একজন লৌহকর্মকারের ঈমানদীপ্ত ঘটনা ও সৎ কাজের বাসনা

একজন লৌহকর্মকারের ঈমানদীপ্ত ঘটনা ও সৎ কাজের বাসনা

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৪৯ ২৯ মার্চ ২০২০  

কোনো নেক কাজ করার লোভ ও ইচ্ছা এবং তা করতে না পারার আক্ষেপও অনেক বড় নেয়ামত। ছবি- ডেইলি বাংলাদেশ

কোনো নেক কাজ করার লোভ ও ইচ্ছা এবং তা করতে না পারার আক্ষেপও অনেক বড় নেয়ামত। ছবি- ডেইলি বাংলাদেশ

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ. এর ইন্তেকালের পর জনৈক ব্যক্তি তাকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করেন, হজরত, কেমন আছেন? উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা বড় দয়া করেছেন এবং ক্ষমা করে দিয়েছেন আর উপযুক্ততা না থাকা সত্তেও উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু আমাদের সামনের বাড়িতে বসবাসকারী লৌহকর্মকার যে মর্যাদা লাভ করেছে তা আমি পাইনি। 

স্বপ্ন থেকে জেগে লোকটি চিন্তা করলো লৌহকর্মকার ব্যক্তিটি কে ছিল এবং তার কি বিশেষ আমল ছিল তা জানতে হবে। তিনি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ. এর মহল্লায় গেলেন এবং লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে কি কোনো লৌহকর্মকার ব্যক্তি ছিল যার মৃত্যু হয়েছে? লোকেরা বলল, হ্যাঁ, এই সামনের বাড়িতে একজন লৌহকর্মকার ব্যক্তি থাকত। কয়েকদিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে। লোকটি কর্মকারের বাড়িতে গেল এবং তার স্ত্রীর কাছে নিজের স্বপ্নের কথা বর্ণনা করে জিজ্ঞাসা করল, তোমার স্বামী এমন কি আমল করত যার কারণে সে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবাকর রহ. এর চেয়েও বেশি মর্যাদা লাভ করল। 

স্ত্রীলোকটি বলল, আমার স্বামী তো এরূপ বিশেষ কোনো ইবাদত করত না। সারাদিন কর্মকারের কাজই করত। তবে তার মধ্যে দুইটি বিষয় লক্ষ্য করেছি। এক. যখন কাজের মাঝখানে আজানের আওয়াজ আল্লাহু আকবার কানে আসত তখন সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দিতেন। এমনকি তিনি লোহা পেটানোর জন্য হাতুড়ি উপরে তুলেছেন আর তখন তার কানে আজানের আওয়াজ পৌঁছত, তিনি হাতুড়ির ওই আঘাতটিও দিতে পছন্দ করতেন না বরং ওই অবস্থায় হাতুড়িটিকে পিছনের দিকে ফেলে, উঠে নামাজের প্রস্তুতিতে লেগে যেতেন। 

দুই. আমাদের সামনের বাড়িতে একজন বুজুর্গ ব্যক্তি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ. থাকতেন। তিনি রাতভর তার ঘরের ছাদে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন। তাকে দেখে আমার স্বামী বলতেন, এই আল্লাহর বান্দা সারারাত ইবাদত করে। আহ! আল্লাহ তায়ালা আমাকেও যদি অবসর দিতেন তাহলে আমিও ইবাদাত করতাম। এ কথা শুনে লোকটি বললেন, হ্যাঁ! আক্ষেপই তাকে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারকের চেয়ে বেশি সম্মান এনে দিয়েছে।

মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. এ ঘটনা শোনানোর পর বলতেন, এটা হলো সেই দুর্লভ আক্ষেপ, যা মানুষকে বহু উচ্চ মর্যাদা এনে দেয়। তাই যখন কারো সম্পর্কে শুন যে, অমুক ব্যক্তি এই নেক আমল করে তখন হৃদয়ে ওই নেক আমলের ব্যাপারে লোভ ও আক্ষেপ পয়দা হওয়া উচিত যে, আহ! এই নেক আমল করার আমারও যদি তাওফিক হত।

সাহাবায়ে কেরামের চিন্তাধারা :

হাদিস শরিফে আছে, একবার কয়েকজন সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলেন এবং আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের অনেক বন্ধু আছেন, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা সম্পদ দান করেছেন। আমরা যে সব দৈহিক ইবাদত করি সেগুলো তারাও করে, কিন্তু সেগুলো ছাড়াও তারা বাড়তি আর্থিক ইবাদত করেন। যেমন, দান-সদকা করা, মুজাহিদদেরকে সহযোগিতা করা, গরিবদেরকে খাবার প্রদান করা, এগুলোর কারণে তাদের অনেক গুনাহ মাফ হয় এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তারা তো এতে করে পরকালেও আমাদের চেয়ে বেশি মর্যাদা লাভ করবে। আমরা যতই চেষ্টা করি কিন্তু গরিব হওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে পেরে উঠি না। এ জন্য আমরা দুঃখবোধ করি।

দেখুন, আমাদের চিন্তায় আর তাদের চিন্তায় কত পার্থক্য? আমরা যখন আমাদের চেয়ে বেশি ধনী লোকদের নিয়ে চিন্তা করি তখন তাদের দান-সদকার ওপরে আমরা ঈর্ষান্বিত হই না বরং এই কথা ভেবে ঈর্ষান্বিত হই যে, তাদের কাছে অনেক সম্পদ আছে। তারা অনেক আরামে জীবনযাপন করছে। আহ! আমাদের যদি সম্পদ থাকত, তা হলে আামরাও তাদের মতো আরাম আয়েশের জীবনযাপন করতাম। দেখুন, চিন্তার কত পার্থক্য।

যাহোক, সাহাবায়ে কেরামের প্রশ্নের উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি তোমাদেরকে একটি আমলের কথা বলে দিচ্ছি, যদি তোমরা নিয়মিত সে আমলটি কর তা হলে দান-সদকাকারীদের চেয়ে সাওয়াবে তোমরা আগে বেড়ে যাবে। আমলটি হচ্ছে প্রতি নামাজের পরে তেত্রিশবার সুবহানআল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদু লিল্লাহ এবং চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার পড়বে।

নেক কাজের লোভ বহুত বড় নেয়ামত :

যদি সম্পদশালীরাও এ জিকির শুরু করে দেয়? সেক্ষেত্রে সাহাবিদের প্রশ্নটি একই অবস্থায় থাকে। কারণ সম্পদশালীরা তখনও নেকি অর্জনে তাদের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। এর জওয়াব হলো, মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বলতে চেয়েছেন, যদি তোমাদের এই লোভ এবং আক্ষেপ অবশিষ্ট থাকে যে, আমরাও যদি সম্পদশালী হতাম তা হলে তাদের মতো আমরাও দান-সদকা করতাম। তাহলে আল্লাহ তায়ালা এ লোভ ও আক্ষেপের বরকতে তোমাদেরকেও দান-সদকা করার সাওয়াব দান করবেন।

যাহোক, কোনো নেক কাজ করার লোভ ও ইচ্ছা এবং তা করতে না পারার আক্ষেপও অনেক বড় নেয়ামত। তাই যখন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে জানবে যে, অমুক ব্যক্তি নেক আমল করে, তখন তোমরা এ দোয়া কর যে, হে আল্লাহ! এ নেক কাজ করা আমার সাধ্যের বাইরে, আপনি এ কাজ করতে আমাকে সাহায্য করুন, আমাকে নেক আমলের তাওফিক দান করুন। তা হলে আল্লাহ তায়ালা হয় তোমাকে উক্ত আমলের তাওফিক দেবেন নচেৎ ওই আমলের সাওয়াব ও প্রতিদান দান করবেন। এটি বহুত দামী ও মূল্যবান কথা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে