ইমাম মাহদি আবির্ভাবের পূর্বে রমজান, যা ঘটতে পারে দুনিয়ায়

ইমাম মাহদি আবির্ভাবের পূর্বে রমজান, যা ঘটতে পারে দুনিয়ায়

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০১ ২৮ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৫ ২৮ এপ্রিল ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। সেই ধারায় তিনি হজরত ইমাম মাহদি (আ.) এর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণীও করে গেছেন। বিষয়টি নিয়ে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তাই তার আবির্ভাবের বিষয়টি এখন অকাট্যভাবে প্রমাণিত।

শরীয়তবেত্তারা বলেন, হজরত মাহদি (আ.) এর আবির্ভাবের আকিদা পোষণ করা ওয়াজিব। তবে তার আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে যুগে যুগেই পানি ঘোলা করা হয়েছে। বহু মানুষ নিজেকে মাহদি দাবি করেছে। অথচ এর কোনোই ভিত্তি ছিলো না। রাসূল (সা.) মাহদির (আ.) এর যেসব আলামত বর্ণনা করেছেন, তাদের মাঝে সেসব ছিলো অনুপস্থিত। বিষয়টি ছিলো সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা মাহদি সাজতো।

দ্বীন ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য, নীরিহ মানুষ, ইসলামি বুদ্ধিজীবী, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদেরকে হত্যা ও মুসলিম বিশ্বে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নিজেকে মাহদি প্রমাণের অপ্রয়াস চালিয়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব না পেয়ে, রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতেও মাহদি নামের আশ্রয় নিয়েছে কেউ কেউ। সুফীদের থেকেও মাহদি দাবিদার ছিলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মারা যাওয়ার পরও ব্যক্তিকে মাহদি উপাধি দেয়া হয়েছে, অনুসারীদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। ইমাম মাহদির আবির্ভাবের অপেক্ষায় এখন গোটা মুসলিম বিশ্ব। অতিতের মতো এখনো কেউ নিজেকে মাহদি দাবি করতে পারে। অস্থিতিশীল করে তোলতে পারে মুসলিম বিশ্বকে। তাই হজরত মাহদি (আ.) এর আবির্ভাবের ঘটনা, বংশ পরিচয় ও আগে-পরের কিছু ঘটনা তোলে ধরবো। ইমাম মাহদিকে নিয়ে স্বতন্ত্র কিতাবও রচনা করা হয়েছে। এর মাঝে রয়েছে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি (রাহ.) এর কিতাব ‘আল উরফুল ওয়ারদি ফি আখবারিল মাহদি’।

যেভাবে ঘটবে হজরত মাহদি (আ.) এর আবির্ভাব :

হাদিসের কিতাবগুলো থেকে ঘটনার বিবরণ জানা যায় যে, ‘একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যু হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্বে কাকে বসানো হবে, এ নিয়ে সভাসদগণের মাঝে তুমুল মতবিরোধ দেখা দেবে। কেন্দ্রীয় অব্যবস্থাপনার কারণে, রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটবে। অন্যান্য ফেতনা ফাসাদও ব্যাপকভাবে হতে থাকবে। যে রাষ্ট্রে এই ঘটনা ঘটবে, হাদিসের মধ্যে এর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে মদিনা রাষ্ট্র হওয়ার ব্যাপারে অনেকে মত পোষণ করেছেন। অন্য কোনো রাষ্ট্রও হতে পারে। ওই অবস্থায় এক লোক সেখান থেকে পালিয়ে মক্কায় আশ্রয় নিবে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও অন্যান্য ফেতনা ফাসাদ থেকে বাঁচার জন্য মক্কায় এসে আশ্রয় নিবে। কারো কারো মত হচ্ছে, সবাই মিলে তাকে ক্ষমতায় বসাতে চাইবে। ক্ষমতা থেকে দূরে থাকার জন্য সে পালাবে। পালিয়ে আসা ওই লোকই হচ্ছেন, হজরত মাহদি (আ.)।

শুধু আরবে নয়, সারা দুনিয়ায় তখন জুলুম নির্যাতন ছড়িয়ে পড়বে। আশ্রয় নেয়ার মতো কোনো স্থান থাকবে না। দুনিয়ার অবস্থা দেখে কিছু মানুষ বুঝে ফেলবে, হজরত মাহদি (আ.) এর আবির্ভাবের সময় হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আলামতগুলো মিলিয়ে, লোকেরা ওই পালানো ব্যক্তিকে মাহদি হিসেবে চিহ্নিত করবে। সবাই মিলে তাকে ঘর থেকে বের করে আনতে চাইবে। কিন্তু ক্ষমতার দোষণীয় দিকগুলোর কথা চিন্তা করে তিনি নেতৃত্বগ্রহণ করতে চাইবেন না। অনাগ্রহের কারণ, ছড়িয়ে পড়া বিশৃঙ্খলা ও অন্যান্য ফেতনা ফাসাদও হতে পারে। কিন্তু এক পর্যায়ে ঠিকই তাকে বের করে আনতে সক্ষম হবেন। হারাম শরিফে এসে, হজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিমের মাঝে সবাই তার হাতে বাইয়াত হবে।

আল্লাহ তায়ালা হারাম শরিফে সমস্ত রকমের হত্যাযজ্ঞ নিষেধ করেছেন। তাছাড়া হজরত মাহদি হবেন রাসূল (সা.) এর বংশের লোক। এতদ্সত্তেও শাম এলাকা থেকে তার মোকাবিলা করার জন্য এক বাহিনী আসবে। রাসূল (সা.) এর জমানায় শাম বলতে বুঝানো হতো, বর্তমান সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও জর্দানসহ আশপাশের কিছু এলাকাকে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায়, শামী ওই বাহিনী মক্কা-মদিনার মধ্যবর্তী ‘বায়দা’ নামক স্থানে, ভূমিকম্পে মাটি চাপা পড়ে যাবে। ওই ঘটনা হজরত মাহদির কারামত হিসেবে ঘটবে। তখন দুনিয়ার অন্যান্য খাঁটি মুমিনরা বুঝে নিবেন যে, তিনিই হজরত মাহদি।

শামের দিক থেকে ওলি আউলিয়ারা দলে দলে হজরত মাহদির কাছে বাইয়াতের জন্য আসতে থাকবে। তখন কুরাইশ বংশের আরেক লোক, হজরত মাহদির মোকাবিলার জন্য বাহিনী পাঠাবে। বিরোধী লোকটির বংশ পরিচয় হবে, মায়ের দিক থেকে আরবের প্রসিদ্ধ গোত্র বনু কালবের সঙ্গে যুক্ত। সম্ভবত তখনকার সময়ে সে হজরত মাহদির চেয়ে আরো শক্তিশালী হবে। হজরত মাহদি এবং তার অনুসারীদের মোকাবিলা করার জন্য তারপরও সে মামাদের থেকে সহযোগিতা নিবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা মাহদি (আ.) ও তার বাহিনীকে বিজয় দান করবেন। হজরত মাহদি (আ.) আবির্ভাব হবে মক্কা থেকে এ ব্যাপারে কোনো দ্বীমত নেই। এবং তার আবির্ভাবের সময়ের ব্যাপারেও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

হজরত মাহদি (আ.) সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন- দুনিয়া ধ্বংস হবে না, যতক্ষণ না আমার পরিবারে এক সদস্য সমগ্র আরবের মালিক হবে। তার নাম, আমার নামে হবে।’ মোল্লা আলী কারী (রাহ.) বলেন, ‘রাসূল (সা.) এর ভাষ্য দ্বারা প্রতীয়মাণ হয়, এক পর্যায়ে সমগ্র আরব জাতি ইমাম মাহদির আনুগত্য স্বীকার করে নেবে। তার আনুগত্যের ব্যাপারে আরবদের মাঝে কোনো মতবিরোধ হবে না। তাই রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘হযরত মাহদি সমগ্র আরবের মালিক হয়ে যাবে।’ অনারবদের মাঝে তার নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ থাকবে। তাই রাসূল (সা.) এর হাদিসে অনারবদের প্রসঙ্গ আসেনি।’ (মেরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-৩৪৯, প্রকাশ, এইচ এম সাইদ ভারত)।

ইমাম মাহদির নাম ও বংশ পরিচয় :

নাম হবে মুহাম্মাদ আল মাহদি। রাসূল (সা.) এর আদর্শ, নীতি ও আচার ব্যবহারের অনুসারী হওয়ায় তার খেতাব হবে মাহদি। এটা আরবি শব্দ। যার অর্থ হচ্ছে, হেদায়াতপ্রাপ্ত। অর্থাৎ তিনি রাসূল (সা.) এর এসব বিষয়ের দিকে হেদায়েত বা নির্দেশনা পাবেন। হজরত মাহদি (আ.) এর নাম ও বংশ নিয়ে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, দুনিয়া ধ্বংস হবে না, যে পর্যন্ত না সমগ্র আরবের মালিক হবে আমার আহলে বাইতের এক লোক। আমার নামের সঙ্গে তার নামের মিল থাকবে। এটি হচ্ছে, তিরমিজি ও আবু দাউদের বর্ণনা। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘এমন যদি হয় দুনিয়ার মেয়াদ আর এক দিন বাকি আছে, তাহলেও আল্লাহ তায়ালা ওই দিনটিকে লম্বা করে দেবেন এবং দুনিয়াতে আমার বা আমার আহলে বাইতের থেকে এক লোকের দুনিয়াতে আসার ব্যবস্থা করে দেবেন। তার নাম আমার নামের সঙ্গে মিলবে এবং তার পিতার নাম আমার পিতার নামের সঙ্গে মিলবে। সে দুনিয়ায় নমুনাহীন ন্যায় ইনসাফ কায়েম করবেন। যেমন ইতিপূর্বে দুনিয়ায় চরম পর্যায়ের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিলো। (মিশকাত, হাদিস নম্বর-৪৫৫১)।

রাসূল (সা.) এর আহলে বাইতের সদস্য হবেন, যা পূর্বোক্ত হাদিস থেকে জানা গেলো। আমরা জানি রাসূল (সা.) এর বংশধারা দুজনের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে। এক হজরত হাসান (রা.)। দুই. হজরত হুসাইন (রা.)। হজরত মাহদি (আ.) কার ধারা থেকে হবেন এ ব্যাপারে দুরকমেরই হাদিস রয়েছে। ভিন্নার্থ হাদিসগুলোর মাঝে সমন্বয় করার জন্য মোল্লা আলী কারী (রাহ.) বলেন, ‘মুহাদ্দিসদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে যে, হজরত মাহদি (আ.) হজরত হাসানের বংশধারা থেকে আসবে নাকি হজরত হুসাইন (রা.) এর বংশধারা থেকে? এক্ষেত্রে হতে পারে তিনি উভয় বংশের সমন্বিত ধারা থেকে আসবেন। স্পষ্ট কথা হচ্ছে, তিনি পিতার দিক থেকে হবেন হজরত হাসান (রা.) এর বংশধারায় এবং মাতার দিক থেকে হবেন হজরত হুসাইন (রা.) এর বংশধারায়।

আমাদের অবগতিতে আছে যে, হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর দুসন্তান ছিলো। হজরত ইসমাইল ও হজরত ইসহাক (আ.)। হজরত ইসহাক (আ.) এর বংশ থেকে বনি ইসরাইলের হাজার হাজার নবীর আগমণ ঘটেছে। অন্যদিকে হজরত ইসমাইল (আ.) থেকে মাত্র একজন নবী এসেছেন। তিনি হচ্ছেন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। কিন্তু এই একজনেই বনি ইসরাইলের সমস্ত নবীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তেমনি হজরত হুসাইন (রা.) এর বংশ থেকে বহু ওলি আউলিয়া, মুজাহিদ ও মুজতাহিদ জন্মগ্রহণ করেছেন। আর হজরত হাসান (রা.) এর বংশ থেকে একজন হজরত মাহদি (আ.) আসবেন। কিন্তু সেই একজনেই হজরত হুসাইনের বংশের শতশত ব্যক্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবেন।’ (মেরকাতুল মাফাতিহ, শরহে মেশকাতুল মাসাবিহ, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-৩৭৯)।

রাসূল (সা.) হজরত মাহদির বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘তার কপাল হবে প্রশস্ত এবং নাক হবে খাড়া।’ (মেশকাত হাদিস নম্বর-৫৪৫৪) হজরত মাহদি (আ.) আবির্ভাবের পর সাত বছর জীবিত থাকবেন। কোনো কোনো বর্ণনায় আট বা নয় বছরের কথাও এসেছে। তবে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তিনি সাত বছর জীবিত থাকবেন। তার ন্যায়ের শাসন ও এর বরকতে আল্লাহর রহমত নাজিলের ধারা দেখে, জীবিত ব্যক্তিরা বলাবলি করবে, হায়! আজ যদি আমাদের পূর্বপুরুষেরা জীবিত হতো!’ (মেরকাত, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-৩৫৯)। ইমাম মাহদির আবির্ভাব হারাম শরিফে হবে, আমরা পূর্বে জেনেছি। কিন্তু মুসনাদে আহমদ ও বাইহাকির এক বর্ণনা থেকে জানা যায়, তার আবির্ভাব হবে খোরাসানের দিক থেকে। (মেশকাত-৫৪৬১)। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, ইমাম মাহদির সমর্থনে খোরাসান এলাকা থেকে এক বিশাল বাহিনী আসবে। ইমাম মাহাদির ওই বাহিনীকেই তার নাম দিয়ে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ওই বাহিনীতে প্রধান হিসেবে থাকবেন হারেছ ও মানসুর নামে দুই লোক। (মেরকাত, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-৩৬৩)।

হজরত মাহদি (আ.) এর পূর্ব রমজানে যা ঘটতে পারে দুনিয়ায় :

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম দারা কুতনী (রা.) এর সূত্রে মোল্লা আলী কারী (রা.) উল্লেখ করেন, হজরত মুহাম্মাদ ইবনে আলী বলেন, ‘আমাদের মাহদি আবির্ভাবের দু’টি নিদর্শন রয়েছে, আসমান-জমিন সৃষ্টির পর যা কখনো সংঘটিত হয়নি। ওই নিদর্শন হচ্ছে, হজরত মাহদির আবির্ভাবের পূর্ব রমজানের প্রথম রাতে চন্দ্রগ্রহণ হবে। দ্বিতীয় নিদর্শন হলো, পনেরই রমজান সূর্যগ্রহণ হবে। ( মেরকাত, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-৩৬৪)।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে