Alexa উচ্চবিত্তের পরিচয় কেন `অপচয়ে’

উচ্চবিত্তের পরিচয় কেন `অপচয়ে’

প্রকাশিত: ১৪:৪০ ২ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৪:৪৪ ২ অক্টোবর ২০১৯

ড. ফারজানা আলম, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলদেশের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপক। তিনি যুক্তরাজ্য থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। তার গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে সমজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ উন্নয়ন।

সারাবিশ্ব বাংলাদেশকে বড়জোর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জানে। 

এখনো এদেশের মানুষ একদিকে যেমন দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। আবার এদেশে উচ্চবিত্তের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু অপচয়ের দিক দিয়ে কোনো গোষ্ঠী কম যায় না। কখনো এ অপচয় সামাজিক আচারের নামে আবার কখনো কেবলমাত্র মনের খেয়াল, বিলাসিতা বা উদাসীনতার জন্য। 

একটু যদি চোখ মেলে দেখি,  নিতান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারও একটি মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আর এ অনুষ্ঠানগুলো করার জন্য বছরের পর বছর পরিবাররগুলো সঞ্চয় করতে থাকে। লাগাতার নানান পর্বে আচার এবং অনুষ্ঠান হয়। 

খরচের একটা বড় অংশ চলে যায় খাবারের জোগান দিতে। নিতান্ত দরিদ্র মানুষও সেদিন চেষ্টা করে মনে রাখার মতো পর্যাপ্ত খাদ্য দিতে। প্রতি প্লেটে উপর্যপরি খাবার ঢেলে দেয়া হয়। ফলাফল- অপচয়। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায় মাত্র কয়েকঘণ্টায়। অল্প সময়ের জন্য হলেও তারা দারিদ্রতার খোলস ছেড়ে উচ্চবিত্ত হতে চায়। ফলে দারিদ্রতার চক্র তাদের আষ্টেপৃষ্টে ধরে।

আসলে উচ্চবিত্ত চেনার উপায় কী? অপচয় কি কখনো উচ্চবিত্তের পরিচয় হতে পারে? সত্যিকারের উচ্চবিত্তের দিকে একটু তাকানো যাক।
ঢাকার অভিজাত বিয়ে বাড়িগুলোতে যে রান্না হয়, তা বেশিরভাগ ধনীদেশগুলোর সাধারণ নাগরিকেরা চিন্তা করতেত পারবে না। অন্যান্য জাঁকজমক তো রূপকথাকেও হার মানিয়ে দেয়। কোটি কোটি টাকা মাত্র একটি রাতে কিংবা কয়েক ঘণ্টায় কর্পূরের মতো উড়ে যায়। দেশের বিখ্যাত রন্ধনশিল্পীরা সেদিন তাদের সর্বোচ্চ মেধা দিয়ে শ্রেষ্ঠ রান্নাগুলো করেন। এতে সব আয়োজন যাদের জন্যে যেসব অতিথিরাও কিন্তু বিত্তবান। ভালো খাবার তাদের কাছে অত্যন্ত সুলভ। প্লেটের বেশিরভাগ খাবার একটু খুঁটে তারা ফেলে দেয়, ফলাফল-অপচয়।

আমরা কি জানি, এ খুঁটে খেয়ে ফেলে দেয়া খাবারগুলো কত পরিবারের, কতো মানুষের স্বপ্নের খাবার।  কতো বাবাই মাইলের পর মাইল হাঁটতে রাজি, একটু ভালো খাবারের জন্য। কতো পরিবার আছে যেখানে এই জাতীয় খাবার কোনোদিন রান্নাও হয়নি, হয়তো হবেও না।

কুকুর-বেড়াল শুধু নয়, কত মানবশিশু ডাস্টবিনে ময়লা ঘাঁটতে দেখেছি, ফেলে দেয়া ভালো খাবারের আশায়। মানুষের মতো মন নিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যায়-দৃশ্যটা কত নিষ্ঠুর, কতো করুণ।

আমি বিত্তের বিপক্ষে নই। সবার সামাজিক অবস্থান এক হবে না, তারতম্য থাকবেই। এটা পুরোনো বিষয়। আমি শুধু অপচয়ের বিপক্ষে। এই ব্যাপারে ইসলাম ধর্মের অবস্থান খুবই সুন্দর। ইসলাম মতে, আমরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী আহার করবো, পরিধান করবো কিন্তু অপচয় করবো না।

বিত্তশালী কিংবা নিম্নবিত্ত সন্তানের বিয়েতে সবাই সর্বোচ্চ আয়োজন করতে চায়। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিত্ত দেখানোর আয়োজন প্রতিযোগিতার দিন শেষে দেখা যাচ্ছে- তা হলো নিদারুণ অপচয়। অনুষ্ঠানের শেষে এ খাবার কারো কোনো কাজে লাগে না। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করছে। উদ্বৃত্ত খাবারগুলো অভাবিদের কাছে পৌঁছে দিতে। কিন্তু তাদের সংখ্যা অপ্রতুল। শেষ বেলায় অনেক খাবারই খাবার উপযোগিও থাকে না। খাবার চলে যায় ডাস্টবিনে। পলিথিনে বাঁধা খাবার ডাস্টবিনে যেতে যেতে সেটা আর কুকুর-বিড়ালের খাবারের উপযোগিও থাকে না।
খাবার মানুষের মৌলিক চাহিদা। আমি Marketing- এর শিক্ষক। Needs, Wants, demands নিয়েই আমাদের কাজ। অল্প কিছু চাহিদা যা সৃষ্টিকর্তার তৈরি করা, যেমন- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিতসা। এর প্রথমেই আসে খাদ্য। আমি একজন সাধারণ শ্রমিক হই কিংবা প্রধানমন্ত্রী, ক্ষুধা কাউকে ছাড় দেয় না। খাবার ছাড়া আমরা কেউ ২/৩ দিনের বেশি বেঁচে থাকতে পারবো না। সেই খাদ্যকেই বৈভবের মাপকাঠি বানিয়ে অপচয় করলে এর ফলাফল অদূর ভবিষতয়ে কখনোই ভালো হবে না। প্রজন্মের ওপর প্রভাব পড়বেই।

There is no planet B- আমাদের জন্য দ্বিতীয় কোনো পৃথিবী নেয়। এই একটাই পৃথিবী আামাদের,  সীমিত জমি, আলো-বাতাস, সীমিত উর্বরা শক্তি। প্রযুক্তি হয়তো উতপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, কিন্তু সেই প্রযুক্তিরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। আর একটি দেশের বিত্তশালীদের আচরণ কখনোই অপচয়ে সর্বস্ব হওয়া উচিত নয়। বিত্তশালীদের ভাত-কাপড়ের চিন্তা করতে হয়না। কাজেই তারাই পথ দেখাবে। এখনো দেশের একটা বড় সংখ্যক স্কুল কলেজ লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতারা একসময়ের বিত্তশালীরা তারাইতো শিক্ষানুরাগী হবেন, সংস্কৃতমনা হবেন। বিত্তের সঠিক ব্যবহার না করলে পৃথিবী তাদের মনে রাখবে না। ১০ রকমের খাবার সমারোহ আপ্যায়ন দিয়ে নয়, সমাজে উন্নয়নের আলো ছড়াতে সাহায্য করলে মানুষ বেশি মনে রাখবে।

সামান্য সহযোগিতা কিংবা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে মানুষের মনে জায়গা করা খুবই সহজ। সম্পদের অপচয় দেখলে অভাবিদের মনে বরং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, সম্পদশালীদের প্রতি শ্রদ্ধ কমে যায়। যা কোনো সমাজের জন্যই কাম্য নয়।

আমরা হচ্ছি সেই জাতি- ১৭কোটি মানুষ নিয়ে হিমসিম খেয়েও আবার ১০লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি, খাবার ভাগ করে খাচ্ছি। এতো মানবিক একটি জাতির খাবারের অপচয় করা মানায় না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর