ঈদে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে ইসলাম যে পথ দেখালো 

ঈদে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে ইসলাম যে পথ দেখালো 

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:০৮ ২২ মে ২০২০  

আমরা যদি একটু সতর্ক হই। আমাদের মার্কেটিং থেকে একটু বাঁচিয়ে রাস্তার পাশে থাকা শিশুদের জন্য যদি একশ টাকা দিয়ে ঈদের উপহার দিই- তাহলে এটা হবে প্রকৃত মুসলমান ও রোজাদের কর্ম।

আমরা যদি একটু সতর্ক হই। আমাদের মার্কেটিং থেকে একটু বাঁচিয়ে রাস্তার পাশে থাকা শিশুদের জন্য যদি একশ টাকা দিয়ে ঈদের উপহার দিই- তাহলে এটা হবে প্রকৃত মুসলমান ও রোজাদের কর্ম।

আমরা বৈশ্বিক এক দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছি। করোনা ভাইরাসের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সারা পৃথিবীজুড়ে এক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। করোনার নষ্ট আঘাত লেগেছে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।

এই ভাইরাসে মানুষ শুধু অসুস্থ হয়েছে বিষয় কিন্তু এমন নয়, এই ভাইরাস দেশের ব্যবসা বাণিজ্য মানুষের কাজকর্ম অফিস আদালত কলকারখানাও ধ্বংস করেছে। বন্ধ হয়ে পড়েছে অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান। ‘দিন আনে দিন খায়’ মানুষের অভাবটা কেউ বুঝবে না। অসহায় রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ছোট ছোট শিশুদের অভাব কি পরিমাণ সেই হিসেব পৃথিবী রাখে না। দেশে দেশে লকডাউনের ফলে বিশেষত মধ্যম ও নিম্ন আয়ের লোকগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ছে। অনেকের ঘরেই খাদ্যসামগ্রীর সঙ্কট প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে।

এরই মধ্যে বিশ্বমুসলিমের ঘরে এলো পবিত্র মাহে রমজান। এই মাসকে কেন্দ্র করে কত আয়োজন কত উৎসব আর কত কি থাকে কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে এবার রমজান ছিল উৎসব শুন্য। আর দু-এক দিন বাদেই রমজান শেষ হবে। আকাশে শাওয়ালের শুভ্র চাঁদ দেখা যাবে। মুসলমানের ঘরে আসবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এবারের ঈদ সবার ঘরে আনন্দ আনবে না। যাদের বিত্ত আছে এদের ঘরে ঈদ আনন্দের। কিন্তু যার ঘরে দুবেলা দুমুঠো ভাত নেই; তাদের ঘরে ছড়িয়ে পড়বে বিষাদের ছোঁয়া। 

মুসলমানদের প্রধান উৎসব এই ঈদ। এই ঈদ উৎসব শুধুমাত্র বিত্তবানদের? নাকি সব মুসলমানের? দেখুন হাদিস শরিফে আল্লাহর নবী (সা.) কী বলেছেন-

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ دَخَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم وَعِنْدِى جَارِيَتَانِ تُغَنِّيَانِ بِغِنَاءِ بُعَاثٍ فَاضْطَجَعَ عَلَى الْفِرَاشِ وَحَوَّلَ وَجْهَهُ فَدَخَلَ أَبُو بَكْرٍ فَانْتَهَرَنِى وَقَالَ مِزْمَارُ الشَّيْطَانِ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم فَأَقْبَلَ عَلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم فَقَالَ دَعْهُمَا فَلَمَّا غَفَلَ غَمَزْتُهُمَا فَخَرَجَتَا

হজরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। ঈদের দিন রাসূল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন। সেই সময় আমার কাছে দু’টি কিশোরী ‘দুফ’ বাজিয়ে বুআষ (যুদ্ধের বীরত্বের) গীত গাচ্ছিল। অবশ্য তারা গায়িকা ছিল না। তা দেখে আল্লাহর রাসূল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ চেহারা ফিরিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি কাপড় ঢাকা দিয়ে বিছানায় শুয়ে গেলেন। এই সময়ে আবু বকর রাযি. ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘শয়তানের সুর আল্লাহর রাসূলের কাছে?’ এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ চেহারা খুলে আবু বকর রাযি. এর দিকে ঘুরে বললেন, ‘হে আবু বকর ওদেরকে ছেড়ে দাও, আজ তো ঈদের দিন। প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে। আর আজ হলো আমাদের ঈদ।’ অতঃপর তিনি একটু অন্যমনস্ক হলে আমি তাদেরকে চলে যেতে ইঙ্গিত করলাম। তখন তারা বেরিয়ে গেল। (বুখারি হাদিস- ৯৪৯, মুসলিম হাদিস- ২১০২)।

আরেকটি হাদিস উল্লেখ করি-

عَنْ أَنَسٍ قَالَ قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم الْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا فَقَالَ مَا هَذَانِ الْيَوْمَانِ قَالُوا كُنَّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِى الْجَاهِلِيَّةِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم إِنَّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ

হজরত আনাস ইবনে মারিক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখলেন, মদিনাবাসীরা দু’টি ঈদ পালন করছে। তা দেখে তিনি বললেন, (জাহেলিয়াতে) তোমাদের দু’টি দিন ছিল যাতে তোমরা খেলাধূলা করতে। এখন সেইদিন পরিবর্তে আল্লাহ তোমাদেরকে দু’টি উত্তম দিন প্রদান করেছেন; ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার দিন।’ (আবু দাঊদ, হাদিস-১১৩৬, সুনানে নাসাঈ, হাদিস-১৫৫৬)।

আজকে করোনার কারণে পৃথিবীর বহু মুসলমান আনন্দ করতে পারবে না। কারণ আনন্দ উৎসব করার মতো তাদের অর্থবিত্ত নেই। আনন্দ তো অনেক পরের কথা ঈদের দিনে দুমুঠো ভাত ভালো তরকারি দিয়ে মুখে দেয়া মতো সাধ্য অনেকের মধ্যে নেই। তবে আবার আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে যাদের ঘরে হাতে ব্যাংকে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ আছে। আল্লাহ যাদের অর্থ দিয়েছেন প্রচুর। এই পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই অবস্থায় আমাদেরকে সমাজের সব মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে। করোনার এইকালে যেমন তাদের পাশে আমরা দাঁড়িয়েছি তেমনি রমজানের শিক্ষা নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে ঈদের সময়ও দাঁড়াবো। 

যারা মানুষের অসহায় সময়ে দান সদকা করে পাশে থাকেনি। এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কঠিন হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে দাতার সুসংবাদের কথাও বলেছেন। 

السخيُّ قريب مِن الله، قريب من الجنة، قريب مِن الناس، بعيد من النار، والبَخيل بعيدٌ مِن الله، بعيد من الناس، قريب مِن النار، ولَجاهل سخيٌّ أحب إلى الله عز وجل من عابد بخيل

অর্থ : দানশীল আল্লাহর নিকটবর্তী। আর যে আল্লাহর নিকটবর্তী হবে সে জান্নাতের অধিবাসী হবে ও সে মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠবে। জাহান্নাম থেকে বহুদূরে থাকবে। আর কৃপণ আল্লাহর থেকে দূরবর্তী। আর যে আল্লাহর থেকে দূরবর্তী সে জাহান্নামের অধিবাসী, মানুষ কাছে অপ্রিয় এবং জাহান্নামের নিকটবর্তী। কৃপণ ইবাদতকারী থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় অজ্ঞ দানশীল। (আবু দাউদ)।

এই হাদিসের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরো হাদিস উল্লেখ করতে চাই। যেটি মূলত একটি দোয়া যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত পাঠ করতেন-

أعوذُ بك مِن البُخل والكسل،

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনার নিকট কৃপণ ও অলস থেকে পানাহ চাই। 

উল্লিখিত কোরআন হাদিস সামনে রেখে আমরা বলতে পারি ভয়াবহ দুঃখসংবাদ হলো তাদের জন্য যাদের সামর্থ থাকার পরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। সুতরাং বর্তমান সময়ের মহামারিতে বেশির ভাগ মানুষ খাদ্য সঙ্কটে ভোগছে। তাই বিত্তবান মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহ এর একটি নির্দেশনা পেশ করছি- তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ বা রুগ্ণ ব্যক্তির সেবা করো এবং বন্দীকে মুক্ত করো অথবা ঋণের দায়ে আবদ্ধ ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করো। (বুখারি)।

যদি কেউ রাসূলুল্লাহ এর নির্দেশনা পালন করে তার কি উপকার হবে সেই কথা বর্ণিত হয়েছে রাসূলের আরেক বাণীতে ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে মানুষকে খাদ্য দান করবে, কেয়ামতের দিন তাকে খাদ্য দান করা হবে। যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে পানি পান করিয়েছে, তাকে সেদিন পানি পান করিয়ে তার পিপাসা দূর করা হবে। যে মানুষকে বস্ত্র দান করেছে, তাকে সেদিন বস্ত্র পরিধান করিয়ে তার লজ্জা নিবারণ করা হবে। (আবু দাউদ)। 

এই অসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ালে আল্লাহ কেয়ামতের দিন মানুষের পাশে দাঁড়াবে। যে দিন কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। অসহায় মানুষকে অন্নদান, মহামারিতে অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, গরিবদের সহায়তা প্রদানকারীর ব্যাপারে বেহেশতের সুসংবাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘একটি রুটি দানের কারণে তিন ব্যক্তিকে জান্নাতে পাঠানো হবে। ১. আদেশদাতা, ২. ত্রাণ প্রস্তুতকারক ৩. ত্রাণ পরিবেশক- অর্থাৎ যে ত্রাণ নিয়ে গরিবের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। (হাকিম, তাবারানি)। এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি- যদি আমি সাহায্য নাও করতে পারি; কমপক্ষে আমি সাহায্যের ব্যবস্থা করে দিই। কিভাবে মানুষ সাহায্য পেতে পারে সেই পথ ও পদ্ধতি বলে দিই। বিত্তশালীদেরকে দানে উদ্বুদ্ধ করি। তাহলে আমিও হাদিসে বর্ণিত তিন শ্রেণির একজন হয়ে যাবো ইনশাল্লাহ! সাহায্য করার ফজিলতের আরেকটি হাদিসে- বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে ‘কেউ যদি হালাল আয় থেকে দান সাদকাহ ও সাহায্য করে আল্লাহ নিজে সেই দান সাদকাহ ও সাহায্য গ্রহণ করেন, সেটি উত্তমরূপে সংরক্ষণ করেন। একসময় সেই দান সাদকাহ ও সাহায্যের নেকি পাহাড় তুল্য হয়ে যায়।

আমরা যদি একটু সতর্ক হই। আমাদের মার্কেটিং থেকে একটু বাঁচিয়ে রাস্তার পাশে থাকা শিশুদের জন্য যদি একশ টাকা দিয়ে ঈদের উপহার দিই- তাহলে এটা হবে প্রকৃত মুসলমান ও রোজাদের কর্ম। একটি হাদিস উল্লেখ করে একটি কথা বলে প্রবন্ধ শেষ করছি। হাদিসটি হলো- রাসূীলুল্লাহ বলেন, কাল কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে আহার্য দাওনি। তখন অবাক হয়ে বান্দা বলবে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি যে অভাবমুক্ত, তুমি তো খাও না, পান কর না, তুমি কীভাবে ক্ষুধার্ত হতে পারে? 

তখন প্রতিউত্তরে আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা যে ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার দুয়ারে হাজির হয়েছিল, তুমি তো তাকে খাবার দাওনি, তাকে দিলে আমাকে দেয়া হতো! এখন আমি যদি এই হাদিসের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলি যে, আল্লাহ যদি বলে তুমি আমাকে ঈদের দিন পোশাক দাওনি, আজকে আমিও তোমাকে জান্নাতের পোশাক দেব না? তখন আমাদের অবস্থা কি হবে? আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে বুঝ দান করুন। আমিন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে