Alexa একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের ইতিহাস

একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের ইতিহাস

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:১৬ ৩১ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১৭:২৯ ৩১ মার্চ ২০১৯

বিষয়টা নিয়ে আমার লেখার ইচ্ছে ছিলো না। গত দুই তিন দিন লিখিওনি। কিন্তু এক ধরণের অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়েই আজ লিখতে বাধ্য হলাম। 

বনানীর অভিজাত এলাকা। কামাল আতাতুর্ক সড়কের ‘ফারুক রুপায়ন টাওয়ার’, সংক্ষেপে এফ আর টাওয়ার। ২২ তলার বহুতল ভবন। প্রতিটি তলায় অনেকগুলো অফিস। প্রায় সবগুলোই কর্পোরেট ধরণের অফিস। DIRD গ্রুপের কয়েকটা অফিস এই ভবনটিতে। যথাক্রমে ২, ১২, ১৩, ১৬ এবং ১৯ ফ্লোরে। সব মিলিয়ে ৩২০ জন এমপ্লয়ী এই প্রতিষ্ঠানের। মেজর মইনুল হাসান (অবঃ) এই প্রতিষ্ঠানের ডিজিএম প্রশাসন (কর্পোরেট)। তিনি আমার এক সময়ের সহকর্মী। অবসরের পর আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছি জীবনের প্রান্তে প্রান্তে।  

২৮ মার্চ, ২০১৯ সাল। বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই শান্ত সমাহিত ভাব চারদিকে। সামনের কামাল আতাতুর্ক সড়কে হাতে গোণা কয়েকটা গাড়ি চলছে। শীত চলে গেলেও গ্রীষ্মের দাবদাহ এখনো শুরু হয়নি। তবে গত দুই একদিন হতেই দুপুরের দিকে রোদের তীব্রতা বেড়ে যায়। দুপুর ১২টা ২৫ মিনিট। হঠাৎ ৬ষ্ঠ ফ্লোরে আগুণের সুত্রপাত। মাত্র কয়েক মিনিটের ভেতরে ঘন ধুঁয়ায় ভবনের প্রধান সিঁড়ি আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। শুধু তাই নয়। প্রধান সিঁড়ির পাশেই ‘ফায়ার এক্সিট’। কম বেশী দুই ফুট প্রশস্ত । হবার কথা অন্তত পাঁচ ফুট। সেটাও মূহুর্তের ভেতরে একই সাথে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। এই ধুঁয়ার ভেতর দিয়ে উপরে বা নীচে কোথাও গমন বা নির্গমন সম্ভব নয়। ফলে একমাত্র দোতলার এমপ্লয়ীরা ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের সকল এমপ্লয়ীরাই তাদের নিজ নিজ অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষের ভেতরে আবদ্ধ হয়ে গেলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখী। ১২তম ফ্লোরের এই কক্ষটিতে আটকা পড়ে গেলেন মেজর মইন সহ মোট ২৩ জন। এদের মধ্যে আবার ৪/৫ জন মহিলা। 

প্রবল ধুঁয়া ও উত্তাপের কারণে কক্ষগুলো ক্রমশ পরিবর্তিত হতে লাগলো উত্তপ্ত চুল্লীতে। কক্ষের বাতাসে অক্সিজেন কমে আসার কারণে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো সবার। বাঁচার তাগিদে তারা বাধ্য হয়ে কক্ষের কাঁচের জানালাগুলোকে ভেঙ্গে ফেললেন। বাতাসের জন্যে। কিন্তু বাতাস এতোই উত্তপ্ত যে, সবার মুখ জ্বলতে লাগলো। বাধ্য হয়ে ভেজা তোয়ালে দিয়ে নিজেদের মুখমন্ডলকে আবৃত করার চেষ্টা করলেন সবাই, কিন্তু বাতাস এতই শুষ্ক যে, মুহুর্তের ভেতরে তাদের মুখমন্ডল শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিলো। 

অতঃপর নিশ্চিত মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা। এক মৃত্যু উপতক্যার ভেতরে। প্রতিটি মূহুর্তকে মনে হচ্ছিলো অন্তহীন। তবে এই দল ভবনের অনেক মানুষদের চেয়ে ভাগ্যবান ছিলেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা আটকে থাকার পর বিকেল ৪ টা ৩০ মিনিটের দিকে ফায়ার সার্ভিসের মই দিয়ে কয়েকজন অদম্য ফায়ারকর্মী প্রজ্বলিত আগুণের লেলিহান শিখাকে অগ্রাহ্য করে সেই তালায় পৌঁছান এবং তাদেরকে উদ্ধার করে আনেন। মেজর মইনুল হাসান (অবঃ) এভাবেই বর্ণনা দেন তার সেদিনকার অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতাকে। এই পৃথিবীতে থেকেও ভিন্ন এক পৃথিবীর অভিজ্ঞতা!   

উল্লেখ্য, সেদিন টানা ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম  হলেও ততক্ষণে ২৫ জন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়ে বিপন্ন জীবনের মুখোমুখি হয়ে গেছেন। চিরজীবনের জন্যে।  

দুঃখজনক হল এই দূর্ঘটনা পরবর্তীতে পর্যবেক্ষিত হয়েছে যে, ভবনটিতে জীবন বাঁচানোর পর্যাপ্ত সাইজের ফায়ার এস্কেপ সিঁড়ি ছিলো না। আর এফ টাওয়ারের ফায়ার এস্কেপের প্রস্থ ছিল মাত্র কম বেশী দুই ফুট। যা অন্তত  পাঁচ ফুট হবার কথা। প্রধান সিড়ির সমান্তরালে সেটা আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলো ধুঁয়ায়। ভবনটির দুইপাশে ফায়ার ব্রিগেডের যানবাহন চলাচলের জন্যে কোন স্পেস রাখা ছিলো না। ফলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদেরকে আগুন নেভানোর জন্য শুধুমাত্র সামনের এবং পিছনের জায়গাকে ব্যবহার করতে হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যদি কোন কারণে আগুনকে নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম না হতেন, তাহলে তা পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং সমূহে অবলীলায় ছড়িয়ে পড়তে পারতো। ভবনটির আভ্যন্তরীন অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল খুবই অপ্রতুল। কোন এক্সটার্নাল স্টেয়ারকেস ছিল না। ছিল না এলার্ম সিস্টেম , স্প্রিঙ্কলার, অটো বার্স্টিং এক্সটিঙ্গুইশার ইত্যাদির ব্যবস্থা। ফায়ার ব্রিগেড থেকেও উদ্ধারের জন্যে স্লিপারের ব্যবস্থা করাও সম্ভব হয়নি। 

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। ঢাকা মহানগরীর অধিকাংশ বহুতল ভবনের মত এই ভবনটিরও যথাযথ অনুমোদন ছিল না। আমার জানামতে ভবনটির অনুমোদন ছিলো ১৮তম ফ্লোর পর্যন্ত। কিন্তু অনিয়মতান্ত্রিকভাবে তা তৈরি করা হয়েছিল ২২ তম ফ্লোর পর্যন্ত। অদ্ভুত ব্যাপার হল এর মালিকরা এতই শক্তিশালী যে, তারা কোন ধরণের নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করেই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের ইচ্ছে মত ফ্লোর তৈরী করে ফেলেন। 

আমি জানি আমার এই অস্থির চিত্ত নিয়ে গোছানো কোন লেখা সম্ভব নয়। তবু লিখলাম। আমার আরেক ফেসবুক বন্ধুর লেখা নীচের কবিতাটি উদ্ধৃত করে শেষ করছি। কবিতার নাম বিবাগী!  

‘জানি মৃত্যু অবধারিত। তবুও দিলাম লাফ। জানেন কেন? পুড়ে ছাই হওয়ার চেয়ে স্বজনদের কাঁধে লাশ হয়ে কবরে যাওয়া ভালো। জানেন? একটুও ভয় লাগেনি। বাজিকরদের বাজি ধরার মতো জীবনকে নিয়ে না হয় একটু বাজিই ধরেছিলাম। হয় বাঁচবো, না হয় শেষ। 

লাফটা সাহস সঞ্চয় করে দিয়েই দিলাম। নিজেকে পাখি মনে হতে লাগলো। কী বিশাল একটা পাখি! দৃপ্ত লুকায়িত পাখার ঝাপটানি! সম্রাটের হালে বাতাসে ভেসে যাচ্ছি। কিন্তু বিমানের ল্যান্ডিংয়ের মতো শুধু নিচের দিকে। মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লাম। আলো আধাঁরী ছুঁয়ে জুয়ার টেবিলে হেরেই গেলাম। আমি একজন বিবাগী, একজন বিবাগী!’ - তানভীর রাসিব হাশেমী

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ

Best Electronics
Best Electronics