উম্মতের ভ্রান্ত বাহাত্তর দলের ব্যাখ্যা ও সঠিক দল

উম্মতের ভ্রান্ত বাহাত্তর দলের ব্যাখ্যা ও সঠিক দল

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:২৭ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন : মানুষের মুখে শোনা যায়, আল্লাহর রাসূল বলেছেন, আমার উম্মত তেহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। তার মধ্যে একটি দল জান্নাতে যাবে আর বাকি সব দল জাহান্নামে যাবে। এখন তো দলের কোনো শেষ নেই। কোন দল যে জান্নাতে যাবে!

তাবলীগ একটি দল, হেফাজত একটি দল, চরমোনাই একটি দল। কওমীরা একটি দল, আলিয়ারা আরেকটি দল ইত্যাদি। কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে বলেন, হানাফী একটি দল, মালেকী একটি দল, হাম্বলী একটি দল এবং শাফেয়ী একটি দল। মানুষ বলে থাকে, আমরা এখন কোন দলে যাব? কোন দল যে জান্নাতে যাবে সেটি তো আমাদের জানা নেই।

আমার কাছে অনেকে এ বিষয়টি উত্থাপন করেছেন বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন ভাষায় এবং তারা অনেকে বারবার এ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। তাই মুফতি সাহেবের নিকট আকুল আবেদন এই যে, বিষয়টি স্পষ্ট করে বাধিত করবেন।  আল্লাহ উত্তম তাওফীকদাতা।

উত্তর : কয়েকটি বিষয় আমরা প্রথমে জেনে নিই-

(এক) যার ঈমান আছে (হোক সেটা দুর্বল ঈমান) সে একদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। ঈমানদার হওয়ার পর যদি সে ভালো আমলওয়ালা হয় তাহলে সে প্রথম পর্যায়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাকে শাস্তি পেতে হবে না। আর যদি ঈমানদার হওয়ার পর ভালো আমলওয়ালা না হয়, তার আমল খারাপ হয়, তাহলে খারাপ আমলের কারণে শাস্তি ভোগ করার পর সে জান্নাতে যাবে। এটি কোরআন-সুন্নাহ থেকে গৃহীত একটি সর্বসম্মত মূলনীতি। যেসব মুমিন খারাপ আমলের কারণে জাহান্নামে যাবে তারা শাস্তি ভোগ করার পর আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তাদের ঈমানের কারণে জাহান্নাম থেকে বের করে অনবেন।

হাদিসে কুদসীতে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলবেন,

أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِه مِثْقَال حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ

‘যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের কর।’ (সহিহ বুখারী, হাাদস: ২২)।

এ হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, যার অন্তরে ঈমান আছে সে একদিন না একদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাহলে বলা যায়, যার ঈমান আছে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে না। হ্যাঁ, সে খারাপ আমলের কারণে কিছুদিন জাহান্নামে থেকে জান্নাতে যাবে। তাহলে যে দলের ঈমান আছে আপনি সে দলের ব্যাপারে বলতে পারেন না যে, তারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামে যাবে।

তাবলীগ জামাতের ঈমান আছে, চরমোনাই দলের ঈমান আছে, হেফাজতের ঈমান আছে, ইসলামী খেলাফত আন্দোলনের ঈমান আছে, যারা হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী তাদেরও ঈমান আছে। তাহলে তাদেরকে বাহাত্তর দলের অন্তর্ভুক্ত করে স্থায়ীভাবে জাহান্নামী বলার অবকাশ নেই। হ্যাঁ, তাদের কারো আমলের সমস্যা থাকলে সে কারণে তারা শাস্তি পেয়ে জান্নাতে যাবে।

(দুই) যাদের ঈমান নেই তারা জান্নাতে যাবে না। হাদিসে এসেছে, রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إنه من يعش منكم بعدي فسيرى اختلافا كثيرا فعليكم بسنتي و سنة الخلفاء الراشدين المهديين تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ.

‘মনে রেখ, আমার পরে তোমরা যারা জীবিত থাকবে তারা অনেক মতানৈক্য দেখতে পাবে। তখন আমার সুন্নাহ ও আমার খোলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরবে। তা অবলম্বন করবে ও মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরবে। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৬০৭, সুনানে তিরমিযী, ৫/৪৩, মুসনাদে আহমাদ ৪/১২৬, হাদিস: ১৬৬৯২, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস: ৪২)।

এ হাদিসে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার কথা বলেছেন। যারা সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে তারা হচ্ছেন আহলে সুন্নাহ।

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলে করিমম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

ألا إن من قبلكم من أهل الكتاب افترقوا على ثنتين وسبعين ملة وإن هذه الملة ستفترق على ثلاث وسبعين  ثنتان وسبعون في النار وواحدة في الجنة وهي الجماعة .

‘তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাব বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে। আর এই উম্মত হবে তেহাত্তর দলে বিভক্ত। বাহাত্তর দলই যাবে জাহান্নামে। (শুধু) একটি দল যাবে জান্নাতে। আর সেটি হচ্ছে জামাআ।’(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৫৯৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ২৭৭৯, ইমাম তিরমিযী রহ. এটিকে হাসান বলেছেন,  মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৬৯৭৯)।

এ হাদিসে বলা হয়েছে নাজাতপ্রাপ্ত দল হচ্ছে জামাআ। উভয় হাদিস মিলিয়ে বলা যায়, নাজাতপ্রাপ্ত দলটি হচ্ছে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআ। যারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আদর্শের ওপর থাকবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ হবে না।

যে যতটুকু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে সে ততটুকু দূরে সরে যাবে। কারো যদি আমল খারাপ হয় তাহলে সে আমলের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ থেকে বিচ্যুত। সে খারাপ আমলের কারণে জাহান্নামে যাবে, এরপর জান্নাতে যাবে।

কেউ যদি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর চিন্তা থেকে বিচ্যুত হয় তাহলে সে চিন্তার ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বাইরে। যদি তার ঈমান থাকে তাহলে সে জাহান্নামে থেকে পরে জান্নাতে যাবে।

আর কারো যদি আকীদা বিশ্বাস খারাপ হয়, যার কারণে তার ঈমানই না থাকে তাহলে সে পূর্ণরূপে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ থেকে বিচ্যুত। সে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

বাহাত্তর দল: উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিষ্কার হলো যে, যার ঈমান আছে, আমলও ভালো সে প্রথম পর্যায়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যার ঈমান আছে কিন্তু আমল খারাপ বা চিন্তা খারাপ সে তার অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
আর যার ঈমানই নেই, সে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এ আলোচনা মনে রাখলে আমরা সহজে বুঝতে পারব বাহাত্তর দল কারা।

বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে, এ বাহাত্তর দল কারা, হাদিসে স্পষ্ট করে তা বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ জান্নাতে প্রবেশ করবে। এবং এ বাহাত্তর দল কি স্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে, না অস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে, (অর্থাৎ খারাপ আমলের কারণে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করে আবার জান্নাতে যাবে,) এসব কিছু হাদিসে স্পষ্ট করে বলা হয়নি।

যদি বলা হয়, তারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামে যাবে তাহলে বলতে হবে তারা (বাহাত্তর দল) মুমিন নয় বরং তারা কাফের।

আর যদি বলা হয়, তারা খারাপ আমলের কারণে জাহান্নামে যাবে এরপর তারা জান্নাতে যাবে, তাহলে বলতে হবে, তারা মুমিন কিন্তু খারাপ আমলওয়ালা।

বাহাত্তর দল কারা, হাদিসে তার কোনো উল্লেখ নেই। হাদিসে শুধু বলা আছে যে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ জান্নাতে যাবে। তাই হাদিসটি এভাবে বুঝতে হবে যে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ জান্নাতে যাবে। আর যারা কাফের তারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামে যাবে। আর যারা মুমিন কিন্তু আমল খারাপ বা চিন্তা খারাপ, তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার পর জান্নাতে যাবে।

তারা কারা, হাদিসে তাদেরকে চিহ্নিত করা হয়নি, তাই আমাদেরও চিহ্নিত করার দরকার নেই।

হ্যাঁ, কেউ কেউ বাহাত্তর দল চিহ্নিত করে দিয়েছেন। তারা জাবরিয়া, কাদরিয়া, শিআ, মুতাজিলা ইত্যাদি ভ্রান্ত দল থেকে বাহাত্তর দল চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তারা একেকজন একেকভাবে বলেছেন, তাই বাহাত্তর দলের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। এবং কেউ একটি দলকে বাহাত্তর দলের মধ্যে ঢুকিয়েছেন, আবার কেউ সেটিকে বাদ দিয়েছেন। একেইভাবে কেয়ামত পর্যন্ত তো আরো কত ভ্রান্ত দলের উদ্ভব ঘটবে। তাদেরকে যোগ করলে তো বাহাত্তর দল থাকবে না; বরং অসংখ্য দল হবে। তাই বাহাত্তর দল কারা, এটি নির্দিষ্ট না করাই যুক্তিযুক্ত।

বাহত্তর দ্বারা কি বাহাত্তর উদ্দেশ্য: হাদিসে যে বাহাত্তর দলের কথা উল্লেখ করা হলো, এর দ্বারা আধিক্য উদ্দেশ্য হতে পারে। বাহাত্তর সংখ্যাই উদ্দেশ্য নয়। আরবি ভাষায় প্রচলন আছে যে, সত্তর দ্বারা আধিক্য উদ্দেশ্য নেয়া হয়। (রুহুল মাআনী ১০/ ২৯৪)।

আমরা যেমন বলি, ‘হাজারবার বললেও বিশ্বাস করব না’। এ বাক্যে হাজারবার বলা উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে তুমি যত বেশিই বলো না কেন, আমি তোমার কথা বিশ্বস করব না। তেমনিভাবে হাদিসে বাহাত্তর দ্বারা আধিক্য উদ্দেশ্য হতে পারে। বাহাত্তরটিই দল হবে, এটি উদ্দেশ্য নয়।

-এ পুরা আলোচনার জন্য দেখুন; মুকাদ্দিমাতুল কাওসারী, পৃ: ১১২-১১৩

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে