Alexa ঈদের ছুটি কাটুক লালাখালে

ঈদের ছুটি কাটুক লালাখালে

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:১৩ ৬ আগস্ট ২০১৯  

লালাখাল

লালাখাল

প্রচণ্ড গরমে যখন হাঁটু পানিতে নামলাম তখন অদ্ভুত একটা ভালোলাগা ছুঁয়ে গেল। কী ঠান্ডা! এই অবস্থায় আর ঝাঁপিয়ে পড়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। এতটা নীল পানি এর আগে বিরিশিরিতেই দেখেছিলাম শুধু। আমার সঙ্গে সঙ্গে গ্রুপের সবাই নেমে পড়লো পানিতে। রীতিমত জলকেলি। গ্রুপের যে কয়জন সাঁতার জানে না তারাও লাইফ জ্যাকেট পরে ভেসে ভেসে শীতল পরশ নিচ্ছে। এমন শান্তির পরশ কয়জন-ই বা মিস করতে চায়!

এরই মধ্যে একজন বললো, লালাখালের পানি নীল বৈ লাল তো কিছু নয়। তবু এর নাম লালাখাল হলো কেন! নাম হওয়া উচিত ছিল ‘নীল শীতলা খাল’! নামের সঙ্গে তো পানির রঙের কোনো মিলই নেই। লালাখাল না হয়ে নীল খাল হলে খুব কি ক্ষতি হতো! নাম নিয়ে যত সংশয়ই থাক না কেন, চারদিকে সবুজের সমারোহ আর তার সঙ্গে পাহাড়, নদী, চা বাগানের মায়াবী সৌন্দর্য মুহূর্তেই মোহাচ্ছন্ন করে দেবে যে কাউকে।

ছোট ছোট টিলা আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে এঁকেবেঁকে চলা এক নদী পাড়ি দিয়েই যেতে হয় লালাখাল। এ নদীর উত্পত্তি ভারতের চেরাপুঞ্জি পাহাড়। লোকমুখে শোনা যায়, এ নদী দিয়েই নাকি বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশ্ব বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা। সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সারি গাঙের বুকে ভেসে বেড়ায় শত শত বারকি নৌকা। ফাঁকে ফাঁকে দু-একটা ভ্রমণ নৌকাও দেখা যায়, যার বেশির ভাগেরই গন্তব্য লালাখাল। সারি ঘাট থেকে নদীর পূর্ব দিকে চললে ঘণ্টাখানেক সময়ে পৌঁছে যাওয়া যায় লালাখাল।

নীল পানি ও গাঢ় হলুদ মাটি পর্যটকদের মুগ্ধ করে

শুরু থেকে শুরু হোক

আমাদের মূল গন্তব্য লালাখাল হলেও আমরা আরো বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরেছি। বাস থেকে নেমেছি সেই সকালে। নেমেই সকালের নাস্তা সেরে নিজেরা বসে পড়লাম ধবধবে সাদা দুটা লেগুনার ভেতরে। প্রতিটাতে ১২ জন করে। গন্তব্য জাফলং। লেগুনার একদম পেছনের দিকে বসতেই ভাললাগে আমার। সবকিছু দূরে সরে সরে যাচ্ছে দেখতে কেমন একটা আরাম লাগে চোখে।

ভাবলাম, পাখির মতন উড়ুউড়ু মন। শুধু ছুটতেই চায়। উড়তে চায় আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। আকাশের দিকে তাকালাম, মেঘ করে আছে। ভাঙা রাস্তা। হঠাৎ জোরে ঝাঁকি খেল লেগুনা। আরেকটু হলে ছিটকে পড়তাম বাইরে। প্রথমেই বুঝিনি আরো কয়েকশো এমন আছাড় যে অপেক্ষা করছে সামনে। লেগুনার সবাই গান ধরেছে। যাত্রা শেষে সামনে তাকিয়ে দেখি বিশাল এক পাহাড়। তারপরে পাহাড়, আরো পাহাড়। আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি। সপ্তাহখানেক আগেই সাজেক থেকে ঘুরে এসেছি। তখন যেমন মুগ্ধ হয়েছিলাম, এখনো হচ্ছি। পাহাড় তো মুগ্ধ করার মতো জিনিস। কী স্নিগ্ধ আর কোমল দেখতে। দূরে একটা পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে শুভ্র ঝরনাধারা।

সিলেটের জাফলং যেন স্রষ্টার সৃষ্টির অপরূপ মহিমা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। ওপারে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়, এপারে নদী। পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলছে ঝরনা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। এখানেই কি শেষ? না! মতল চা-বাগান, খাসিয়া পল্লী, পানের বরজ-কী নেই জাফলংয়ে! তাইতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলা হয় জায়গাটিকে। অনেকে আবার আদর করে ডাকেন ‘প্রকৃতিকন্যা’ নামে!

পানির কাছাকাছি আসতেই দেখলাম একজন বৃদ্ধ জাল টেনে তুলছে। উৎসুক কয়েকজন দেখছে দাঁড়িয়ে। মাছ ধরা ব্যাপারটাতে কী যেন একটা আনন্দ আছে। ধরার চেয়ে দেখতে বেশি সুখ। বেশি মাছ পড়েনি জালে। একটা দুটা পুঁটি মাছ দেখা যাচ্ছে। আমরা সামনে হাঁটতে লাগলাম। হুট করেই আমাদের সঙ্গে দশ বছরের একটা ছেলে যোগ দিয়েছে। নাম সিমরান। সবার সঙ্গে খাতির জমাচ্ছে সে। খানিক বাদে তার উদ্দেশ্য বোঝা গেল। সে আসলে মার্কেটিং করছে। তাদের খাবার হোটেলে যেন দুপুরে খাই!

জাফলং-এর পথে

ছেলেটার কথায় কান না দিয়ে ঝরনা দেখতে একটা নৌকা ভাড়া করলাম। পানি খুব বেশি ছিল না। চাইলে হেঁটেও যাওয়া যেতো। গিয়ে আবারো মুগ্ধ হলাম। ঝরনাটাকে মনে হলো একটি সাদা শাড়ি! ঝরনায় না ভিজেই ফিরতি পথ ধরলাম। যেতে যেতে পথে নামলো বৃষ্টি।  একেবারে ঝুম বৃষ্টি। দৌড়ে একটা পলিথিনের ঝুপড়িতে ঢুকলাম সবাই। দশ জনের জায়গায় পঁচিশ জন আশ্রয় নিয়েছি। তাতে ভিজেই গেলাম! প্রায় ঘন্টাখানেক পর বৃষ্টি থামল।

‘নীল নদ’ যাত্রা

দুপুর ১১টা। ভয়ঙ্কর পথ ধরে আবারো ছুটে চলেছে লেগুনা। এবার গন্তব্য লালাখাল। লেগুনা থেকে নামতেই দেখি চায়ের দোকান। চায়ের তেষ্টায় জানা যায় অবস্থা। প্রথম চুমুক দিয়েই মনে হলো ধাতে ফিরলাম। এবার নৌকায় চড়ার পালা। লালাখাল ঘাটে সারি বাঁধা অনেক নৌকা। আমাদের মতো ঘুরতে এসেছেন অনেকেই। দু’টা নৌকা ঠিক করা হলো আমাদের। পানির অনেক সুনাম শুনেছি কিন্তু এ তো দেখি স্বাভাবিক পানিই। একটু বেশি স্বচ্ছ এই যা। কিছুদূর যাওয়ার পর ভুল ভাঙতে বেশি দেরি হলো না। টলটলে সবুজ পানি দেখে ভিরমি খাবার জোগাড়। কেউ যেন ইচ্ছে করে পানিতে সবুজ রং গুলে রেখেছে। সে রং ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। মনে হচ্ছে বিশাল এক সুইমিংপুল পার হচ্ছি নৌকায় করে।

তবে পানিতে নামার সময় খেয়াল রাখবেন, পানির গভীরতা কতটুকু? প্রয়োজনে গাইড কিংবা সঙ্গে যাওয়া কারো সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে। আর ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা! সন্ধ্যার আগে-পরে তাদের পানিতে না নামাই ভালো। 

লালাখাল বছরজুড়েই রং বদলায়। বৈশাখে লালাখালে হাঁটু জল না থাকলেও ভরা বর্ষায় টইটুম্বর থাকে এর দু’কূল। তবে বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের কারণে হারিয়ে ফেলে নিজের স্বকীয়তা। তখন পানিতে নীলের আভা একেবারেই কমে যায়। তবে শীত এলে পানির রঙ বদলে গিয়ে পুরোপুরি নীল হতে শুরু করে। আবার শরতে দেখা যায় এর ভিন্ন রূপ। পালকের মতো নরম সাদা কাশফুলের দেখা মেলে এর প্রতিটা বাঁকে। কাশফুলের নরম ছোঁয়ায় এক স্নিগ্ধ বিকাল কাটাতে কিংবা নগরজীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে একটু শান্তির খোঁজে সেই কাশবনের তুলনা হয় না। শুধু কাশবনই নয়, লালাখালের দু’পাশে গড়ে ওঠা চা বাগান নিয়ে যাবে অন্য এক জগতে।

লালাখালের মুগ্ধতা

বলে নেয়া ভালো, চাইলে সারা দিন লালাখালে কাটাতে পারেন। আবার শুধু দিনের শেষ ভাগটাও কাটিয়ে আসতে পারেন। সারা দিনের জন্য গেলে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় ফিরলে দুই ধরনের আনন্দ পাওয়া যায়। লালাখালের চারপাশে সন্ধ্যার আগমুহূর্তটা আরো অবিস্মরণীয়। ওপরে আলোকিত আকাশ। ক্লান্ত সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিম আকাশে। চারপাশে গাছপালার মধ্যে পাখির কিচিরমিচির। এসব দেখলে মনে হয়, পাহাড় থেকে তিরতির সন্ধ্যা নেমে আসছে। ধীরে ধীরে গোধূলিকেও আঁধার ঢেকে দেয়। ক্রমে চারপাশে নেমে আসে আঁধার। স্বচ্ছ নীল জলে পড়ে কালো আভা। তবে জ্যোৎস্না রাতে নৌকায় লালাখাল পাড়ি দেয়ার মজাই আলাদা।

যেভাবে যাবেন

সিলেটের শিশু পার্কের সামনে থেকে লেগুনা অথবা জাফলংয়ের বাসে চেপে সিলেট-তামাবিল সড়ক ধরে যেতে হবে সারিঘাট। সিলেট আর জাফলং মাঝামাঝি এ স্থানটির নাম সারিঘাট। আগেই বলা হয়েছে, যাওয়ার জন্য পথ দুটি সড়কপথ ও নৌপথ। সড়ক পথে যেতে চাইলে মাইক্রোবাস বা কার ভাড়া নিলে ভালো হয়। তা ছাড়া সিলেট শহর থেকে বাস, লেগুনায় সারিঘাট গিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া নিতে পারেন। নৌপথে যেতে চাইলে আগে সারিঘাট পর্যন্ত একই নিয়মে বাস, লেগুনায় গিয়ে নৌযান ভাড়া নিতে হবে। ফেরার পথে এখান থেকে বাসে কিংবা লেগুনায় আসতে পারবেন। রাত ৮টা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল করে।

থাকার জায়গা

হয়তো ভাবছেন এই ঈদেই ঘুরে আসবেন লালাখাল। সঙ্গে যদি অনুসঙ্গ যোগ হয়? আপনি চাইলে পারবেন লালাখালের পাড়ে রাত কাটাতে। আগে সুবিধাটা ছিল না। এখন একটি রিসোর্ট হয়েছে সেখানে। নাম- ‘নর্দান রিসোর্ট’। যাওয়ার কয়েক দিন আগে বুকিং দেয়াই ভালো। না হয় জায়গা পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে। রিসোর্টটির নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাও আছে। এ ছাড়া সিলেট শহরে রাত যাপন করে একদিনে মাত্র লালাখাল ঘুরতে পারেন। অথবা বিছনাকান্দি ও জাফলং যেকোনো একটার সঙ্গে মিলিয়ে বিকেলের ভ্রমণটা লালাখালে হতে পারে। সিলেট শহর থেকে বেশ দূর হওয়ায় সন্ধ্যার দিকে নদীতে কোনো নৌকা থাকে না। তাই ভ্রমণ বা ঘোরাঘুরি সন্ধ্যার মধ্যেই শেষ করতে হয়। সবচেয়ে ভালো হয় নৌকা ভাড়া নিয়ে যাতায়াত করলে।

খরচ

লালাখালের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে নৌকায় ভ্রমণের কোনো বিকল্প নেই। আর নৌকার ভাড়াও খুব বেশি নয়। সাধারণত দল বেঁধে যাওয়াই শ্রেয়, এতে ভ্রমণ আনন্দ যেমন উপভোগ করা যায়। তাছাড়া সবাই মিলে হইচই করে আনন্দ ভাগাভাগি করা যায়। শুধু তা-ই নয়, খরচও কমে যাবে অনেকখানি। সাধারণত ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভাড়া পড়বে দেড় হাজার থেকে ২ হজার ৫০০ টাকা। যারা দর কষাকষিতে পটু, তারাই এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন নিঃসন্দেহে। তবে শীতের সময়টায় একটু বেশি ভাড়া গুনতে হতে পারে। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ধারণক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ জনের মতো। সে হিসাবে লালাখালে নৌকায় যেতে জনপ্রতি খরচ হবে ১০ টাকা। সারি ঘাটেই অনেক খাবারের হোটেল আছে। ভাত, ডাল, মাছ, মাংস যা-ই খান না কেন, ১০০ টাকা প্যাকেজে পেয়ে যাবেন সবই। তবে লালাখালে ভ্রমণের সময় সঙ্গে শুকনা খাবার কিংবা পানীয় নিয়ে নিলেই ভালো।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে

Best Electronics
Best Electronics