Alexa ঈমান আনার পর কুফরী করার পরিণতি  

ঈমান আনার পর কুফরী করার পরিণতি  

শেষ পর্ব

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:২৪ ৮ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৯:২৬ ৮ ডিসেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আল্লাহ, রাসূল (সা.), ইসলামী নিদর্শন ও ইসলামের বিধান-বিধান সমূহের প্রতি ভালবাসা, ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মেনে চলাকে অপরিহার্য মনে করা ছাড়া ঈমান কল্পনা করা যায় না।

আরো পড়ুন>>> ঈমান আনার পর কুফরী করার পরিণতি পর্ব-১ 

এইসব বিষয়সমূহকে অবজ্ঞা করা, বিদ্রূপ করা, এসবের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করা, এমনকী অপ্রীতিকর মনে করাও কুফরী ও মুনাফেকী।

এই মানসিকতা পোষণকারীদের ঈমান-ইসলামের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নাই। আর অবজ্ঞা ও বিদ্রূপ তো এতই ভয়াবহ যে, তা শরয়ী দলীলে প্রমাণিত ছোট কোনো বিষয়ে প্রকাশিত হলেও সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তির ঈমান শেষ হয়ে যাবে এবং তার ওপর কুফরের বিধান আরোপিত হবে।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ بَعْدَ إِيمَانِهِمْ ثُمَّ ازْدَادُواْ كُفْرًا لَّن تُقْبَلَ تَوْبَتُهُمْ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الضَّآلُّونَ

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ وَمَاتُواْ وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَن يُقْبَلَ مِنْ أَحَدِهِم مِّلْءُ الأرْضِ ذَهَبًا وَلَوِ افْتَدَى بِهِ أُوْلَـئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ

সরল বঙ্গানুবাদ:‘যারা ঈমান আনার পর কুফরী করল, তারপর তাদের কুফরী বেড়েই চলল, তাদের তাওবাহ কখনো কবুল করা হবে না এবং এ লোকেরাই পথভ্রষ্ট। যারা কুফরী করে এবং সেই কাফির অবস্থায়ই মারা যায়,তাদের কেউ পৃথিবী-ভরা স্বর্ণও বিনিময়স্বরুপ প্রদান করতে চাইলে তা তার কাছ থেকে কখনো গ্রহন করা হবে না। এরাই তারা, যাদের জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা: আলে- ইমরান, আয়াত: ৯০-৯১)।

১ম পর্বের পর থেকে...

মুসনাদ আহমাদের একটি হাদিস রয়েছে- আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক জান্নাতবাসীকে আনা হবে এবং তাকে আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘বলো, তুমি কী রুপ জায়গা পেয়েছ।’সে উত্তরে বলবে, ‘হে আল্লাহ! আমি খুব উত্তম জায়গা পেয়েছি।’ আল্লাহ তায়ালা তখন বলবেন, ‘আচ্ছা, আরো চাইতে হলে চাও এবং মনের কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকলে তা প্রকাশ করো।’সে বলবে, ‘হে আমার প্রভু! আমার শুধুমাত্র বাসনা এটাই এবং এ একটি যে, আমাকে পুনরায় পৃতিবীতে পাঠিয়ে দেয়া হোক। আমি আপনার পথে জিহাদ করে পুনরায় শহীদ হব, আবার জীবিত হব এবং পুনরায় শহীদ হব। দশবার যেন এরকমই হয়।’কেননা শাহাদাতের প্রকৃষ্টতা এবং শহীদের পদ-মর্যাদা সে স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। অনুরুপভাবে একজন জাহান্নামবাসীকে আহ্বান করা হবে। এবং আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি তোমার স্থান কিরুপ পেয়েছ? সে বলবে,‘হে আল্লাহ!খুবই জঘন্য স্থান।’আল্লাহ তায়ালা তখন বলবেন, ‘পৃথিবী পরিমাণ সোনা দিয়ে এ শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়া তুমি পছন্দ করো কি? সে বলবে,‘হে প্রভু! হ্যাঁ। সেই সময় আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি মিথ্যাবাদী। আমি তো তোমার নিকট এর চেয়ে বহু কম ও অত্যন্ত সহজ জিনিস চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি এটাও করোনি।’ অতএব, তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়া হবে। (হাদিসটি সহিহ,মুসনাদ আহমাদ-৩/২০৭,২০৮)।

তাই এখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 

أُوْلَـئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ

‘তাদের জন্য বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং এমন কোনো জিনিস নেই যা তাদেরকে এ শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে বা তাদেরকে  কোনো প্রকার সাহায্য করতে পারে।’

কাফিরদের শাস্তি কবর থেকেই শুরু হবে: এ মর্মে আনাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
‘বান্দাকে যখন কবরে রেখে তার সাথীগণ অর্থাৎ-আত্নীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব সেখান থেকে চলে আসে আর তখনো সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায় তার নিকট (কবরে) দু‘জন ফেরেশতা পৌছেন এবং তাকে বসিয়ে প্রশ্ন করেন, তুমি দুনিয়াতে এই ব্যক্তির অর্থাৎ-মুহাম্মাদ (সা.) এর ব্যাপারে কী জান? এ প্রশ্নের উত্তরে মুমিন বান্দা বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা.) নি:সন্দেহে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তখন তাকে বলা হয়, ওই দেখে নাও তোমার ঠিকানা জাহান্নাম কিরুপ জঘন্য ছিল। তারপর আল্লাহ তায়ালা তোমার সে ঠিকানা অর্থাৎ-জাহান্নামকে জান্নাতের সঙ্গে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তখন সে বান্দা দু‘টি ঠিকানা (জান্নাত-জাহান্নাম) একই সঙ্গে দেখবে। কিন্তু মুনাফিক ও কাফিরদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, দুনিয়াতে এ ব্যক্তি অর্থাৎ-মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতে? তখন সে উত্তরে দেয়, আমি বলতে পারি না (প্রকৃত সত্য কী ছিল) মানুষ যা বলত আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হয়, তুমি বিবেক-বুদ্ধি দিয়েও চেষ্টা করোনি এবং মহান আল্লাহর কোরআন পড়েও জানতে চেষ্টা করোনি। এ কথা বলে তাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে কঠিনভাবে মারতে থাকে, এতে সে তখন উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকে। এ চিৎকারের শব্দ পৃথিবীর  জিন আর মানুষ ছাড়া নিকটস্থ সকলেই শুনতে পায়। (মুত্তাফাকুন‘আলাইহি,শব্দসমূহ বুখারী,র হা:-১৩৩৮,১৩৭৪)।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ-

(১) কাফির অবস্থায় যাদের মৃত্যু হবে পরকালে তাদের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। তারা জাহান্নামে যাবে। কখনো তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে না। অর্থাৎ-জাহান্নাম থেকে তারা কখনো বের হতে পারবে না।

(২) কাফিরের তাওবাহ মহান আল্লাহর নিকট কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না, কেননা তারা পথভ্রষ্ট। যেমন- ফেরাউনের তাওবাহ মহান আল্লাহর নিকট গৃহীত হয়নি । যেমন-আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

قَالَ آمَنتُ أَنَّهُ لا إِلِـهَ إِلاَّ الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَاْ مِنَ الْمُسْلِمِينَ

آلآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ

‘ফেরাউন বলল, ‘আমি ঈমান আনছি যে, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই যাঁর প্রতি বনী ইসরাইল ঈমান এনেছে। আর আমি আত্নসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’এখন ঈমান আনছ, আগে তো অমান্য করেছ আর ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত থেকেছ।’(সূরা: ইউনুস, আয়াত: ৯০-৯১)।

(৩) তাওবাহ কবুলের জন্য পূর্বশর্ত হলো তাকে প্রথমে অবশ্যই মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হতে হবে। মুমিন হওয়া ব্যতীত মহান আল্লাহর নিকট কোনো বিনিময়ই পাওয়া যাবে না। সে জন্য মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে তাওবাহ করা একান্ত প্রয়োজন।

(৪) পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য দুনিয়া ভর্তি স্বর্ণ এবং তার সমপরিমাণ আরো যদি বিনিময় হিসেবে দেয়া হয় তাও মহান আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে না।

(৫) পরকালে কাফিরদের শাস্তি হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আর সেখানে তারা কোনো সাহায্যকারী পাবে না। কাজেই জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য সর্বদা আল্লাহ তায়ালা কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা অবশ্য কর্তব্য।

উপসংহারে বলা যায় যে, পরকালে কাফিররা আল্লাহ তায়ালা শাস্তি থেকে কোনো অবস্থাতেই রক্ষা পাবে না। কেননা দুনিয়াতে তারা ছিল পথভ্রষ্ট। তাদের কার্যক্রম ছিল আল্লাহদ্রোহী। আল্লাহ তায়ালা তাদের 
সমুচিত শাস্তি প্রদান করবেন। তারা কখনো জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না। তারা সেখানে সব সময় শাস্তি  পেতেই থাকবে। তাইতো আল্লাহ তায়ালা বলেন,

مَن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لاَ يُبْخَسُونَ

أُوْلَـئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلاَّ النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُواْ فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُواْ يَعْمَلُونَ

‘যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, হয় আমি তাদের দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হয় না।’

‘এরাই হলো সেসব লোক আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে; আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হলো।’ (সূরা: হুদ, আয়াত: ১৫-১৬)।

পরিশেষে বলতে চাই, আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের তাওবাহ কবুল করেন  এবং মৃত্যুর সময় ঈমানী অবস্থায় কালিমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’পড়তে পড়তে মৃত্যু দান করেন এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে আমাদেরকে হেফাজত করেন-আমীন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে