Alexa ইসলামে ঋণের বিধি-বিধান (শেষ পর্ব)

ইসলামে ঋণের বিধি-বিধান (শেষ পর্ব)

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৫৫ ২০ জানুয়ারি ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ঋণের আরবি শব্দ ‘কার্য’, যা প্রচলিত বাংলা ভাষায় কর্য নামে পরিচিত। এর বাংলা সমার্থবোধক শব্দ হচ্ছে, দেনা, ধার, হাওলাত ইত্যাদি।

ঋণ-কর্য মানুষের তথা সমাজের একটি প্রয়োজনীয় লেনদেন। সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তি জীবন-যাপন করার ক্ষেত্রে কোনো না কোনো সময় ঋণ নেয়ার কিংবা অন্যকে দেয়ার সম্মুখীন হতে হয়। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধারে কারবার করবে, তখন তা লিখে রাখবে।’(সূরা: আল বাক্বারাহ, আয়াত: ২৮২)।

আরো দেখুন>>> ইসলামে ঋণের বিধি-বিধান

১ম পর্বের পর থেকে...

ইবনু মুনাযির বলেন,‘তাদের ঐক্যমত রয়েছে যে, ঋণ দাতা যদি ঋণ গ্রহীতাকে ঋণ ফেরতের সময় বেশি দেয়া কিংবা হাদিয়াসহ ঋণ ফেরত দেয়ার শর্ত দেয় এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ঋণ দেয়া হয়, তাহলে বেশি নেয়াটা সুদ। (মুগনী-৬/৪৩৬)।

তাই ঋণ ফেরতের সময় বেশি গ্রহণ বৈধ নয়, যতক্ষণে দু‘টি শর্ত না পাওয়া যায়।

(ক) ঋণ দাতা ঋণ গ্রহীতার সঙ্গে লাভ নেয়ার শর্ত দেয়নি।

(খ) সমাজে বেশি দেয়ার প্রথা প্রচলিত ও নয়।

যদি শর্ত দেয়া হয় কিংবা এটা সমাজে প্রচলিত থাকে ,তাহলে বেশি নেয়া সুদ হবে। এখানে প্রচলিত শব্দটির উল্লেখ এই কারণে করা হচ্ছে যে, শরয়ী মূলণীতিতে প্রচলিত প্রথা শর্তের মতই। অর্থাৎ-শর্তরোপ তো করে না কিন্তু প্রথা ও প্রচলন অনুযায়ী বেশি নেয় বা দেয়, তাহলে সেটা শর্ত হিসেবেই গণ্য হবে।

ঋণ পরিশোধে বিলম্ব না করা: ঋণ দাতা যখন মানুষের উপকারার্থে ঋণ প্রদান করে, তখন ঋণ গ্রহীতার দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব হবে তা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দেয়া। আর যদি এই রকম করে; টাল-বাহানা, মিথ্যা ওজর পেশ ইত্যাদি, তাহলেই আপসে মিল-মুহাব্বত ও ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয়, শক্রতা বৃদ্ধি পায় এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস যোগ্যতা হারায়।

রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

هَلْ جَزَاء الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ

‘উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (সূরা: আর রাহমা, আয়াত: ৬০)।

আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন,

إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন,হকদারদের হক তাদের নিকট পৌঁছে দিতে।’(সূরা: আন নিসা, আয়াত: ৫৮)।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ধনী ব্যক্তির টাল-বাহানা করা অত্যাচার।’ (মুত্তাফাকুন‘আলাইহি)

তিনি (সা.) আরো বলেন,

‘যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল এমতাবস্থায় যে, সে তিনটি স্বভাব থেকে মুক্ত ছিল, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে: অহংকার, গনীমতের সম্পদ হতে চুরি এবং ঋণ।’ (সুনান ইবনু মাজাহ -হা: ২৪১২)। আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ বলেছেন।

ঋণ পরিশোধের পূর্বে মৃত্যুবরণ: ঋণ মানুষের হক-পাওনা, তা পূরণের পূর্বে মৃত্যুবরণ করা মানে মানুষের হক নিজ স্কন্ধে থেকে যাওয়া, যা বড় অপরাধ। সেই কারণে এই প্রকার ব্যক্তির জানাজার নামাজ প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে পড়েননি। 

ইমাম আত তিরমিযী হাসান- সহিহ সনদে আবূ ক্বাতাদাহ  (রা.) হতে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) এর কাছে একদা ব্যক্তির জানাজা নিয়ে আসা হলে, তিনি (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়; কারণ সে ঋণী।’ (সুনান আত তিরমিযী- অধ্যায়: জানাজা, হা: ১০৬৯)।

এই কারণে ইসলামি পণ্ডিতরা বলেন, মাইয়্যেতের তারেকাহ (উত্তরাধিকার) বন্টনের পূর্বে কয়েকটি হক নির্ধারিত, তা পূরণের পরেই তার উত্তরাধিকার বন্টিত হবে। তন্মধ্যে মাইয়্যেতের ওপর অপরের হকসমূহ অন্যতম। সেই হক মহান আল্লাহর  হোক, যেমন জাকাত কিংবা মানুষের হক হোক, যেমন ঋণ।’ (আল মুলাখ্খাস আল ফিক্হী -ড.ফাউযান/৩৩৪)।

অভাবী ঋণীকে অবকাশ প্রদান: সমাজে যেমন কিছু লোক পাওয়া যায়, যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ঋণ শোধ করতে ঢিলেমি করে, তেমন সত্যিকারে এমন লোকও রয়েছে যারা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম। এই রকম ব্যক্তিকে ইসলাম অতিরিক্ত সময় দিতে উদ্বুদ্ধ করে। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَإِن كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ وَأَن تَصَدَّقُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

‘যদি ঋণী দরিদ্র হয়, তবে স্বচ্ছল অবস্থা আসা পর্যন্ত অবকাশ দেবে আর মাফ করে দেয়া তোমাদের পক্ষে অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে!’(সূরা: আল কাকারা: ২৮০)।

নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পচ্ছন্দ করে যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে কেয়ামত দিবসের কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি দেবে, সে যেন অভাবী ঋণীকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণের বুঝা লাঘব করে।’ (সহিহ মুসলিম- অধ্যায়: ক্রয়-বিক্রয়, হাদিস ৪০০০)।

এখানে একটি বিষয় বর্ণনা করা জরুরি মনে করছি, তা হলো, ঋণ গ্রহীতা যদি নির্ধারিত সময়ে ঋণ ফেরত দিতে না পারে, তাহলে তাকে অবকাশ দিতে হবে বিনা লাভের শর্তে। কিন্তু যদি ঋণ দাতা তার মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় এবং এর বিনিময়ে লাভ নেয় তাহলে তা স্পষ্ট সুদ হবে। যেমন কেউ এক বছর পর তার ঋণ ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু বছর শেষ হলে সে ফেরত না দিতে পারায় ঋণ দাতার নিকট আরো ৫ মাস সময় বাড়িয়ে দেয়ার আবেদন করল। অতঃপর ঋণ দাতা তাকে বলল, ঠিক আছে মেয়াদ বাড়াব কিন্তু এর বিনিময়ে তোমাকে ঋণ ফেরতের সময় মূলধনের বেশি দিতে হবে। অর্থাৎ- সময় বৃদ্ধির  বিনিময়ে লাভ গ্রহণ। এটা স্পষ্ট সুদ, যা নবী (সা.) এর যুগে আরবের জনপদে ছিল এবং তা এখনো বিধ্যমান। (আল মুলাখ্খাস আল ফিকহী-ড.ফাউযান/২৩৭)।

ঋণ পরিশোধ না করার উদ্দেশ্যে ঋণ করা: আজ-কাল সমাজে আর এক প্রকার লোক দেখা যায়, যারা ঋণ নেয় পরিশোধ না করার উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ-আসলে তার অন্তরে থাকে অন্যের অর্থ কৌশলে আত্নসাত করা। আর ঋণ করাটা হচ্ছে তার একটি বাহানা মাত্র। এই রকম লোকেরা এক সঙ্গে কয়য়েকটি হারাম কাজে লিপ্ত হয়।

(১) বাতিল পদ্ধিতে অন্যের মাল-সম্পদ ভক্ষণ,যা আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করেছেন। (সূরা: আল বাকারা: ১৮৮)।

(২) ধোঁকা তথা প্রতারণা।

(৩) জেনে-বুঝে সজ্ঞানে গুনাহ করা।

(৪) মিথ্যা বলা।

নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের মাল পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তায়ালা তাঁর পক্ষ হতে পরিশোধ করে দেন। (পরিশোধ করতে সাহায্য করেন) আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তায়ালা তা নষ্ট করে দেন।’ (সহিহ বুখারী- অধ্যায়: ইস্তিকরায,হা: ২৩৮৭)।

ঋণের জাকাত: অর্থাৎ-কেউ কাউকে ঋণ দিলে এবং সেই ঋণ জাকাতের আওতায় পড়লে, জাকাত কাকে দিতে হবে? ঋণ গ্রহীতাকে যার কাছে সেই মাল আছে? না ঋণ দাতাকে? আসলে সেই অর্থ, দাতার নিকট থেকে গ্রহীতার কাছে স্থানান্তর হয়েছে মাত্র। নচেৎ প্রকৃতপক্ষে তার মালিক দাতাই। সেই কারণে ঋণ দাতাকেই সেই মালের জাকাত দিতে হবে। তবে ইসলামিক গবেষকদের নিকট বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা রয়েছে, তা হলো-ঋণ গ্রহীতা যদি অভাবী হয়, যার কারণে সে সঠিক সময়ে ঋণ ফেরত দিতে অক্ষম কিংবা সক্ষম তবে টাল-বাহানাকারী, যার থেকে ঋণ আদায় করা কষ্টকর। এই ক্ষেত্রে ঋণ দাতার প্রতি সেই মালের জাকাত দেয়া জরুরি নয়, যতক্ষণে তা তার হাতে না আসে। আর যদি ঋণী ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে সক্ষম হয় তথা সেই ঋণ পাওয়ার পুরো সম্ভাবনা থাকে, তাহলে জাকাতের সময় হলেই ঋণ দাতাকে তার জাকাত আদায় করতে হবে। (ফাতাওয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি-৯/১৯১,ফাতাওয়া নং-৯০৬৯)।

তবে টাল-বাহানাকারীর কাছ থেকে কয়েক বছর পর ঋণ পাওয়া গেলে বিগত সব বছরের জাকাত দিতে হবে না এক বছরের দিলেই হবে? এ ক্ষেত্রে উপরোক্ত ফাতাওয়া কমিটি এক বছরের দিলেই হবে বলে ফাতাওয়া দিয়েছেন। (ফাতাওয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি-৯/১৯০)।

ঋণ হতে আশ্যয় প্রার্থনা এবং ঋণ পরিশোধের দোয়া: নবী (সা.) ঋণ হতে মহান আল্লাহর নিকট বেশি বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যা দেখে এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, আল্লাহর রাসূল! আপনি ঋণ থেকে খুব বেশি বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করেন? নবী (সা.) বলেন,

‘মানুষ ঋণী হলে, যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে।’ (সহিহ বুখারী-অধ্যায়: ইস্তিকরায,হা: ২৩৯৭)।

তাই সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, 

‘আল্লাহুম্মা! ইন্নি আউযুবিকা মিনাল কাসালি, ওয়াল হারামি, ওয়াল মাসামি, ওয়াল মগ্রাম।’ 

অর্থাৎ: হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় কামনা করছি- অলসতা, অধিক বার্ধক্য, গুনাহ এবং ঋণ হতে।’

তিনি (সা.) আরো বলেন,

‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আজ্যি ওয়াল কাসালি, ওয়ার বুখলি ওয়াল জুবিন, ওয়া যালাইদ্দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজার।’

অর্থাৎ: ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, চিন্তা-ভাবনা, অপারগতা, অলসতা, কৃপণতা এবং কাপুরুষতা থেকে। অধিক ঋণ থেকে এবং দুষ্ট লোকের প্রাধান্য থেকে।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে