Alexa উগ্রতা নয়, বিনয়-নম্রতা ও মধ্যপন্থাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য (পর্ব-১)

উগ্রতা নয়, বিনয়-নম্রতা ও মধ্যপন্থাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য (পর্ব-১)

মুহম্মদ রফিকুর রহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:০৬ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৯:৩৪ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

দাওয়াতই হচ্ছে ইসলামের সঠিক পথ- ফাইল ফটো

দাওয়াতই হচ্ছে ইসলামের সঠিক পথ- ফাইল ফটো

ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানবতার ধর্ম। উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ, খুন-খারাবি, ছিনতাই, দুর্নীতিকে কখনো ইসলাম সমর্থন করে না। 

উগ্রবাদ নয়, সন্ত্রাস নয়, দাওয়াতই হচ্ছে ইসলামের সঠিক পথ। আত্মিক পরিশুদ্ধির মাধ্যমে নাজাতের পথ দেখাতেই আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সমগ্র মানব জাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে রাসূল করে পাঠিয়েছিলেন। তিনি দাওয়াতের মাধ্যমেই মানুষকে মহান আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। নবী (সা.)-কে আল্লাহ তায়ালা সার্বিকভাবে সুচারুরুপে গড়ে তুলেন সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার মতো করে। তিনি (সা.) পরিস্থিতি বুঝে হিকমাতের মাদ্যমেই মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। মহান আল্লাহর পথে চলার পথ দেখিয়েছেন মহান আল্লাহর নির্দেশেই। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ادْعُ إِلِى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ

‘(হে রাসূল!) আপনি মানুষকে আপনার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান করুন হিকমত ও সৎ উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে কথা বলুন উত্তম পন্থায়। আপনার প্রতিপালকের পথ ছেড়ে কে বিপদগামী হয় সে সম্পর্কে তিনি সবিশেষে অবহিত আছেন এবং কারা সৎ পথে আছে সে বিষয়ও তিনি সম্যক অবহিত। (সূরা: আন নাহল, আয়াত: ১২৫)।

দাওয়াতের পথই হচ্ছে ইসলামের প্রকৃত পথ। উগ্রতা, সন্ত্রাস, তথাকথিত জিহাদ করে ইসলামকে এগিয়ে নেয়ার কোনো নির্দেশনা, অনুমতি পবিত্র কোরআনে কিংবা সহিহ হাদিসের কোথাও উল্লেখ নেই। ভ্রান্ত পথের ভ্রষ্ট ‘আক্বীদায় বিপদগামী কিছু তরুণ-যুবক ইসলামের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে উগ্রতাকে লুফে নিয়েছে জান্নাত প্রাপ্তির আশায়। আসলে উগ্রবাদী সন্ত্রাসীরা কোরআন সুন্নাহর জ্ঞানে অপরিপক্ক ও নির্বোধ। তাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত করে ধোঁকায় ফেলে তথকথিত জিহাদের প্রলোভনে আকৃষ্ট করা হয়।

ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, যুলুম ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ

‘ফিতনা বা সন্ত্রাস হত্যার চেয়েও ভয়াবহ।’(সূরা: আল বাকারাহ, আয়াত: ১৯১)।

মানুষ হত্যা নিষেধ করে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا

‘কেউ কাউকে নরহত্যার অপরাধ অথবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টির কারণ ব্যতীত হত্যা করলে সে যেন গোটা মানবতাকে হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণ বাঁচালে সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচাল।’ (সূরা: আল মায়িদাহ, আয়াত: ৩২)।

নবী (সা.) বলেছেন, শেষ জামানায় এমন একটি গোষ্টির আবির্ভাব ঘটবে যারা হবে বয়সে নবীন, বুদ্ধিতে অপরিপক্ক ও নির্বোধ। তারা পবিত্র কোরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কন্ঠনালীও অতিক্রম করবে না। (অর্থাৎ-হৃদয় স্পর্শ করবে না) তারা সৃষ্টির সেরা মানুষের কথাই বলবে কিন্তু দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন ধনুক থেকে তীর বেরিয়ে যায়। (আত তিরমিযী)।

বিদায় হজের সময় মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করে নবী (সা.) বলেন, শুনে রাখো! মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। সাবধান! আমার পরে তোমরা একজন আরেকজনকে হত্যা করার মতো কুফরী কাজে লিপ্ত হয়ো না। আল্লাহ তায়ালা এবং নবী (সা.) এর সতর্ক বানী মান্য করে চললে সমাজের বুকে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকানণ্ড মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। উগ্রতা, যুলুম, সন্ত্রাস পরিহার করে হিকমাত ও কৌশল প্রয়োগ করে বিনয়-নম্রতা সহকারে মানুষকে মহান আল্লাহর পথে আহ্বান করাই শ্রেষ্ঠ দাওয়াত। ইসলামে কোনো জবরদস্তির বিষয় নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

لاَ إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ

‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।’ (সূরা: আল বাকারাহ, ২৫৬)।

নীতি, কর্ম আদর্শ ও দর্শনে একপেশে নয় ও চরম পন্থাও নয় বরং ভারসাম্যপূর্ণ থাকাটাই মুসলিমের তথা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ

‘যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুগঠিত করেছেন এবং তোমাকে ভারসাম্যপূর্ণ করেছেন।’ (সূরা: আল ইনফিতার, আয়াত: ৭)।

ইবাদতের ক্ষেত্রেও মুমিনের জন্য একটা ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। কোনো ব্যাপারেই অতিরঞ্জন আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না। সংসার বিবাগি হয়ে সন্ন্যাসী জীবনও যেমন কাম্য নয় তেমনি দ্বীনের ইবাদত থেকে সম্পূর্ণ গাফেল হয়ে মহান আল্লাহকে অমান্য করে কুফরীর জীবন বাঞ্ছীনীয় হতে পারে না। সংসার, পরিবার, পরিজন সমভিব্যবহারে সবার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়েই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ادْعُواْ رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাক বিনীতভাবে ও গোপনে। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা: আল আরাফ, আয়াত: ৫৫)।

দ্বীনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই সব ধরনের ইবাদত বন্দেগী চালিয়ে যেতে হবে। কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি মহান আল্লাহর পছন্দ নয়। ক্রোধের কারণে কর্কশ স্বরে গাল-মন্দ করা, চিৎকার-চেচামিচি, কলহ, বিবাদ-বিসম্বাদ না করে ধৈর্য-সহিষুতার পরিচয় দিয়ে সবার কাছে প্রিয়ভাজন হয়ে নিজের ঈমান ঠিক রাখতে হবে। মহান আল্লাহকেও ডাকতে হবে বীনিতভাবে, চিৎকার করে, উচ্চকন্ঠে, হুকুমের স্বরে, ধমকের স্বরে, কি কখনো কারোর কাছে কিছু চাওয়া যায়? আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلاَ تَجْهَرْ بِصَلاَتِكَ وَلاَ تُخَافِتْ بِهَا وَابْتَغِ بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلاً

‘তোমার সালাতে স্বর উঁচু করো না এবং একেবারে নিচুও করো না এবং এর মাঝে একটি পথ (অর্থাৎ-মধ্যপন্থা) তালাশ করো।’ (সূরা: আল ইশরা, আয়াত: ১১০)।

وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ إِنَّ أَنكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ

‘তোমার হেঁটে চলার মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কন্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয়ই গাধার কন্ঠস্বরই সবচেয়ে খারাপ।’ (সূরা: লুকমান, আয়াত: ১৯)।

জীবনের সবক্ষেত্রে কোনো বাড়াবাড়ি অপব্যয় অপচয় অহেতুক বিলাসিতা যেমন করা যাবে না তেমনি একেবারে কৃপণতাও করা যাবে না। যখন যেখানে যেমন দরকার তখন সেখানে তেমনটাই বিচার-বিবেচনা প্রসূতভাবে সম্পাদন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا

‘যারা, যখন ব্যয় করে তখন অপচয় করে না এবং কৃপণতাও করে না এবং তারা এর মাঝে মধ্যপন্থী।’ (সূরা: আল ফুরকা, আয়াত: ৬৭)।

ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী করিম (সা.) একদা সা’দ (রা.)-কে ওজু করার সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে বললেন, হে সা‘দ! এ অপচয় কেন? তখন তিনি বললেন, ওজুতেও কি অপচয় আছে?

রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, যদিও তুমি একটি প্রবাহমান নদীতে থাকো। (সহিহ বোখারী)।

বিনয় মানুষের ভুষণ আর ভদ্রতা-ভব্যতা ও নম্রতা বিনয়ীদের মাঝেই পরিদৃষ্ট হয়। যার মধ্যে যত বেশি বিনয় পাওয়া যাবে, সে তত বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবে। যারা মহান আল্লাহর হুকুম বিনয় ও ধৈর্যসহকারে পালন করে তারা শ্রেষ্ঠ বিনয়ী এবং তাদের বন্ধু আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُواْ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاَةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ

‘তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনরা যারা বিনিত হয়ে সালাত কায়েম করে ও জাকাত দেয়।’ (সূরা: আল মায়িদাহ, আয়াত: ৫৫)।

তিনি আরো ওয়াদা করেছেন,

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُواْ وَعَمِلُواْ الصَّالِحَاتِ وَأَخْبَتُواْ إِلَى رَبِّهِمْ أُوْلَـئِكَ أَصْحَابُ الجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

‘যারা মুমিন, সৎকর্মপরায়ন এবং তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনয়াবনত, তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।’ (সূরা: হুদ, আয়াত: ২৩)।

অহংবোধ ও হামবড়া ভাব যার মধ্যে থাকে তাকে কেউ পছন্দ করে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا

‘রহমান এর বান্দা তারাই, যারার পৃথিবীতে বিনয় হয়ে চলে।’(সূরা: আল ফুরকান, আয়াত: ৬৩)। চলবে...

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে