ইজতেমায় আগত মুসল্লিরা যেভাবে কাটাবেন তিনদিন

ইজতেমায় আগত মুসল্লিরা যেভাবে কাটাবেন তিনদিন

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৩৯ ৯ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৯:২১ ৯ জানুয়ারি ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

বিশ্ব ইজতেমা। টঙ্গির তুরাগ তীরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই ইজতেমা। ইজতেমা তাবলিগ জামাতের পোগ্রাম হলেও সাধারণ মুসল্লিদের সেখানে যাওয়ার অনুমতি থাকে। তারও একটা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ব্যাপক জমায়েত ঘটে ইজতেমায়। তাই ইজতেমা বিশ্বের দ্বিতীয় ও বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ জমায়েত। 

মানুষের সমাগম অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা একেবারেই অপ্রতুল। আর এত মানুষের জন্য সুন্দর কোনো ব্যবস্থাপনা করা সম্ভবও নয়। স্থান, যাতায়াতের পথ, টয়লেট-গোসলখানাসহ সবকিছুতেই একটা সংকট বিরাজমান। তাই ইজতেমায় আগত মুসল্লিগণ যদি সবকিছুতে নিয়ম মেনে চলেন তাহলে তিনটা দিন পার করা সবার জন্য সহজ হয়ে যায়। সে দিকে লক্ষ্য করে কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হচ্ছে-

জিম্মাদারের নির্দেশনা মেনে চলা: ইজতেমাই শুধু নয়, ইসলামের নিয়ম-শৃঙ্খলার মূলে রয়েছে জিম্মাদারের আনুগত্য। তবে অবশ্যই তা শরীয়তের ভেতরে থেকে হতে হবে। শরীয়তের বাইরে গিয়ে কারো আনুগত্য করা জায়েজ নেই। তাবগিলের কাজের যত স্তর আছে, প্রত্যেক স্তরে একজন করে জিম্মাদার সাথী রয়েছেন। এলাকার মসজিদের জিম্মাদার, হালকার জিম্মাদার ও মার্কাজের জিম্মাদার ইত্যাদি।

ইজতেমায় রওয়ানা হওয়া থেকে নিয়ে সব কর্মকাণ্ডে জিম্মাদারের সকল নির্দেশানা মেনে চলতে হবে। জিম্মাদারও নিজে সব কাজ করার দায়িত্ব না নিয়ে, সাথীদের মাঝে কাজকে ভাগ করে দেবে। যেমন গাড়ি ভাড়া করার দায়িত্ব থাকলো কিছু সাথীর ওপর। তিন দিন থাকতে হলে, খাবার ও ব্যবহারের জন্য কিছু আসবারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই জিম্মাদারি থাকলো কিছু সাথীর ওপর। এভাবে কাজগুলোকে সাথীদের মাঝে ভাগ করে জিম্মাদারের দায়িত্ব হলে তাদেরকে তদারকি করা।

হেদায়েতি আলোচনা করে সাথীদেরকে আনা: তাবলিগের মৌলিক যে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে পালন হয়, অন্যতম হচ্ছে হেদায়েতি বয়ান। হেদায়েতি বয়ান শুনা ছাড়া কোনো সাথী তাবলিগে বের হতে পারে না। ইজতেমায় আসার সময়ও গুরুত্বের সঙ্গে সাথীদেরকে হেদায়েতের বয়ান দেয়া। হেদায়েতি বয়ানে গুরুত্বের সঙ্গে আসতে পারে, ইজতেমায় আসার লক্ষ-উদ্দেশ্য, অন্যের সামান অনুমতি ছাড়া ব্যবহারের গুরুতরতা, সময়ের হেফাজত ইত্যাদি। তাছাড়া হেদায়েতি বয়ানে আলোচনার জন্য তাবলিগের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ও আছে, সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা। মনে রাখতে হবে, সময় যত কমই হোক, কোনো সাথীকে যেন হেদায়েতি বয়ান ছাড়া ইজতেমায় আনা না হয়। অন্যথায় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখে আফসোস করেও কোনো লাভ হবে না।

যাত্রাপথে সচেতন থাকা: রওয়ানা দেয়ার আগেই সাথীদের একটি তালিকা তৈরি করা। রওয়ানা দেয়ার সময় সব সাথী ও প্রয়োজনীয় সামান গাড়িতে ওঠানো হয়েছে কী না খুঁজ-খবর নেয়া। পথে নামাজের বিষয় থাকলে ওঠার সময়ই চালকে জানিয়ে নামাজের জন্য গাড়ি বিরতি দেয়ার ব্যাপারে সম্মতি নিয়ে রাখা। গাড়ীতে ওঠা বা নামার সময় হুড়াহুড়ি না করা। ডান পা দিয়ে গাড়িতে ওঠা এবং আল্লাহর সাহায্যের জন্য দোয়া পড়া। নামার সময় ইজতেমায়ি সামানা আগে নামিয়ে সাথীদের মাঝে কয়েকজনকে দায়িত্ব দিয়ে দেয়া। বাকি সাথীরা গাড়ি থেকে নামার পর একজনকে দিয়ে পুরো গাড়ি ভালোভাবে দেখানো যে, কোনো কিছু রয়ে গেছে কী না। মনে রাখতে হবে, তাড়াহুড়া হচ্ছে, শয়তানের উস্কানি আর ধীরস্থীরতা আল্লাহর রহমত। অতএব, আমরা কোনো ক্ষেত্রেই তাড়াহুড়া করবো না।

ইকরামুল মুসলিমিন ও অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়া: দাওয়াত ও তাবলিগের ছয় উসুলের একটি হচ্ছে ইকরামুল মুসলিমিন তথা ছোটকে স্নেহ করা ও বড়কে সম্মান করা। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সমস্ত ভালো গুণের সমাহার ঘটে ছিলো। সব ক্ষেত্রে অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বিশেষভাবে আল কোরআনে আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘আর তারা নিজেদের ওপর অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয় যদিও তাদের বিশেষ প্রয়োজন থাকে।’ হিজরতের পর মদিনার আনসার সাহাবিরা নিজেদের সম্পদ মুহাজির সাহাবিদের মাঝে ভাগ করে দিয়েছিলেন। এমনও হয়েছে, কোনো কোনো সাহাবি বলেছেন, আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিচ্ছি আপনি তাকে বিবাহ করে নেন। তাহলে অন্যকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে তুলনা করা যায়! দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনত হচ্ছে, সাহাবায়ে কেরামের নমুনায় মেহনত। তাই ইজতেমার ময়দানে সে আদর্শের বাস্তবায়ন করতে হবে। সব সাথীদের সঙ্গে সদাচারণ করতে হবে। খাবার, ঘুমের জায়গা, গোসলের সুযোগ ইত্যাদি নিয়ে কোনো ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া যাবে না।

বয়ানের সময় সব সাথীদেরকে জমায়েত করে এক সঙ্গে বয়ান শুনা: ইজতেমার গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হচ্ছে বয়ান শুনা। রাসূল (সা.) বলেছেন, কিছু কিছু বয়ানে যাদু থাকে। অর্থাৎ যাদুর মতো মানুষের মনে আকর্ষণ করে। তাবলিগের মুরব্বিগণ সারা বিশ্বের ফিকির করেন। তাদের বয়ানে দরদ ও ব্যথা থাকে। মনযোগ দিয়ে যে কেউ তাদের আলোচনা শুনলে হৃদয়ে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। তাছাড়া তাবলিগের মূল বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হয়। তাই আলেমদের মুখের কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে, শুনার ব্যবস্থা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে না বসে, সবাই এক সঙ্গে বসিয়ে বয়ান শুনার ব্যবস্থা করা। বয়ানের প্রয়োজনীয় অংশ নোট করার জন্য সাথীদের তাকিদ দেয়া। বয়ানের পর অল্প সময় সাথীদের নিয়ে মোজাকারা বা বয়ানের পর্যালোচনা করা। দু’একজন থেকে বয়ানের কিছু অংশ শুনা। তাহলে বয়ানের অনেকটা হক আদায় হবে। অন্যথায় তাবলিগের এই ইজতেমায় এসে সাথীরা হতাশাও হয়ে যেতে পারেন।

তালিমে ও বিশেষ বিশেষ পোগ্রামে অংশগ্রহণ: ইজতেমার ময়দানে নিয়মিত তালিমের ব্যবস্থা এবং সাধারণদের জন্য কোরআনের মশকের ব্যবস্থা থাকে। জিম্মাদার সাথীদের দায়িত্ব হলো এগুলোর সুন্দর ব্যবস্থা করা। সাথীদের দায়িত্ব হচ্ছে, আগ্রহের সঙ্গে সেগুলোতে অংশগ্রহণ করা। কোরআন মশকের সময় সাথীদের যারা কোরআন শুদ্ধভাবে পড়তে পারেন, তাদের মাঝে অন্যদেরকে ভাগ করে দেয়া। আলেমগণের দায়িত্ব হলো সাধারণ লোকদেরকে কোরআনের মশক করিয়ে তাদের মাঝে কোরআন শিখার আগ্রহ সৃষ্টি করা। তালিমে আরবি হাদিস পড়ে তরজমা পড়তে পারেন এমন লোক ঠিক করা।

ইজতেমার ময়দানে বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর লোকদের নিয়ে কিছু বিশেষ পোগ্রাম হয়। স্কুলের শিক্ষক, মাদরাসার ওস্তাদ, ছাত্রদের নিয়ে যে প্রগ্রামগুলো হয় সেখানে গুরুত্বের সঙ্গে অংশগ্রহণ করা। জিম্মাদারগণ সময়, স্থানের বিষয় জেনে তাদেরকে সেখানে পাঠানোর ফিকির করবেন।

নামাজ ও তাহাজ্জুদের বিষয়ে গুরুত্বারোপ: নামাজ দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ রুকন। জামাতে নামাজের গুরুত্বও আমাদের জানা। ইজতেমার মতো এত বড় জামাত বাংলাদেশের আর কোথাও হয় না। তাই নামাজ জামাতে পড়ার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে মূল জামাতের শরীক হওয়ার জন্য চেষ্টা করা। ইজতেমায় তাহাজ্জুদের গুরুত্ব বৃদ্ধি করা। কারণ, ইজতেমার পরিবেশ এর জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই সাথীরা একে অন্যকে ডেকে দেন। তাই ইজতেমার মূল জামাত এবং রাতের তাহাজ্জুদ যেন না ছুটে সে ব্যাপারে আমাদের বিশেষ গুরুত্ব থাকতে হবে।

মোবাইল ইন্টারনেটে সময় নষ্ট করবো না: তাবলিগের নিয়ম হচ্ছে, এ কাজে বের হওয়ার সময় সঙ্গে মোবাইল না নেয়া। তারপরও জরুরতের কারণে মোবাইল নিতে হয়। তাই মোবাইলকে জরুরতেই ব্যবহার করবো। অযথা মোবাইল ব্যবহার করবো না। ফেসবুক বা ইন্টারনেটের অন্য কোনো প্রোগ্রামে সময় নষ্ট করবো না। মানুষের জন্য কিছু বিশেষ মুহূর্ত থাকে, যখন বান্দা যা চায় আল্লাহ তায়ালা তাই দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন। ইজতেমায় এত মানুষের মধ্যে অবশ্যই কিছু মকবুল বান্দা থাকেন। হয়তো তাদের ওসিলায় আল্লাহ তায়ালার সবার জন্য রহমতের দরজা খোলে দেন। আমি মোবাইল বা ইন্টারনেটের কারণে, সেই বিশেষ মুহূর্তে গাফেল থাকতে পারি। তখন আমার মতো হতভাগা আর কেউ হবে না। তাই অনর্থক সব কাজ থেকে ফারেগ হয়ে আল্লাহমুখী হয়ে বিভিন্ন ইবাদতের মধ্যেই সময় ব্যয় করা।

সকল ধরনের অপচয় থেকে বাঁচবো: ইজতেমার ময়দান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ শয়তানের সঙ্গ দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন আদৌ সম্ভব নয়। তাই ইজতেমায় অপচয় রোধ করতে হবে। খাবারের অপচয়, পানি ব্যবহারের অপচয়সহ যাবতীয় অপচয় থেকে দূরে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমি খাবার শেষ করতে কষ্ট করে খেয়েছি আর পাশের ভাই খাবার কম খেয়ে কষ্ট করেছে তাও কিন্তু এক ধরনের অপচয়। তাই সহযোগিতা ও নুসরতের ধারও ইজতেমায় উন্মোক্ত হতে পারে। তাহলে খাবার ও অর্থের অপচয় থেকে বাঁচা সহজ হবে।

কেউ কারো কষ্টের কারণ হবো না: ইজতেমায় এক সঙ্গে থাকা, খাওয়াসহ অসংখ্য মানুষের ব্যবস্থাপনা। তাই মুরব্বিদের পক্ষ থেকে যে নির্দেশনা থাকে তা মান্য করে চলা সবার জন্য জরুরি। তাদেরকে অমান্য করে কোনো কাজ করতে গেলেই তা দ্বারা অন্যদের কষ্ট হবে। তাই ডান দিক দিয়ে চলা, রাস্তায় না বসা, রান্নার জন্য নির্ধারিত জায়গা ব্যবহার করা, রাস্তায় ওজু-গোসলের পানি ফেলে কাদা না করার প্রতি বিশেষ খেয়াল করতে হবে। মনে রাখতে হবে ওই লোক খাঁটি মুসলমান যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।

সবকিছুর মূলে আল্লাহর সন্তুষ্টি: নিশ্চয় ইজতেমায় আসার উদ্দেশ জাগতিক কোনো ফায়দা হাসিল করা নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টিই এখানে মূল। তাই সব ক্ষেত্রে নিয়ত খালেস রাখা। এটাই ইসলামের মূল। ইজতেমারও লক্ষ্য মানুষের মাঝে নিয়তের বিশুদ্ধতার চেতনাকে জাগ্রত করা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে