Alexa ইসলামে জিহ্বা হেফাজতের গুরুত্ব (পর্ব-১)

ইসলামে জিহ্বা হেফাজতের গুরুত্ব (পর্ব-১)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:০২ ৮ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৮:০৫ ৮ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

হজরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর এবং পরকালের ওপর ঈমান রাখে তার উচিত, সে যেন ভালো এবং উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’

হজরত আবু হুরায়রা (রাযি.) এর অপর এক বর্ণনায় আছে: ‘হজরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি। তিনি ইরশাদ করেছেন, কোনো মানুষ চিন্তা-ভাবনা ছাড়া যখন কোনো বাক্য মুখে বলে ফেলে তখন সে বাক্যটি ওই ব্যক্তিকে জাহান্নামের এত গভীরে নিক্ষেপ করে দেয়, যত দুরত্ব ও  ব্যবধান পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে রয়েছে।’ তৃতীয় আরো একটি হাদিস এ অর্থেই বর্ণিত হয়েছে।

আরো পড়ুন>>> হজের বিশেষ আমলসমূহ 

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে: ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, অনেক সময় এক ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির কোনো কথা বলে। অর্থাৎ এমন বাক্য মুখ হতে বের করে, যা আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করে দেয়। তা আল্লাহর সন্তোষজনক হয়; কিন্তু যখন ওই বাক্য জিহ্বার দ্বারা আদায় করে, তখন ওই বাক্যের গুরুত্ব তার উপলব্ধিতে ছিল না এবং বেপরোয়াভাবে ওই শব্দ মুখ থেকে বের করে ছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ওই বাক্যের বদৌলতে জান্নাতে তার মর্তবা বৃদ্ধি করে দেন এবং এর বিপরীত অনেক সময় কোনো ব্যক্তি মুখে এমন বাক্য বের করে, যা আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে দেয় এবং ওই ব্যক্তি বেপরোয়াভাবে ওই বাক্য মুখ হতে বের করে দেয়, কিন্তু ওই বাক্য তাকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করে।

জিহ্বার দেখভাল করুন: এই তিনটি হাদিসে একথার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে যে, মানুষ জিহ্বার গুনাহ থেকে বাঁচার প্রতি গুরুত্ব দেবে এবং জিহ্বাকে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টিতে ব্যয় করবে। তাঁর অসন্তুষ্টির কার্যক্রম থেকে তাকে বাঁচাবে। যেমন আমি আগেও আরজ করেছিলাম যে, আমাদের জন্য সবচাইতে গুরুত্বের বিষয় এই যে, গুনাহ থেকে বাঁচবে। গুনাহ যেন প্রকাশ না পায়। ওইসব গুনাহের মাঝে এখানে জিহ্বার গুনাহের বর্ণনা শুরু হয়েছে। যেহেতু জিহ্বার গুনাহ এমন যে, অনেক সময় মানুষ চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই বেপরোয়াভাবে এমন কথা বলে ফেলে যে, ওই কথা তার জন্য বড়ই কঠিনতর শাস্তির কারণ সাব্যস্ত হয়ে যায়। এজন্য রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, জিহ্বাকে দেখে-শুনে ব্যবহার করবে। যদি ভালো কোনো বাক্য মুখে বলার হয় তাহলে বলবে, অন্যথায় চুপ করে বসে থাকবে।

জিহ্বা একটি মহান নেয়ামত: এই জিহ্বা যা আল্লাহ তায়ালা আমাদের দান করেছেন। এ নিয়ে সামান্য চিন্তা করলেই দেখা যাবে যে, এটি কত বড় নেয়ামত। এটা কত বড় পুরস্কার। যা আল্লাহ তায়ালা আমাদের দিয়েছেন। তিনি আমাদের কথা বলার এমন মেশিন দিয়েছেন যে, যা জন্ম থেকে নিয়ে মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষকে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে এবং চালু রয়েছে। আবার তা এমনভাবে চলছে যে, মানুষ সামান্য একদিকে যখনি ইচ্ছা করছে অপরদিকে তা কাজ শুরু করে দিয়েছে। যেহেতু এ যন্ত্রটি অর্জন করতে আমাদের কোনো শ্রম ও কষ্ট করতে হয়নি, কোনো টাকা-পয়সাও ব্যয় করতে হয়নি। এজন্য এই নেয়ামতের মূল্য জানা হয়নি। আর যে নেয়ামত বসে বসে না চাইতে পাওয়া যায়, তার মূল্যায়ন হয় না। এ জিহ্বাও বসে বসেই পাওয়া গেল এবং ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে আমরা যা চাই এ জিহ্বার দ্বারা বলতে পারছি।

আরো পড়ুন>>> পবিত্রতা অর্জনের গুরুত্ব

এই নেয়ামতের মূল্যমান ওই লোকদের জিজ্ঞেস করুন, যারা এ নেয়ামত থেকে বিরত। জিহ্বা আছে কিন্তু বলার শক্তি নেই। মানুষ কোনো কথা বলতে চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না। অন্তরে আগ্রহ সৃষ্টি হয়ে আছে কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারছে না। তাকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি বলে দেবেন যে, জিহ্বা কতবড় নেয়ামত, আল্লাহ তায়ালার কত বড় উপহার।

যদি যবান বন্ধ হয়ে যায়: এ কথাটি একটু চিন্তা করুন যে, খোদা না করুক যদি এ জিহ্বা কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং এখন আপনি বলতে চাইছেন কিন্তু বলতে পারছেন না। তখন জগতে কত অসহায় এবং শক্তিহীন মনে হবে। আমার এক বন্ধু যার ইদানিং অপারেশন হয়েছে। তিনি বললেন যে, অপারেশনের পরে কিছু সময় এভাবে অতিবাহিত হয়েছে যে, গোটা দেহটা অনুভূতিহীন ছিল।

পিপাসা এতই শক্তভাবে লেগেছিল যে, সামনে কিছু মানুষ ছিল, তাদের বলতে চাইলাম যে, তোমরা আমাকে পানি পান করাও। কিন্তু জিহ্বা চলছে না, আধাঘন্টা এভাবে চলে গেল। পরে তিনি বলতেন আমার গোটা জিন্দেগীর মাঝে ওই আধাঘন্টা যত কষ্ট করেছিলাম, এমন সময় আমার ওপর আর কখনো অতিবাহিত হয়নি।

জিহ্বা আল্লাহর আমানত: আল্লাহ তায়ালা মুখ এবং দেমাগের মাঝে এমন সংযোগ রেখেছেন যে, যখনই দেমাগ এই ইচ্ছা করেছেন যে, অমুক বাক্যটি মুখ থেকে বের হোক। সেই মূহুর্তে জিহ্বা ওই বাক্যটি আদায় করে দিচ্ছে। আর যদি মানুষের ওপর ছেড়ে দেয়া হত যে, তুমি নিজে ওই জিহ্বাকে ব্যবহার কর। তার জন্য প্রথমে ওই বিদ্যা শিখতে হত যে, জিহ্বাকে কীভাবে নাড়ালে আলিফ বের হবে। জিহ্বাকে কোথায় নিয়ে গেলে বা বের হবে। তাহলে ফের মানুষ এক সমস্যায় লিপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা প্রাকৃতিকভাবে মানুষের মাঝে এ বাক্যটি রেখে দিলেন যে, যেকোনো শব্দ সে মুখে আদায় করতে চাইছে তখন ইচ্ছা করলেই তৎক্ষণাৎ ওই শব্দ সে মুখ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। অতএব এই জিহ্বা (আলিফ) ব্যবহারের সময় চিন্তা করা উচিত যে, এ যন্ত্রটিকে তুমি কী ক্রয় করে এনেছিলেন? না, বরং এটি আল্লাহ তায়ালার দান, তিনিই তোমাকে তা দান করেছেন।

এটির মালিকানা তোমার নয়; বরং তোমার কাছে এটি আল্লাহর আমানত। যখন তাঁর দেয়া আমানত এটি, তখন এটিও ভাবা প্রয়োজন যে, তাকে তাঁর সন্তুষ্টি মোতাবেক ব্যবহার করা হবে। এমন যেন না হয় যে, যা মনে এল তাই বলে দিলাম। বরং যে কথা আল্লাহ তায়ালার বিধি-বিধান মোতাবেক হয় তাই বের করবে আর যে কথা আল্লাহ তায়ালার বিধান মোতাবেক না হয়, তা মোটেও বের করবে না। এটি সরকারী মেশিন। তাকে তাঁর মর্জি মত ব্যবহার কর।

জিহ্বার সঠিক ব্যবহার: আল্লাহ তায়ালা এই জিহ্বাকে এমন বানিয়েছেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি এই জিহ্বাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে, যেমন আপনার ইতোপূর্বে এক হাদিসে পড়েছেন যে, এক ব্যক্তি একটি শব্দ বেপরোয়াভাবে মুখ থেকে বের করল কিন্তু কথাটা ছিল উত্তম। তখন তাকে ওই বাক্যটির কারণে আল্লাহ তায়ালা না জানি তার কত উচ্চমর্যাদ প্রদান করেন এবং তার কত সওয়াব ও বিনিময় অর্জিত হয়ে যায়! যখন একজন মানুষ কাফের থেকে মুসলমান হয়, তাহলে সে এই জিহ্বার বদৌলতেই হয়। মুখে কালিমা শাহাদাত পাঠ করে নেয়।

এই কালিমায়ে শাহাদাত পাঠের আগে সে কাফের ছিল। কিন্তু তা পাঠের পর সে মুসলমান হয়ে গেল। আগে জাহান্নামী ছিল এখন সে জান্নাতী হয়ে গেল। আগে আল্লাহর অপ্রিয় ছিল, এখন সে প্রিয়পাত্র হয়ে গেল। এবং রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতে শামিল হয়ে গেল। এই মহান পরিবর্তন এই একটি কালিমার বদৌলতে এসেছে যা সে জিহ্বা দ্বারা আদায় করেছে।

জিহ্বাকে জিকির দ্বারা সিক্ত রাখুন: ঈমান আনার পর একবার মুখে বলে দিল সুবহানাল্লাহ! এর দ্বারাই তার এই বিরাট পরিবর্তন। হাদিস শরিফে এসেছে যে, এর মাধ্যমেই তার আমলের পাল্লা আধা ভরে যায়। বাক্যটি ছোট হলেও কিন্তু তার সওয়াব কতই না বিশাল। অন্য এক হাদিসে এসেছে যে, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আযীম’ এ দু’টো বাক্য মুখে পড়া তো সহজ, যে সামান্য সময়ে তা আদায় করা হয়ে যায় কিন্তু আমলের পাল্লায় বড়ই ভারি এবং আল্লাহ পাকের দরবারে তা বড়ই প্রিয়। তা দ্বারা আল্লাহ তায়ালার জিকির কর এবং আল্লাহর জিকির দ্বারা ওই জিহ্বাকে সিক্ত রাখ। তারপর দেখ, কীভাবে তোমাদের পদমর্যাদা উন্নীত হতে থাকে। এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন আমল উত্তম? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন যে, তোমাদের জিহ্বা আল্লাহ তায়ালার জিকির দ্বারা সিক্ত রাখ। চলাফেরা ওঠাবসায় আল্লাহর জিকির করতে থাক। (তিরমিযী, কিতাবুত দাওয়াত, হাদিস ৩৩৭২)। 

চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে