্ত বিকেলে আমি ও আমার পিতা বিড়ালটিকে সৈকতে ছেড়ে এসেছিলাম। তিনি বাইসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং আমি পিছনের সীটে বসেছিলাম একটা বাক্স হাতে নিয়ে, যেটার ভেতরে বিড়ালটি ছিল। আমরা শুকুগাওয়া নদীর তীর ধরে চলছিলাম এবং সৈকতে পৌঁছেছিলাম কোরোয়েন এলাকায়। সেখানে বাক্সটিকে কয়েকটা গাছের ভেতরে নামিয়ে রেখে, আমরা বাড়ির দিকে যাত্রা করেছিলাম। একবারও পিছন ফিরে তাকাইনি। সৈকতটা ছিল আমাদের বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। 

বাড়িতে ফেরার পর সাইকেল থেকে নেমে আমি পিতার সাথে বিড়ালটিকে ছেড়ে আসার জন্যে দুঃখিত হওয়া নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের কিই বা করার ছিল? কিন্তু পরক্ষণেই বাড়ির সামনের দরজা খুলতেই পরিত্যাগকৃত বিড়ালটি তার লম্বা লেজটিকে খাঁড়া করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ মিউমিউ শব্দ করে আমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছিল। সেটা আমাদের পূর্বেই বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু কীভাবে সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। আমার পিতাও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা দুজনেই সেখানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম কিছুক্ষণ। আমার পিতার দৃষ্টি ছিল পরিপূর্ণ বিস্ময়ের। তিনি সপ্রশংস দৃষ্টিতে সেটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার মুখে প্রশান্তির আনন্দ দেখা গিয়েছিল। এবং ফিরে আসার পর বিড়ালটা আমাদের পোষা হয়ে গিয়েছিল। 

আমাদের বাড়িতে সব সময়েই বিড়াল ছিল, এবং আমরা সেগুলোকে পছন্দ করতাম। আমার কোন ভাই-বোন ছিল না। বিড়াল ও বইই ছিল আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। আমার বেড়ে উঠার সময়ে। আমি বারান্দায় বিড়াল নিয়ে বসে সূর্যের আলো পোহাতে পছন্দ করতাম।

তাহলে বিড়ালটিকে নিয়ে কেন আমরা সৈকতে গিয়েছিলাম সেটাকে ছেড়ে দিয়ে আসার জন্যে? আমিই বা কেন প্রতিবাদ করিনি? আর কীভাবে বিড়ালটা আমাদেরকে পরাজিত করে আমাদের পূর্বেই বাড়িতে পৌঁছেছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও আমি পাইনি। 

আমার পিতার সাথে আরেকটি স্মৃতি হল নিম্নরূপঃ 
প্রতিদিন সকালের ব্রেকফাস্টের পূর্বে আমার পিতা বাড়িতে বুদ্ধের একটা মূর্তির সামনে বসে থাকতেন এবং নিমীলিত চক্ষে অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে বুদ্ধের সূত্রগুলো পাঠ করতেন। ওটা কোন মঠ ছিল না। ছিল একটা গোলাকার কাঁচের গোলক, যার ভেতরে বুদ্ধের মূর্তি খাঁজ কেটে আঁকা ছিল। প্রচলিত বৌদ্ধ মন্দিরে না গিয়ে আমার পিতা কেন একটা কাঁচের গোলকের সামনে সুত্রগুলো আবৃত্তি করতেন, সেটাও আমার জবাব না পাওয়া প্রশ্নগুলোর অন্যতম। 
নিঃসন্দেহে এটা তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা অর্চনা ছিল, যা দিয়ে তিনি তার প্রাত্যহিকের দিন শুরু করতেন। আমি যতদূর জানি, এই অর্চনা পালন করতে তিনি কখনই ভুলে যাননি, এবং এই অনুষ্ঠান পালনে তাকে বাঁধা দিতেও কেউ পারেনি। তিনি কাজটি গভীর নিমগ্নতার সাথেই সম্পন্ন করতেন। সুতরাং আমরা যদি একে শুধুমাত্র দৈনন্দিন অভ্যাস বলে অভিহিত করি, তবে তা সঠিক হবে না। 

শিশুকালে আমি তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, কার জন্যে তিনি এই প্রার্থনা করে থাকেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধে যারা মৃত্যুবরণ করেছিল তাদের জন্যে। যেমন, তার সঙ্গী জাপানী সৈন্যগণ, এমনকি চীনা সৈনিকগণের জন্যেও। এর চেয়ে বেশী তিনি ব্যাখ্যা করেননি। এবং আমিও তাকে এবিষয়ে আর চাপাচাপি করিনি। আমার ধারণা আমি জোর করলে হয়ত তিনি আমাকে আরও কিছু বলতেন। কিন্তু আমি তা করিনি। নিশ্চয়ই আমার ভেতরে কিছু একটা ছিল, যা আমাকে এই অতিরিক্ত অন্বেষণ করা থেকে বিরত রেখেছিল। 

আমার পিতার অতীত জীবন সম্পর্কে এই মূহুর্তে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তার পিতা, অর্থাৎ আমার দাদা বেনসিকি মুরাকামির জন্ম হয়েছিল আইচি এলাকার একটি কৃষক পরিবারে। সেই সময়ের প্রথা অনুসারে পরিবারের ছোট ছেলে হিসেবে তাকে কাছের একটা মন্দিরে প্রেরণ করা হয়েছিল। ভিক্ষু হিসেবে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্যে। তিনি একজন নম্র স্বভাবের ছাত্র ছিলেন। বিভিন্ন মন্দিরে শিক্ষানবিশ সময় পার করার পর তাকে কিয়োটো শহরের এনিওজি মন্দিরের প্রধান ভিক্ষু হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল। এই মন্দিরের অধীনে পাঁচ শত পরিবার ধর্মচর্চা করত। সুতরাং তার জন্যে এটা বড় ধরণের উত্তরণ ছিল বলেই বিবেচনা করা যেতে পারে। 

আমি বড় হয়েছিলাম ওসাকা-কোবে এলাকায়। কাজেই দাদার বাড়ি ও কিওটো মন্দিরে যাওয়া-আসার খুব বেশী সুযোগ আমার ছিল না। সুতরাং তার সম্পর্কে আমার স্মৃতির সংখ্যা খুবই কম। তবে আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি, সেই অনুযায়ী তিনি একজন সংস্কারমুক্ত মানুষ ছিলেন। পানাসক্তির জন্যে তার পরিচিতি ছিল। তার নামের প্রথম অংশ ‘বেন’ অর্থ হল বাগ্মিতা। এটাকে সার্থক করে তিনি অসাধারণ ধরণের বাকপটু মানুষ ছিলেন। আপাতভাবে তিনি জনপ্রিয়ও ছিলেন। আমার কাছে তাকে মনে হয়েছে দরাজ কন্ঠের একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষ হিসেবে। 

আমার দাদার ছয় ছেলে-সন্তান ছিল। একটাও মেয়ে ছিল না। তিনি ছিলেন স্বাস্থ্যবান ও উদার হৃদয়ের মানুষ। কিন্তু ১৯৫৮ সনের ২৫ আগস্ট তারিখ সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কেইশিন রেলক্রসিং অতিক্রম করার সময়ে ট্রেন তাকে ধাক্কা দিলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সেই সময়ে তার বয়স হয়েছিল সত্তুর বছর। কেইশিন রেলক্রসিংটি ছিল পাহারাহীন। একই দিনে কিনকি এলাকায় একটা বিশাল টাইফুন হয়েছিল। সারাদিন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার দাদা একটা ছাতা বহন করছিলেন এবং সম্ভবত বাঁকের দিক থেকে যে ট্রেনটি আসছিল তা তিনি দেখতে পাননি। অবশ্য তিনি কানেও কিছুটা কম শুনতেন। 

আমার মনে আছে দাদা মারা যাওয়ার রাতে আমার পিতা কিওটোতে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নেয়ার সময়ে আমার মা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন এবং বলছিলেন,”তুমি যাই কর না কেন, মন্দিরের দায়িত্ব নিতে রাজী হইয়ো না।“ সেই সময়ে আমার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর, কিন্তু এই স্মৃতির প্রতিচ্ছবিটা আমার মগজের ভেতরে আটকে আছে, সাদা-কাল সিনেমার স্মরণীয় কোন দৃশ্যের মত। আমার পিতার মুখভঙ্গি ছিল নির্বিকার। তিনি নীরবে মাথা নাড়ছিলেন। আমার ধারণা তিনি নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। 

আমার পিতার জন্ম হয়েছিল ১৯১৭ সালের পহেলা ডিসেম্বর তারিখে। কিওটোর অধীন সাকিও-কু’র অন্তর্গত আ ওয়াটা-গুচি এলাকায়। তিনি যখন শিশু ছিলেন, তখন শান্তিপূর্ণ তাইসু গণতন্ত্রের সময় শেষ হয়ে এসেছিল। এর অব্যবহিত পরেই এসেছিল বিশাল মন্দা, চীন-জাপান যুদ্ধ ও বিয়োগান্তক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সবশেষে এসেছিল যুদ্ধপরবর্তী অস্থিরতা ও দারিদ্র। এই সময়ে আমার পিতার প্রজন্ম বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছিল। আমি পূর্বেই বলেছি যে, আমার পিতারা ছিলেন ছয় ভাই। এদের মধ্যে তিনজন চীন-জাপান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সবাই অলৌকিকভাবে কোন ধরণের আহত হওয়া ছাড়াই বেঁচে গিয়েছিলেন। 

ছয় ভাইয়ের প্রত্যেকেই কমবেশী ভিক্ষু হবার জন্যে যোগ্য ছিলেন। তাদের সবারই এ সংক্রান্ত শিক্ষা ছিল। আমার পিতাকে ভিক্ষু হিসেবে যে পদমর্যাদা দেয়া হয়েছিল, তা মোটামুটিভাবে সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদের সমতুল্য ছিল। গ্রীষ্মকালে পূর্বপুরুষদেরকে সম্মান করার বার্ষিক উৎসবে ছয় ভাইয়ের সকলেই কিওটোতে জড় হতেন এবং নিজেদের মধ্যে মন্দিরের পূজারীদেরকে ভাগ করে নিতেন। উৎসবটি পরিচালনার জন্যে। এরপর রাতের বেলায় তারা একত্রিত হতেন এবং সবাই মিলে মদ্যপান করতেন।

আমার দাদার মৃত্যুর পর মন্দিরের ভিক্ষুর দায়িত্ব কে পালন করবেন, তা নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। দাদার সকল পুত্রেরাই বিবাহিত ও চাকুরীজীবি ছিলেন। সত্য বলতে কি, কোন পুত্রই আশা করেনি যে, তাদের পিতা এত তাড়াতাড়ি ও আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন। 

আমার বড় চাচার নাম ছিল শিমেই মুরাকামি। তার ইচ্ছে ছিল পশুডাক্তার হবার। কিন্তু যুদ্ধের পর তিনি ট্যাক্স অফিসে চাকুরী নিয়েছিলেন। ওসাকা এলাকায়। বর্তমানে তিনি একটা সাবসেকশনের প্রধান। দ্বিতীয় পুত্র অর্থাৎ আমার পিতা কানসাই এলাকার সম্মিলিত কোনিও গাকুইন জুনিওর ও সিনিয়র হাইস্কুলে জাপানী ভাষার শিক্ষক ছিলেন। আমার অন্য চাচারাও হয় শিক্ষক ছিলেন, নতুবা বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কিত স্কুলে পড়াশুনা করতেন। তাদের দুইজন ভাইকে অন্য পরিবারেরা দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিল, যা সেই সময়ে সাধারণ চল ছিল। যাই হোক, কোন ভাইই এককভাবে মন্দিরের দায়িত্ব গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। কারণ বড় কোন মন্দিরের প্রধান ভিক্ষু হওয়া কোনক্রমেই সহজ কাজ ছিল না। যেকোন পরিবারের জন্যেই এই দায়িত্ব ছিল বোঝা স্বরূপ। সকল ভাইয়েরাই বিষয়টি খুব ভাল করেই জানত। এছাড়া আমার বিধবা দাদী ছিলেন একজন অনমনীয় কিন্তু বুদ্ধিহীন মহিলা। তার মত প্রধান ভিক্ষুর স্ত্রীর সাথে চলা তার পুত্রবধূদের জন্যে আসলেই কঠিন ছিল। আমার মা ছিলেন ওসাকা অঞ্চলের সেনবা এলাকার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। তিনি ছিলেন একজন ফ্যাশনদুরস্ত মহিলা। কোনভাবেই তার প্রকৃতি কিওটো এলাকার প্রধান ভিক্ষুর স্ত্রীর সঙ্গে মিলত না। সুতরাং এটা অবাক করার মত বিষয় ছিল না যে, তিনি অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে আমার পিতাকে অনুরোধ করেছিলেন মন্দিরের দায়িত্ব না নেয়ার জন্যে। 

অন্তত আমার দৃষ্টিতে, সন্তান হিসেবে পিতাকে আমার অকপট ও দায়িত্ববান ব্যক্তি বলেই হয়েছে। তিনি তার পিতার মত উদার হৃদয়ের ছিলেন না। কিছুটা বিচলিত ও অন্তর্মুখী প্রকৃতির ছিলেন। কিন্তু নম্র আচরণ ও মিতভাষীতার কারণে চারপাশের লোকজন তাকে যথেষ্ট পছন্দ গ্রহণ করত। আন্তরিকভাবেও তিনি বিশ্বাসী প্রকৃতির ছিলেন। সম্ভবত তিনি ভাল ভিক্ষু হতে পারতেন, এবং এটা তিনিও জানতেন। আমার বিশ্বাস তিনি একা থাকলে এই দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে তেমন প্রতিবাদ করতেন না। কিন্তু তার ক্ষুদ্র পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ তাকে তা করতে দেয়নি। 

অবশেষে আমার জ্যেষ্ঠ চাচা শিমেই তার ট্যাক্স অফিসের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে প্রধান ভিক্ষু হিসেবে দাদার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার পূত্র, অর্থাৎ আমার চাচাত ভাই জুনিচি তাকে প্রতিস্থাপন করেছিল। জুনিচির মতে তার পিতা শিমেই প্রধান ভিক্ষু হবার বিষয়ে সম্মতি প্রদান করেছিলেন শুধুমাত্র জেষ্ঠ সন্তান হিসেবে তার বাধ্যতা থেকে। কিন্তু আমি মনে করি, এটা ছাড়া তার আর কোন পথ ছিল না। সেই সময়ে মন্দিরের পূজারিরা বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশী প্রভাবশালী ছিল, এবং সম্ভবত তারা তাকে এই দায়িত্ব থেকে কখনই অব্যাহতি দিত না। 

আমার পিতা যখন বালক ছিলেন, তখন তাকে শিক্ষানবিশ হিসেবে নারা এলাকার এক মন্দিরে প্রেরণ করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল যে, হয়ত তাকে ভিক্ষুর পরিবার দত্তক হিসেবে গ্রহণ করবে। কিন্তু শিক্ষানবিস সময় অতিক্রম করার পর তিনি কিয়োটোতে আমাদের বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। আপাতভাবে তার ফিরে আসার কারণ ছিল কিয়োটর ঠান্ডা। এটা তাকে শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তুলেছিল। কিন্তু আসল কারণ সম্ভবত ছিল যে, তার পক্ষে নতুন কোন পরিবেশে খাপখাওয়ানো সম্ভব ছিল না। বাড়িতে প্রত্যাবর্তনের পর পরিবারের সন্তান হিসেবেই তিনি পূর্বের মত বাস করতেন। কিন্তু আমার ধারনা যে, সেখানকার অভিজ্ঞতা তার ভেতরে একটা গভীর মানসিক ক্ষত হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়ে আমার পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে কোন সাক্ষ্য উপস্থিত করা সম্ভব নয়, তবে কিন্তু তার আচরণের ভেতরে এমনকিছু ছিল, যা আমাকে এরকম ভাবতে শিখিয়েছিল। 

আমি এখনও বিড়ালটি কর্তৃক আমাদেরকে পরাজিত করে আমাদের পূর্বেই বাড়িতে ফিরে আসার পর আমার পিতার সেই মুখের অভিব্যক্তি স্মরণ করতে সক্ষম। সেটা ছিল প্রথমে বিস্ময়, তারপর সপ্রশংস দৃষ্টি এবং অবশেষে মুক্তির আনন্দ। 
ব্যক্তিগত জীবনে এধরণের কিছু সম্পর্কে আমি কখনই অভিজ্ঞতা লাভ করিনি। একটা সাধারণ পরিবারের একমাত্র সন্তান হিসেবে মোটামুটি আদরযত্নের ভেতরেই আমি বড় হয়েছিলাম। সুতরাং আমি বুঝতে সক্ষম নই যে, কোন সন্তানকে যখন তার পিতামাতা পরিত্যাগ করে, তখন তার ভেতরে কী ধরণের মানসিক ক্ষতের সৃষ্টি হয়। আমি শুধু ভাসাভাসা ভাবে বিষয়টি কল্পনা করতে পারি। 

ফরাসী চলচ্চিত্র পরিচালক François Truffaut বাল্যকালে কিভাবে তাকে পিতামাতা থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল সে সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন। সারা জীবন ধরে তিনি তার চলচ্চিত্রে বিষয় হিসেবে পরিত্যাগ করার ইতিবৃত্তকে বেছে নিয়েছেন। বেশীর মানুষেরই সম্ভবত এমনকিছু মন খারাপ করা অভিজ্ঞতা আছে, যা তারা কখনই শব্দে প্রকাশ করতে সমর্থ হন না, কিন্তু তারা সেগুলো ভুলতেও পারেন না। 

আমার পিতা হিগাশিমিয়া জুনিওর হাই স্কুল থেকে ১৯৩৬ সনে পাশ করেন এবং আঠার বছর বয়সে Jōdo Buddhism সম্পর্কে পড়াশুনার জন্যে উচ্চতর হাইস্কুলে ভর্তি হন। ছাত্রদেরকে সাধারণত পড়াশুনার জন্যে সামরিক চাকুরী হতে চার বছরের জন্যে অব্যাহতি দেয়া হয়, কিন্তু আমার পিতা কিছু প্রশাসনিক কাগজপত্র বিষয়ে ভুল করার কারণে, তাকে দুই বছর পর অর্থাৎ ১৯৩৮ সনে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তার কৃত ভুলটি ছিল পদ্ধতিগত, কিন্তু এটা এমন ভুল যা হয়ে যাবার পর স্বীকার করেও শোধরানো যায় না। আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনী এরকমেরই। তারা সকল সময়েই প্রোটোকলকে অনুসরণ করে থাকে। 

আমার পিতার ইউনিট ছিল ২০তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট, যা ১৬তম ডিভিশনের অধীন ছিল। এই ডিভিশনটি মূলত চারটি ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট নিয়ে গঠিত হয়েছিলঃ ৯ম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট (কিওটো), ২০তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট (ফুকুসিয়ামা), ৩৩ তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট (সু সিটি, মি এলাকা), এবং ৩৮ তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট (নারা)। এটা আমার কাছে স্পষ্ট নয় যে, আমার পিতা কিওটো শহরের অধিবাসী হওয়া স্বত্বেও কেন তাকে স্থানীয় ৯ম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে বদলী না করে দূরবর্তী ফুকুসিয়ামা এলাকাতে প্রেরণ করা হয়েছিল। 

আমি দীর্ঘদিন যাবত এরকমই ভাবতাম। কিন্তু যখন আমার পিতার পটভূমি নিয়ে গভীরভাবে ভাবলাম, তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার বোঝাটা ভুল ছিল। প্রকৃতপক্ষে আমার পিতা ২০তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সদস্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন ১৬তম ট্রান্সপোর্ট রেজিমেন্টের সদস্য। এই ইউনিটও ১৬তম ডিভিশনের অংশ ছিল। এই ইউনিট ফুকুসিয়ামাতে অবস্থিত ছিল না। এর সদরদপ্তরের অবস্থান ছিল কিয়োটো শহরের ফুকাকুশা/ফুসিমি এলাকায়। তাহলে কেন আমার কাছে মনে হয়েছিল যে, আমার পিতা ২০তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের ছিলেন? এই বিষয়টি আমি পরবর্তীতে আলোচনা করব। 

নানজিং শহরের পতনের পর ২০তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট সেখানে প্রথম আগমন করেছিল। কিয়োটো হতে আসা ইউনিটগুলো সাধারণভাবে প্রশিক্ষিত ও উঁচুমানের হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এই ইউনিটের বিষয়টি ছিল আরও ভিন্ন ধরণের। এই রেজিমেন্টের কার্যক্রম সেটিকে অসাধারণ খ্যাতি দিয়েছিল। অনেকদিন ধরে আমি ভাবতাম যে, আমার পিতা নানজিং আক্রমণে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে এবিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমি কখনই আগ্রহী ছিলাম না। এমনকি ২০০৮ সনের আগস্ট মাসে নব্বই বছর বয়সে যখন আমার পিতা মৃত্যুবরণ করেন তার পূর্বেও নয়। তখনও আমি তাকে জিজ্ঞেস করিনি। আসলে এবিষয়ে কখনই তার সাথে আমার আলাপচারিতা হয়নি। 

১৯৩৮ সনের আগস্ট মাসে আমার পিতা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মাত্র এক বছর পূর্বে, ১৯৩৭ সনের ডিসেম্বর মাসে নানজিং-এ ২০তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট তাদের কুখ্যাত আক্রমণটি পরিচালনা করেছিল। সুতরাং এক বছরের কিছু কম সময় পরে যোগদান করার কারণে এই যুদ্ধটিতে তিনি অংশ গ্রহণ করতে পারেননি। বিষয়টা জানার পর আমি বিশাল মানসিক স্বস্তি পেয়েছিলাম। এবং আমার মনের উপর থেকে বিশাল একটা ভার নেমে গিয়েছিল বলে আমি অনুভব করেছিলাম। 

১৬তম ট্রান্সপোর্ট রেজিমেন্টের একজন সৈনিক বা প্রাইভেট হিসেবে আমার পিতা ১৯৩৮ সনের অক্টোবর মাসের ৩ তারিখে উজিনা পোতাশ্রয়ে সৈন্য বহনকারী ট্রাকের সাথে নিয়োজিত হয়েছিলেন এবং অক্টোবর মাসের ৬ তারিখে সাংহাইতে আগমন করেছিলেন। এখানেই তার রেজিমেন্ট, ২০ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সাথে যোগদান করে। সেনাবাহিনীর যুদ্ধের ডাইরেক্টরি অনুযায়ী, ১৬তম ট্রান্সপোর্ট রেজিমেন্ট মূলত সরবরাহ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। আপনি যদি এই রেজিমেন্টের চলাচলের ইতিহাসকে অনুসরণ করেন, তাহলে আপনি দেখতে পাবেন যে, এটি সেই সময়ে অবিশ্বাস্য রকমের দূরত্ব অতিক্রম করেছিল। যদিও এই ইউনিটগুলো খুব কমই মোটরযানচালিত ছিল এবং এদের জ্বালানীর অভাবও ছিল প্রকট। মূলত অশ্বই ছিল এই ইউনিট সমুহের প্রধানতম পরিবহনের মাধ্যম। এগুলো নিয়ে এত দূরত্ব পর্যন্ত আগমন নিঃসন্দেহে খুবই কষ্টকর ছিল।

যুদ্ধের ফ্রন্ট বা সম্মুখবর্তী এলাকার পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। সেখানে কোন রসদ সরবরাহ করা সম্ভব ছিল না। সর্বক্ষণ রেশন ও গুলির সল্পতা ছিল। লোকজনের পরিধানের ইউনিফর্ম বা উর্দি পুরনো হয়ে ছিড়ে গিয়েছিল। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সেখানে কলেরা ও সংক্রামক রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছিল। সীমিত ক্ষমতার জাপানের পক্ষে চীনের মত বিশাল দেশকে কুক্ষিগত করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। যদিও সেই সময়ে জাপান সামরিকভাবে একটার পর একটা দেশের উপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেই চলছিল, বাস্তবে তারা এই বিশাল অঞ্চল দখল করে রাখতে সমর্থ ছিল না। ২০তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সদস্যদের স্মৃতিকথাগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, পরিস্থিতি খুবই শোচনীয় ছিল তাদের জন্যে। ট্রান্সপোর্ট রেজিমেন্টের সদস্যদের সাধারণত ফ্রন্টলাইন যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে হত না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তারা নিরাপদে ছিলেন। তাদেরকে যেহেতু শুধুমাত্র হালকা অস্ত্রে সজ্জিত করা হত, সেহেতু শত্রু পেছন থেকে আক্রমণ করলে তাদের বহুজন হতাহত হত। 

বৌদ্ধ স্কুলের দিনগুলোতে আমার পিতা হাইকু কবিতা বিষয়ে আগ্রহী হয়েছিলেন এবং হাইকু কবিদের একটা গ্রুপেও যোগ দিয়েছিলেন। এবিষয়ে তার প্রবল আগ্রহ ছিল। তিনি হাইকু কবিতাগুলোকে নতুন বাক্যপদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইতেন। সেনাবাহিনীতে চাকুরীকালে তার লেখা কিছু কবিতা বৌদ্ধ হাইস্কুলের হাইকু জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। সম্ভবত তিনি সেগুলোকে যুদ্ধের সম্মুখবর্তী এলাকা বা ফ্রন্ট থেকে চিঠি হিসেবে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। 

“পাখিরা পরিযায়ী হচ্ছে 
কোথায় যাচ্ছে তারা? 
আমি নিশ্চিত, তাদের মাতৃভূমিতে” 
অথবা, 
“সৈনিক-একইসাথে ধর্মযাজক 
আমার হাতদুটো তুলে ধরেছে
প্রার্থনার ভঙ্গীতে, চাঁদের দিকে” 

আমি হাইকু বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই। সুতরাং তার লেখা হাইকুগুলো আসলে মানসম্মত হয়েছিল কিনা তা আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে আমি নিশ্চিত যে, তার লেখা হাইকুগুলোতে পদ্ধতিগত বিষয়ের চেয়ে কবির খোলামেলা ও অন্তর্গত অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছিল। 

আমার পিতা ভিক্ষু বা ধর্মযাজক হবার উদ্দেশ্যে অধ্যাবসায়ের সাথেই অধ্যয়ন করছিলেন। কিন্তু সামান্য একটি করণিক ত্রুটি তাকে সৈনিকে পরিবর্তিত করেছিল। ফলে তাকে নিষ্ঠুর ধরণের মৌলিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হয়েছিল। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে প্রদান করা হয়েছিল একটি টাইপ-৩৮ রাইফেল এবং সৈন্যবাহী জাহাজে করে প্রেরণ করা হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখবর্তী এলাকায়। তার ইউনিটকে প্রতিনিয়ত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গমন করতে হত। চীনা সৈন্য ও গেরিলা যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধ করতে হত, যারা অধিকাংশ সময়েই প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টি করত। 

যেকোন ভাবেই আমি চিন্তা করি না কেন, তার জীবন পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। কিয়োটো পাহাড়ের মন্দিরে তার শান্তিপূর্ণ জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে। আমি নিশ্চিত যে, তিনি প্রচন্ড মানসিক বিশৃঙ্খলা ও আত্নিক অস্থিরতার মধ্যে জীবনযাপন করছিলেন। এই পরিস্থিতিতে হাইকু লেখা সম্ভবত তার জন্যে একমাত্র সান্ত্বনা ছিল। সাধারণ চিঠিতে তিনি যা লিখতে পারতেন না, অথবা লিখলেও যা ইউনিটের সেন্সর অতিক্রম করতে সক্ষম হত না, সেই বিষয়গুলোকে তিনি হাইকুর রূপ দিতেন। প্রতীকের মধ্য দিয়ে নিজের অনুভূতিগুলোকে সততা ও স্বতস্ফুর্ততার সাথে উপস্থাপন বা প্রকাশ করতে সমর্থ হতেন, তিনি এই হাইকুগুলোর মধ্য দিয়ে। 

যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে পিতা শুধুমাত্র একবার আমার সাথে কথা বলেছিলেন। তিনি গল্প শুনিয়েছিলেন কিভাবে তার ইউনিট বন্দী চীনা সৈনিকদেরকে মৃত্যুদণ্ড দিত। আমি জানি না কি তাকে আমাকে এ সম্পর্কে বলার জন্যে প্রেষণা যুগিয়েছিল। যেহেতু তিনি অনেক বছর পূর্বে তিনি গল্পটা শুনিয়েছিলেন, আমার কাছে এখন তা একটি বিচ্ছিন্ন স্মৃতি মাত্র। এমনকি বলার পরিস্থিতিটাও আমার কাছে এখন স্পষ্ট নয়। আমি তখন প্রাইমারী স্কুলের নীচের ক্লাসে পড়তাম। তবে আমার মনে আছে যে, তিনি আমাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতিটি বিস্তারিতভাবে বলেছিলেন। এটাও বলেছিলেন যে, যদিও চীনা সৈনিকটি জানত যে, তাকে মেরে ফেলা হবে, তথাপি সে পালিয়ে যাবার কোন চেষ্টাই করেনি বা আতঙ্কিত হয়নি। সে শুধুমাত্র চোখ বন্ধ করে সেখানে বসেছিল। এবং সেই অবস্থাতেই তাকে মেরে ফেলা হয়। 

আমার পিতা বলেছিলেন যে, সৈনিকটির মনোভাব ছিল অনুকরণীয়। আমার মনে হয়েছে যে, পিতার মধ্যে সৈনিকটি সম্পর্কে এক ধরণের প্রবল শ্রদ্ধাবোধ জন্মেছিল। আমি জানি না আমার পিতা ইউনিটের অপরাপর সদস্যদের মত এই মৃত্যুদন্ডকে কার্যকর করার দৃশ্যটি শুধু অবলোকন করেছিলেন, নাকি তাকেও সেখানে প্রত্যক্ষ কোন অবদান রাখতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ বিষয়ে বর্তমানে আমার পক্ষে নির্দিষ্ট কোন অনুমানও করা সম্ভব নয়, কারণ স্মৃতিটা আসলেই খুব অস্পষ্ট হয়ে গেছে। এমনও হতে পারে যে আমার পিতা ইচ্ছাকৃতভাবেই বিষয়টিকে আমার নিকটে অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছিলেন। যাই হোক, একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে, অভিজ্ঞতাটি তার ভেতরে মানসিক অস্থিরতা ও যন্ত্রনার সৃষ্টি করেছিল এবং এই অস্থিরতা ও যন্ত্রণাকে তিনি দীর্ঘকাল বহন করেছিলেন। সম্ভবত সেটা হয়েছিল ভিক্ষু হতে তার সৈনিকে রুপান্তরিত হবার কারণে। 

সে সময়ে ইউনিটের নতুন সৈনিকদেরকে দিয়ে বন্দী চীনা সৈনিকদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার চর্চা অপ্রচলিত ছিল না। যদিও নিরস্ত্র বন্দী সৈনিকদেরকে হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ছিল, তথাপি জাপানী সেনাবাহিনীতে এই চর্চাকে স্বতঃসিদ্ধ বলেই মনে করা হত। সেই সময়ে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলোতে বন্দীদেরকে দেখাশুনা করার জন্যে পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা ছিল না। এবং বেশির ভাগ মৃত্যুদণ্ডই কার্যকর করা হত গুলি করে অথবা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, পিতার গল্পের সেই নির্দিষ্ট মৃত্যুদণ্ডটি কার্যকর করতে তরবারী ব্যবহৃত হয়েছিল। 

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ঠাণ্ডা মাথায় তরবারী দিয়ে একজন মানুষের মস্তক ছিন্ন করার গল্পটি আমার কিশোর মনে প্রগাঢ় ছাপ রেখে গিয়েছিল। অন্যভাবে বললে বলা যায়, যে যন্ত্রনার ভার একা আমার পিতা বহন করছিলেন, তা তিনি আংশিকভাবে পুত্র হিসেবে আমার নিকটে হস্তান্তর করেছিলেন। ওটা ছিল মূলত দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠান। আমার পিতা তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কদাচিতই আমাকে বলেছিলেন। এটা সম্ভবত সত্য নয় যে, তিনি হত্যাকাণ্ডটি নিজে স্মরণ করতে অথবা সেটা সম্পর্কে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিশ্চয়ই কোন বাধ্যতা অনুভব করেছিলেন নিজের রক্ত-মাংশে গড়া পুত্রের কাছে গল্পটি বর্ণনা করার। যদিও জানতেন যে, গল্পটি আমাদের উভয়ের জন্যেই খোলা ক্ষত হিসেবে রয়ে যাবে। দীর্ঘকাল। 

২০তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট, আমার পিতার ইউনিটকে সহ ১৯৩৯ সনের ২০ আগষ্ট তারিখে জাপানে ফিরে এসেছিল। মোট এক বছর সৈনিক হিসেবে থাকার পর, আমার পিতা বৌদ্ধ হাইস্কুলে পুনরায় পড়াশুনা করতে ফিরে গিয়েছিলেন। সেসময়ে ন্যূনতম দুই বছরের জন্যে যুবকদেরকে সামরিক সার্ভিসে অন্তর্ভূক্ত করা হত। কিন্তু কোন কারণে আমার পিতা মাত্র এক বছরকাল সেখানে ছিলেন। সম্ভবত সেনাবাহিনী চাকুরীতে অন্তর্ভূক্তিকালীন সময়ে তিনি ছাত্র ছিলেন, এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছিল। 

সেনাবাহিনী হতে বেরিয়ে আসার পর আমার পিতা পুনরায় প্রবল উৎসাহের সাথে হাইকু লেখা চালিয়ে গিয়েছিলেন। নীচের হাইকুটা তিনি লিখেছিলেন ১৯৪০ সালের অক্টোবর মাসে। সম্ভবত এটা লেখা হয়েছিল ‘হিটলার ইউথ’ নামের একটি জার্মানীর যুবক সংগঠনের (মূলত নাৎসি দলের একটা অঙ্গসংগঠন যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২২ সালে এবং পরিচিতি লাভ করেছিল হিটলার ইয়ুথ নামে) সদস্যদের জাপানে কোন গুড-উইল ভিজিটের সময়েঃ 

“গান গাইতে গাইতে 
হরিণটিকে কাছে ডাকল 
যুবক হিটলার” 
ব্যক্তিগতভাবে আমি পিতার লেখা এই হাইকুটা খুবই পছন্দ করি। এটা ইতিহাসের এক অপ্রকাশিত অস্পষ্ট সময়কে সূক্ষ্ম ও অসাধারভাবে ফিরিয়ে আনে। বিম্বিত করে ইউরোপের রক্তাক্ত সংঘর্ষ ও হরিণের (সম্ভবত নারা অঞ্চলের বিখ্যাত হরিণ) মধ্যকার প্রবল বৈসাদৃশ্যকে। 
হিটলার ইয়ুথের সেই যুবকেরা জাপানে তাদের স্বল্পকালীন ভ্রমণের পর নিয়োজিত হয়েছিল ইস্টার্ণ ফ্রন্টে। নির্মম শীতের ভেতরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে বিলীন হয়ে যাবার জন্যে। 
পিতার লেখা নীচের হাইকু কবিতাটিও আমার খুবই পছন্দেরঃ
“ঈসার মৃত্যুবার্ষিকীতে 
আমি এখানে বসে থাকি 
তার লেখা দুঃখের কবিতাগুলোকে সাথে নিয়ে” 
কবিতাটিতে একটা শান্ত, সুস্থির অথচ দীর্ঘস্থায়ী গোলযোগের পৃথিবীকে বিম্বিত করা হয়েছে। 

আমার পিতা সকল সময়েই সাহিত্য পছন্দ করতেন এবং শিক্ষক হবার পর নিজের বেশীর ভাগ সময়ই পড়ার জন্যে ব্যয় করতেন। আমাদের বাসা ভর্তি বই ছিল। এগুলো আমার কৈশোরের সময়টাকে প্রভাবিত করেছিল এবং বই পড়া আমার জন্যে একটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বৌদ্ধ স্কুল থেকে আমার পিতা সম্মানসহ স্নাতক পাশ করেছিলেন এবং ১৯৪১ সনের মার্চ মাসে কিয়োটো ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটির সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। ভিক্ষু বা ধর্মযাজক হবার জন্যে বৌদ্ধ স্কুলে পড়ার পর কিয়োটো ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটির মত উঁচুমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সহজ ছিল না। আমার মা প্রায়ই আমাকে বলতেন,”তোমার পিতা খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন।“ বাস্তবে তিনি কতটা মেধাবী ছিলেন, সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। এটা আমার কাছে কখনই আগ্রহের বা জিজ্ঞাস্য কোন বিষয় ছিল না। কারণ, আমি যে ধরণের কাজ করে থাকি, সে ধরণের মানুষের কাছে বুদ্ধির চেয়ে গভীর স্বজ্ঞা বা ইনটুইশনই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। যাই হোক না কেন, সত্যি হল যে, আমার পিতা স্কুলে সকল সময়েই খুব ভাল গ্রেড অর্জন করতেন। 

তার সাথে তুলনা করলে পড়াশুনার প্রতি কখনই তেমন আগ্রহ ছিল না আমার। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার সকল গ্রেড সমূহই ছিল অতীব সাধারণ মানের। আমি হলাম সেই ধরণের ব্যক্তি যে শুধুমাত্র পছন্দের বিষয়গুলোকে আগ্রহের সাথে অনুধাবন করতে ইচ্ছুক। অন্যকিছু নিয়ে আদৌ চিন্তিত নয়। আমার ছাত্রাবস্থায় এটি সত্য ছিল। এবং বর্তমানেও এটাই আমার জন্যে সত্য। 

পড়াশুনায় আমার পারদর্শিতার বিষয়টি পিতাকে হতাশ করত। আমি নিশ্চিত যে, তিনি তার একই বয়সে আমার সাথে নিজেকে তুলনা করতেন। তুমি একটা শান্তিপূর্ণ সময়ে জন্মগ্রহণ করেছ, তিনি নিশ্চয়ই ভাবতেন। তুমি চাইলেই কোন ধরণের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই যত ইচ্ছে পড়াশুনা করতে পার। কাজেই তুমি আরও চেষ্টা করছ না কেন? আমার ধারণা যুদ্ধের কারণে তিনি যা করতে সমর্থ হননি, তিনি চাইতেন আমি তা করার চেষ্টা করি। 

কিন্তু আমি কখনই পিতার প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম ছিলাম না। তিনি যেভাবে চাইতেন সেভাবে পড়াশুনা করতে কখনই ইচ্ছে করত না আমার। স্কুলের ক্লাসগুলোকে আমার নিকটে অর্থহীন এবং পাঠদানের পদ্ধতিগুলোকে অতিরিক্ত রকমের অভিন্ন ও যাতনামূলক বলে মনে হত। বিষয়টি আমার পিতাকে দীর্ঘস্থায়ী একটা কষ্টের ভেতরে ফেলে দিয়েছিল, এবং যা নিয়ে আমিও সকল সময়ে মর্মপীড়ায় ভুগতাম (এবং নির্দিষ্ট পরিমানে অব্যাখ্যাত ক্রোধে)। তিরিশ বছর বয়সে আমি যখন লেখক হিসেবে উদিত হলাম, তখন আমার পিতা খুবই খুশী হয়েছিলেন, কিন্তু ততদিনে তার সাথে আমার সম্পর্ক শীতল ও দূরবর্তী রূপ ধারণ করেছে। 

বর্তমানেও আমি অনুভব করি যে, আমি আমার পিতাকে হতাশ করেছি ও নীচে ফেলে দিয়েছি। কৈশোরে বিষয়টা আমাকে অস্বস্তি ও অবিরত অনুতাপবোধে দগ্ধ করত। এখনও আমি দুঃস্বপ্ন দেখি যে, স্কুলের পরীক্ষায় একটা প্রশ্নের উত্তর দিতেও সক্ষম হচ্ছি না। ক্রমাগত সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছি না। এবং স্বপ্নের ভেতরেই আমি জানতাম যে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া আমার জন্যে বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনা। এই ধরণের প্রতিটা স্বপ্নের শেষে আমি শীতল ঘর্মাক্ত কলেবরে ঘুম থেকে উঠতাম। 

কিন্তু এতদসত্ত্বেও পড়ার টেবিলে নিজেকে আটকে রাখা, হোম-ওয়ার্ক সম্পন্ন করা, ও পরীক্ষার ভাল মান অর্জন করার জন্যে চেষ্টা করার বিষয়গুলো আমাকে আকর্ষণ করত না।আমাকে আকর্ষন করত পাঠবহির্ভূত বইপুস্তক পড়া, পছন্দের গান শোনা, খেলাধুলা করা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারা এবং মেয়েদের সাথে ডেট করতে যাওয়া। 

আমাদের সকলের জন্যেই যা প্রয়োজন তা হল, যে সময়কালে আমরা বেঁচে থাকি, সেই সময়ের বাতাসে শ্বাস গ্রহণ করা, সময়ের ভার বহন করা এবং জীবনের সীমাবদ্ধতাগুলোর ভেতরে বেড়ে উঠা। জীবনের সত্যিগুলো এরকমেরই। 
আমার পিতা বৌদ্ধ স্কুল থেকে ১৯৪১ সালের বসন্তকালে পাশ করে বেরিয়েছিলেন। অতঃপর সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকেই সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত হবার বিশেষ নোটিশ পেয়েছিলেন। অক্টোবর মাসের ৩ তারিখে তিনি ইউনিফর্মে ফিরে গিয়েছিলেন। তার বদলী হয়েছিল প্রথমে ২০ তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে (ফুকুচিয়ামা), এবং পরবর্তীতে ৫৩তম ট্রান্সপোর্ট রেজিমেন্টে। এই ইউনিটটি ৫৩তম ডিভিশনের অংশ ছিল। 

১৯৪০ সনে, ১৬তম ডিভিশন স্থায়ীভাবে মাঞ্চুরিয়াতে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। সেখানে থাকাবস্থাতেই কিওটোতে অবস্থিত ৫৩তম ডিভিশনকে সংগঠিত করা হচ্ছিল সেটাকে প্রতিস্থাপন করার জন্যে। খুব সম্ভবত এই আকস্মিক পুনর্গঠনের ফলে সৃষ্ট অস্পষ্টতার কারণে আমার পিতাকে প্রাথমিকভাবে ফুকুচিয়ামা রেজিমেন্টে দেয়া হয়েছিল। (আমি পূর্বেই বলেছি যে, আমি সকল সময়ে ভুল করে ভাবতাম যে, সেনাবাহিনীতে প্রথমবারের মত অন্তর্ভূক্ত হবার সময় হতেই আমার পিতাকে ফুকুচিয়ামা রেজিমেন্টে বদলি করা হয়েছিল।)। ৫৩তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টকে ১৯৪৪ সনে বার্মায় প্রেরণ করা হয়েছিল। ইমফাল যুদ্ধে (Battle of Imphal) অংশগ্রহণের জন্যে। ১৯৪৫ সনের ডিসেম্বর হতে মার্চ সময়ে ব্রিটিশদের কর্তৃক ‘ইরাবতী নদীর যুদ্ধে’ (Battle of the Irrawaddy River) এই ইউনিট প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছিল।

কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে ৩০ নভেম্বর, ১৯৪১ তারিখে আমার পিতাকে সামরিক চাকুরি হতে অব্যাহতি দিয়ে তাকে অসামরিক জীবনে ফিরে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়েছিল। এই তারিখের মাত্র আটদিন পর পার্ল হারবার আক্রমণ হয়েছিল। আমি মনে করি যে, এই আক্রমণের পর সেনাবাহিনী বাহিনী তাকে ছেড়ে দেয়ার মত উদারতা কখনই প্রদর্শন করত না। 

আমার পিতার বর্ণনা অনুযায়ী, একজন অফিসার তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। সে সময়ে আমার পিতা ছিলেন একজন প্রাইভেট (সৈনিক)। জনৈক সিনিয়র অফিসার তাকে ডেকে বলেছিলেন,”তুমি যেহেতু কিয়োটো ইমপেরিয়াল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করছিলে, সেহেতু তোমার উচিৎ হবে সৈনিক না হয়ে সেখানেই পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া। “কোন অফিসারের কি এধরণের সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার থাকে কিনা সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। এবং আমার পক্ষেও ধারণা করা কঠিন ছিল যে, আমার পিতার মত মানবিক বিভাগের একটা ছাত্র কলেজে প্রত্যাবর্তন করে হাইকু পাঠ করবেন এবং দেশের সেবা করবেন। আমি নিশ্চিত যে, তাকে ছেড়ে দেয়ার পিছনে অন্যান্য আরও কারণ ছিল। তবে যে ভাবেই হোক, আমার পিতাকে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল এবং তিনি পুনরায় একজন মুক্ত মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। 

তবে উপরের গল্পটাই আমি শুনেছিলাম। অথবা শিশু হিসেবে এটা শোনার স্মৃতিই আমার আছে। দুঃখজনকভাবে প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে এই গল্পটা মিলেনি। কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড হতে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে, আমার পিতাকে ১৯৪৪ সনের অক্টোবর মাসে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের লিটারেচার ডিপার্টমেন্টে নথিভূক্ত (enrolled) করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে সম্ভবত আমার স্মৃতিটাই অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর। অথবা এমনও হতে পারে যে, আমার মা আমাকে গল্পটা শুনিয়েছিলেন, এবং তার স্মৃতিই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে আমার কাছে আর কোন উৎস বা অভিমুখ নেই, যা থেকে আমি বিষয়টির সত্যমিথ্যা যাচাই করতে পারি। 

কিয়োটো ইমপেরিয়াল ইউনিভার্সিটির নথিপত্র অনুযায়ী আমার পিতা ১৯৪৪ সনের অক্টোবর মাসে সাহিত্য ডিপার্টমেন্টে প্রবেশ করেন এবং ১৯৪৭ সনের সেপ্টেম্বর মাসে তার গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। কিন্তু তিনি ২৩ থেকে ২৬ বছর বয়সের সময়ে অর্থাৎ সেনাবাহিনী হতে অবমুক্ত হবার অব্যবহিত পরের ৩ বছর কোথায় ছিলেন বা কি করছিলেন, সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই।

সেনাবাহিনী হতে আমার পিতার প্রত্যাবর্তনের পর পরই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে ১৬তম ডিভিশন ও ৫৩ত ডিভিশন প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আমার পিতাকে যদি সেই সময়ে সেনাবাহিনী হতে অবমুক্ত না করা হত এবং তার পূর্বতন ইউনিটের কোন একটির সাথে তাকে জাহাজে তুলে দেয়া হত, তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করতেন এবং আমার জন্মই হত না। এটাকে আপনি তার সৌভাগ্য বলতে পারেন। কিন্তু তারপরেও নিজের জীবনের বিনিময় হিসেবে সহচরদের মৃত্যু তার জন্যে বিশাল বেদনা ও মনস্তাপের কারণ হয়েছিল। আমি এখন আরও ভালভাবে বুঝি যে, তিনি কেন তার জীবনের প্রতিটা সকালে চোখ বন্ধ করে ভক্তিভাবে সুত্রগুলো আবৃত্তি করতেন। 

১২ জুন, ১৯৪৫ তারিখে কিয়োটো ইমপেরিয়াল ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশের পর আমার পিতা তৃতীয় বারের মত সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভূক্তির নোটিশ পেয়েছিলেন। এই সময়ে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল চুবু এলাকায় ১৪৩ কোরের একজন সৈনিক হিসেবে। আমার কাছে এটা স্পষ্ট নয় যে, এই কোরটিকে প্রতিষ্ঠা করার পর কেন জাপানের ভেতরে অবস্থান করানো হয়েছিল। এর মাত্র দুই মাস পর আগস্ট মাসের ১৫ তারিখে যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং অক্টোবরের ২৮ তারিখে আমার পিতাকে সেনাবাহিনী মুক্তি দিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তখন তার বয়স হয়েছিল ২৭ বছর। 

১৯৪৭ সনের সেপ্টেম্বর মাসে আমার পিতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বি এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সাহিত্যে গ্রাজুয়েট প্রোগ্রাম করার জন্যে কিয়োটো ইমপেরিয়াল ইউনিভার্সিটিতে গমন করেন। আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম জানুয়ারী, ১৯৪৯ মাসে। বিবাহিত ও সন্তানের জনক হবার কারণে প্রোগ্রাম শেষ হবার পূর্বেই আমার পিতাকে পড়াশুনা পরিত্যাগ করতে হয়েছিল। জীবিকা নির্বাহের জন্যে তিনি নিশিমনিয়া এলাকার কোয়ো গাকুইন স্কুলের শিক্ষক পদে যোগদান করেছিলেন। আমি জানি না কিভাবে আমার পিতা-মাতা বিয়ে করেছিলেন। যেহেতু তারা পরস্পর থেকে অনেক দূরে বসবাস করছিলেন (একজন কিয়োটোতে ও অন্যজন ওসাকাতে), খুব সম্ভব তাদের দুজনেরই পরিচিত ব্যক্তি তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমার মা একজন গানের শিক্ষককে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, যিনি যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এবং আমার পিতার যে দোকানটি সেনবা’তে (ওসাকা এলাকা) অবস্থিত ছিল তা আমেরিকার বম্বিং রেইড এর কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমার মা সকল সময়েই স্মৃতিচারণ করতেন যে, গ্রুম্যান ক্যারিয়ার থেকে আসা ফাইটার প্লেনগুলো শহরের বুকে কিভাবে বোমা বর্ষন করত এবং তিনি কিভাবে ওসাকা শহরের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন। যুদ্ধ আমার মায়ের জীবনের উপরেও গভীর প্রভাব রেখেছিল। 

আমার মা, যার বয়স এখন ৯৬ বছর, এক সময়ে জাপানী ভাষার শিক্ষিকাও ছিলেন। শোহিন মহিলা কলেজ (ওসাকা) থেকে সাহিত্য বিষয়ে গ্রাজুয়েশন করার পর নিজের স্কুলেই তিনি শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করতেন, কিন্তু বিয়ের পর তিনি চাকুরী ছেড়ে দেন।

মায়ের মতে, যৌবনকালে আমার পিতা বলগাহীন জীবন যাপন করতেন। যুদ্ধের অভিজ্ঞতাগুলো তার নিকটে প্রাণবন্ত ছিল এবং তিনি হতাশাগ্রস্ত ছিলেন যে, যুদ্ধের কারণে তিনি নিজের জীবনকে ইচ্ছামত গড়তে সক্ষম হননি। তিনি প্রচুর মদ্যপান করতেন এবং মাঝেমধ্যে ছাত্রদেরকে মারধোরও করতেন। কিন্তু আমি বড় হবার পূর্বেই তিনি শান্ত মেজাজে পরিবর্তিত হয়েছিলেন। যদিও তিনি হতাশ থাকতেন ও অতিরিক্ত মদ্যপান করতেন (যা আমার মা প্রায় সময়েই অভিযোগ করতেন), তথাপি তাকে নিয়ে বাড়িতে আমার কোন অপ্রীতকর ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে না। 

নৈর্ব্যক্তিকভাবে বললে, আমার ধারণা এই যে, আমার পিতা একজন অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। তার মৃত্যুর পর আমি অবাক হয়েছিলাম তার অনেক পুরনো ছাত্রদেরকে তার সৎকারের সময়ে আসতে দেখে। তারা মূলত এসেছিল তাকে সম্মান প্রদর্শন করতে। তারা সবাই তাকে খুব ভালবাসত বলে আমার মনে হয়েছে। তাদের অনেকেই চিকিৎসক হয়েছিল এবং তার শেষ সময়ে শুশ্রূষা করেছিল, যখন তিনি ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। 

আমার মাতাও আপাতভাবে একজন অসাধারণ শিক্ষিকা ছিলেন। আমার জন্মের পর তিনি শুধুমাত্র সার্বক্ষণিক একজন গৃহিণী হওয়া স্বত্বেও তার প্রাক্তন ছাত্রীরা আমাদের বাড়িতে আসত। অবশ্য কোন কারণে জানি না, জীবনে আমার কখনই শিক্ষক হতে ইচ্ছে করেনি। 

বড় হবার সময়ে নিজের মত করে ব্যক্তিত্ব গঠনের কারণে পিতার সাথে আমার মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়েছিল। আমরা দুজনেই ছিলাম অনমনীয় প্রকৃতির। আমাদের প্রকাশভঙ্গীও ভিন্ন ধরণের ছিল। ফলাফল ভাল বা মন্দ, যাই হোক না কেন।

আমার বিয়ের পর যখন আমি চাকুরী শুরু করলাম, তখন আমার পিতা আরও দূরের ব্যক্তি হয়ে গেলেন। যখন আমি ফুলটাইম লেখক হলাম, তখন আমাদের পরস্পরের মধ্যকার সম্পর্ক এতই জটিল হয়ে উঠল যে, শেষ পর্যন্ত আমরা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া আমরা কখনই কথা বলতাম না। 

আমার পিতা পৃথিবীর ভিন্ন সময়ে ও পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের দুজনের চিন্তাও চেতনার মধ্যেও বিশাল ফারাক ছিল। আমি যদিও দুই একবার তার সাথে সম্পর্ক পুনঃসৃষ্টির চেষ্টা করেছিলাম, সেটা বাস্তবে ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছিল। অবশ্য এটা ঠিক যে, আমি নিজেকেই বেশী গুরুত্ব দিতাম এবং যা করতে চাইতাম, সেদিকেই আমার প্রচেষ্টা কেন্দ্রীভূত থাকত। 

পিতা ও আমি শেষবার পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিলাম, তার মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে। আমার বয়স তখন প্রায় ৬০ বছর এবং তার ৯০ বছর। কিয়োটোর নিশিজিন নামক হাসপাতালে তিনি ভর্তি ছিলেন। তার ভয়ঙ্কর ধরণের ডায়াবেটিস হয়েছিল এবং ক্যান্সার তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। সারাজীবন তিনি তাগড়া ও স্থুলকায় থাকলেও এই সময়ে তিনি নির্জীব ও ক্ষীণ হয়ে পড়েছিলেন। তাকে চেনাই যেত না। সেখানে, পিতার চূড়ান্ত সময়ে কিছু সময়ের জন্যে পিতা ও আমি পরস্পরের সাথে বেমানান কিছু আলাপচারিতা করতে পেরেছিলাম। এবং সম্ভবত পরস্পরের সাথে কিছু সমঝোতায় পৌঁছুতেও পেরেছিলাম। দুজনের মধ্যকার বিদ্যমান পার্থক্য সত্ত্বেও পিতার রুগ্ন শরীরের পানে তাকিয়ে আমি তার সাথে একটা বন্ধন অনুভব করেছিলাম। 

আজও আমি বিস্মৃতির ভেতর থেকে পারস্পারিক বিভ্রান্তির সেই গ্রীষ্মের দিনের কথা তুলে আনতে সক্ষম, যেদিন আমরা সাইকেলে করে একসাথে কোরোয়েন সৈকতে গিয়েছিলাম একটা বিড়ালকে ছেড়ে আসার জন্যে, যে বিড়াল আমাদের দুজনকেই পরাজিত করেছিল। আমি এখনও সেদিনের ঢেউয়ের শব্দ এবং পাইন বনের ভেতর দিয়ে শীষ দিয়ে চলা বাতাসের গন্ধ স্মরণ করতে সক্ষম। আমি জানি যে, এই ধরণের তুচ্ছ জিনিসের আহরণই আমাকে আজকের আমিতে পরিণত করেছে। 

বিড়াল নিয়ে আমার শৈশবের আরও একটা স্মৃতি আছে। আমি এই স্মৃতিকে আমার একটি উপন্যাসের অধ্যায় হিসেবে ব্যবহার করেছি। কিন্তু আমি বিষয়টাকে আবার এখানে উল্লেখ করতে চাই, ঠিক যেভাবে ঘটনাটি ঘটেছিল। 
আমাদের একটি সাদা বিড়ালছানা ছিল। আমার মনে নেই সেটাকে আমরা কিভাবে পেয়েছিলাম। কারণ সেই সময়ে আমাদের বাড়িতে প্রায়ই বিড়াল আসা-যাওয়া করত। কিন্তু আমি এটুকু মনে করতে পারি যে, বিড়ালটার অসাধারণ সুন্দর পশম এবং সেটা দেখতেও খুবই সুন্দর ছিল। 

একদিন বিকেলে আমি বারান্দায় বসেছিলাম। বিড়ালটি হঠাৎ করে সোজা আমাদের বাগানের লম্বা পাইন গাছে উঠে গেল। ভাবখানা এমন যে, আমাকে দেখাতে চাচ্ছিল কেমন সাহসী ও চটপটে সে। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কি দ্রুততার সাথে সেটা গাছের কান্ড বেঁয়ে উপরে উঠে গিয়েছিল এবং গাছটির উপরের দিকের শাখার ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর সেটা করুণভাবে মিউ মিউ করছিল। মনে হচ্ছিল সে সাহায্যের জন্যে প্রার্থনা করছে। এত উপরে উঠতে তার কোন সমস্যা না হলেও নেমে আসতে সে ভীষণ ভয় পাচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল। 

আমি গাছের মূলে দাঁড়িয়েছিলাম উপরের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু বিড়ালটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি শুধু তার অস্পষ্ট কান্না শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি আমার পিতার কাছে গিয়ে তাকে বলেছিলাম কি হয়েছে, আশা করে যে তিনি বিড়ালটিকে উদ্ধার করার একটা পথ বাৎলে দিতে পারবেন। কিন্তু তিনি কিছুই করতে পারলেন না। গাছটি ছিল খুবই উঁচু। মই কোন কাজেই আসছিল না। সূর্য ডুবে যাবার সময়েও বিড়ালটা অনবরত মিউ মিউ করে সাহায্য চাইছিল। অবশেষে অন্ধকার এসে পাইন গাছটাকে গ্রাস করেছিল। 

আমি জানি না বিড়ালের বাচ্চাটির কি হয়েছিল। পরেরদিন সকালে আমি ঘুম থেকে উঠার পর সেটার কান্না আর শুনতে পাইনি। আমি গাছটির মূলে দাঁড়িয়ে বিড়ালের বাচ্চাটিকে নাম ধরে ডেকেছিলাম, কিন্তু কোন উত্তর পাইনি। শুধু নীরবতা ছাড়া। সম্ভবত বিড়ালটি রাতের অন্ধকারে নেমে এসেছিল এবং অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল (কিন্তু কোথায়?)। অথবা সেটা হয়ত নামতেই পারেনি। গাছের ডালে ঝুলে থাকতে থাকতে ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে একসময়ে মরে গিয়েছিল। আমি বারান্দায় বসে গাছের উপরের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দৃশ্যপটগুলো আমার মনের ভেতরে গেঁথে গিয়েছিল। বিড়ালের বাচ্চাটির জীবনের জন্যে ছোট্ট নখ দিয়ে আঁকড়ে ধরে থাকা, তারপর তার কুঁচকে যাওয়া ও মরে যাওয়ার দৃশ্য। 

এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটা সুস্পষ্ট শিক্ষা দিয়েছিল। উপরে উঠার চেয়ে নীচে নেমে আসা অনেক বেশী কষ্টদায়ক। সরলীকরণ করা হলে বলা যেতে পারে যে, ফলাফল শেষ পর্যন্ত কারণকে আচ্ছন্ন ও নিষ্কৃয় করে দেয়। ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে বিড়ালের মৃত্যু হয়, অন্য সময়ে মানুষের। 

সবকিছুর পর এই ঘটনাটি হতে একটা বিষয়ে আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাই। একক কিন্তু স্পষ্ট সত্যে। সেটা হলঃ 
আমি একজন সাধারণ মানুষের সাধারণ সন্তান। এটা নিজ থেকেই স্পষ্ট একটা সত্য। কিন্তু এই সত্যটি উদঘাটন করতে গিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে আমার নিকটে। সেটা হল যে, আমার পিতা ও আমার জীবনে যা যা ঘটেছে, সেগুলোর প্রত্যেকটিই আপতিক বা একসিডেন্টাল। আমরা আমাদের জীবন এভাবেই যাপন করে থাকি। ধরে নেই যে, যা কিছুই ঘটে তা দুর্ঘটনাক্রমেই ঘটে থাকে এবং এই কাঁকতলিয় মিলনই মানেই সম্ভাব্য বাস্তবতা। 

অন্যভাবেও বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কল্পনা করুন যে, বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে একটা বিস্তৃত প্রান্তরের উপরে। আমরা প্রত্যেকেই অসংখ্য বৃষ্টির ফোঁটার ভেতরে এক একটি নামহীন বৃষ্টির ফোঁটা। স্বতন্ত্র একক বৃষ্টির ফোঁটা, যাকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। তারপরেও একাকী নির্জন ফোঁটাটির নিজস্ব আবেগ, ইতিহাস, এমনকি সেই ইতিহাস বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। যদিও সে তার চলার পথে নিজস্ব বিশুদ্ধতা হারিয়ে ফেলতে পারে এবং সমষ্টিগত কোন কিছুতে রূপ নিতে পারে। অথবা নির্ভুল্ভাবে বললে, বৃহত্তর কোন সামষ্ঠিক স্বত্বার ভেতরে তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে। 

কোন কোন সময়ে আমার স্মৃতির ভেতরে আমাদের বাড়ির বাগানের সেই পাইন গাছটি অস্পষ্ট কিন্তু ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভূত হয়। আমি দেখতে পাই ছোট্ট বিড়ালের বাচ্চাটি গাছের শাখায় ঝুলে আছে এবং তার শরীর ক্রমশ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে পরিষ্কার সাদা হাড্ডিতে। আমি তখন মৃত্যুর কথা চিন্তা করি। এবং ভাবি উপর থেকে নীচে সোজা ভূমিতে অবতরণ করা কতই না কঠিন। এতই নীচে ও দূরে যে, তাকালেই আমাদের মাথা ঘুরে যায়। 

সমাপ্ত

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ