Alexa ঈমান আনার পর কুফরী করার পরিণতি  

ঈমান আনার পর কুফরী করার পরিণতি  

পর্ব-১

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৩০ ৫ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২০:৪৮ ৫ ডিসেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আল্লাহ, রাসূল (সা.), ইসলামী নিদর্শন ও ইসলামের বিধান-বিধান সমূহের প্রতি ভালবাসা, ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মেনে চলাকে অপরিহার্য মনে করা ছাড়া ঈমান কল্পনা করা যায় না। 

এইসব বিষয়সমূহকে অবজ্ঞা করা, বিদ্রূপ করা, এসবের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করা, এমনকী অপ্রীতিকর মনে করাও কুফরী ও মুনাফেকী।
 
এই মানসিকতা পোষণকারীদের ঈমান-ইসলামের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নাই। আর অবজ্ঞা ও বিদ্রূপ তো এতই ভয়াবহ যে, তা শরয়ী দলীলে প্রমাণিত ছোট কোনো বিষয়ে প্রকাশিত হলেও সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তির ঈমান শেষ হয়ে যাবে এবং তার ওপর কুফরের বিধান আরোপিত হবে।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ بَعْدَ إِيمَانِهِمْ ثُمَّ ازْدَادُواْ كُفْرًا لَّن تُقْبَلَ تَوْبَتُهُمْ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الضَّآلُّونَ

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ وَمَاتُواْ وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَن يُقْبَلَ مِنْ أَحَدِهِم مِّلْءُ الأرْضِ ذَهَبًا وَلَوِ افْتَدَى بِهِ أُوْلَـئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ

সরল বঙ্গানুবাদ:‘যারা ঈমান আনার পর কুফরী করল, তারপর তাদের কুফরী বেড়েই চলল, তাদের তাওবাহ কখনো কবুল করা হবে না এবং এ লোকেরাই পথভ্রষ্ট। যারা কুফরী করে এবং সেই কাফির অবস্থায়ই মারা যায়,তাদের কেউ পৃথিবী-ভরা স্বর্ণও বিনিময়স্বরুপ প্রদান করতে চাইলে তা তার কাছ থেকে কখনো গ্রহন করা হবে না। এরাই তারা, যাদের জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা: আলে- ইমরান, আয়াত: ৯০-৯১)।

আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট: হাফিজ আবূ বাকর আল বাযযায (র.) বর্ণনা করেন। ইবন আব্বাস (রা.) বরেছেন যে, ‘কতিপয় লোক মুসলিম হয় আবার ধর্মত্যাগী হয়ে যায়। অত:পর আবার ইসলাম গ্রহন করে এবং পুনরায় ধর্মত্যাগী হয়ে পড়ে। তারপর তারা স্বীয় গোত্রের নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করে যে, এখন তাদের তাওবাহ গৃহীত হবে কি না? তাদের গোত্রের লোক তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করে। ফলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সহিহ দারুল মানসূর-২/২৫৮)।

মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পর অবিশ্বাসকারী এবং ওই অবিশ্বাসের অবস্থায়ই মৃত্যুবরণকারীদেরকে এখানে আল্লাহ তায়ালা ভয় প্রদর্শন করেছেন। বলা হচ্ছে যে, মৃত্যুর সময় তাদের
তাওবাহ গৃহীত হবে না। যেমন-অন্য জায়গায় রয়েছে-

وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ 

‘আর এমন লোকদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমন কী যখন তাদের কারো মাথার ওপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে: আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।’ (সূরা: আন-নিসা,আয়াত: ১৮)।

এখোনেও ওই কথাই বলা হয়েছে-

لَّن تُقْبَلَ تَوْبَتُهُمْ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الضَّآلُّونَ

‘তাদের তাওবা কখনোই গৃহীত হবে না এবং এরাই তারা যারা সুপথ হতে ভ্রষ্ট হয়ে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয়েছে।’

আয়াতদ্বয়ের সংক্ষিপ্ত তাফসীর: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ بَعْدَ إِيمَانِهِمْ ثُمَّ ازْدَادُواْ كُفْرًا لَّن تُقْبَلَ تَوْبَتُهُمْ 

‘যারা ঈমান আনার পর কুফরী করল, তারপর তাদের কুফরী বেড়েই চলল, তাদের তাওবাহ কখনো কবুল করা হবে না....।’

কুফরের ওপর মৃত্যুবরণকারীদের তাওবাহ কখনো গৃহীত  হবে না, যদিও তারা পৃথিবী পরিমাণ সোনা মহান আল্লাহর পথে খরচ করে।

‘আয়িশাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে-

রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ‘আব্দুল্লাহ ইবনু জুন‘আন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি একজন বড় অতিথী সেবক ও গোলাম আজাদকারী লোক ছিল। তার এ সওয়াব কোনো কাজে আসবে কি? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন ‘না, কেননা সে সারা জীবন একবারও ‘হে আমার প্রভু! কিয়ামতেরদিন আমাকে ক্ষমা করুন বলেনি” । (মুসলিম-১/১৯৬,আহমাদ-৬/১২০, হাকিম-২/৪০৫.হিলাইয়াতুল আওলিয়া-৩/২৭৮,সহীহ- ২৪৯)।

অনুরুপভাবে অবিশ্বাসী কাফিররাও যদি দুনিয়া ভর্তি স্বর্ণও তাদের মুক্তিপণ হিসেবে প্রদান করতে চায় তাহলে তাও গ্রহন করা হবে না। যেমন-অন্য জায়গায় আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وَلاَ يُقْبَلُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلاَ تَنفَعُهَا شَفَاعَةٌ

‘কারো নিকট হতে বিনিময় গৃহীত হবে না, সুপারিশও ফলপ্রদ হবে না ‘ (সূরা: আল বাকারা, আয়াত: ১২৩)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

لاَّ بَيْعٌ فِيهِ وَلاَ خِل

‘সেই দিন আসার পূর্বে যেদিন ক্রয়-বিক্রয় ও বন্ধুত্ব থাকবে না।’ (সূরা: ইব্রাহিম,আয়াত: ৩১)।

অন্য স্থানে আরো ইরশাদ হচ্ছে,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ لَوْ أَنَّ لَهُم مَّا فِي الأَرْضِ جَمِيعًا وَمِثْلَهُ مَعَهُ لِيَفْتَدُواْ بِهِ مِنْ عَذَابِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَا تُقُبِّلَ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

‘নিশ্চয়ই যারা কাফির, যদি তাদের কাছে বিশ্বের সমস্ত সম্পদও থাকে এবং এর সঙ্গে সমপরিমাণ আরো
থাকে  এবং এগুলোর বিনিময়ে কেয়ামতের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে চায়, তবুও এই সম্পদ তাদের থেকে কবুল করা হবে না, আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি।’ (সূরা: আল মায়িদাহ,আয়াত: ৩৬)।

ওই বিষয় এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, কাফিরদেরকে আল্লাহ তায়ালার শাস্তি থেকে কোনো জিনিসই রক্ষা করতে পারবে না, যদিও সে অত্যন্ত সৎ ও খুবই দানশীল হয়। যদিও সে পৃথিবী পরিমাণ সোনা মহান আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়, কিংবা পাহাড়, পর্বত, মাটি, বালু, মরুভূমি এবং সিক্ত মাটি পরিমাণ সোনা শাস্তির  বিনিময়ে খরচ করে তবুও তার কোনো উপকারে আসবে না।

কাফিরদের শাস্তি দেয়ার কারণ: আল্লাহ তায়ালা মানব ও দানবকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। অথচ এই মানব ও দানব এর মধ্যে থেকে কিছু পদঙ্খলিত হতভাগ্যরা মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান না এনে তাঁর অবাধ্য হয়ে দুনিয়াতে জীবন-যাপন করলেও তাদের পরকালীন জীবন কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এর কারণ হিসেবে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ

‘নিশ্চয় সে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না।’(সূরা: আল হা-ক্বক্বাহ,আয়াত: ৩৩)।

অর্থাৎ: তাদের কুফরীই তাদের ওপর শাস্তিকে অবধারিত করে দিয়েছে। অতএব, যে ব্যক্তি কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে স্থায়ী শাস্তি ভোগ করবে। যেমন- আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেন,

إِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الْكَافِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيرًا

خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا لَّا يَجِدُونَ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا

يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا

‘নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। এবং তাদের জন্যে জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছেন। তথায় তারা অনন্তকাল থাকবে। সেখানে তারা কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। যেদিন অগ্নিতে তাদের মুখমণ্ডল ওলট-পালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে,হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রাসূলের আনুগত্য করতাম।’ (সূরা: আল আহযাব, আয়াত: ৬৪-৬৬)।

এ ক্ষেত্রে কেউ জন্ম সূত্রে কাফির হোক বা মুসলিম অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়ে কুফরী আক্বীদাহ বিশ্বাস পোষণ করুক, অথবা কুফরী প্রকাশ পায় এমন কাজ কর্ম করুক সর্বাবস্থায় সে উক্ত শাস্তি ভোগ করবে। তবে যদি মৃত্যুর পূর্বেই তাওবাহ করে। আর আল্লাহ তায়ালা যদি তার তাওবাহ কবুর করে, সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। কিন্তু আমাদের বিষয় হলো কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, এমন ব্যক্তির পরিণতি নিয়ে। অতএব,যার মৃত্যু কুফরী অবস্থায় হবে, সে জাহান্নামে স্থায়ী শাস্তি ভোগ করবে। যা কখনো তাদের ওপর হালকা করা হবে না।

এরুপ শাস্তিতে নিপতিত ব্যক্তিকে বলা হবে, আজ যদি ফিদইয়া তথা ঘুষ দেয়া ও গ্রহণের সুযোগ থাকত, তাহলে কি তুমি সে সুযোগ গ্রহণ করতে? তখন সে জবাবে বলবে-হ্যাঁ। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘এর চেয়েও তুচ্ছ জিনিস তোমার কাছে চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা তুমি বাস্তবায়ন করোনি।’ যেমন মুসনাদ আহমাদে রয়েছে- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জাহান্নামবাসীকে কেয়ামতের দিন বলা হবে-পৃতিবীতে যত কিছু রয়েছে, সবই যদি তোমার হয়ে যায়, তবে কি তুমি এ দিনের ভীষণ শাস্তির বিনিময়ে ওই সমস্তই মুক্তিপণ স্বরুপ দিয়ে দেবে? সে বলবে হ্যাঁ।

তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমি তোমার নিকট এর তুলনায় অনেক কম চেয়েছিলাম। যখন তুমি তোমার পিতা আদম (আ.) এর পৃষ্ঠে ছিলে তখন আমি তোমার নিকট অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। তুমি আমার সঙ্গে কাউকেও অংশীদার করবে না। কিন্তু তুমি শির্ক ছাড়া থাকতে পারোনি। (বুখারী-৬/৪১৬,মুসলিম-৪/৫১/ ২১৬৫, আহমাদ-৩/১২৭)।

এ হাদিসটি সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের মধ্যেও অন্য সনদে রয়েছে। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে