ইন্দিরাকে লেখা তার বাবা জওহরলাল নেহেরুর চিঠি

ইন্দিরাকে লেখা তার বাবা জওহরলাল নেহেরুর চিঠি

ফাতিমাতুজ্জোহরা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:১২ ৯ এপ্রিল ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সকল পিতা চান তার জীবনে অর্জিত জ্ঞান তার সন্তানদের দিতে। এই  জ্ঞান শুধু যে তার সামাজিক চিন্তাভাবনা তা কিন্তু নয়। এটা হতে পারে সকল জ্ঞান বা শিক্ষা যা একজন ব্যক্তি গবেষণা, উপলব্ধি, পড়াশুনা এবং বোধশক্তি দিয়ে অর্জন করেন। এই সকল শিক্ষাই আমাদের পিতামাতাকে মানুষ হিসেবে বিকশিত করেছে এবং তারা চায় তাদের এই অর্জনের বিতরণ চলতে থাকুক। এভাবেই তাদের জীবন চক্র চালিয়ে যেতে চান তারা। ১৯২৮ সালে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে, জওহরলাল নেহেরু কে এলাহাবাদ কারাগারে পাঠানো হয়। তার মেয়ে ইন্দিরার বয়স ছিল তখন ১০ বছর। ইন্দিরা তখন ভারতের মুসুরি নামের একটি ছোট শহরে সময় কাটাচ্ছিলেন।নেহেরুর সাথে তার মেয়ের এই দূরত্বে অবস্থানের কারণে তার মূল্যবোধ প্রদান কঠিন হয়ে পড়েছিল।

জওহরলাল নেহেরু তখন তার মেয়েকে নিয়মিত চিঠি লেখা শুরু করেন। নেহেরুর লেখা চিঠিগুলো শুধু উত্তম লেখনীই ছিল না! তা ছিল বিশ্বের কার্যাবলীর বিবরণী। যার মাধ্যমে শত মাইলের দূরত্বে থেকেও তিনি হয়ে উঠেছেন একজন শ্রেষ্ঠ পিতা। একটি চিঠিতে নেহেরু তার মেয়ে ইন্দিরাকে লিখেছেন- “নাইনির জেল থেকে আমি তোমাকে কিইবা উপহার দিতে পারি? কোনো জিনিসপত্র তো আমি তোমাকে উপহার হিসেবে দিতে পারছিনা। তাই আমার উপহার হবে মনন এবং আত্মার”। তিনি তার কথা রেখেছেন। তার চিঠি গুলো পরিণত হয়েছে একটি ১০ বছর বয়সী শিশুর বৈশ্বিক জ্ঞান অর্জনের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতিগুলোর একটি। কারাগারে থাকা অবস্থায়, সবাই আশা করে আবেগপূর্ণ চিঠি আদান প্রদানের। নেহেরুর থেকেও হয়ত এটাই সবাই আশা করেছিল। কিন্তু, ইন্দিরাকে পাঠানো নেহেরুর চিঠিমালার সংগ্রহ পড়া হোলে বুঝতে পারা যায়, তার লেখা চিঠিগুলো ছিল সেসব, যা একজন বাবা তার মেয়েকে শেখাতে চান। তার লেখা চিঠিমালা একটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। বইটির নাম “লেটারস ফ্রম এ ফাদার টু হিজ ডটার”।

দুই কন্যার সঙ্গে জহরলাল নেহেরুতার চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যাবে বিশ্বকে অধিকতর ভালো করে তৈরি করতে কি কি করা উচিত। পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে শুরু করে মানব সম্প্রদায়ের বিকাশ। তিনি তার সেরা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন মেয়েকে শিক্ষা দিতে। পৃথিবীর বর্তমান অবস্থায় আসতে কতটা পরিবর্তন এবং বিকাশের ধাপের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তার মূলভাব তিনি তার মেয়েকে শেখানোর চেষ্টা করেছেন। তার চিঠিতে তিনি লিখেছেন, পৃথিবী কিভাবে তৈরি হয়েছে। সৃষ্টির আদিতে কারা ছিল। কোন জীব, কোন প্রাণী, কি কি উদ্ভিদ? ঋতু কিভাবে শুরু হলো এবং তার পরিবর্তন কেন হয়। তিনি শিলা এবং জীবাশ্ম ব্যবহার করে কীভাবে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণ করা হয় তাও লিখেছেন তার চিঠিতে। তার মেয়ের মধ্যে কৌতূহল উদ্দীপক অন্যতম একটি চিঠি ছিল কতটুকু পরিবর্তনের সাক্ষী এই পৃথিবী। নেহেরু তার নিজের সম্পর্কে লিখতেননা। তিনি লিখতেন না তার অর্জন, তার অনুভূতি নিয়ে। বরং মেয়েকে লেখার জন্যে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সামগ্রিক মানব ইতিহাস। তিনি লিখেছিলেন কীভাবে উপজাতিগুলোর গঠন হয়েছে। কীভাবে এত এত ভাষা তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে এমন করে বিষয়গুলোকে প্রকাশ করেছেন, তা ইন্দিরার শিশুমনের বিশ্বকে দেখার ধরন প্রভাবিত করে।

নেহেরু সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন, কীভাবে আদিম মানুষ একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করে। গুহায় আবিষ্কৃত ছবিগুলোর বর্ণনাও তিনি দেন। তিনি লিখেন- “একটি জিনিস খুবই কৌতূহলের। এই অসভ্য আদিম মানুষগুলো আঁকতে জানতো। অবশ্যই, তাদের কোনো কমল, পেন্সিল কিংবা রং তুলি ছিল না। তাদের আঁকার জন্যে ছিল পাথরের সূচ এবং ভোঁতা যন্ত্রপাতি। এসব ব্যবহার করে তারা গুহার ভেতরের দেয়ালে খুঁচে খুঁচে পশুর ছবি আঁকত।  কিছু কিছু ছবি খুব এ সুন্দর, কিন্তু অধিকাংশই আকৃতি।  তুমি জানবে যে, বিভিন্ন আকৃতি আঁকা সহজ, বাচ্চারা এভাবে আঁকার চেষ্টা করে। গুহাগুলো যেহেতু অন্ধকার ছিল সেহেতু, গুহামানবদের অবশ্যই কোনো আলোর উৎস ছিল”। সকল পিতাদেরই উচিত সন্তানকে সঠিক বৈশ্বিক  জ্ঞান প্রদান। এতে করে তাদের মূল্যবোধ বৃদ্ধি পাবে, বৃদ্ধি পাবে তাদের সচেতনতা।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস